Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৫ নভেম্বর, ২০১৯ , ১ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (1 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৮-২০১৯

ছলনার পেছনে ঘুরছে ইসলামি বিপ্লবীরা

আনিস আলমগীর


ছলনার পেছনে ঘুরছে ইসলামি বিপ্লবীরা

ঢাকায় ধরা পড়েছে সিরিয়া ফেরত এক বাংলাদেশি আইএস জঙ্গি। মিডিয়ার খবর অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন ইসলামিক স্টেট বা আইএসের হয়ে সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে গিয়েছিল ওই জঙ্গি মুতাজ আব্দুল মজিদ কফিল উদ্দিন বেপারি ওরফে মুতাজ (৩৩)। ঢাকায় আসার পর তাকে গ্রেফতার করেছে ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশানাল ক্রাইম ইউনিট- সিটিটিসি। সৌদি আরবে জন্ম ও বেড়ে ওঠা এই জঙ্গি সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। গত ফেব্রুয়ারি মাসে সে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে। রবিবার ৫ মে তাকে উত্তরা থেকে গ্রেফতার করা হয়। পরদিন তাকে আদালতে সোপর্দ করে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

এদিকে, গত ২৯ এপ্রিল রাজধানী ঢাকার বসিলায় জঙ্গি উপস্থিতির কথা জানতে পেরে র‌্যাব ঘেরাও দিয়েছিল। কিন্তু দুই সন্ত্রাসীকে জীবিত ধরা সম্ভব হয়নি। তারা নিজেদেরকে বিস্ফোরক দিয়ে উড়িয়ে দিয়েছে। র‌্যাব বলেছে, একেকটা মৃতদেহ নাকি ছয় টুকরা হয়েছে। শ্রীলঙ্কার হামলাকারীরাও আত্মঘাতী ছিল। ইসলামিক স্টেট ওই হামলার দায় স্বীকার করেছে। এতদিন আবু বকর আল-বাগদাদী সিরিয়ায় তার বাহিনী এবং ইসলামিক স্টেট নিয়ে ব্যস্ত ছিল। বাগদাদী এবং তার অনুসারীরা উৎখাত হয়েছে ইরাক ও সিরিয়া থেকে। পাঁচ বছর আগে ২০১৪ সালে ইরাকের মসুলের বিখ্যাত আল নুরানি মসজিদে খুতবা দিতে শেষবার দেখা গিয়েছিল বাগদাদীকে। সম্প্রতি বাগদাদী তার গোপন ভিডিও প্রকাশ করে তার ফিরে আসার জানান দিয়েছে। সেখানে তাদের সর্বশেষ পরাজয় আর শ্রীলঙ্কায় হামলার কথা বলা হয়েছে।

ইরাক এবং সিরিয়ার যে বিশাল এলাকাজুড়ে বাগদাদী খেলাফত প্রতিষ্ঠা করেছিলো তার কোনও অস্তিত্ব এখন আর অবশিষ্ট নেই। সুতরাং বাগদাদীর এখন মেলা সময় হাতে আছে বিশ্বের সর্বত্র পরিকল্পিতভাবে হামলা চালিয়ে উৎপাত সৃষ্টি করার। খেলাফত প্রতিষ্ঠার কথা শুনে মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা থেকে বহু যুবক গিয়ে বাগদাদীর খেলাফতের বাহিনীতে যোগ দিয়েছিলো। সবচেয়ে বেশি যোগদান করেছিলো ইউরোপের মুসলিম কমিউনিটির যুবকরা।

বাংলাদেশ থেকে যাওয়াও বিচিত্র নয়। তবে বাংলাদেশি বংশোদ্ভূতরা যে ছিল তা বারবার প্রমাণিত হয়েছে। বাগদাদী প্রশাসন প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছিলো। তার বাহিনীকে নিয়মিত বেতনভাতাও প্রদান করেছিলো। এখন বাগদাদী ইরাক, সিরিয়া, রাশিয়া, আমেরিকার আক্রমণে বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। তার বাহিনীর লোকেরা স্ব-স্ব দেশে ফেরত গেছে। সুতরাং এখন বিশ্বের বহু জায়গায় পুনরায় গুপ্ত হামলা হবে। সম্ভবত তাদের সঙ্গে বাগদাদীর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি। যে কারণে ইসলামিক স্টেট শ্রীলঙ্কায় হামলার দায় স্বীকার করছে।

এই আন্দোলনে অংশগ্রহণকারী কর্মীরা ধর্মান্ধ, নিবেদিত প্রাণ এবং তাদের বিশ্বাসের প্রতি এতই নিষ্ঠাবান যে তারা তাদের বিশ্বাসের জন্য আত্মহননে লিপ্ত হচ্ছে। শ্রীলঙ্কায়ও তাই করেছে। শ্রীলঙ্কার ভয়াবহ ওই জঙ্গি হামলাতেও যারা অংশ নিয়েছিল, তাদের অনেকেই আইএসের হয়ে ইরাক ও সিরিয়ায় যুদ্ধ করতে গিয়েছিল। আইএসের পতন শুরু হলে তারাও নামে-বেনামে নিজ দেশ শ্রীলঙ্কায় ফিরে যায়।

গত শতাব্দীতে মিশরের হাসান আল বান্না ইখওয়ানুল মুসলিমিন (ইংরেজিতে ইসলামিক ব্রাদারহুড নামে পরিচিত) একটা সংগঠন গড়ে তুলেছিলেন। যার চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রস্তরে ধর্মীয় অনুশাসন কায়েম করা। দীর্ঘদিন ধরে তারা শক্তিশালী সংগঠন গড়ার পরও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কব্জা করতে পারেননি, কারণ প্রধান প্রতিবন্ধক ছিলেন কর্নেল নাসের, আনোয়ার সাদাত, হোসনি মুবারক। এরা তিনজনই মিশরের রাষ্ট্রক্ষমতায় ছিলেন এবং আধুনিক রাষ্ট্রের ধারণায় তারা বিশ্বাস করতেন।

ইখওয়ানের বহু নেতা বিশেষ করে সৈয়দ কতুব ফাঁসিতে নিহত হয়েছিলেন। অবশ্য আরব বসন্তের পর মিশরে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ইখওয়ানুল মুসলিমিনের রাজনৈতিক সংগঠন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টি জিতে ক্ষমতায় এসেছিলো। রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনও পরিবর্তন না করে আধুনিক রাষ্ট্রকাঠামোতেই বৎসরাধিককাল ক্ষমতায় ছিলেন। ড. মুরসি প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন, কিন্তু আমেরিকা আর ইসরায়েলের ষড়যন্ত্রে ড. মুরসির পতন হয়। এখন জেনারেল সিসি মিশরের প্রেসিডেন্ট, ড. মুরসি এখনও কারাগারে। মৃত্যুদণ্ডের হুকুম হয়েছে, কিন্তু এখনও কার্যকর হয়নি। নামকাওয়াস্তে ইসলামিক রিপাবলিক মেনে নিতে আমেরিকা কখনও আপত্তি করে না, কিন্তু যারা কুরআন-সুন্নাহর অনুশাসন মোতাবেক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চায় আমেরিকা তাদের প্রতি খুবই নির্মম আচরণ করে থাকে। আমেরিকা চায় না গণতন্ত্রের প্রতিদ্বন্দ্বী কোনও আদর্শ কোনও রাষ্ট্রে কায়েম হোক। তারা রাজতন্ত্র, শেখতন্ত্র মেনে নেয়, কিন্তু সমাজতন্ত্র ইসলামতন্ত্রকে কখনও সহ্য করে না।

আমেরিকার চূড়ান্ত বিরোধিতার পরও ইরানের মোল্লারা ইসলামি বিপ্লব সফলতার সঙ্গে সংঘটিত করতে পেরেছিলেন। ইরানের কোম শহর ধর্মীয় গুরুদের শহর। সমগ্র ইরানের ওপর এ শহরের প্রভাব ছিল। আয়াতুল্লাহ খোমেনি নির্বাসিত জীবন-যাপন করেছিলেন। ১৯৭৯-এর বিপ্লবের সময় তিনি প্যারিসে ছিলেন। খোমেনির অনুপস্থিতিতে অন্যান্য আয়াতুল্লাহরা বিপ্লবের ভূমি তৈরি করেছিলেন। এ বিপ্লবে বামপন্থীদেরও সমর্থন ছিলো। ড. আলী শরিয়তী খুবই পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন তার মাঝে জালাল-ই-আহাম্মদ এবং বাজারগান ইসলামি সংস্কারবাদী চেতনা মিলিত হয়েছিল যে কারণে তার প্রচারণায় বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আর বামপন্থীরাও মোহগ্রস্ত হয়ে পড়তেন। তাকে অনেক পণ্ডিত ‘ইসলামিক মার্ক্সিস্ট’ বলে নিন্দা করতো কিন্তু ইরানি বিপ্লবে তার অবদান ছিল খুবই বেশি। তিনি সকল মত পথকে একত্রিত করতে পেরেছিলেন।

গত শতাব্দীর বিখ্যাত দার্শনিক মিশেল ফুকো প্যারিস থেকে তেহরান গিয়েছিলেন ইরান বিপ্লবের কর্মকাণ্ড দেখার জন্য। ফুকো প্রথম দিকে আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলেন যখন তিনি দেখলেন ইরানের বামপন্থী ছাত্ররা ‘ইসলামী সরকার’ কায়েমের দাবি জানাচ্ছে। তারপর তিনি উপলব্ধি করলেন, ইরানের মোল্লারা যদি ইরানি জনগণকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ করে তবে বুঝতে হবে, এটা সম্ভব হচ্ছে মোল্লাদের নেতৃত্বের গুণে নয়, বরং ইরানি জনগণের সাধারণ এবং সর্বসম্মত ইচ্ছারই তারা প্রতিধ্বনিত করছে বলে। আন্দোলনরত বিক্ষোভকারীরা ফুকুকে জানায়, তাদের আকাঙ্ক্ষিত ও প্রত্যাশিত ‘ইসলামী সরকার’ এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে শ্রমের মর্যাদা প্রদান করা হবে, সংখ্যালঘুদের প্রতি সম্মান দেখানো হবে, সেই সঙ্গে জনগণের কাছে আইন প্রশাসন ও সরকারের জবাবদিহিতা বজায় থাকবে। ফুকো স্বীকার করেছেন, বিক্ষোভকারীদের এ জাতীয় কথাবার্তা তাকে নিরাশ করে তুলেছিলো ও অস্বস্তিতে ফেলে দিয়েছিলো।

ইসলামিক সরকার সম্পর্কে বামপন্থী ছাত্রদের ধারণা অবহিত হওয়ার পর ফুকো বলেছিলেন ‘রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতাপূর্ণ’ এ পরিস্থিতি ক্যালভিন এবং ক্রমওয়েল এর সময়ে ইংল্যান্ডে বিরাজমান ছিল তাতে সমাজের কোনও উপকার হয়নি। ‘রাজনৈতিক আধ্যাত্মিকতা’ যে রূপে প্রকাশিত হয় তাতে এক চূড়ান্ত নৈরাজ্যবাদ কায়েম হয় যা আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে একেবারেই সঙ্গতিবিহীন। এ ধরনের আন্দোলন দীর্ঘস্থায়ী হয় না কখনোই আবার এ ধরনের আন্দোলন সহসাই বিপথগামী ও পরিত্যাজ্যও হয় না। ইরানের চূড়ান্ত অবস্থা থেকে বিশ্ব একটা ধারণা লাভ করবে।

সম্প্রতি ইরানের নোবেল শান্তি পুরস্কার বিজয়ী মানবাধিকার কর্মী শিরিন এবাদির একটি বই পড়লাম। তিনি বিপ্লবের সময় ইরানে ছিলেন, বিচার বিভাগের একজন বিচারপতি ছিলেন। তার মতে, আসলে ইসলামি বিপ্লবটা ইরানের সমাজকে কিছু দেয়নি। রেজাশাহ পাহলভীর ব্যক্তিগত অনাচার থেকে মুক্ত করে সমাজটাকে একটি গোষ্ঠীর অনাচারের মাঝে নিক্ষেপ করেছে। ইসলামের প্রথম যুগের খেলাফতের কোনও জৌলুশই নেই তাতে।

অনেকে মনে করেন, ইসলাম হচ্ছে আসলে পিউরিটান সোসাইটিতে চর্চা করার বিষয়। কলুষিত বিশ্বে এটি চর্চা করে উপযুক্ত ফল প্রত্যাশা করা যায় না। আইএসের মতো সন্ত্রাসীদের দ্বারা তো নয়ই। সম্ভবত সে কারণেই রাসুল (স.) বলেছিলেন, ‘খেলাফত মাত্র ৩০ বছর’।

লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট। ইরাক ও আফগান যুদ্ধ-সংবাদ সংগ্রহের জন্য খ্যাত।

আর/০৮:১৪/০৮ মে

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে