Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-২৯-২০১৯

শর্শদি থেকে কলকাতা কল্লোলিনী

পিয়াস মজিদ


শর্শদি থেকে কলকাতা কল্লোলিনী

তাঁর বইয়ের পরিচিতিতে লেখা থাকত "যৌবনের মন্ত্র 'ভোজনং যত্রতত্র, শয়নং হট্ট মন্দির'।" কথাটি যে শুধু অলঙ্কারবাক্য নয় বরং এর চেয়েও অধিক সত্য তাঁর জীবনে- সেটা বেলাল চৌধুরীর (১২ নভেম্বর ১৯৩৮-২৪ এপ্রিল ২০১৮) ঘনিষ্ঠমাত্রই জানেন। ফেনীর শর্শদির সন্তান স্বগ্রাম, সন্দ্বীপ, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, ঢাকায় অস্থির অশ্বক্ষুর চালিয়ে নিজের রজতজয়ন্তী বর্ষে ১৯৬৩-তে জীবনঘোড়াকে আপাতত থিতু করেন কলকাতা নামের স্বপ্নের আস্তাবলে। রেলকর্তা বাবা রফিকউদ্দিন আহমদ চৌধুরীর চাকরিসূত্রে ছোটবেলা থেকেই রেলগাড়ি দেখতে দেখতে, কু-ঝিকঝিক শুনতে শুনতে জীবনকেই মেনেছেন এক বিস্ময়ের স্টেশন- অনন্ত অজানার ডাকে ঘর ছাড়ার আহ্বান ধ্বনিকে বরণ করেছেন সানন্দে। মা মনিরা আখতার খাতুন চৌধুরী ছিলেন স্বভাবকবি। সাহিত্যানুকূল পারিবারিক পরিবেশে কলকাতা যাত্রার আগে থেকেই বাংলা ও বিশ্বসাহিত্যের নিবিড় পাঠে নিমগ্ন থেকেছেন। প্রাতিষ্ঠানিক পাঠের চেয়ে পৃথিবীর পাঠশালাকেই জ্ঞান করেছেন শ্রেষ্ঠ অধ্যয়নশালা। 

'হল অ্যান্ড স্টিভেনস'-এর ক্রাউন সাইজের 'জিওমেট্রি' বইয়ের নিচে রেখে লুকিয়ে পড়েছেন কিরীটি সিরিজ। দস্যু মোহন, প্রহেলিকা, কাঞ্চনজংঘা, কালোভ্রমর, ছায়া কালো কালো'র গোয়েন্দা কাহিনীভুবন থেকে বঙ্কিম-রবীন্দ্রনাথ-শরৎচন্দ্র-তারাশঙ্কর-বিভূতিভূষণ-মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়-সঞ্জয় ভট্টাচার্য-জীবনানন্দ দাশের ধ্রুপদী ভুবন হয়ে নীহাররঞ্জন সরকারের ছোটদের অর্থনীতি, প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথমা, বুদ্ধদেব বসুর হঠাৎ আলোর ঝলকানি সমানভাবেই আচ্ছন্ন করেছে তাঁকে। কলেজে থাকতেই কমিউনিস্ট পার্টির ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। রাজনৈতিক সাহিত্যপাঠের সূত্রপাত তখনই। ভাষা আন্দোলনের পরপর চুয়ান্নর যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে গ্রাম-গ্রামান্তরে কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ করেছেন। দেশব্যাপী ৯২-ক ধারা জারি হওয়ার পর রাজনৈতিক কারণে গ্রেফতার হয়ে ফেনী থেকে নোয়াখালী হয়ে কুমিল্লা জেল থেকে ঘুরতে ঘুরতে ঢাকার জেলখানায় এসে একাটা বিরাট জগতের মধ্যে পড়লেন, যেখানে জ্ঞান চক্রবর্তী, সাম্যবাদের ভূমিকা'র লেখক অনিল মুখার্জী, অমল সেন, রতন সেন, নলিনী দাশের মতো ডাকসাইটে কমিউনিস্ট নেতাসহ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সরদার ফজলুল করিম, কবিয়াল রমেশ শীল, সন্তোষ গুপ্ত, আলী আকসাদ, মুস্তফা সরোয়ারকে পেয়েছেন একান্ত সান্নিধ্যে। 

জেলখানা তাঁর কাছে হয়ে ওঠে সাহিত্যের সূতিকাগার। কলকাতার 'পরিচয়' পত্রিকায় নাচোলের কৃষক বিদ্রোহের পটভূমিতে লেখা সোমনাথ লাহিড়ীর 'কামরু আর জোহরা'য় গল্পটি যেমন আকর্ষণ করেছিল খুব, তেমনি ননী ভৌমিকের লেখাপত্রও। ননী ভৌমিকের ধানকানা গল্পগ্রন্থটি পড়ে তাঁকে চিঠিও লিখেছিলেন। যার উত্তরে বেলালের নামে পোস্টকার্ড আসে- 'একদিন আমাদের উপহার দেবেন এক উজ্জ্বল সাহিত্য।' জেল ও জেলের বাইরে নরেন্দ্রনাথ মিত্র, গৌরকিশোর ঘোষ, সন্তোষ কুমার ঘোষ, নবেন্দু ঘোষ, সতীনাথ ভাদুড়ী, সুবোধ ঘোষ, সমরেশ বসু, নারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়, রাজশেখর বসু, অমরেন্দ্র ঘোষ, রালফ ফক্স, এরস্কিন কল্ডওয়েলের ইলিউশন অ্যান্ড রিয়ালিটি, এরিখ মারিয়া রেমার্ক-এর থ্রি কমরেডস, অল কোয়ায়েট অন দ্য ওয়েস্টার্ন ফ্রন্ট, চীনা লেখক লাও চাওয়ের রিকশাওয়ালা, লু সুন, গ্রাৎসিয়া দেলেদ্দা, ন্যুট হামসন, তলস্তয়, শেখভ, ম্যাক্সিম গোর্কি, এরেনবুর্গ, ফকনার, হেমিংওয়ে, হাওয়ার্ড ফাস্ট, আপটন সিনকেয়ার, এডগার অ্যালান পো, ইওজিন ও নিল, কামু, কাফকা, স্তঁদাল, অস্কার ওয়াইল্ড, সার্ত্র পাঠ তাঁর জীবননদীর গভীরে জোয়ার তুলে গেছে ভীষণ। পূর্ববঙ্গে বসেই কলকাতার চতুরঙ্গ, নতুন সাহিত্য, কবিতা, কৃত্তিবাস, উল্টোরথ, ইদানীং, প্রসাদ পত্রপত্রিকা গো-গ্রাসে পড়েছেন। নিজেও যুক্ত হয়েছেন পল্লীবার্তা নামক পত্রিকা সম্পাদনায়। কলকাতা-জীবনে যাদের সঙ্গে তাঁর নিবিড় সখ্য গড়ে ওঠে তাঁদের মধ্যে কমলকুমার মজুমদারের উপন্যাস অন্তর্জলী যাত্রা, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাস কুয়োতলা, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের গল্প 'বাঘ' পড়েছেন ঢাকার বই বাজার থেকে সংগ্রহ করেই। ফলে কলকাতায় সাহিত্যজীবনের প্রবেশিকা যে তাঁর এ বঙ্গেই রচিত হয়ে গিয়েছিল, তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। 

তাঁর আত্মভাষ্য থেকে জানা যায়, জেল থেকে বেরিয়ে বিচিত্র কিছু করার চেষ্টা করেছেন আর গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজে চাকরি নিয়ে এক পর্যায়ে জীবন-জাহাজের নোঙর ফেলেছেন নগর কলকাতায়। তার পর বলা যায় বেলাল চৌধুরী কলকাতায় এলেন, দেখলেন ও জয় করলেন। 

সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ভাষায়- 

অন্য দেশের নাগরিক হয়েও কলকাতার এক অজ্ঞাত কবরখানায় বেলাল যে-ভাবে দিনযাপন করেছে, তাতে মনে হয়েছে, এ ছেলে নিশ্চিত কোনো ছদ্মবেশী রাজকুমার। 
(অর্ধেক জীবন, ২০০২)

শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কথায় ভেসে আসে বেলালের বোহেমিয়ান জীবনচিত্র- 

বেলা গেছে, খেলা গেছে, প্রখর বাতাস বেগে ব'হে
কেচেন্দা বাঁধের কাছে, আদিবাসী মহল্লায় নিয়ে গেছে
বেলালকে-আমাকে। 
(গদ্যসংগ্রহ ১৯৯৭) 

কবিতা সিংহ বলেন- 
যার জন্য আমাদের সকলের ঘরেই চাল মাপা থাকত সেই বেলাল... 
(কৃত্তিবাস, ১৯৭৫) 


অরূপরতন বসুর স্মৃতিতে-
কোন জাদুবলে যে বেলাল এক সম্পূূর্ণ অপরিচিত বিশাল শহর, কলকাতার হৃদয় জয় করে ফেললেন, তা তাঁদের বোঝানো যাবে না, যাঁরা তখনকার বেলালকে দেখেননি।
(সংবাদ প্রতদিন, ১৮ মে, ১৯৯৭) 

কলকাতার কবরখানায়, ক্যামাক স্ট্রিট, অ্যাংলো ইন্ডিয়ানপাড়া, কালিঘাটের শিখ গুরুদুয়ারা, দূরের আদিবাসী মহল্লা, কফি হাউস, খালাসিটোলায় কেবল উন্মূল-উদ্বাস্তু বেলাই শুধু কাটাননি বেলাল চৌধুরী; ভবঘুরে জীবনে সম্পাদনা করেছেন দৈনিক কবিতা এবং কৃত্তিবাস পত্রিকার কয়েকটি সংখ্যা থেকে শুরু করে বন্ধু সুনীল ও স্বাতী গঙ্গোপাধ্যায়ের বিয়ে উপলক্ষে প্রকাশিত স্মরণিকা। তাঁর নিজের ভাষায়- ভিন দেশের ভূগোলে আত্মপরিচয়ে জায়গাজমি নির্মাণ করতে কবিতা লেখা শুরু।

প্রথমদিকে সঞ্জয় ভট্টাচার্যের পূর্ব্বাশা, শান্তি লাহিড়ী সম্পাদিত বাংলা কবিতা আর শরৎকুমার মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত কৃত্তিবাসে কবিতা লিখে উৎপলকুমার বসুসহ সুধীজনের প্রশংসা পান। আনন্দবাজার ও অমৃতবাজার পত্রিকা, যুগান্তর, দেশসহ নানান ছোট ও বড় কাগজে দু'হাতে স্বনামে ও ময়ূরবাহন, সবুক্তগীন, বল্লাল সেন ছদ্মনামে লিখেছেন কবিতা, গদ্যনির্ঝর। নির্মাল্য আচার্য এবং সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত এক্ষণ পত্রিকায় তরজমা করেছেন হোর্হে লুই বোর্হেস-এর গল্প 'প্রতীক্ষা', কমলকুমার মজুমদারের অঙ্কভাবনা পত্রিকায় গণিত বিষয়ক গদ্য। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আহ্বানে আনন্দবাজার পত্রিকার দেশ-বিদেশ পাতায় বিচিত্র বিষয়ে লিখেছেন ফিচার। লিখতেন কলকাতার কড়চায়ও। খণ্ডকালীন কাজ করেছেন পত্রিকা সিন্ডিকেট থেকে শুরু করে অমৃতবাজার পত্রিকার প্রকাশনা সংস্থায়। 

কলকাতার যৌবন-জীবনে বুদ্ধদেব বসু, সৈয়দ মুজতবা আলী, আবু সয়ীদ আইয়ুব, গৌরী আইয়ুব, কমলকুমার মজুমদার, রামকিঙ্কর বেইজ, পরিতোষ সেন, সোমনাথ হোড়, ইন্দ্রনাথ মজুমদার, ননী ভৌমিক, সত্যজিৎ রায়, গৌরকিশোর ঘোষ, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, সাগরময় ঘোষ, শঙ্খ ঘোষ, অমর্ত্য সেন, অ্যালেন গিন্সবার্গ, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়, তারাপদ রায়, আয়ান রশিদ খান, উৎপলকুমার বসু, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, বিনয় মজুমদার, ভাস্কর চক্রবর্তী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়, কবিতা সিংহ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য, বাদল বসুর মতো নক্ষত্রপুঞ্জের ঘনিষ্ঠ সংসর্গে এসেছেন। 

আত্মজীবনী নিরুদ্দেশ হাওয়ায় হাওয়ায় তিনি লিখেছেন, রুমানিয়ান দার্শনিক ই.এস. চোরানের দর্শনের চোরাগুপ্তা প্রভাবে স্থিরজীবনের প্রতি আসক্তি হারান। ফলে কলকাতা পর্বের বিপুল সংখ্যক লেখালেখির কোনো সংগ্রহও সংরক্ষণ করেননি।

যদিও ১১ বছরের কলকাতা জীবনে প্রকাশ পেয়েছে তাঁর প্রথম দুটো কবিতার বই নিষাদ প্রদেশে (১৯৬৪) এবং বেলাল চৌধুরীর কবিতা (১৯৬৮)। তবে নিজের বইয়ের বেশি তিনি ভাস্বর হয়েছেন বন্ধুদের বইপত্রে। তাঁকে বিষয় করে গল্প লিখেছেন গীতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অরূপরতন বসু। শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায়ের স্বর্গে তিন পাপী, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের আত্মপ্রকাশ, দুই নারী, হাতে তরবারি; সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়ের কলকাতার দিনরাত্রি, তুষার রায়ের শেষ নৌকা ইত্যাদি উপন্যাসে বেলাল চৌধুরীকে খুঁজে পাওয়া যায় ভিন্ন মাত্রায়। 

বেলাল চৌধুরীর কলকাতা পর্বেই বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। একাত্তরের কলকাতায় দেশের কবিবন্ধুদের দীর্ঘ দিন পর কাছে পেয়েছেন, তখন থেকেই দেশে ফেরার একটা তাগাদা তৈরি হচ্ছিল। 

অবশেষে দুরন্ত জাহাজও যেমন পাড়ি দেয় আপন আলয়ে, ঠিক তেমনি বাবার অসুস্থতার সংবাদে ১৯৭৪-এ কলকাতা থেকে বেলাল চৌধুরী প্রত্যাবর্তন করলেন স্বাধীন বাংলাদেশে। ইতিমধ্যে পুত্রবিরহকাতর কবি-মাতা তাঁর বিরহী অনুভব আর দুঃখকথার মিশেলে লিখে ফেললেন বেশ কিছু কবিতাও; চিরসুমধুর শিরোনামে পরে যা বই আকারে প্রকাশিত হয়। 

এমএ/ ০২:০০/ ২৯ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে