Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২০ অক্টোবর, ২০১৯ , ৪ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (48 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৯-১৭-২০১১

বারাক ওবামার শাসন-সাধন

আবদুল মতিন খান


বারাক ওবামার শাসন-সাধন
বারাক ওবামা রাজনীতি করবেন এবং যুক্তরাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠীর একজন হবেন এমন সংকল্প নিয়ে জীবনের প্রস্তুতি গ্রহণ করেন। তার বিদ্যায়তনিক শিক্ষা উঁচুমানের। তিনি বলতেও পারেন ভালো। তিনি প্রচুর পড়াশোনা করেন এবং বিশ্ব পরিস্থিতি নখদর্পণে রাখেন। তার আগের প্রেসিডেন্ট জর্জ ওয়াকার বুশ (জুনিয়র) তার পাশে একদম নিষ্প্রভ। বুশের ইংরেজি ভাষার ওপরও দখল ছিল না। বুশের বক্তব্য পর্যালোচনা করে মার্কিন সাংবাদিকরা তার ভাষার ভুলের একবার একটি ফিরিস্তি প্রকাশ করেছিলেন। তার মধ্যে একটি ছিল dont misunderestimate me! না, কেউ বুশকে অবমূল্যায়ন করেনি। বুশের ধীশক্তি সম্পর্কে কারও কোনো সংশয় ছিল না।

বুশের সঙ্গে ওবামার তুলনা চলে না। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাপিতারা এবং আব্রাহাম লিংকন বাদে পরবর্তী অপর সব প্রেসিডেন্টের তুলনায় ওবামা নিঃসন্দেহে অধিক যোগ্য ও বিদ্বান। তার তুখোর রাজনীতিজ্ঞানের পরিচয় পাওয়া যায় প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী হিসেবে নিজেকে ঘোষণা দেয়ার পর থেকেই।

যৌন কেলেঙ্কারি সত্ত্বেও প্রেসিডেন্ট হিসেবে বিল ক্লিনটন জনপ্রিয় ছিলেন। যৌন কেলেঙ্কারির সময় ক্লিনটন স্ত্রী হিলারির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেয়ায় ক্লিনটন ও হিলারি উভয়ের ভাবমূর্তি মার্কিন জনগণের কাছে উজ্জ্বল হয়। ক্লিনটনের স্ত্রী হিসেবে হিলারি ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ফার্স্ট লেডি। তাতেও তার আলাদা একটি বিশেষ মর্যাদা ছিল। হিলারি ক্লিনটন প্রেসিডেন্ট পদের জন্য নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবেন একথা রটে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রে তখন পর্যন্ত কোনো মহিলা প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচিত হয়ে হোয়াইট হাউসে প্রবেশ করতে পারেননি। হিলারির জন্য সে রকম একটা সম্ভাবনা কেবল যে দেখা দিয়েছিল তা নয়, হোয়াইট হাউসে তার পুনঃপ্রবেশ প্রায় নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিল। যুক্তরাষ্ট্রের অধিবাসীরা তো বটেই, এমনকি পৃথিবীর অপরাপর দেশসহ বাংলাদেশের মানুষও ধরে নিয়েছিল যে হিলারি হবেন পরের প্রেসিডেন্ট এবং বিশ্বের প্রধান ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রথম মহিলা প্রেসিডেন্ট।

যুক্তরাষ্ট্র ও পৃথিবীর সব মানুষের প্রত্যাশা এবং অনুমান ভুল হয়ে গেল দৃশ্যপটে বারাক হোসেন ওবামার আবির্ভাবের পর। যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্ট পদে নির্বাচনের আগে দলের নমিনেশনের জন্য ভোটাভুটি হয়। এ ভোটাভুটি চলে প্রতিটি অঙ্গরাজ্যে। এ ভোটে জয়লাভ প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের ভোটের চেয়ে কোনো অংশে কম কঠিন নয়। অঙ্গরাজ্যগুলোতে নমিনেশন লাভের জন্য যে ভোটাভুটি হচ্ছিল সেখানে প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিটি সামনাসামনি বিতর্কে ওবামা হিলারিকে কোণঠাসা করে ফেলছিলেন। শ্বেতাঙ্গ ও মহিলা ভোটারদের হিলারির প্রতি দুর্বলতা থাকা সত্ত্বেও ওবামার বক্তব্যের ধারের জন্য তারা হিলারির চেয়ে ওবামা যোগ্যতর এ সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দোমনা থাকতে ব্যর্থ হচ্ছিল। ওবামা অধিকাংশ রাজ্যে হিলারিকে ভোটে হারিয়ে ডেমোক্র্যাটিক দলের নমিনেশন জয় করে নিয়েছিলেন।

নমিনেশন লাভের পর এবার এলো আসল নির্বাচনের পালা। লোকে ভাবল রানিংমেট হিসেবে ওবামা আর কাউকে না নিয়ে হিলারিকেই বেছে নেবেন। হিলারিও ভেবেছিলেন এটা তার জন্যও হবে ভালো। পরে কখনও প্রেসিডেন্ট পদের জন্য লড়তে গেলে প্রশাসক হিসেবে কাজ করার ও অভিজ্ঞতা অর্জন তার জন্য থাকবে একটি প্লাস পয়েন্ট হয়ে। ওবামা এবারও সবার অনুমান ভণ্ডুল করে দিলেন। নির্বাচনে জেতার পর অবশ্য তিনি হিলারিকে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ পদটি দিয়েছেন। নির্বাচনের সময় যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে ছিল লিপ্ত। টুইন টাওয়ার হামলার জন্য আফগানিস্তানের তালেবানযারা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের শাসকদেরই সৃষ্টদায়ী করে জর্জ বুশ আফগানিস্তানে হামলা চালান। ইরাকও তার দ্বারা আক্রান্ত হয়। এ দুই দেশেই যুদ্ধরত মার্কিন সৈন্য শত্রুর চোরাগোপ্তা ও আত্মঘাতী হামলায় বেঘোরে অক্কা পাচ্ছিল। আফগান ও ইরাকিদের তুলনায় মার্কিন সৈন্য খুব কম নিহত হলেও নিহত মার্কিন সৈনিকদের পিতামাতার হৃদয়ে তার বিরূপ প্রতিক্রিয়া পড়তে বাধ্য। তারা হোয়াইট হাউসের সম্মুখে শান্তি মিছিল করে ওই দুই দেশ থেকে সৈন্য প্রত্যাহারের জোর দাবি জানাতে থাকে। যুক্তরাষ্ট্রের শাসকদের কাছে এসব বিক্ষোভ মিছিল অনভিপ্রেত এবং প্রায় দেশদ্রোহিতামূলক অপরাধ। এ কারণে পুলিশ দিয়ে পিটিয়ে জর্জ বুশ এসব মিছিল যুক্তরাষ্ট্রে নিষিদ্ধ করেন।

এসব কাণ্ড বারাক ওবামার চোখের সম্মুখেই ঘটে। ভিয়েত্নাম যুদ্ধের সময় কন্সক্রিপশন বা বাধ্যতামূলক সামরিক কর্তব্য অর্থাত্ যুদ্ধে যাওয়া এড়াতে বিল ক্লিনটন ব্রিটেনের অক্সফোর্ডে গিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় বার্ট্র্যান্ড রাসেল আয়োজিত ভিয়েত্নাম যুদ্ধবিরোধী শান্তি আন্দোলন ও মিছিলে তিনি শরিক হয়েছিলেন। নির্বাচনের সময় এসব ঘটনা তুলে ধরে জর্জ বুশ তার প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী বিল ক্লিনটনকে ঘায়েল করতে তাকে দেশদ্রোহীরূপে ভোটারদের কাছে তুলে ধরেন। তাতে অবশ্য কোনো ফল হয়নি। ভোটাররা ক্লিনটনকেই জয়ী করে দেয়। বারাক ওবামা এসব ঘটনা অবশ্যই জানতেন।

শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা বর্ণবাদী এবং তারা নিজেদের পৃথিবীর প্রভু বলে বিশ্বাস করে। কৃষ্ণাঙ্গ কেউ হোয়াইট হাউসে ঢুকুক তারা সেটা অন্তর থেকে চায় না। বারাক ওবামাকে তাদের মেনে নেয়ার ক্ষেত্রে যে মনোভাবটি কাজ করেছিল তা সম্ভবত এই যে, তিনি পূর্ণ কৃষ্ণাঙ্গ নন, তার মা শ্বেতাঙ্গী। দ্বিতীয়ত, তিনি কৃষ্ণাঙ্গ কেনিয়ান মুসলমান পিতার সন্তান হলেও শ্বেতাঙ্গ নানা-নানীর আশ্রয়ে প্রতিপালিত হয়ে একজন খ্রিস্টান হিসেবে বেড়ে ওঠেন। যুক্তরাষ্ট্রের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান মূল্যবোধ নিয়ে বেড়ে ওঠায় বিজাতীয় চেতনা ও সংস্কার থেকে তিনি মুক্ত। তার নির্বাচনী বক্তৃতা-বিবৃতি শুনে শ্বেতাঙ্গ ভোটাররা তার পাণ্ডিত্য ও মেধা সম্পর্কে আশ্বস্ত হয় এবং তাকে প্রথম অশ্বেতাঙ্গ হিসেবে বা অর্ধ-শ্বেতাঙ্গ হিসেবে হোয়াইট হাউসে ঢুকতে দিতে মনের দ্বিধা কাটিয়ে উঠতে পারে।

একজন বিদ্বান ও বুদ্ধিমান ব্যক্তি হিসেবে বারাক ওবামা অবশ্যই জানেন ব্রিটেন ও যুক্তরাষ্ট্রের খ্রিস্টান শ্বেতাঙ্গ সভ্যতার মধ্যগগনে থাকা অবস্থায় তাদের অহমিকায় আঘাত লাগে এমন সবকিছু তাকে পরিহার করে চলতে হবে। এর অন্যথা হলে বা করলে হোয়াইট হাউসে তার থাকা চলবে না। একজন আধা কৃষ্ণাঙ্গ হিসেবে তার হোয়াইট হাউসে প্রবেশ তার জন্য বিশাল এক বিজয়। হোয়াইট হাউসে ঢুকে তিনি দেখিয়ে দিয়েছেন অশ্বেতাঙ্গরাও মেধাবী মানুষ এবং তারা বহুলাংশে ও বহু ক্ষেত্রে, যেমন ক্রীড়াঙ্গন ও সঙ্গীতে শ্বেতাঙ্গদের থেকে এগিয়ে অবস্থান করে। ইরাক, আফগান ও লিবীয় নিরস্ত্র এবং নিরপরাধ মানুষ ক্ষেপণাস্ত্র মেরে ও বিমান থেকে বিষাক্ত বোমা ফেলে হত্যা অমানবিক ও অন্যায়। ওসামা বিন লাদেন হত্যা অভিযান দেখার সময় তিনি স্বীকার করেছেন, তিনি ছিলেন বিহ্বল এবং দিশেহারা। সে ৪০ মিনিট সময় তিনি চরম উত্কণ্ঠায় কাটান। এমন একজন সংবেদনশীল মানুষকে তবু জেদের বশবর্তী হয়ে দখল করা গদিতে নিরাপদে বসে থাকতে তার মনের বিরুদ্ধে বিশ্বের নানা প্রান্তে হত্যাকাণ্ড চালিয়ে নেয়া সহ্য করতে হয়। তিনি কিছুকাল আগে ইউরোপ সফর করেন, পশ্চিম ইউরোপের শ্বেতাঙ্গদের পৃথিবীর ওপর আধিপত্য রক্ষায় আশ্বাস দিতে। এ কাজটি করতেও তিনি যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার স্বাক্ষর রেখেছেন। ব্রিটেনের সরকার ওবামা দম্পতিকে রাখে রানীর প্রাসাদে তার মেহমান হিসেবে। ব্রিটেনের পার্লামেন্টে এমপিরাও বসেন চাপাচাপি করে। এজন্য ব্রিটেনের লর্ডস ও কমন্সসভার সদস্যদের উদ্দেশে তার ভাষণদানের ব্যবস্থা করা হয় নয়শ বছরের পুরনো ওয়েস্ট মিনস্টার গির্জার হলঘরে, যা এক বিরল সম্মান। সেখানে তার ইউরো-আমেরিকান প্রভুত্ব, চীন ও ভারতের লাফিয়ে লাফিয়ে এগিয়ে চলার পৃষ্ঠপটে, এ শতাব্দী ও তার পরেও ধরে রাখার জন্য করণীয় নির্দেশ করে দেয়া ভাষণ, এক কথায় অনবদ্য। শ্রোতারা তাতে মুগ্ধ হন।

বারাক হোসেন ওবামার শাসন-সাধন যে সার্থক একবাক্যে তা স্বীকার করতে হয়। তিনি সব কুল রক্ষা করে চলতে সফল হয়েছেন। মুসলমান হত্যা ও নির্যাতন বন্ধ করতে না পারলেও সভ্যতায় সভ্যতায় সংঘর্ষে তিনি বিশ্বাসী নন তা বলেছেন। আফগানিস্তান থেকে সৈন্য প্রত্যাহারেরও একটি ঘোষণা দিয়েছেন কমান্ডারদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে। নানা প্রতিকূলতার মধ্যে কাজ করেও যেমন লিবিয়ায় ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আদেশ দিয়ে তিনি সসম্মানে শ্বেতাঙ্গ মৌলবাদীর দেশে টিকে আছেন, তেমনি পরের নির্বাচনে দল তাকেই মনোনয়ন দেবে এটাও সুনিশ্চিত। তবে যতদিন তিনি প্রেসিডেন্ট ও অন্য পদে থাকবেন শ্বেতাঙ্গদের মুখ চেয়ে ও রক্ষা করে তাকে চলতে হবে। আগামী নির্বাচনে জেতাও তাদের ওপর নির্ভরশীল। ব্যাপারটা বোঝেন বলেই শ্বেতাঙ্গ ইহুদি-খ্রিস্টানদের সন্তুষ্ট করার জন্য তিনি জাতিসংঘে ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের সদস্যপদ লাভের বিরুদ্ধে গোঁয়ারের মতো কঠোর অবস্থান নিয়েছেন।

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে