Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯ , ১ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-০৩-২০১৯

এই ঈদের চাঁদ যেন সব ধর্মমতের মানুষের ঘরে আলো ছড়ায়

আবদুল গাফফার চৌধুরী


এই ঈদের চাঁদ যেন সব ধর্মমতের মানুষের ঘরে আলো ছড়ায়

রমজানের ঈদ এবং কোরবানির ঈদ নিয়ে প্রতিবছরই সংবাদপত্রে লেখা বেরোয়। একটি সংযমের মাস, অন্যটি ত্যাগের উৎসব। এই সংযম ও ত্যাগ নিয়ে আমিও কতবার লিখেছি, তার সীমা সংখ্যা নেই। নজরুল তো এই দুই ঈদ নিয়ে একটি গান, একটি কবিতাই লিখে ফেলেছেন। রমজানের ঈদ নিয়ে তিনি লিখেছিলেন গান, ‘রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ কোরবানির ঈদ নিয়ে লিখেছিলেন কবিতা, ‘ওরে হত্যা নয় আজ সত্যাগ্রহ শক্তির উদ্বোধন।’ এই গান ও কবিতা দুটিই একসময় প্লাবন সৃষ্টি করেছিল দেশে।

দুই ঈদ সম্পর্কেই নজরুল লিখেছিলেন, ‘সারাদিন উপবাসে থেকে ইফতার ও সেহিরতে যথেচ্ছ পান ভোজন করাটা ত্যাগ এবং সংযম কোনোটাই নয়। গরিব প্রতিবেশীকে অনাহার অর্ধাহারে রেখে নিজে ইফতারি-সেহিরর নামে পোলাও-কোর্মা খাওয়াটা সংযম নয়, বরং ভণ্ডামি।’ কোরবানির ঈদ সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘বনের পশুকে নয়, তুই আগে মনের পশুকে হত্যা কর। তা না পারলে কেবল পশু হত্যা কোনো কাজ দেবে না।’

রমজানের ঈদের নাম ঈদুল ফিতর। অর্থাৎ ফিতরের ঈদ। এই ঈদ বা উৎসব গরিব প্রতিবেশীকে শরিক না করে পালন করা যায় না। এ জন্য একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ গরিব প্রতিবেশীকে দিতে হয়। ইসলামে ফিতরা, জাকাত ইত্যাদি প্রবর্তন করা হয়েছিল গরিবদের প্রতি ধনীদের দায়িত্ব পালনের জন্য।

দুই ঈদের আরো একটি উদ্দেশ্য ছিল সমাজে শ্রেণি ব্যবধান ঘোচানো। গরিব আর ধনী, অভিজাত আর অনভিজাত পাশাপাশি বসে নামাজ পড়ছে, নামাজ শেষে মনিব আর চাকর কোলাকুলি করছে। দেড় হাজার বছর আগে এটি ছিল একটি বৈপ্লবিক ব্যবস্থা। বর্তমানে আরো উন্নত যুগের উন্নত সামাজিক ব্যবস্থার সময়েও এই দৃশ্য বিরল। নারীরা ঘোড়ায় চড়ে পুরুষের পাশাপাশি যুদ্ধ করে এই দৃশ্য দেখা ইসলামের প্রথম যুগেই সম্ভব ছিল। মোল্লাবাদের আবির্ভাবের ফলে ইসলামের এই মৌলিক আদর্শ, নারীমুক্তি, দাসমুক্তি, শ্রেণি সাম্য, আর্থিক সাম্য, অন্য ধর্মের প্রতি সম্মান ও সহিষ্ণুতা প্রায় বিলুপ্তির পথে।

ইসলামকে তার প্রকৃত আদর্শে ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য পরবর্তীকালে যেসব সংস্কারক চেষ্টা করেছিলেন, যেমন ইমাম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ি, ইমাম মালেক, ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল প্রমুখ সংস্কারকের বেশির ভাগকেই উগ্র মোল্লাবাদীরা হত্যা করেছিল। বাংলাদেশের সৌভাগ্য, সেই প্রাচীনকালে ব্রাহ্মণ্য শাসনের অত্যাচার-উত্পীড়নে অতিষ্ঠ এবং বর্ণবিভাগে বিভাজিত দেশটিতে প্রধানত পারস্য থেকে আগত ধর্ম প্রচারকরা ইসলাম প্রচার করেছেন। উত্পীড়িত মানুষ তাকে স্বাগত জানিয়েছে।

শ্রেণি বিভক্তিতে পীড়িত অস্পৃশ্য নিম্ন শ্রেণির হিন্দু ও বৌদ্ধরা দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করেছে। তাদের অস্পৃশ্যতা দূর হয়েছে। মানবাধিকার ফিরে পেয়েছে। পণ্ডিত মোতাহার হোসেন চৌধুরীর মতে, বাঙালির স্থানীয় কালচার তার জাতীয় কালচার। ইসলাম যে বহিরাগত কালচার সঙ্গে করে এনেছে, তা ধর্মীয় কালচার। এ দুইয়ের মিলনে-মিশ্রণে যে বাঙালি কালচার গড়ে উঠেছে, তা ধর্মনিরপেক্ষ কালচার। এই কালচারের প্রভাবে ধর্মীয় উগ্রতা কখনো প্রশ্রয় পায়নি। মিলন ও ভালোবাসায় সুফিবাদ, মরমি বৈষ্ণববাদ ইত্যাদি গড়ে উঠেছে।

ব্রিটিশ আমলেও বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের প্রধান উৎসব ছিল রমজানের ঈদ ও সর্বজনীন দুর্গাপূজা। রমজানের ঈদ ও দুর্গাপূজা উপলক্ষে শরৎকালে সরকারি অফিস-আদালত, স্কুল-কলেজ এক মাস ছুটি থাকত। শহরে কর্মরত মানুষ ছুটিতে গ্রামে ফিরে আসত। ঈদ ও পূজা উপলক্ষে হিন্দু ও মুসলমানের মধ্যে মিলন ঘটত। পাকিস্তান আমলে সামাজিক জীবন ও রাজনীতিতে ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতার বিভেদ বেড়ে ওঠে। দুই সম্প্রদায়ের বাঙালি জীবনেই তার ছাপ পড়ে।

বাংলাদেশ হিন্দু-মুসলমানের মিলিত সংগ্রামের পর স্বাধীনতা লাভ করায় অসাম্প্রদায়িক জাতীয়তার ভিত্তি শক্ত হবে; রমজানের ঈদ, দুর্গাপূজা, বৈশাখী উৎসব, ভাষা দিবস প্রভৃতি জাতীয় উৎসবে রূপান্তরিত হবে আশা করা হচ্ছিল। কিন্তু বাধা পড়ে উগ্র ওয়াহাবিবাদ, মওদুদীবাদ ইত্যাদি মতবাদের আবির্ভাবের ফলে। এই ওয়াহাবিবাদ থেকেই কট্টর জঙ্গিবাদ বা পলিটিক্যাল ইসলাম জন্ম নেয়। তা শুধু জাতীয় উৎসবগুলোকেই ধর্মীয় করেনি, জাতীয় রাজনীতিকেও ধর্মীয় কালচার দ্বারা প্রভাবিত করে যেসব ধর্মীয় উৎসব জনগণের মিলিত উৎসবে পরিণত হয়েছিল, তাতেও বিভাজন ঘটায়।

বাঙালির সমাজ এখন বিভাজিত সমাজ। তার হাজার বছরের মিশ্র সংস্কৃতি এখন ধর্মীয় সংস্কৃতি দ্বারা আচ্ছন্ন। স্বাধীনতাযুদ্ধে বাঙালি মুসলমান যতটা স্বদেশে ফিরেছিল, বিএনপি-জামায়াতের শাসন এবং মোল্লাবাদের উত্থানে ততটাই স্বদেশবিমুখ হয়েছে। এ অবস্থাকেই কবি শামসুর রাহমান বলেছিলেন, ‘অদ্ভুত উটের পিঠে চলেছে স্বদেশ।’ এই উটের পিঠ থেকে স্বদেশকে নামাতে সময় লেগেছে ২১ বছর। এই যুদ্ধ চলেছে ২১ বছরের বেশি এবং এখনো চলছে।

বাংলাদেশে রমজানের খুশির চাঁদ এখন খণ্ডিত। দুর্গাপূজার মণ্ডপ পুলিশ পাহারায় রাখতে হয়। এই অবস্থা থেকে জাতীয় উৎসবগুলোকে মুক্ত করতে হবে। আমাদের কৈশোরে রমজানের ঈদে হিন্দু ও বৌদ্ধরাও উৎসবে যোগ দিত। তারা নামাজ পড়তে আসত না। আসত উৎসবের খাওয়াদাওয়ায় যোগ দিতে। অনুরূপ আমরাও দুর্গা ও সরস্বতীর পূজার উৎসবের অংশে যোগ দিতাম। বৌদ্ধ পূর্ণিমার উৎসবে মেতে উঠতাম। বাঙালির সংস্কৃতি, সমাজ ছিল মিশ্র ও মিলিত। তার উৎসবও তাই। বাংলাদেশে তার হাজার বছরের লোকায়ত সমাজ ও সভ্যতা ফিরিয়ে আনতে হবে। না হলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অসম্পূর্ণ থাকবে। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলার বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না।

পশ্চিমবঙ্গের রাজধানী কলকাতায় একাধিকবার গড়ের মাঠে রমজানের ঈদের নামাজের বিশাল জামাতে যোগ দেওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। দেখেছি, মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধান রায়, সিদ্ধার্থ শঙ্কর রায় এই ঈদের জামাতে আসতেন। এখন আসেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁরা নামাজ পড়তে আসেন না। নামাজের আগে যে খুতবা পাঠ হয়, সেই সময় খতিবের পাশে বসেন। খুতবা পাঠ শেষ হলে মুসলমানদের ঈদ মোবারক জানান। তাদের সমস্যা ও অভিযোগ দূর করার প্রতিশ্রুতি দেন।

বাংলাদেশেও দুর্গাপূজায়, বুদ্ধপূর্ণিমায় বা উপজাতীয়দের কোনো ধর্মীয় উৎসবে যে দলের সরকারই ক্ষমতায় থাকুক, তারা যায়। যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী যখন মন্ত্রী, তিনিও পুলিশসহ দুর্গাপূজার মণ্ডপে গেছেন। সেটা ছিল লোক-দেখানো যাওয়া। একদিকে মন্ত্রী গেছেন পূজামণ্ডপে, অন্যদিকে তাঁর দলের লোকেরা মন্দিরে হামলা করেছে, মূর্তি ভেঙেছে। এইচ এম এরশাদের আমলে তো সরকারের নিযুক্ত গুণ্ডারা মন্দির ও মূর্তি ভেঙেছে। সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। অতঃপর বিশ্বজনমতের নিন্দা ও চাপের মুখে আবার সরকারি খরচে ভাঙা মন্দির মেরামত করেছে।

এই অবস্থা ভারতেও দেখা গেছে। মহররমের মিছিলে হামলা হয়েছে। ঈদের জামাতে বোমা মারা হয়েছে। মসজিদ ভাঙা হয়েছে। গরু কোরবানির জন্য সংখ্যালঘু মানুষ হত্যা করা হয়েছে। ভারতে ৭০০ বছরের পুরনো বাবরি মসজিদ ভাঙা হয়েছে। বাংলাদেশে পাকিস্তানি হানাদাররা হাজার বছরের প্রাচীন রমনা কালীমন্দির ভেঙেছে। একদিকে ভারতে দাপট দেখাচ্ছে হিংস্র হিন্দুত্ববাদ এবং বাংলাদেশে দাপট দেখাচ্ছে উগ্র ইসলামী জঙ্গিবাদ।

অথচ কোনো ধর্মেই হিংসাকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়নি। ধর্মে হিংসা ঢুকিয়েছে মোল্লাবাদীরা এবং উদ্দেশ্যপূর্ণ রাজনীতিকরা। একে রুখতে হলে ধর্মের পবিত্র অনুষ্ঠানগুলোকে মোল্লাবাদীদের খপ্পরমুক্ত করতে হবে। রমজানের ঈদ, দুর্গাপূজার মতো উৎসবগুলোকে সাম্প্রদায়িক মিলনের কেন্দ্র করে তোলার জন্য সরকারকেই উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে। আওয়ামী লীগের শাসনামলে অবশ্য সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি অনেকটাই ফিরে আসে। সংখ্যালঘুদের পূজা-পার্বণও অনেকটা হামলামুক্ত হয়। কিন্তু বড় কাজ হবে এই উৎসবগুলোকে সব ধর্মের মানুষের সম্মিলিত উৎসব করে তোলা। ইউরোপে যেমন খ্রিস্ট ধর্মের ক্রিসমাস উৎসব সব ধর্ম-বর্ণের মানুষই পালন করে।

রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আনন্দময়ীর আগমনের বাজনা যেন হিন্দুর ঘরেই সীমাবদ্ধ না থাকে, সকল ধর্মের মানুষের ঘরেই বেজে উঠে।’ আর নজরুল বলেছিলেন, ‘রমজানের ঈদের চাঁদ যেন কেবল মুসলমানের ঘরে আলো না ছড়িয়ে সকল ধর্মের মানুষের ঘরেই আলো ছড়ায়।’ এবারের রমজানের ঈদে আমাদের সবার প্রার্থনা হোক, এই চাঁদ যেন সব বিভেদ-বিবাদের মেঘ সরিয়ে ধর্ম-বর্ণ-নির্বিশেষে সবার ঘরে আনন্দের আলো ছড়ায়। সবার জন্য রইল ঈদ মোবারক।

আর/০৮:১৪/০৪ জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে