Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৮ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-২৪-২০১৯

একে অপরের সহযোদ্ধা

সেলিনা হোসেন


একে অপরের সহযোদ্ধা

দুটি অসাধারণ পঙিক্ত বাংলাদেশের মানুষের জাতিগত বৈশিষ্ট্যকে অদম্য স্পৃহায় ধারণ করেছে। যে দুজন মানুষ এই অসাধারণ পঙিক্ত উচ্চারণ করেছিলেন, তাঁদের একজন কবি কাজী নজরুল ইসলাম, অন্যজন রাজনীতিবিদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান।

পঙিক্ত দুটি হলো : ‘বল বীর—বল উন্নত মম শির।’ অন্যটি ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না।’

একজন সাহিত্যের মাধ্যমে বাঙালির গৌরবকে সাহসের সঙ্গে উচ্চারণ করেছেন। অন্যজন বাঙালিকে প্রতিবাদী চেতনায় প্রদীপ্ত করেছিলেন। এই অর্থে একজন সংস্কৃতির কবি। অন্যজন রাজনীতির কবি। সংস্কৃতি এবং রাজনীতি জনজীবনের প্রবহমান ধারায় এক অসাধারণ বলয়। এই বলয় ছাড়া মানুষের জীবনচর্চা পরিশুদ্ধ হয় না। সংস্কৃতি জীবনকে পরস্ফুিটিত করে। রাজনীতি জীবনকে গতিময় করে। স্বৈরাচারী শাসন যেমন জনজীবনের কাম্য নয়, তেমনি অপরিশীলিত সংস্কৃতির চর্চা জনজীবনের কাম্য নয়। স্বৈরাচারী শাসন রুদ্ধ করে মানবিক অধিকারের খোলা প্রান্তর। অপরিশীলিত সংস্কৃতি ঘটায় মূল্যবোধের অবক্ষয়। সংস্কৃতি যেকোনো জাতির শেকড়ের গভীরতা। আত্মপরিচয়ের গভীরতম উৎস।

১৯২২ সালে প্রকাশিত হয়েছিল ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। দেশে তখন ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন চলছে। ভারতবর্ষের স্বাধীনতার জন্য মুক্তিপাগল মানুষ মরিয়া হয়ে উঠেছে। নজরুলই একমাত্র কবি, যিনি স্বাধীনতার পক্ষে লড়াকু সৈনিক হয়ে উঠেছিলেন। ব্রিটিশ সরকার তাঁকে জেলে ঢুকিয়েছিল। তিনি তাঁর ‘ধূমকেতুর পথ’ নিবন্ধে লিখেছিলেন, “সর্বপ্রথম ‘ধূমকেতু’ ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা চায়। স্বরাজ-টরাজ বুঝি না, কেননা ও কথাটার মানে এক এক মহারথী এক এক রকম করে থাকেন। ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির অধীন থাকবে না। ভারতবর্ষের সম্পূর্ণ দায়িত্ব, সম্পূর্ণ স্বাধীনতা রক্ষা, শাসনভার সমস্ত থাকবে ভারতীয়দের হাতে। তাতে কোনো বিদেশির মোড়লি করবার অধিকারটুকু পর্যন্ত থাকবে না। যাঁরা এখন রাজা বা শাসক হয়ে এ দেশে মোড়লি করে দেশকে শ্মশান-ভূমিতে পরিণত করেছে, তাঁদের পাততাড়ি গুটিয়ে, বোঁচকা-পুঁটলি বেঁধে সাগরপারে পাড়ি দিতে হবে। প্রার্থনা বা আবেদন-নিবেদন করলে তাঁরা শুনবেন না। তাঁদের অতটুকু সুবুদ্ধি হয়নি এখনো। আমাদের এই প্রার্থনা করার, এই ভিক্ষা করার কুবুদ্ধিটুকুকে দূর করতে হবে। পূর্ণ স্বাধীনতা পেতে হলে সকলের আগে আমাদের বিদ্রোহ করতে হবে, সকল কিছু নিয়ম-কানুন বাঁধন-শৃঙ্খল মানা নিষেধের বিরুদ্ধে।” শুধু কবিতা লিখে নয়, পত্রিকা প্রকাশ করেও অনবরত মানুষকে বিদ্রোহ করার পক্ষে উজ্জীবিত করেছেন কবি। তিনি ভারতবর্ষের এক পরমাণু অংশও বিদেশির হাতে থাকবে না বলে ঘোষণা দিয়েছিলেন। চেয়েছিলেন পূর্ণ স্বাধীনতা।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান উপমহাদেশের মাটিতে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের স্থপতি। ১৯৪৭ সালে ভারতবর্ষ থেকে ইংরেজ চলে যাওয়ার ঘটনা এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম বিদ্রোহী কবি দেখে যেতে পারেননি। ১৯৪২ সালে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা এমনই ছিল যে শুধু শারীরিক অসুস্থতা নয়, মানসিকভাবেও তিনি অসুস্থ হয়ে যান এবং বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েন। বেঁচে থাকার শেষ শর্ত ছিল নিঃশ্বাস-প্রশ্বাস। এই কবিকে আপন অন্তরে ধারণ করেছিলেন বঙ্গবন্ধু। তিনি ভোলেননি স্বাধীনতার জন্য এই কবির অদম্য স্পৃহার বাণী। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে তাঁর মুত্যৃকে সম্ভব করেছিলেন বঙ্গবন্ধু—দেশটি বাঙালির, বাংলা ভাষা সাংবিধানিকভাবে সে দেশের রাষ্ট্রভাষা। বাংলা ভাষার একজন কবির স্বপ্নের মৃত্যু হয়েছিল ইতিহাসের হাত ধরে। প্রথমে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভারতবর্ষ ভাগ হয়েছিল। তার ২৪ বছর পরে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন হলো বাংলাদেশ। একজন কবির সাংস্কৃতিক চৈতন্যের সঙ্গে অদ্ভুত যোগ ঘটল আর একজন মানুষের রাজনৈতিক চৈতন্যের। বড় প্রেরণাদায়ক এই যোগাযোগ।

বঙ্গবন্ধু তাঁর ৭ই মার্চের ভাষণে তর্জনী তুলে পরিষ্কার বলেছিলেন, ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না।’ বাক্যটি গভীরভাবে বিশ্লেষণের দাবি রাখে। তিনি প্রমিত বাংলা ব্যবহার করলে বলতেন, ‘আর দাবিয়ে রাখতে পারবে না।’ তিনি প্রমিত বাংলা ব্যবহার করেননি। আঞ্চলিক শব্দ সহযোগে, আঞ্চলিক ক্রিয়াপদ ব্যবহার করে আঞ্চলিক টানে একটি প্রবল বিদ্রোহী পঙিক্ত উচ্চারণ করে বাঙালি জাতিসত্তার হৃদয়ের বিশাল দরজা খুলে দিয়েছেন, যে দরজাপথে বেরিয়ে এসেছে বাঙালি চরিত্রের যাবতীয় বৈশিষ্ট্য। বাঙালির চরিত্র প্রতিরোধের, প্রতিবাদের। বৃহত্তর স্বার্থে জীবনদানে কুণ্ঠিত নয় বাঙালি।

এভাবেই একজন বাঙালি কবি এবং বাঙালি রাজনীতিবিদ ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ বাঙালি হন। এভাবেই তৈরি হয় সংস্কৃতি ও রাজনীতির বন্ধন। একজন সৃজনশীল মানুষ তাঁর সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে তাঁর গণমানুষ, সমাজ ও রাষ্ট্রের পরিস্থিতি নিজের প্রজ্ঞায় বিশ্লেষণ করেন। তা আপন সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে পৌঁছে দেন সমাজের সর্বস্তরের মানুষের কাছে। একজন রাজনীবিদও সৃজনশীল মানুষ, যখন তিনি গণমানুষের মর্যাদার বোধকে আলোয় নিয়ে আসেন। তাঁকে বুঝিয়েছেন কী তাঁর অধিকার, কোথায় তাঁর লড়াই।

৭ই মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণে ‘আর দাবায়ে রাখতে পারবা না’ বলার পরে বলেছিলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ বঙ্গবন্ধুই সেই অসাধারণ মানুষ, যিনি এই উপমহাদেশে একটি ভাষাভিত্তিক স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্নদ্রষ্টা ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে বাঙালি জাতি সেই রাষ্ট্রের স্বাধীনতা অর্জন করেছিল। এই রাষ্ট্রটি বিদ্রোহী কবির ভাষার রাষ্ট্র, যে ভাষায় তিনি তাঁর গণমানুষকে মাথা উন্নত রাখার ডাক দিয়েছিলেন। নজরুলই একমাত্র বাঙালি কবি, যিনি ভারতবর্ষের এক ইঞ্চি ভূমিও পরাধীন দেখতে চাননি। এ জন্য ঔপনিবেশিক সরকারের জেল-জুলুমের শিকার হয়েছিলেন। ধর্মঘট পালন করেছিলেন, তাঁকে জেলে অনশন ভাঙার ডাক দিয়ে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন,

Our literature claims you. রবীন্দ্রনাথ তাঁকে অনশন ভাঙার আহ্বান জানিয়েছিলেন। তাঁর সৃজনশীল শক্তিকে অভিনন্দন জানিয়ে নিজের লেখা বই উৎসর্গ করেছিলেন। বিশ্বকবি একজন স্বাধীনতার পক্ষে লড়াকু কবিকে নন্দিত করেছিলেন এভাবে।

বঙ্গবন্ধুই সেই রাষ্ট্রনায়ক, যিনি কালজয়ী কবি কাজী নজরুল ইসলামকে স্বাধীন বাংলাদেশে এনে তাঁর বেঁচে থাকার বাকি দিনগুলো স্বস্তির করেছিলেন—শারীরিকভাবে এবং মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত করে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে এই কবির গান অনুপ্রেরণার অন্তহীন উৎস ছিল।

পূর্ববঙ্গে ঘুরে বেড়ানোর সময় নজরুল এই ভূখণ্ডকে বারবার নমস্য মেনেছেন। ‘পূর্বববঙ্গ’ নামের কবিতায় এবং ‘বাংলাদেশ’ শীর্ষক গানে আবেগের মাত্রা প্রকাশ পায়। অসুস্থ হওয়ার কয়েক মাস আগে দৈনিক ‘নবযুগ’ পত্রিকায় একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলেন ‘আমার সুন্দর’ নামে। এখান থেকে উদ্ধৃতি ‘আট বৎসর ধরে বাংলাদেশের প্রায় প্রতি জেলায়, প্রতি মহকুমায়, ছোট বড় গ্রামে ভ্রমণ করে দেশের স্বাধীনতার জন্য গান গেয়ে, কখনো কখনো বক্তৃতা দিয়ে বেড়ালাম। এই প্রথম আমার মাতৃভূমি বাংলাদেশকে ভালোবাসলাম। মনে হলো, এই আমার মা।’ কবিতায় বলেছেন :

পদ্মা-মেঘনা-বুড়িগঙ্গা         বিধৌত পূর্ব দিগন্তে

তরুণ অরুণ বীণা বাজে       তিমির বিভাবরী-অন্তে।

১৯৪২ সালের এপ্রিল মাসে লিখলেন ‘বাঙালির বাঙলা’ নামের প্রবন্ধ। লিখলেন : ‘বাঙালিকে, বাঙালির ছেলেমেয়েকে ছোটবেলা থেকে শুধু এক মন্ত্র শেখাও—এই পবিত্র বাংলাদেশ বাঙালির—আমাদের। ... বাঙলা বাঙালির হোক! বাঙলার জয় হোক! বাঙালির জয় হোক!’

সাতচল্লিশের দেশভাগের পরে পূর্ববঙ্গ পাকিস্তান রাষ্ট্রের অংশ হিসেবে পূর্ব পাকিস্তান হয়। ২৩ বছর ধরে বঙ্গবন্ধু তাঁর জনসভা কিংবা পার্লামেন্টে ভাষণে বা বিবৃতিতে কখনো পূর্ব পাকিস্তান বলতেন না। তিনি পূর্ববঙ্গ বলতেন। পাকিস্তান আমলের শেষের দিকে তিনি বাংলাদেশ নামে উল্লেখ করেন।

দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে পড়ার ২৯ বছর পরে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। স্বাধীন দেশে কবির জন্মদিন পালনের জন্য তাঁকে নিয়ে আসেন বঙ্গবন্ধু। ১৯৭২ সালের ২৪ মে কবিকে ঢাকায় আনা হয়। তাঁর বাসস্থান এবং পরিচর্যার সব আয়োজন সম্পন্ন করা হয়।

১৯৭৫ সালের ২২ জুলাই কবির স্বাস্থ্যের অবনতি হলে প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান কবিকে পিজি হাসপাতালে ভর্তির নির্দেশ দেন। এর ২৫ দিন পরে বঙ্গবন্ধু কিছু বিপথগামী সেনা সদস্যের হাতে সপরিবারে নিহত হন। তারিখটি ১৫ আগস্ট। কবি হাসপাতালে রয়ে গেলেন দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি। ১৯৭৬ সালের ২৯ আগস্ট কবি মৃত্যুবরণ করলেন।

এও এক অসাধারণ যোগসূত্র। দুজনের মৃত্যুর জন্য নির্ধারিত হয়েছিল আগস্ট মাস। এ যোগসূত্র মহিমান্বিত হয়েছিল দুজনের স্বাধীনতার স্বপ্নে।

সুস্থ অবস্থায় বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কবির দেখা হয়নি। কিন্তু ইতিহাসের কালস্রোতে সেটি বড় বিষয় ছিল না। বিষয় ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। এই স্বপ্নে দুজনের যাত্রা ছিল সমুদ্রপথের দীর্ঘ পাড়ি। স্বাধীন দেশে কবির মৃত্যুকে সত্য করে দিয়েছিলেন রাজনীতির কবি। একজন সমাহিত হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে। অন্যজন সমাহিত হয়েছেন তাঁর পৈতৃক নিবাস টুঙ্গিপাড়ায়। বাংলার মানুষকে স্মরণ করতে হবে এই দুই সমাধিস্থল।

তাঁরা দুজনে ইতিহাসে অমর।

লেখক : কথাসাহিত্যিক

আর/০৮:১৪/২৫ মে

প্রবন্ধ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে