Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২৬ জুন, ২০১৯ , ১২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৭-২০১৯

জনবাজেট প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করা দরকার

ড. আতিউর রহমান


জনবাজেট প্রক্রিয়া আরো শক্তিশালী করা দরকার

আসছে বাজেট মৌসুম। এরই মধ্যে ‘কেমন বাজেট চাই’ সে বিষয়ে অর্থনীতিবিদ ছাড়াও নানা মহলে আলাপ-আলোচনা শুরু হয়ে গেছে। কয়েক দিন আগে ‘গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন’-এর একটি প্রাক-বাজেট আলোচনায় যোগ দিয়েছিলাম। অন্যান্য আলোচক ছাড়াও তিনজন সংসদ সদস্য ওই আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন। তাঁদের মধ্যে দুজন ছিলেন গত সরকারের মন্ত্রী। তাঁরা অভিজ্ঞতার আলোকে গুরুত্বপূর্ণ কথা বললেন। তাঁদের কথা হচ্ছে যে বাজেট মূলত আমলারাই তৈরি করেন এবং অর্থমন্ত্রী পেশ করেন। সংসদ সদস্য বা মন্ত্রীদেরও বাজেট প্রণয়নে কার্যকর অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। তবে কষ্ট করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করা গেলে কিছু ক্ষেত্রে কার্যকরী নীতি সংস্কার করা সম্ভব—সাবেক শ্রম প্রতিমন্ত্রী মো. মুজিবুল হক চুন্নু শ্রকিদের কল্যাণে এমন কিছু ভালো কাজের উদাহরণও দিলেন। তিনি আরো বললেন, সবাই মিলে শুধু ‘হতাশা’র কথা বললে দেশ এগোবে কী করে? এ কথা তো ঠিক, অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে গত এক দশকে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। তাই শুধু সমস্যার কথা না বলে সুনির্দিষ্ট সমাধানের প্রস্তাব দেওয়ার ওপরও তিনি গুরুত্ব আরোপ করেন।

আমার ভালো লাগছে এ কারণে যে বাজেট প্রণয়নে জনগণের অংশগ্রহণের যে আন্দোলন আমরা দুই দশকেরও বেশি সময় আগে গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ‘সমুন্নয়’ থেকে শুরু করেছিলাম, তা আজ অনেকটাই বিকশিত। সে সময় আমরা নিয়মিত ‘বাজেট সহজ পাঠ’ বের করতাম। এর ফলে বাজেটচর্চা বেশ বিস্তৃত হয়েছিল। এই চর্চা এখন আরো গতিময় হয়েছে। সমাজের নানা অংশের প্রতিনিধিরা তাঁদের মতো করে বাজেট নিয়ে আজকাল কথা বলছেন। অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণের এই আন্দোলন আরো পোক্ত হোক, সে প্রত্যাশাই করছি। ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার নিশ্চিত করা গেলে খুব সহজেই আরো ব্যাপকভাবে বাজেট প্রণয়ন ও মনিটরিংয়ে জনচাহিদার যথার্থ প্রতিফলন ঘটানো যাবে বলে আমার বিশ্বাস।

বাজেট প্রণয়নে জন-অংশগ্রহণ : জাতীয় বাজেট প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারের মধ্যমেয়াদি লক্ষ্যমাত্রা ও দীর্ঘমেয়াদি প্রতিশ্রুতির আলোকে একটি আসন্ন অর্থবছরে সরকারের আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পনা জনগণের সামনে হাজির করা হয়। নিঃসন্দেহে এটি জনগণের কাছে সরকারের জবাবদিহির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতি। বাজেট প্রস্তাবের মাধ্যমে জনগণের চাহিদার কতটুকু সরকারের পরিকল্পনা ও কার্যক্রমে প্রতিফলিত হচ্ছে, তা প্রকাশ পায়। কাজেই জনগণের কার্যকর অংশগ্রহণের ভিত্তিতে সুশাসন নিশ্চিত করার জন্য জাতীয় বাজেট প্রক্রিয়া সম্পর্কে জনগণের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা থাকা এবং এ প্রক্রিয়ায় জনগণের  অংশগ্রহণের সুযোগ থাকা অতি গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত।

বাংলাদেশে দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে বাজেটপ্রক্রিয়াকে আরো অংশগ্রহণমূলক করা এবং বাজেট বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া মনিটরিংয়ে জনগণকে যুক্ত করার ক্ষেত্রে অনেক অ্যাকশন রিসার্চ ও অ্যাডভোকেসি করা হয়েছে। বিভিন্ন থিংকট্যাংক ও এনজিও এ ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছে, সরকারের দিক থেকেও পাওয়া গেছে যথাযথ সহায়তা। গণামাধ্যমও পিছিয়ে নেই। অনেক টেলিভিশন চ্যানেল অর্থনীতিবিদ, ব্যবসায়ী, সচেতন নাগরিকদের জড়ো করে প্রাক-বাজেট আলাপ-আলোচনায়। আবার চ্যানেল আই মাঠে চলে যায় ‘কৃষকের বাজেট’ ভাবনা সংগ্রহের জন্য। ফলস্বরূপ বাজেট প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ বহুলাংশে বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইন ও অনুশীলনেও ব্যাপক ইতিবাচক পরিবর্তন হয়েছে। তবে এ কথা মানতেই হবে যে জাতীয় বাজেটে জনগণের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে এখনো অনেক কাজ করার সুযোগ রয়েছে। বিশেষত দেশের তরুণসমাজকে এ বিষয়ে আগ্রহী করে তোলা এবং এ ক্ষেত্রে তাদের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা খুবই জরুরি। আর এ ক্ষেত্রেই অ্যাকশনএইডের সহায়তায় ‘গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন’ উল্লেখ করার মতো কাজ করছে। তারা তৃণমূল থেকে তরুণদের এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে পেরেছে। নারীসহ অনেক সক্রিয় সংগঠকদেরও তারা পাশে পেয়েছে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, তরুণরাই বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কাজেই জাতীয় বাজেটের মতো একটি অতি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তরুণসমাজের কার্যকর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত থাকা দরকার। তরুণদের প্রত্যাশা ও চাহিদা জাতীয় বাজেটে প্রতিফলিত হচ্ছে কি না, জাতীয় বাজেটে যুববান্ধব উদ্যোগ অর্থায়নের যথেষ্ট ব্যবস্থা থাকছে কি না ইত্যাদি বিষয়ে তরুণদের দিক থেকে প্রস্তাব থাকা জরুরি। তাদের দিক থেকে বাজেট মনিটরিংও একই রকম দরকারি। আশার কথা এই যে নির্বাচনী ইশতেহারে ক্ষমতাসীন দল সব আর্থ-সামাজিক পরিকল্পনায় তরুণদের মতামত যুক্ত করার সুস্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছে। তাই অনেকেই অপেক্ষায় রয়েছে আসন্ন বাজেট তরুণ-তরুণীর আশা-আকাঙ্ক্ষা কতটা ধরতে পারে, তা দেখার জন্য।

অস্বীকার করার উপায় নেই যে তরুণরা বাজেট সম্পর্কে জানলে তা একই সঙ্গে দেশের বৃহত্তর জনগণের জন্যও উপকারী হবে। বাজেটপ্রক্রিয়া সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা রাখে—এমন তরুণরা সমাজের অন্যান্য মানুষকেও এ বিষয়ে সচেতন করে তুলতে পারবে। আর এর ফলে বৃহত্তর অর্থে জনগণের মধ্যে বাজেট বিষয়ে সচেতনতা বাড়বে এবং অংশগ্রহণমূলক সুশাসন জোরদার হবে। এর ফলে অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ণের ভিত্তি আরো প্রসারিত হবে।

বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে জাতীয় বাজেট নিয়ে যেকোনো পর্যালোচনা বা বিশ্লেষণে কিছু বিষয়ের ওপর বিশেষ জোর দেওয়া প্রয়োজন বলে মনে করি। যেমন—বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই জাতীয় বাজেট প্রস্তাবের ব্যয়ের অংশ, বিশেষ করে উন্নয়ন ব্যয়ের অংশটি নিয়ে যত আলোচনা হয়, তার তুলনায় অনেক কম আলোচিত হয় আয় প্রস্তাব নিয়ে। কিন্তু আমাদের মনে রাখতে হবে, যত ভালো উন্নয়ন পরিকল্পনাই করা হোক না কেন, তা বাস্তবায়নের জন্য প্রয়োজনীয় রাজস্ব (ট্যাক্স) আহরণ করা না গেলে সরকারের পক্ষে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা সম্ভব হবে না। কাজেই সরকারের করনীতি ও কর আহরণের ধারা নিয়েও বিস্তর আলোচনা হওয়া জরুরি। নতুন করের উৎস যেমন চিহ্নিত করা দরকার, তেমনি একই রকম দরকার এরই মধ্যে চিহ্নিত উৎস থেকে কিভাবে আরো দক্ষতার সঙ্গে কর আহরণ করা সম্ভব, তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা। আমাদের কর-জিডিপির অনুপাত সন্তোষজনক নয়। এমনকি নেপালের চেয়েও আমাদের কর-জিডিপির হার কম। দ্রুততম সময়ের মধ্যে দেশকে উচ্চ আয়ের দেশে পরিণত করতে হলে কিংবা ক্ষুধা-দারিদ্র্যমুক্ত দেশ গড়তে অবশ্যই আমাদের কর আহরণের দক্ষতা বাড়াতে হবে। অবশ্য সম্প্রতি কর মেলা, সেলিব্রিটিদের সংযুক্ত করে উদ্দীপনামূলক অনুষ্ঠানসহ একাধিক উদ্যোগ এনবিআরকে নিতে দেখা যাচ্ছে। এর ফলে কর দেওয়ার সংস্কৃতিতে বেশ খানিকটা পরিবর্তন আসবে বলে আশা করা যায়। কর ছাড়াও করবহির্ভূত অনেক সরকারি আয়ের ক্ষেত্রও রয়েছে, সেসব দিকেও নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। আর প্রয়োজন সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের জন্য নানা উদ্যোগের।

এবার আগামী বাজেটের বরাদ্দ প্রসঙ্গে গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলনের প্রস্তাবগুলো নিয়ে কিছু বলি। তাদের প্রস্তাবের শুরুতেই রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা। নিঃসন্দেহে এটিই সবচেয়ে জনগুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। গত মাসে মূল্যস্ফীতি ছিল ঊর্ধ্বমুখী। রমজানে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের চাহিদা সাধারণত বাড়ে। তাই খাদ্য-মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে। অন্যদিকে বোরো ধানের বাম্পার ফলনের কারণে মোটা চালের দাম স্থিতিশীল থাকবে বলে আশা করা যায়। তবে কৃষকপর্যায়ে ন্যায্য মূল্যে ধান সংগ্রহ করতে না পারলে মধ্যস্বত্বভোগীদের পোয়াবারো। সে কারণেই খাদ্য মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের মধ্যে নিবিড় সমন্বয় থাকার প্রয়োজন রয়েছে। উপযুক্ত মনিটরিং ও নীতি সমন্বয় করে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ভোক্তাদের নাগালের মধ্যে রাখার কোনো বিকল্প নেই। আসন্ন বাজেটে ভ্যাট আইন বাস্তবায়িত হবে। নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর বাড়তি ভ্যাটের চাপ যেন না পড়ে সেদিকেও নীতিনির্ধারকদের খেয়াল রাখতে হবে। তবে ভ্যাট আইন চালু করার সিদ্ধান্তটি ইতিবাচক। অনেক দিন ধরে এই কর সংস্কার আইনটি আটকে আছে। উল্লেখ্য, এখনো মোট করের দুই-তৃতীয়াংশই পরোক্ষ। প্রত্যক্ষ কর কী করে আরো বাড়ানো যায় সেদিকে নজর দেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। গণতান্ত্রিক বাজেট আন্দোলন এরপর বেকারত্ব কমানোর জন্য তরুণদের উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য বাজেটে বাড়তি প্রণোদনা দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। তা ছাড়া আমাদের তরুণরা যাতে কারিগরি শিক্ষার দিকে ঝুঁকতে পারে, শিক্ষাক্ষেত্রে তেমন সুযোগ সৃষ্টি করার উদ্যোগও বাজেটে থাকতে হবে। বিশেষ করে উচ্চ শিক্ষালয়ে উদ্ভাবন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য বিশেষ বরাদ্দ দেওয়ার বিষয়টি বাজেট প্রণেতারা নিশ্চয়ই খেয়াল রাখবেন।

বৈষম্য বাড়ছে। বিশেষ করে বাংলাদেশে আড়াই শ কোটি টাকার বেশি সম্পদের মালিক অতি ধনীদের সংখ্যা গত বছর ১৭.৩ শতাংশ বাড়ার পরিপ্রেক্ষিতে এই আন্দোলন যথার্থই প্রস্তাব করেছে যে এবারের বাজেট যেন প্রগতিশীল কর কাঠামো শক্তিশালী করে এবং সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার সমস্যা সমাধান করে সাধারণ মানুষের পরিষেবা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়। একই সঙ্গে তারা প্রস্তাব করেছে যে স্বাস্থ্য-শিক্ষা-পরিবহন নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যয়ের গুণগত মান যেন বাড়ানো হয়। বলা হয়েছে, স্বাস্থ্য খাতে গেল বাজেটে জিডিপির মাত্র ০.৯ শতাংশ বরাদ্দ করা হয়েছিল। এই বরাদ্দ কখনোই ১ শতাংশের বেশি হয়নি। তবে কমিউনিটি হাসপাতাল চালু হওয়ার কারণে জনগণ গ্রামপর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা বেশ খানিকটা পাচ্ছে। এখন এই সেবা একটি ট্রাস্টের অধীনে দেওয়া হচ্ছে। এই ট্রাস্টের জন্য বরাদ্দ আরো বাড়ানোর প্রস্তাব করছি। জনসাধারণকে নিজেদের পকেট থেকে স্বাস্থ্য খরচের ৬৭ শতাংশ বহন করতে হয়। হালে দারিদ্র্য নিরসনের হার শ্লথ হওয়ার পেছনে এটিও একটি বড় কারণ। তাই স্বাস্থ্য খাতে বাজেট বরাদ্দ ও তার যথার্থ খরচের কোনো বিকল্প নেই। শিক্ষা খাতেও বরাদ্দ আশানুরূপ নয়। গত বাজেটে তা ছিল জিডিপির ১.৯ শতাংশ। উন্নয়নশীল বিশ্বের শিক্ষা খাতে গড় বরাদ্দ জিডিপির ৫-৬ শতাংশ। বঙ্গবন্ধু চেয়েছিলেন অন্তত জিডিপির ৪ শতাংশ। কিন্তু এখনো আমরা শিক্ষা খাতে এর অর্ধেকও বরাদ্দ পাচ্ছি না। অথচ এটিই সবচেয়ে টেকসই বিনিয়োগ। জেন্ডার বাজেট নিয়েও আন্দোলন বেশ কিছু ইতিবাচক কথা বলেছে। তারা জানিয়েছে, ৪৩টি মন্ত্রণালয়কে জেন্ডার বাজেটের আওতায় আনা হয়েছে। তবে আরো সুনির্দিষ্টভাবে এ বাজেটকে নারী সংবেদনশীল শিক্ষা ব্যবস্থা ও নিরাপদ কর্মক্ষেত্র তৈরির দিকে নজর দিতে বলেছে। এর ফলে নারীর প্রতি সহিংসতা কমবে বলে তাদের বিশ্বাস। তা ছাড়া আইন প্রয়োগকারী বাহিনীকে আরো নারী সংবেদনশীল এবং একই লক্ষ্যে বিচার বিভাগের সক্রিয়তা বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর পাশাপাশি নারী উদ্যোক্তাদের বিকাশে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সে জন্য বিভিন্ন আর্থিক প্রতিষ্ঠানকে বেশি করে নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ দিতে উৎসাহিত করতে বড় আকারের ‘ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিম’ চালু করার জন্য বিশেষ বাজেট বরাদ্দের প্রস্তাব করছি। বাংলাদেশ ব্যাংককে এর বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে।

জলবায়ুর পরিবর্তন মোকাবেলার জন্য সংশ্লিষ্ট খাতে এ বছর বরাদ্দ অন্তত ৫ শতাংশ বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান ও আর্থিক খাতকে সবুজ অর্থায়নে উদ্বুদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সুদ ভর্তুকি ও অন্যান্য প্রণোদনার জন্য প্রস্তাব করা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদের চেয়ে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগে মনোযোগ দিয়ে পরিবেশবান্ধব অবকাঠামো গড়ে তোলার কথা বলা হয়েছে।

আমাদের জাতীয় বাজেটে প্রতিবছর গড়ে মোট বরাদ্দের ১০ শতাংশের বেশি বরাদ্দ করা হয়ে থাকে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য। এ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো বিভিন্ন আর্থ-সামাজিক ঝুঁকি থেকে প্রান্তিক মানুষের সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশ বর্তমানে যে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়নের ধারায় রয়েছে, তার মূলকথাই হলো ‘কাউকে পেছনে না ফেলে এগিয়ে যাওয়া’। এই সবাইকে একসঙ্গে নিয়ে এগোনোর ক্ষেত্রে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বাজেটসংক্রান্ত আলোচনা-বিতর্কে এসব কর্মসূচি নিয়ে আলোচনা জরুরি। যেমন—ডিজিটাল প্রযুক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে এসব কর্মসূচি বাস্তবায়নের দক্ষতা বৃদ্ধি, নতুন উদ্ভাবনী প্রস্তাব ইত্যাদি নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ‘ইগনিশন ফেইজ’ বা উেক্ষপণ পর্যায়ে রয়েছে। এ সময় দরকার দেশের বাজারের চাহিদা মিটিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে আরো বেশি মাত্রায় প্রবেশের উপযোগী শিল্প খাতের বিকাশ এবং এ জন্য প্রয়োজনীয় দেশি-বিদেশি বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা। জাতীয় বাজেটে কী ধরনের প্রকল্পে কতটুকু বরাদ্দ রাখা গেলে মধ্যম থেকে দীর্ঘ মেয়াদে এই বিনিয়োগের পরিবেশ নিশ্চিত করা যাবে, এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, ব্যক্তি খাতের অংশীজন এবং সর্বোপরি তরুণদের মতামত বাজেটবিষয়ক আলোচনা-পর্যালোচনায় উঠে আসা দরকার।

নাগরিকদের পক্ষ থেকে বাজেট পর্যালোচনায় দেশের তরুণদের জন্য যথেষ্ট কর্মসংস্থান এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির বিষয়গুলোও আলাদা গুরুত্বের দাবি রাখে। জাতীয় বাজেটে কী ধরনের প্রকল্প, কর্মসূচি বা উদ্যোগের জন্য অর্থ বরাদ্দ করা গেলে সেগুলো কর্মসংস্থান ও উদ্যোগ তৈরিতে সহায়ক হবে, তা নিয়েও আলোচনা হওয়া দরকার বলে মনে করি।

উন্নয়নপ্রক্রিয়া অন্তর্ভুক্তিমূলক হওয়ার পাশাপাশি টেকসই হওয়া চাই। আর টেকসই উন্নয়ন বা সাসটেইনেবল ডেভেলপমেন্টের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের প্রতি সংবেদনশীল পরিকল্পনার কোনো বিকল্প নেই। নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে বাজেট বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে এই দিকেও তাই বিশেষ নজর রাখতে হবে। বাজেট দেশের ঝুঁকিমুক্ত প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখার অর্থনৈতিক পরিকল্পনা। কাজেই পরিবেশবান্ধব সবুজ প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও বাজেটে থাকা চাই। এ ক্ষেত্রে বদ্বীপ পরিকল্পনা ২১০০-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি অর্থবছরের বাজেট প্রণীত হচ্ছে কি না, সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।

বর্তমানে আমরা অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই উন্নয়নের ধারায় আছি। এ ধারা অব্যাহত রাখা সবারই একান্ত কাম্য। অন্তর্ভুক্তিমূলক এ ধারা অব্যাহত রাখতে হলে অবশ্যই তাতে সবার অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখতে হবে। আর সে জন্য প্রয়োজন আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা এবং সর্বত্র ন্যায়ভিত্তিক সুশাসন।

বাজেটের কাঠামোগত পরিবর্তন আনা গেলে নিশ্চয়ই জন-অংশগ্রহণ বাড়বে। যেমন—তৃণমূলের জনগণের চাহিদামতো গণসেবা প্রদানে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী এবং বাজেট প্রণয়নে অংশীদার করার প্রয়োজন রয়েছে। স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে জনবাজেট করা সম্ভব। আমরা একসময় জাতিসংঘের সমর্থনে সিরাজগঞ্জ প্রকল্পের আওতায় উল্লাপাড়া ইউনিয়ন পরিষদকে সঙ্গে নিয়ে জনবাজেট বাস্তবায়ন করেছিলাম। স্থানীয় জনগণ বিপুলভাবে তাতে সাড়া দিয়েছিল। একইভাবে উপজেলা ও জেলা বাজেটও করা সম্ভব। বিশেষ করে জেলা বাজেট করার সময় ইউনিয়ন, উপজেলা, পৌরসভার নির্বাচিত সব সদস্যকে একসঙ্গে এনে প্রতিটি জেলায় একটি মিনি পার্লামেন্ট গড়ে তোলা সম্ভব। তাঁদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার মাধ্যমেই স্থানীয় সরকারগুলোর পক্ষে স্থানীয় সম্পদ আহরণ, আঞ্চলিক প্রকল্প গ্রহণ ও মনিটরিং ব্যবস্থা জোরদার করা সম্ভব। তাঁদের সঙ্গে নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরাও যোগ দিতে পারেন। সে জন্য ‘ম্যাচিং ফান্ড’ চালু করে জেলা বাজেটসহ স্থানীয় সরকারের বাজেটপ্রক্রিয়াকে শক্তিশালী করা সম্ভব। প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়িয়ে বাজেট প্রণয়নকে আরো জনবান্ধব করা খুবই সম্ভব। ফেসবুক, টুইট, হোয়াটসঅ্যাপ, ই-মেইলসহ নানা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহার করে বাজেট ঘিরে নিশ্চয়ই জনবিতর্ক ও জন-আকাঙ্ক্ষার সমাবেশ করা সম্ভব। নাগরিক সংগঠনগুলোকেও বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় আনুষ্ঠানিকভাবে যুক্ত করা সম্ভব। আমরা অনেক দিন ধরে ‘উন্নয়ন সমন্বয়ে’র পক্ষ থেকে সংসদে বাজেট ‘হেল্প ডেস্ক’ স্থাপন করে সংসদ সদস্যদের বাজেট সম্পর্কিত নানা তথ্য সরবরাহ করে বাজেট পর্যালোচনার মান বাড়াতে সাহায্য করছি। আশা করি, এ প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সংসদ সচিবালয় আগের মতোই উৎসাহী থাকবে।

আরেকটি ভিন্নধর্মী প্রস্তাব। যদি বাজেট পেশ করার পরপরই সংসদ অধিবেশন এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করে প্রতিটি সংসদীয় স্থায়ী কমিটিকে নিজ নিজ এলাকার বাজেট নিয়ে নিবিড় আলোচনা করার সুযোগ দেওয়া যেত, তাহলে বাজেট আলোচনার মান অনেকটাই বাড়ত। স্থায়ী কমিটির সভাপতি প্রত্যেক সদস্যের মতামত ছাড়াও ইচ্ছা করলে গণশুনানির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞ, সংগঠনের প্রতিনিধি, তরুণসমাজের প্রতিনিধির মতামত সংগ্রহ করতে পারতেন ওই সময়টায়। প্রতিটি কমিটির সভাপতি এক সপ্তাহ পরে সংসদ আবার বসলে তাঁর কমিটির প্রস্তাব স্পিকারের কাছে জমা দেবেন এবং সংসদে চুম্বক আকারে পেশ করবেন। এসব প্রস্তাব নিয়ে পুরো সংসদে পরবর্তী সময়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। কমিটি ইচ্ছা করলে অনলাইনেও জনগণের মতামত নিতে পারে। এভাবেই সত্যিকার অর্থেই একটি অংশগ্রহণমূলক জনবাজেট আমরা পেতে পারি।

আর এস/ ০৭ মে

মুক্তমঞ্চ

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে