Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৭ জুন, ২০১৯ , ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-২৭-২০১৯

টেলিভিশন মিডিয়া: বিকল্প চিন্তার এখনই সময়

খ. ম. হারূন


টেলিভিশন মিডিয়া: বিকল্প চিন্তার এখনই সময়

যে টেলিভিশন চ্যানেলগুলোর আকাশ ছোঁয়ার কথা ছিলো সেগুলো (অধিকাংশ) যে এখন বঙ্গোপসাগরে হাবুডুবু খাচ্ছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু কেনো এমন হচ্ছে, তাও শুধু বাংলাদেশে, তা নিয়ে ভাবার সময় এসেছে। আবদুল্লাহ আল মামুনের নাটকের ভাষায় বলা যায় – এখনই সময়। আমারা যদি আমাদের নিজেদের উদ্ধার না করি তা হলে কে করবে?

বুধবার (২২ মে) সকালে ফেসবুক পেজে এমন একটি মন্তব্য লিখেছিলাম। শুনতে চেয়েছিলাম অন্যদের কাছ থেকেও। এরপর একের পর এক প্রতিক্রিয়া মন্তব্য আসতে থাকে। মনে হলো সেগুলো গুছিয়ে তুলে ধরা প্রয়োজন।

লেখক, নাট্যকার ও পরিচালক শাকুর মজিদই প্রথম মন্তব্যটি করলেন। সেটি দিয়ে শুরু করছি। তিনি লিখেছেন- ‘লাইসেন্স বাণিজ্যের কারণে প্রাইভেট টেলিভিশনগুলো শুরু থেকেই বেহাতে চলে গিয়েছিল। আর হাতে আসেনি।’

অনেক সময় আমরা সমস্যার গভীরে ঢুকতে পারিনা। একজন আরেকজনের উপর দোষ চাপিয়ে দেই। টেলিভিশন চ্যানেলগুলো যদি ভালো অনুষ্ঠান করে মুনাফা করতে পারতো, সেই সাথে পেশাদারিত্বের সাথে চলতে পারতো তাহলে তা সবার জন্য ভালো হতো। কিন্তু তাতো হয়নি।

অধিকাংশ ক্ষেত্রে মালিক নিজেই ড্রাইভিং সিটে বসে গেছেন কোনোরকম প্রশিক্ষণ ছাড়াই। কোনোরকম অভিজ্ঞতা ছাড়াই। নতুন সৃজনশীল অনুষ্ঠান নিয়ে কোনো পরিকল্পনা নেই। কোনো বাজেট নেই অনুষ্ঠান তৈরি করার। সুতরাং দর্শকরা বিকল্প রাস্তা খুঁজে নিয়েছে। অন্যদিকে পেশাদার সাংবাদিক, অনুষ্ঠান নির্মাতারা চাকুরি হারাচ্ছে। অধিকাংশ প্রডাকশন হাউস বন্ধ হয়ে গেছে। চ্যানেলগুলোও বন্ধ হবার পথে।

বাবু চৌধুরী নামে একজন ভারতীয় চলচ্চিত্র পরিচালক, যিনি কলকাতার কয়েকটি টেলিভিশন চ্যানেলের জন্য ধারাবাহিক নির্মাণ করছেন। বাংলাদেশের টিভি মিডিয়াতেও তার রয়েছে কাজের অভিজ্ঞতা। তিনি সম্প্রতি একটি মন্তব্য করেছেন। যা এখানে তুলে ধরতে চাই। তিনি বলেছেন, “বাংলাদেশি চ্যানেলের মালিকদের এত হস্তক্ষেপ যে সেখানে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ কম। ভারতীয় চ্যানেলে দীর্ঘদিন কাজ করার ক্ষেত্রে দেখেছি যে মালিক কোনোদিনও আসেননি বা তার সরাসরি কোনো হস্তক্ষেপ নেই প্রোগ্রামের ব্যাপারে। একটি প্রোগ্রাম চ্যানেলের ক্রিয়েটিভ টিম থাকে, গুনগত মান বিচার করেই কোনো প্রোগ্রামকে শুটিংএ যাওয়ার অনুমতি দেওয়া হয়। গল্প বাছাই থেকে ওয়ান লাইনার করা, পর্বে ভাগ করা, অভিনেতা নির্বাচন, সেট রেডি করা, পোশাক পরিকল্পনা করা, স্ক্রিপ্ট লেখা সব মিলিয়ে দুই মাস সময় তো দেওয়া হয়। এর পরে শুটিং। কিন্তু সবটাই চ্যানেল এর ক্রিয়েটিভ টিম ও প্রযোজকের ক্রিয়েটিভ টিম বসে করে। চ্যানেল মালিক এরমধ্যে মাথা গলান না। বাংলাদেশের নাটকগুলো এতো জনপ্রিয়, আমরা এদেশে (ভারত) বসে ইউটিউবে দেখি, তাহলে চ্যানেলে সেটি হবে না কেন? অনেক বছর আগে যখন ভারতীয় স্যাটেলাইট চ্যানেলেগুলোর রমরমা অবস্থা ছিলোনা, তখন আমরা আলাদা এন্টেনা লাগিয়ে বাংলাদেশ টেলিভিশন এর প্রোগ্রাম দেখতাম। নিশ্চয় সে যুগ ফিরে আসবে, যখন স্বাধীনভাবে পরিচালক লেখকদের কাজ করতে দেওয়া হবে আর বিজ্ঞাপনের রাশ টানা হবে।”

বাংলাদেশ টেলিভিশন যা করে দেখাতে পেরেছে এখনকার প্রাইভেট চ্যানেলগুলো তা করতে পারছে না কেনো, সে কথার অনেক উত্তর বাবু চৌধুরীর এই মন্তব্যে পাওয়া যাবে।

আফরোজা চৈতি বাংলাদেশের টিভি চ্যানেলের একজন গুণী প্রযোজক। বিভিন্ন সময়ে অনেক ভালোমানের অনুষ্ঠান নির্মাণ করেছেন। তিনি এখন আর চ্যানেলের জন্য কাজ করেন না। অত্যন্ত ক্ষোভের সাথে চৈতি বলেছেন, ‘চ্যানেলের এই দুরাবস্থা নিয়ে ভাবনা আরোও আগে শুরু করা দরকার ছিলো। এখন শুধুই তাকিয়ে তাকিয়ে এর ধ্বংস দেখা ছাড়া কিছুই করণীয় নেই। একটা বিশাল ইন্ডাস্ট্রি, যেখানে লক্ষ লোকের কর্মসংস্থানের সুযোগ ছিলো, সুযোগ ছিলো ভারতীয় চ্যানেলগুলোকে টেক্কা দিয়ে দাঁড়ানোর, সেখানে শুধুমাত্র দলীয়করণ আর তেলবাজির রাজনীতিতে তলিয়ে গেলো একটি শিল্প। কিছুই নেই আর অবশিষ্ট। বিকল্প প্রয়োজন।’

সত্যিই বিকল্প প্রয়োজন। বাংলাদেশ মেধাবী মানুষের দেশ। সৃজনশীল মানুষের দেশ। সনাতনি ভাবনা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

অষ্ট্রেলিয়া থেকে বিশিষ্ট টিভি অনুষ্ঠান সংগ্রাহক, প্রকৌশলী কাজল রিপনের মন্তব্য, ‘এটা ভয়াবহ বিপদ সংকেত। গুনগত মানের চাইতে আর্থিক মুনাফার ব্যাপারটা বড়ো করে দেখা হচ্ছে। এ ব্যাপারে চ্যানেলগুলোর পজিটিভ ভূমিকা জরুরি প্রয়োজন।’

কিন্তু চ্যানেলগুলিতো মুনাফাও করতে পারছে না। সঠিকভাবে পরিচালিত হলে দক্ষ মানুষের হাতে চ্যানেল থাকলেইতো মুনাফার প্রশ্ন আসবে আমাদের।

আজাদুল হক। দীর্ঘ সময় যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছেন। অত্যন্ত অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন প্রকৌশলী এবং অনুষ্ঠান নির্মাতা, তার প্রশ্ন “কোনো রকম বিজ্ঞাপন ছাড়া শুধু সাধারণ মানুষ এবং ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের অনুদানে চলা একটি সুস্থ ভাবনা-চিন্তার টিভি চ্যানেলের স্থান আছে কি?”

তিনি প্রশ্ন রেখেছেন। এখন তা বাস্তবে করে দেখাবার সময় এসেছে। মনে রাখা দরকার টিভি মাধ্যমের সম্প্রচার কৌশল কিন্তু পরিবর্তন হয়ে গেছে। ঘরে বসেও একটি চ্যানেলকে সারা বিশ্বের দর্শকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া যায়। জনপ্রিয় করা যায়।

সঙ্গীত পরিচালক শামসুল হুদা’র মন্তব্য, ‘শ্রদ্ধেয় খ ম হারূন ভাই মিডিয়ার বর্তমান প্রেক্ষাপট চিন্তাভাবনা করে একটা সমস্যা চিহ্নিত করেছেন, আর কেন করেছেন জানি। উনার কষ্টের জায়গা থেকেই এই প্রশ্নের অবতারণা করেছেন, কারণ জীবনের বেশিরভাগ সময় উনি এই মিডিয়ার সাথেই কাটিয়েছেন আর স্বাধীনতা উত্তরকালে তাঁর মতো একঝাঁক সংস্কৃতিকর্মীর অক্লান্ত পরিশ্রমেই এই মিডিয়া গড়ে উঠেছিলো, যা নিয়ে আমাদের গর্বের শেষ ছিলো না। আজ এই সময়ে এসে আমরা আগের তুলনায় উন্নতি তো করতে পারিইনি বরং আমাদের অনুষ্ঠানের মান আরও নিম্নগামী হয়েছে। এর কারণ মনে হয় যাকে তাকে ধরে এনে চ্যানেলের কর্ণধার বানিয়ে দেয়া। বর্তমান প্রজন্মের ছেলেমেয়েরা বিকল্প মিডিয়া ইউটিউব আর ফেসবুক পেইজের দিকে ঝুঁকে পড়েছে। সেই সাথে আছে আইপিটিভি। অনেকেই এখানে কাজ করছেন কিন্তু তারা প্রশিক্ষিত নন, আর এখানে ৮০% কনটেন্ট ভালগার আর সুরসুরি মার্কা কমেডিনির্ভর। যদি প্রকৃত নির্মাতারা ওনাদের মেধা এখানে প্রয়োগ করেন আমার মনে হয় এই সাইট অবশ্যই গ্রহনযোগ্য হবে।’

সাংবাদিক রনজক রিজভী বললেন, ‘যাদের মেধা আছে, তাদের টাকা নেই। এতোবড় বিনিয়োগ। তাই অন্যরা সুযোগ নিচ্ছেন। পেশায় লোক বাড়ছে, পেশাদারিত্ব হারিয়ে যাচ্ছে। সময় ফুরিয়ে গেছে। যখন কোনো অপরাধী অপরাধ করে টিকে যায়, তখন সে ধরেই নেয় সেখানেই তার সুখ। আমাদেরও একই দশা।’

আমি আর কি বলবো। এখন আপনারাই বলুন।

লেখক: নাট্য নির্মাতা ও টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব।

আর/০৮:১৪/২৭ মে

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে