Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ২১ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৫ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৬-০২-২০১৯

সংকটময় ভূ-রাজনীতি এবং শেখ হাসিনার বিদেশ সফর

আবদুল গাফফার চৌধুরী


সংকটময় ভূ-রাজনীতি এবং শেখ হাসিনার বিদেশ সফর

আমাদের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবার দেশে ঈদ করবেন না। তিনি উল্ক্কাবেগে বিদেশ ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশে অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি আরও বাড়ানোর জন্য। শুধু অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক কারণেও প্রধানমন্ত্রীর এই ঘন ঘন বিদেশ সফর তাৎপর্যপূর্ণ। বলদর্পী ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধবাদী নীতির দরুন মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের সম্প্রসারণ ঘটার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া বেইজিং-ওয়াশিংটন ট্রেড ওয়ার তো সারাবিশ্বের জন্যই এক বিরাট বিপদাশঙ্কা তৈরি করেছে।

বাংলাদেশ ছোট দেশ এবং উন্নয়নশীল দেশ। কিন্তু বিশ্বায়নের থাবা থেকে এই দেশটিও মুক্ত নয়। বিশ্বায়ন অবশ্যই এখন একটি জটিল প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে চলছে। 'চীন-মার্কিন ভাই ভাই'য়ের যুগ শেষ হয়েছে। চীন এখন অর্থনৈতিক সুপার পাওয়ার। বিশ্বে আমেরিকান স্বার্থ ও প্রভাবের সঙ্গে লড়াই করার শক্তি রাখে। চীন ও ভারতের আগেকার প্রত্যক্ষ বিবাদের মধ্যে একটা 'থ' দেখা দিলেও এশিয়া ও আফ্রিকায় অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের প্রতিযোগিতা থেকে তারা বিরত হয়নি। মধ্যপ্রাচ্যে পুতিনের রাশিয়ার ভূমিকাও ট্রাম্পের আমেরিকার স্বার্থ ও আধিপত্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

এই সাংঘর্ষিক বিশ্ব পরিস্থিতিতে সঠিক মিত্র বাছাই বাংলাদেশের মতো একটি ছোট ও উন্নয়নশীল দেশের জন্য কম সমস্যা নয়। এ ক্ষেত্রে শেখ হাসিনা দীর্ঘকাল ক্ষমতায় থাকায় তার প্রাগমেটিক নীতি বাংলাদেশকে শুধু সমস্যা কাটিয়ে উঠতে সাহায্য করেনি; পরস্পরের মিত্র নয় এমন দেশগুলোর সঙ্গেও সম্পর্ক ও সহযোগিতা রক্ষা এবং তাকে আরও গভীর করেছে।

প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরের মধ্যে জাপান এবং সৌদি আরবও রয়েছে। বাংলাদেশে চীনের বিনিয়োগ বিপুলভাবে বাড়ছে। অর্থনৈতিক সহযোগিতার সঙ্গে রাজনৈতিক মৈত্রীও বাড়ছে। তাতে বাংলাদেশে ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনের আগে আওয়ামী লীগবিরোধী রাজনৈতিক জোট ও সুশীল সমাজের একাধিক অর্থনৈতিক পণ্ডিত আশা করছিলেন, শেখ হাসিনা চীনের সঙ্গে সহযোগিতার নীতি অনুসরণ করায় চীনের প্রতি অসন্তুষ্ট ভারত ও জাপান হাসিনা সরকারের প্রতি বিরাগ হবে এবং ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনে সহযোগিতার হাত গুটিয়ে নেবে। চাই কি বিএনপি জোটকে ক্ষমতায় আসতে সাহায্য জোগাবে।

তাদের এই আশা সফল হয়নি। নরেন্দ্র মোদি একটি হিন্দুত্ববাদী-সাম্প্রদায়িক দলের নেতা হওয়া সত্ত্বেও বাংলাদেশে অসাম্প্রদায়িক আওয়ামী লীগ সরকারের দিকে মৈত্রী ও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন এবং তা ভারতের স্বার্থেই। জাপানও বাংলাদেশে তাদের অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন প্রকল্পে সাহায্য অব্যাহত রেখেছে। চীনেরও ঋণ ও সাহায্যদান বাড়ছে বৈ কমছে না।

শেখ হাসিনার বিদেশনীতি এ পর্যন্ত বড় সাফল্য দেখিয়েছে একটা বড় ধরনের সমস্যার মুখোমুখি অঞ্চলটিতে- অর্থাৎ মধ্যপ্রাচ্যে। এখানে এখন দুটি শক্তি ব্লক। একটি সৌদি-ইসরায়েল, অন্যটি ইরান-সিরিয়া-তুরস্ক ব্লক। সৌদি-ইসরায়েল ব্লকের পেছনে আমেরিকা এবং ইরান-সিরিয়া-তুরস্কের পেছনে রাশিয়া। এখানে বাংলাদেশকে ইসরায়েলের সম্পর্ক এড়িয়ে সৌদি আরবের সঙ্গে সম্পর্ক ও সহযোগিতা বাড়াতে হচ্ছে। সৌদির সঙ্গে অর্থনৈতিক বিনিয়োগ ও উন্নয়ন সাহায্যের বড় বড় চুক্তি হচ্ছে। তাতে ইরান, সিরিয়া ও তুরস্কের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের অবনতি ঘটেছে- এ কথা বলা যাবে না। অবশ্য মধ্যপ্রাচ্য সংকট আরও গভীর ও জটিল হলে বাংলাদেশকে পরিস্থিতি বুঝে পদক্ষেপ নিতে হবে। বর্তমানে রাশিয়া ও আমেরিকার সঙ্গে একই সঙ্গে সুসম্পর্ক অক্ষুণ্ণ রাখা বর্তমান সরকারের কূটনৈতিক সাফল্যই বলতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর সফর তালিকায় সৌদি আরব ও জাপান দুটি দেশই থাকাতে মনে হয় মধ্যপ্রাচ্যে এবং দূরপ্রাচ্যেও শেখ হাসিনা বাংলাদেশের অবস্থান আরও শক্ত করার কাজে আগ্রহী। তাতে যারা মনে করছেন বা প্রচার চালাচ্ছেন চীনের সঙ্গে ঢাকার বর্তমান মৈত্রীতে চিড় ধরতে পারে অথবা চীনের সঙ্গে ঢাকার সহযোগিতা বাড়াতে দিল্লি রুষ্ট হতে পারে বা হয়েছে; বর্তমান ঘটনাপ্রবাহ তা প্রমাণ করে না।

বর্তমান ঘটনাপ্রবাহে মনে হয় চীনের দ্রুত অর্থনৈতিক আধিপত্য বিস্তারের ঘোড়া হঠাৎ হোঁচট খেয়েছে। ফলে চীন বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশগুলোকে আরও কাছে টানতে ব্যস্ত। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক নির্বাচনেও চীনের সেই ভূমিকার পরিচয় পাওয়া গেছে।

গত নভেম্বর মাসে পাকিস্তান চীনের সঙ্গে সম্পাদিত ১৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের বাঁধ নির্মাণের চুক্তি বাতিল করে। এটা মার্কিন চাপের ফল বলে অনেক পর্যবেক্ষক সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। চীনের 'ওয়ান বেল্ট ওয়ান রোড' পরিকল্পনা বিরাট বাধার মুখে পড়েছে। এই পরিকল্পনা সফল করতে হলে বিশ্বের ৮০টি দেশের সহযোগিতা দরকার। পরিকল্পনাটি সফল হলে ২০২২ সালের মধ্যে সারাবিশ্বে চীনের অর্থনৈতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করা যেত।

কিন্তু ইউরোপীয় ইউনিয়ন এই প্রকল্পে সাড়া দিচ্ছে না। ভারতের মনোভাব অনিশ্চিত। ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া, কম্বোডিয়া এই প্রকল্পে যোগ দিতে দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখাচ্ছে। নেপাল, মিয়ানমারও চীনের সঙ্গে এ সম্পর্কিত চুক্তি বাতিল করেছে। শ্রীলংকায় চীনের বিনিয়োগনীতির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ চলছে। তাদের অভিযোগ, চীন যে আর্থিক সাহায্য দিচ্ছে শ্রীলংকাকে তার সুদ পরিশোধ করতেই দেশটির সরকারি আয়ের ৯০ শতাংশ চলে যায়।

আগে আমেরিকান সাহায্য ও ঋণদান সম্পর্কে উন্নয়নশীল দেশগুলোয় যে অভিযোগ উঠেছিল, সেই অভিযোগ উঠছে এখন চীনের বিরুদ্ধে। সিঙ্গাপুরের এক ব্যবসায়ী বলেছেন, পুঁজিবাদী দেশগুলোর তথাকথিত আর্থিক সাহায্য ও ঋণে লাভ ও লোভের যোগ থাকে। আগের চীনের এটা ছিল না। পুঁজিবাদী অর্থনীতির দেশ হওয়ার পর তার লাভ-লোভের নীতি এ দুর্নীতিও চীনের অর্থনীতিতে যুক্ত হয়েছে।

বর্তমান পরিবর্তিত অবস্থায় আমেরিকার সঙ্গে ট্রেড ওয়ার সামনে রেখে চীন কোনো উন্নয়নশীল দেশেই বিনিয়োগের ব্যাপারে ঝগড়া বাধাবে অথবা কোনো ধরনের পিছুটান নীতি নেবে বলে মনে হয় না। চীন-আমেরিকা ট্রেড ওয়ারে বিশ্ব উত্তেজনা বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্য সংকটে ইরান যদি হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিতে বাধ্য হয়, তাহলে বিশ্ববাজারে তেল সরবরাহ সংকট তৈরি হবে এবং ছোট-বড় সব দেশেই গুরুতর অবস্থা দেখা দেবে, যা হবে সুয়েজ সংকটের চেয়েও বড় সংকট।

বিদ্যমান বিশ্ব পরিস্থিতি পেছনে রেখেই বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিদেশ সফর করছেন। একই সঙ্গে মধ্যপ্রাচ্য এবং দূরপ্রাচ্যের মাটিতে পা রেখেছেন। অতীতে অনেক সংকট- দেশীয় এবং বিদেশীয় দুই-ই তার সরকার বিস্ময়কর কৃতিত্বের সঙ্গে মোকাবেলা করেছে এবং নিজের দেশকে রক্ষা করেছে। একবার তারই সরকারের আমলে এক প্রচণ্ড ঝড় ও প্লাবনে বিবিসি প্রেডিকসন করেছিল, 'কমপক্ষে দুই লাখ লোকের ঝড়ে এবং অনাহারে মৃত্যু হবে।' এটা সত্য হয়নি। হলে সরকারের পতন হতো। হাসিনা অনাহারে একজনকেও মরতে দেননি। মহাপ্লাবনও সাফল্যের সঙ্গে মোকাবেলা করেছেন।

পদ্মা সেতু প্রকল্পেও ড. ইউনূস ও বিশ্বব্যাংকের চক্রান্তের কাছে তিনি মাথানত করেননি। পদ্মা প্রকল্প এখন বাস্তবায়িত হচ্ছে। বর্তমানেও ভূ-রাজনীতি ও অর্থনীতির সংকট তিনি কাটিয়ে উঠতে পারবেন। চীন ও ভারতের সঙ্গে তিনি সমান সহযোগিতা ও সম্পর্ক রক্ষা করতে পারবেন, তা আশা করা যায়। এটা মধ্যপ্রাচ্যেও সত্য হবে। লক্ষ্য রাখা দরকার- চীন, ভারত, আমেরিকা যে দেশেরই ঋণ বা সাহায্য হোক তা যেন আমাদের উন্নয়নের আশি বা নব্বই শতাংশকে গ্রাস করতে না পারে। আমার পাঠকদের সবাইকে ঈদ মোবারক।

আর/০৮:১৪/০২ জুন

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে