Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২০ মে, ২০১৯ , ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 0/5 (0 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৫-০৪-২০১৯

পরিচ্ছন্ন ঢাকার জন্য সকলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিকল্প নেই

ড. মো. মনিরউদ্দিন


পরিচ্ছন্ন ঢাকার জন্য সকলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণের বিকল্প নেই

পূর্ব আফ্রিকার ছোট্ট দেশ রুয়ান্ডার রাজধানী কিগালি। নিকট অতীতেও রুয়ান্ডা ভয়াবহ জাতিগত  যুদ্ধের মধ্যে ছিল। আর সে যুদ্ধে দেশটির প্রায় বিশ শতাংশ মানুষ প্রাণ দিয়েছিল। হ্যাঁ, ভয়াবহ গৃহযুদ্ধের মধ্যে ছিল ঠিকই, কিন্তু গৃহযুদ্ধ থেকে মুক্তির মাত্র এক দশকের মধ্যেই দেশটি বিভিন্ন দিক থেকে অভুতপূর্ব সাফল্য অর্জন করে। তার মধ্যে আফ্রিকার পরিচ্ছন্নতম দেশে রূপান্তরিত হওয়াটা এক অনন্য দৃষ্টান্ত। আর এটি শুধু এখন আফ্রিকারই নয়; সারাবিশ্বের মধ্যেও অন্যতম পরিচ্ছন্নতম শহর।

গার্ডিয়ান পত্রিকার মতে, ‘সারাশহর এত ভালোভাবে পরিস্কার রাখা হয় এবং ঘাসগুলো এত ভালোভাবে পরিচর্যা করা হয়, যা দেখলে দম্পতি রাস্তার মাঝখানে ছবি তোলার জন্য দাঁড়িয়ে যায়।’ রুয়ান্ডায় ডিএইচএলের ব্যবস্থাপক জুলি এমুটোনির মতে, ‘এই পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম রুয়ান্ডীজদের ঐক্যকে সুদৃঢ় করে।’

নাগরিকেরা গর্বের সাথে বলেন যে, তাদের শহর নিউইয়র্ক এবং লন্ডনের চেয়েও সুন্দর। এখন কিগালির পরিচ্ছন্নতার এই মডেলটি আফ্রিকার অন্যান্য দেশ যেমন কেনিয়াসহ বিভিন্ন দেশে দেখা যাচ্ছে।

স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, কিগালির পক্ষে কিভাবে সম্ভব হলো এমন বিপর্যস্ত পরিস্থিতি থেকে এত অল্প সময়ের মধ্যে আফ্রিকার পরিচ্ছন্নতম শহর হিসেবে রূপান্তরিত হওয়া? এক কথায় এর উত্তর হলো, দেশটির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে ব্যবহার করে সরকারের বলিষ্ঠ নেতৃত্বে সুপরিকল্পনার ভিত্তিতে দেশটির প্রেসিডেন্টসহ সকল সক্ষম নাগরিকের পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমে প্রত্যক্ষ ও নিয়মিত অংশগ্রহন। আর, প্রত্যক্ষ অংশগ্রহনের পেছনে যে বিষয়টি সবচেয়ে বেশি ভূমিকা তা হলো- কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যন্ত অত্যন্ত সুপরিকল্পিত সাংঠনিক নেটওয়ার্ক।

এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে প্রতি মাসের শেষ শনিবার সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত ৩ ঘন্টাকাল সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের কমিউনিটি অনুষ্ঠান উমুগান্ডা নামে দেশব্যপী সকল নাগরিকের অংশগ্রহণে উন্নয়ন-কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। আর এ উন্নয়নকর্ম-কান্ডের মধ্যে পরিচ্ছন্নতা অভিযান অন্যতম।

১৮ থেকে ৬৫ বছর বয়সের দেশের প্রত্যেক সক্ষম নাগরিকের নিজের কাজ বন্ধ রেখে এ কাজে অংশগ্রহণ করা বাধ্যতামূলক। এসময়ে যানবাহন চলাচল ও বন্ধ থাকে। এ উমুগান্ডার দিনটিকে সকল নাগরিকের দেশের জন্য প্রত্যক্ষ অবদান রাখার দিন হিসেবেও মনে করা হয়।

দেশটির সরকার, এনজিওসহ সকল বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, কমিউনিটি ভিত্তিক প্রতিষ্ঠান এর সহযোগিতায় নাগরিকদের নিরাপদ ও পরিচ্ছন-পরিবেশ রক্ষায় তাদের ভুমিকা বিষয়ে সচেতন করে তুলেছে। তাই নাগরিকরা এখন নিজের বাসস্থান, বাসস্থানের আশপাশ, কর্মস্থল ও উম্মুক্ত স্থানের পরিচ্ছন্নতার গুরুত্ব সম্পর্কে সচেতন। পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিষয়ক সচেতনতার জন্য প্রাইমারি স্কুলে রয়েছে বিশেষ শিক্ষা কার্যক্রম।

যুদ্ধ বিধ্বস্ত রুয়ান্ডার পুনর্গঠনও একটি একক জাতীয় ঐক্য সৃষ্টির প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে। ১৯৯৮ সাল থেকে রুয়ান্ডার সরকার দেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য চর্চার দিকে দৃষ্টি দেয়। লক্ষ্য দাঁড়ায় সাংস্কৃতিক চর্চাগুলোকে টেকসই উন্নয়ন কর্মকান্ডের সহায়ক করে তোলা। যার ফলে বের হয়ে আসে একগুচ্ছ দেশীয় সমাধান। আর এই দেশীয় সমাধানগুলোর মধ্যে একটি হলো উমুগান্ডা।

উমুগান্ডা শব্দটি দ্বারা কোনও নির্দিষ্ট বিষয়ে সাফল্য লাভের জন্য সকলে একত্রিত হয়ে কাজ করা বোঝায়। প্রথাগতভাবে রুয়ান্ডীজরা কোন কঠিন সমস্যা সমাধানে তাদের পরিবারের সদস্য, বন্ধু-বান্ধব ও সমাজের অন্যান্য সদস্যদের ডাকতেন। উমুগান্ডা ছিল একটি সামাজিক সহায়তামুলক কাজ এবং ভাতৃত্বের প্রতিক। প্রাত্যহিক ব্যবহারে, উমুগান্ডা বাড়ি নির্মাণে ব্যবহৃত খুঁটিকে বুঝায়। খুঁটি ছাদকে সহায়তা করে, যার ফলে ঘরটি মজবুত হয়।

উমুগান্ডার সাংগঠনিক কাঠামোটি প্রধানমন্ত্রীর অধ্যাদেশ ৫৮/৩ দ্বারা অনুশাসিত; যার মাধ্যমে নির্ধারণ করা হয়েছে এর গুন বা বৈশিষ্ট্য, সংগঠন, কমিউনিটি ওয়ার্ক তদারক কমিটির কার্যকরিতা এবং অন্যান্য সংগঠনের সাথে তাদের সম্পর্ক। জাতীয় পর্যায়ে রয়েছে কমিউনিটি ওয়ার্ক পরিচালনা কমিটি ও টেকনিক্যাল বা বিশেষজ্ঞ কমিটি। পরিচালনা কমিটির ভুমিকা হলো পরিকল্পনা, মূল্যায়ন, নাগরিকদের উমুগান্ডায় অংশগ্রহণের জন্য উতসাহিত করা ও উমুগান্ডার সাফল্য প্রচার করা। আর টেকনিক্যাল বা বিশেষজ্ঞ কমিটির দায়িত্ব হলো সমন্বয়, তদারকি মূল্যায় ও উমুগান্ডার জন্য কর্মসূচী তৈরী করা।

এ কাজের সাফল্যের মধ্যে রয়েছে- স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও বৈদ্যুতিক স্থাপনা নির্মাণ, আবার উচ্চ ফলনশীল কৃষি জমির প্লট উন্নয়ন। ২০০৭ সাল থেকে দেশের উন্নয়নে উমুগান্ডার অবদান আমেরিকান মুদ্রায় প্রায় ৬০মিলিয়ন ডলার।

রুয়ান্ডার সরকার ২০০৯ সালে জাতীয় উমুগান্ডা প্রতিযোগিতা প্রবর্তন করে। প্রতিযোগিতার লক্ষ্য হলো কমিউনিটিকে সঠিক পরিকল্পনা প্রণয়নে উতসাহিত করা এবং তারা যা অর্জন করেছে তা টেকসই বা রক্ষা করা। প্রতিযোগিতাটি গ্রাম থেকে জাতীয় পর্যায় পর্যন্ত রুওয়ান্ডীজ সমাজের সর্বস্তরের নাগরিককে অন্তর্ভূক করে। প্রত্যেক জেলায় সবচেয়ে ভালো উমুগান্ডা কর্ম-কান্ডের জন্য পুরস্কৃত করা হয় সনদ প্রদান ও পুনঃরায় অর্থ বরাদ্ধের মাধ্যমে। সারাদেশের ৩টি শ্রেষ্ঠ প্রকল্প জয়ীকে পুরস্কার হিসেবে দেয়া হয় নগদ অর্থ।

আমরা জানি যে ঢাকা আর কিগালি শহর এক নয়। ঢাকায় রয়েছে অনেক জটিলতর সমস্যা। তাই এর সমাধানও যে সহজ হবে না তা খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু নাগরিক সম্পৃক্ততা ছাড়া কি কোনও ভাবেই এ সমস্যার সমাধান সম্ভব? পৃথিবীর কোনও দেশেই কি তা সম্ভব হয়েছে? জাপানের উদাহরণ দিন আর কানাডার উদাহরণ দিন বা এই কিগালির উদাহরণই দিন- সবখানেই তো নাগরিকের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সম্পৃক্ততা রয়েছে।

ঢাকা শহরের মেয়রদ্বয় অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন- তাতে কোনও সন্দেহ নেই। আগের কোনও মেয়রই এতো সক্রিয় ছিলেন না। কিন্তু সমস্যা হলো তারা তো মাত্র দুজন। কর্মকর্তা, কর্মচারিরাও রয়েছেন। কিন্তু তাতে কি সম্ভব এ জনবহুল শহরটিকে পরিচ্ছন্ন রাখা? মোটেও সম্ভব না; নাগরিক সম্পৃক্ততা লাগবেই।

আমরা রুওয়ান্ডীজদের জাতীয় ঐতিহ্য উমুগান্ডার কথা জানলাম। আমাদের কি সে ধরণের ঐতিহ্য নেই? অবশ্যই আছে। কিন্তু সমস্যা হলো আমরা সে ঐতিহ্যকে দেশ গঠনে ব্যবহার করতে প্রয়াসি হইনি।

বাংলাদেশে এমন একটি মসজিদ, মন্দির, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কি আছে যেখানে নাগরিকদের অবদান নেই? প্রত্যন্ত গ্রামের ছোট্ট একটি বিদ্যালয় থেকে দেশের সর্ববৃহত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত সবই প্রথমত কারো দানের ওপর গড়ে ওঠেছে। মসজিদের ক্ষেত্রেও তাই। প্রত্যন্ত গ্রামের মসজিদটি থেকে বায়তুল মুকাররাম মসজিদ পর্যন্ত সব মসজিদেই রয়েছে নাগরিকের অবদান। কন্যাদায়গ্রস্থ পিতাকে প্রতিবেশির সাহায্য করার উদাহরণ বিরল নয়। চিকিৎসার জন্য সাহায্য চেয়ে না পাওয়ার উদারণ নেই। যে দেশে ভিক্ষাও একটি পেশা এবং ভিক্ষুক ভিক্ষা করে বহাল তবিয়তেই বেঁচে থাকতে পারে- সে দেশের মানুষের প্রতি মানুষের মমত্ববোধ নিয়ে কোনও প্রশ্ন থাকতে পারে না। যে শক্তি এ মানুষদের মসজিদ নির্মাণে, বিদ্যালয় নির্মাণে, কন্যাদায়গ্রস্থ পিতার সহায়তায়, ভিক্ষুকের বেঁচে থাকায়, চিকিৎসার খরচে সাহায্য প্রার্থীর সহায়তায় একত্রিত করতে পারে, ঠিক সে শক্তিই তাদের দেশের নানাবিধ সমস্যার সমাধানেও একত্রিত করতে পারে। প্রয়োজন শধু তাদের জাগিয়ে তোলার, সচেতন করার।

একবার তারা সমস্যাটিকে নিজের সমস্যা বলে বুঝতে পারলে- সমাধানের পথটিও তারা নিজেরাই বের করে নেবে। আর সে পথে তাদের নিয়ে যাওয়ার জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন নাগরিক সম্পৃক্ততা তৈরির কৌশল ও তার বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার প্রণয়ন।

লেখক: শিক্ষক, আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

এমএ/ ০৫:৩৩/ ০৪ মে

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে