Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৫ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (118 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ১১-৩০-২০১১

টরন্টোয় `সূরের রাজকণ্যা' মোহনার বর্ণাঢ্য অভিষেক

টরন্টোয় `সূরের রাজকণ্যা' মোহনার বর্ণাঢ্য অভিষেক
ইউনিভিার্সিটি অব টরন্টোর ইসাবেল বেডার থিয়েটার হল। কানায় কানায় পরিপূর্ণ হয়ে উঠা হলরুমে পিনপতন নিস্তব্দতা।মঞ্চের দিকে সবার একাগ্র দৃষ্টি। সেই দৃষ্টিতে অধীর অপেক্ষার ছাপ। কাটায় কাটায় ঘড়ির কাটা আটটার ঘর ছুঁতেই সরে যায় পর্দা। মঞ্চের আলো আধারীতে স্থির হয়ে দাড়িয়ে থাকা  একঝাক কিশোরী। দর্শকদের দিকে পেছন দিয়ে দাড়ানো হলেও  মোহনাকে খুঁজে পেতে অসুবিধা হয় না। কয়েকটা মুহূর্ত মাত্র।প্রজেক্টরের প্রক্ষেপিত পর্দার আলোটি একটি ছবিতে রুপান্তরিত হয়ে স্থির হয়ে যায়।যন্ত্রসঙ্গীতে বেজে উঠে জনপ্রিয় ডেড মাউস ফিউশনের অপূর্ব সূরের লহরী। পর্দার ছবিটির নীচে ভেসে উঠে কালো কয়েকটি অক্ষরে মোহনার দাদা সৈয়দ আবদুস সাত্তারের নাম। তাঁকে উৎসর্গ করেই শুরু হয় পুরো আয়োজন।  তারপরই বেজে উঠে সূরের মূর্চ্ছনা---`অঞ্জলী  লহ মোর সঙ্গীতে'। কিশোরীদলটির অসাধারন ক্যোরিওগ্র্যাফির সঙ্গে মোহনার  সুরেলা কন্ঠ।মুর্হমুহু করতালি জানান দেয় -মোহনাকে বরন করে নিয়েছে দর্শকরা  হৃদয়ছোঁয়া শুভেচ্ছায়।তারপর শুরু হয় মোহনার পালা, সমবেত সূধীজন,দর্শকদের সূরের ধারায় সিক্ত করে দেওয়ার পালা।
উইক-ের সন্ধ্যা বলেই নয়,মোহনার গানকে নিয়েই  বিশাল একটা আগ্রহ তৈরি হয়ে গিয়েছিলো শহর টরন্টোর সঙ্গীত পিপাসুদের মনে। আর সে কারনেই গত শনিবার সন্ধ্যায়  সঙ্গীতপিপাসুদের উপচেপড়া ভীড় জমে যায়  ইউনিভার্সিটি অব টরন্টোর-ইসাবেল বেডার  থিয়েটার হলে। ভিন্ন ভাষা আর সংস্কৃতিতে বেড়ে উঠা  নতুনপ্রজন্মের জনপ্রিয় বাঙালী শিল্পী মোহনা সাইয়েদের প্রথম একক সঙ্গীত সন্ধ্যা তাই যগপৎ আগ্রহ আর কৌতূহল্ওে জন্ম দেয়।
আয়োজনটা ছিলো রীতিমতো বর্ণিল,জমকালো।প্রজেক্টরে মঞ্চের পেছনের পর্দায় প্রক্ষেপিত রঙের খেলা, আর মঞ্চে  সবুজ পাড়ের লাল শাড়ি পরিহিত মোহনার  প্রাণের ছোঁয়ায় সিক্ত সূরের লহরী ইসাবেল বেদার হলকে যেন পরিণত করে ভিন্ন এক আঙিনায়। সেই স্বপ্নিল মঞ্চে মোহনার পরিবেশনা শুরু হয় নজরুল সঙ্গীত দিয়ে। `পরদেশি মেঘ যাওরে.' কিংবা `আজো কাদে কাননে কুয়েলিয়া' যেন মোহনার কণ্ঠে ভিন্নমাত্রা পায়। শ্রোতারা নজরুল সঙ্গীতে ডুবে যেতে যেতে টের পান পুরো হলই যেন জেগে উঠেছে। জাগিয়ে তুলেছেন আসলে মোহনাই `যে জন প্রেমের ভাব জানে না'... গ্রাম বাংলার চিরায়ত লোকসঙ্গীতের সঙ্গে নেচে গেয়ে মোহনা জাগিয়ে তুলেন হলভর্তি শ্রোতাদেরও।টানা কয়েকটি লোক সঙ্গীতের  পর মোহনা  হাজির হন বাংলাদেশ এবং ভারতের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পীদের গাওয়া গান নিয়ে।মোহনার গানের আইডল লতা থেকে শুরু করে বাংলাদেশের সাবিনা ইয়াসমীন,রুনা লায়লার গাওয়া অতিপরিচিত এবং জনপ্রিয়  গান গেয়ে মাতিয়ে তুলেন মঞ্চকে।
 না, ঠিক নির্দিষ্ট কোনো ঘরানায় স্থির থাকেন নি মোহনা, নজরুল সঙ্গীত,রবীন্দ্র সঙ্গীত, রাগ প্রধান গান,লোক সঙ্গীত আর আধুনিক গান। হিন্দি গানও বাদ পড়েনি মোহনার পরিবেশনা থেকে। নতুন প্রজন্মের একজন শিল্পীর একই সঙ্গে এতো শাখায় স্বচ্ছন্দ বিচরন,দর্শকদের মন্ত্রমুগ্ধের মতো মাতিয়ে রাখা- তাও কি সম্ভব? মোহনার সঙ্গীতানুষ্ঠানে শ্রোতারা সেই অসম্ভবকে সম্ভব হতে দেখেছেন অবাক বিস্ময়ে, আর মুগ্ধ হয়েছেন মোহনার প্রতিভায়। অনেকেই ফিস ফিস করে বলে উঠেছেন `যেন সূরের নতুন এক রাজকন্যার অভিষেক হলো আজ'। আর ক্লাসিক্যাল আর পশ্চিমা সুরের সংমিশ্রিত পরিবেশনা- এক কথায় অসাধারন! পশ্চিমা সূর ও লয়ের সঙ্গে ক্লাসিক্যালের সংমিশ্রন ঘটিয়েই সাজানো তার ব্যতিক্রমী  গানের ডালিকে সানন্দে বরন করে নিয়েছে হলভর্তি শ্রোতা।  
মোহনা যে কেবল গানই গেয়েছেন তা নয়,তার প্রথম একক সঙ্গীত সন্ধ্যাটিকে স্মরণীয় করে রাখতে বেশ কিছু চমকও দেখিয়েছেন তিনি। অনুরোধ করে মঞ্চে ডেকে এনেছেন তার জীবনের প্রিয় মানুষগুলোকে,বিশেষ মানুষগুলোকে। মোহনার অনুরোধে তাই মঞ্চে এসে  গাইতে হয়েছে তার ওস্তাদ এএফএম আলিমুজ্জামানকে, বাবা সঙ্গীত শিল্পী তপন সাইয়েদ, মা লীনা সাইয়েদ, ছোটভাই মনন সাইয়েদকে।মনন সাইয়েদ একই সঙ্গে একটি বাংলা,একটি হিন্দি এবং একটি ইরেজীতে পপ সঙ্গীত গেয়ে দর্শক শ্রোতাদের মাতিলে তুলেন। এমনিতেই তার সাবলীল উপস্থাপনা পুরো অনুষ্ঠানে বাড়তি প্রাণের সঞ্চার করেছিলো,তার কণ্ঠে তিনটি ভাষার গানের ঝংকার যেন তাতে নতুন মাত্রা যোগ করে। মোহনা  মঞ্চে ডেকে আনেন তার আরেক প্রিয় মানুষ হাসানকে। হাসানের গিটারে সূরে মোহনা যখন `ও আমার ময়না গো' বলে কণ্ঠে সূর তুলেন তখন পুরো মঞ্চ,এমনকি হলটাও যেন গেয়ে ওঠে তার সঙ্গে। আর একেবারে ছোটবোনটি মৌমিতা সাইয়েদ  গান না গেয়েও বোনের সাফল্যে,প্রতিভায় তার অহংকারের,তৃপ্তির বিবরন জানিয়ে দিয়ে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি করেন মোহনাকে তখন মঞ্চের কোনায় দাড়িয়ে আচলে চোখ মুছতে দেখা যায়। ওস্তাদ আলিমুজ্জামানের সঙ্গে মোহনার `রাগবিহাগ' তো অতূলনীয় এক পরিবেশনা।
টরন্টো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মানব সম্পদ ব্যবস্থাপনায় ব্যাচেলর ডিগ্রীধারী মোহনা সাইয়েদের বেড়ে উঠা সংগীতপ্রেমী পরিবারে। বাবা তপন সাইয়েদ এবং মা লীনা সাইয়েদ দুজনেই জনিপ্রয় সংগীতশিল্পী এবং সংগঠক। ফলে সুর আর ছন্দের সঙ্গে মোহনার পরিচয় ঘটে ছোটবেলা থেকেই।টরন্টোর বাঙালি কমিউনিটিতে শিল্পী হিসেবে তার পরিচিতি এবং জনপ্রিয়ত্ওা নতুন কিছু নয়। কিন্তু এই আয়োজনটি ভিন্ন কারনে ব্যতিক্রম,গুরুত্বপূর্ণ্ও। টরন্টোর ভিন্নধারার সঙ্গীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান `আলম পিয়া স্কুল অব মিউজিক'  থেকে প্রথম গ্র্যাজুয়েশন প্ওায়া,আর বুলবুল ললিতকলা একাডেমীর (বাফা) কারিক্যুলাম সম্পন্ন করার কৃতিত্ব শিল্পী মোহনার প্রথম একক সঙ্গীতানুষ্ঠানটিকে যেন  বিশেষ মাত্রায়  বৈশিষ্ট্যপূর্ণ করে তুলে। অনুষ্ঠানে আলম পিয়া স্কুল অব মিউজিকের প্রিন্সিপাল মোহনার সঙ্গীত শিক্ষক এএফএম আলিমুজ্জামান শিল্পীর হাতে তুলে দেন গ্র্যাজুয়েশনের সনদ । স্কুলের প্রেসিডেন্ট জোবায়দা পারভীনও এ সময় সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। আর মোহনার বাবা মা,কৃতজ্ঞতা জানানো ছাড়া যেন তাদের মুখে আর কোনো ভাষাই নেই। কৃতজ্ঞতা জানাতে গিয়্ওে গলা ভারী হয়ে আসে তপন সাইয়েদের। তবে সঙ্গীতগুরু এএফএম আলিমুজ্জামান ফাঁস করে দেন মোহনার কৃতিত্ব আর সাফল্যের নেপথ্যের কথা।এই প্রজন্মের মেয়ে হয়্ওে সঙ্গীতের প্রতি মোহনার একনিষ্ঠ আগ্রহ, অপরিসীম ধৈর্য নিয়ে বছরের পর বছর সাধনা কিভাবে একজন মোহনাকে `সূরের রাজকন্যায়' রুপান্তরিত করেছে সেই ইতিবৃত্ত অকপটে বলে যান তিনি। ছাত্রীর সাফল্যে শিক্ষক আলিমুজ্জামানের দুচোখ্ও যেন আনন্দে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
প্রাণোচ্ছল তরুন মনন সাইয়েদের প্রাণবন্ত উপস্থাপনা আর একঝাক মেধাবী যন্ত্রশিল্পীর যন্ত্রসহায়তা মোহনার সঙ্গীত সন্ধ্যাটিকে করে তুলেছে আরো আকর্ষণীয়। তানজির আলম রাজিব,শ্ওান রহমান,মামুন কায়সার,ও তারিক আলমের হাতের ছোয়ায় যন্ত্রগুল্ওো যেন মোহনার কণ্ঠের সুরের সঙ্গে একাকার হয়ে তৈরি করেছে ভিন্ন এক পরিবেশের। দ্বিতীয় পর্বে একের পর আধুনিক গান, সেই গানের সঙ্গে একাত্ম হয়ে য্ওায়া দর্শকরা এতোটাই অভিভুত হয়ে পড়েছিলেন  যে অনুষ্ঠান শেষ হয়ে য্ওায়ার ঘোষনার পরও  কেউই যেন নড়তে চাচ্ছিলেন না। মোহনার সূরের মূর্চ্ছনা যেন তাদের ছুঁয়ে ছুঁয়ে দিচ্ছিলো। একে একে হলের আলোগুলো নিভতে শুরু করল্ওে শ্রোতারা যেন মোহনার সূরের আলোয় মুগ্ধ হয়েই থমকে ছিলেন অনেকটা সময় ধরেই।
টরন্টোতে সঙ্গীতের অনুষ্ঠান নতুন কিছু নয়, কিন্তু নতুন প্রজন্মের কোনো শিল্পীর একক অনুষ্ঠান টরন্টোতে এই প্রথম। মঞ্চে রঙের বর্ণাঢ্য খেলায় মোহনার জমকালো উপস্থাপনা আর প্রাণছোঁয়া সূরের অবগাহন পুরো অনুষ্ঠানটিকেই প্রথম ব্যতিক্রম হিসেবে চিহ্নিত হয়ে  উঠেছে দর্শক শ্রোতাদের কাছ্ওে।আর শ্রোতার্ওা অকুণ্ঠচিত্তে স্বীকার করেছেন, এই ধরনের অনুষ্ঠান টরন্টোতে  আগে কখনো হয়নি, এই প্রথম। সূরের নতুন এই রাজকণ্যাকে  প্রাণঢালা অভিনন্দন।

কানাডা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে