Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ২৭ জানুয়ারি, ২০২০ , ১৪ মাঘ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (34 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-২৫-২০১৩

ময়মনসিংহের যুবরাজ তিনি!


	ময়মনসিংহের যুবরাজ তিনি!

ময়মনসিংহ, ২৪ আগষ্ট- পুরো জেলাকে বানিয়েছেন নিজের সাম্রাজ্য। তার অনুমতি ছাড়া মিলবে না কিছুই। ব্যবসা, চাকরি থেকে শুরু করে সবকিছুতেই লাগে তার অনুমতি। সবকিছুর নিয়ন্ত্রণ রেখেছেন শক্ত হাতে। এজন্য রয়েছে নিজস্ব বাহিনীও। এদের অনেকেই আবার বেতনভোগী। কেউ বা সুযোগ-সুবিধা নিয়ে রয়েছেন বাহিনীর নেতৃত্ব পর্যায়ে। শহরের এক মাথা থেকে আরেক মাথা পর্যন্ত প্রতিটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান এখন তারই অধীনে। এলাকাবাসী তাকে খেতাব দিয়েছেন যুবরাজ বলে। প্রকৃত নাম মুহিত উর রহমান ওরফে শান্ত। এ নামে তাকে খুব একটা চেনেন না জেলাবাসী। যুবরাজ নামে তার খ্যাতি ব্যাপক। ময়মনসিংহের আলোচিত এমপি প্রিন্সিপ্যাল মতিউর রহমানের বড় ছেলে।

পিতা এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর রাতারাতি ময়মনসিংহ শহরকে গড়ে তুলেছেন নিজের সাম্রাজ্য হিসেবে। এমপি হিসেবে কাগজে-কলমে প্রিন্সিপ্যাল মতিউর রহমানের নাম থাকলেও মূলত পুরো কলকাঠি নাড়েন যুবরাজ। এতে এমপি পিতার রয়েছে অকুণ্ঠ সমর্থন। ছেলের বিরুদ্ধে নালিশ করার ক্ষমতা নেই কারও। অতিষ্ঠ হয়ে সাহস করে নালিশ করলেই তিনি হয়ে যান বিরোধী দলের সদস্য। ক্ষেত্র-বিশেষে অভিযোগকারীকে দেয়া হয় জামায়াতের তকমা।
 
সরজমিনে ময়মনসিংহের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে পাওয়া গেছে এসব তথ্য। সন্ত্রাস, টেন্ডারবাজি, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি বাণিজ্য, বালুমহাল দখল, পতিতাপল্লী, মাদক ব্যবসা এমনকি অস্ত্র ব্যবসাও নিয়ন্ত্রণ করছেন যুবরাজ। বিরোধী পক্ষকে ঘায়েল করতে সিদ্ধহস্ত তিনি। নিজ ক্যাডারদের কাজে লাগানোর পাশাপাশি আইনকেও ব্যবহার করছেন সমান তালে। বিরোধীদলীয় নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের বিরুদ্ধে একের পর এক মামলা করে তাদের অনেককে করেছেন এলাকাছাড়া। এদের মধ্যে অনেকেই রয়েছেন জেলে বন্দি। শহরজুড়ে বেশির ভাগ পোস্টারে দেখা গেছে ছাত্রদল, যুবদল নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা তুলে নেয়ার দাবি।
 
এদিকে পুত্রের কল্যাণে এমপি পরিবার এখন শ’ শ’ কোটি টাকার মালিক। শহরের কেন্দ্র থেকে শুরু করে আনাচে-কানাচে রয়েছে অগাধ সম্পত্তি। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলোতে একচ্ছত্র আধিপত্য। কথিত রয়েছে, এমপিপুত্র যে ব্যবসায় হাত দেন রাতারাতি ওই ব্যবসা লাভজনক হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়।
 
২০০১ সালে প্রিন্সিপ্যাল মতিউর রহমানের একটি মাত্র ব্যাংক একাউন্ট ছিল শহরের বড় বাজার অগ্রণী ব্যাংক শাখায়। যার নম্বর ৭৯২৯/২৬। ওই বছরের মে মাসে তার একাউন্টের সর্বশেষ ব্যালেন্স ছিল ২৫৬ টাকা। মূলত কৃষিকাজ আর গরু পালন করে সংসারের ব্যয় নির্বাহ করতেন এমপি। ওই সময় ৪টি গাভী ছিল তার আয়ের মূল উৎস। প্রতিদিন ৯০ লিটার দুধ বিক্রি করতেন। মিন্টু মেমোরিয়ার কলেজ প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর তার মাসিক আয় দাঁড়ায় ১২ হাজার টাকা। সর্বশেষ ২০০৮ সালে নির্বাচনে নির্বাচন কমিশনের কাছে তার দেয়া সম্পদ বিবরণীতে বার্ষিক আয় উল্লেখ করা হয় ১ লাখ ৩৭ হাজার ৮শ’ টাকা। একই হিসাবে স্ত্রী ও পুত্রের বার্ষিক আয় দেখানো হয় তিন লাখ টাকা। সন্তান ও আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকে সুদবিহীন ঋণের পরিমাণ দেখানো হয় চার লাখ ৮৭ হাজার ৮শ’ টাকা। এরপর সময় গড়িয়েছে। পেরিয়েছে প্রায় ৫ বছর। একই সঙ্গে ফুলে-ফেঁপে উঠেছে এসব সম্পত্তির পরিমাণ। ২০০১ সালে একটি ব্যাংক একাউন্ট থাকলেও এখন তা বেড়েছে। স্ফীত হয়েছে ওইসব ব্যাংকের ব্যালেন্সও। আর এসব কিছুই হয়েছে পুত্র যুবরাজের কল্যাণে। এমপি পিতার সমর্থনে পুত্র আজ ময়মনসিংহের ধনীর তালিকায় প্রায় শীর্ষে।
 
ঠিকাদার না হয়েও সব টেন্ডারের নিয়ন্ত্রক তিনি। ঠিকাদারের কোন লাইসেন্স নেই এমপিপুত্রের। নেই ব্যবসাও। তারপরও জেলার সব টেন্ডারের নিয়ন্ত্রক তিনি। ঠিকাদারদের তথ্য অনুযায়ী বর্তমান সরকারের আমলে প্রায় ৪০০ কোটি টাকার টেন্ডার হয়েছে ময়মনসিংহ শহরে। তার অনুগত দু’টি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে এসব টেন্ডার ভাগ-বাটোয়ারা করা হয়েছে। এগুলো হচ্ছে- এসএম এন্টারপ্রাইজ ও মাহবুব এন্টারপ্রাইজ। দু’টি প্রতিষ্ঠানের মালিক মাহবুবুর রহমান ও সাগর পরিচিত শান্ত’র ডানহাত-বামহাত হিসেবে। বেশ ক’জন ব্যবসায়ী জানান, এ পর্যন্ত কোন টেন্ডার নিয়ম অনুযায়ী হয়নি। টেন্ডারের শিডিউল কেনার পর তা বাড়ি থেকে কেড়ে নেয়ার মতো ঘটনাও ঘটেছে। জেলায় যদি ৫০ জন ঠিকাদার থাকে তাহলে ৪০ জনই গত সাড়ে চার বছরে একটি টেন্ডারেও অংশ নিতে পারেননি। শান্ত’র নেতৃত্বে তার ২/৩শ’ সদস্যের পেটোয়া বাহিনীর ভয়ে ওই ব্যবসায়ীরা হাত গুটিয়ে বসে রয়েছেন। এদের কারও কারও আর্থিক অবস্থা শোচনীয় পর্যায়ে পৌঁছেছে।
 
এদিকে আগামী ১লা সেপ্টেম্বর জেলার বেশ কয়েকটি থানায় মাদ্‌রাসা নির্মাণ ও মেরামতের টেন্ডার আহ্বান করা হবে। ৬০ লাখ টাকা মূল্যমানের ২৭টি কাজ করা হবে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। শান্তর নেতৃত্বে এসব কাজের টেন্ডার এরই মধ্যে ভাগ-বাটোয়ারার প্রস্তুতি শেষ হয়েছে বলে জানান তারা। শহরের অন্যতম ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান মেসার্স মীক এন্টারপ্রাইজের মালিক সিদ্দিকুর রহমান মিন্টু বলেন, গত সাড়ে চার বছরে আমি একটি টাকারও টেন্ডার জমা দিতে পারিনি। শান্ত তার ক্যাডার বাহিনী দিয়ে সব টেন্ডার কুক্ষিগত করে রাখে। দেড় বছর আগে প্রায় এক কোটি টাকার একটি টেন্ডারের শিডিউল কিনেছিলাম। পরে আমার বাসা থেকে শান্তর ক্যাডাররা ওই শিডিউল কেড়ে নিয়ে যায়। এরপর ব্যবসা বাদ দিয়ে হাত গুটিয়ে বসে আছি।
 
এলাকাবাসী জানিয়েছেন, শান্ত দু’টি দামি গাড়ির মালিক। একটি প্রাডো ও আরেকটি মাইক্রোবাস। এর মধ্যে মাইক্রোবাসটি নেয়া হয়েছে উৎকোচ হিসেবে। সদর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান পদে আশরাফ উদ্দিনকে মনোনয়ন দিয়ে তার কাছ থেকে নেয়া হয়েছে ওই গাড়ি। এ ঘটনা এখন লোকমুখে ছড়াছড়ি।
 
বেপরোয়া ক্যাডার বাহিনী: জেলার ছাত্রলীগ কর্মীদের নিয়ে এমপিপুত্র শান্ত গড়ে তুলেছেন নিজস্ব ক্যাডার বাহিনী। বিভিন্ন অস্ত্রে পারদর্শী এ ক্যাডারের সংখ্যা দুই শতাধিক। এদের বেশির ভাগই মাসিক মাসোহারা নিয়ে কাজ করেন। আবার অনেককে দেয়া হয়েছে নানা ধরনের ছোট ব্যবসা। বিনিময়ে শান্তর অনুগত হয়ে থাকতে হয়। কয়েকটি মার্কেটের ব্যবসায়ী অভিযোগ করে বলেন, ঈদের আগে শান্তর বেপরোয়া ক্যাডার বাহিনী ইচ্ছামতো শপিং করেছে। জামা-কাপড় থেকে শুরু করে পায়ের স্যান্ডেল নিয়ে টাকা না দিয়ে চলে গেছে। টাকা চাইলে শান্তর নাম বলে শাসিয়ে যায়। এরপর টুঁ শব্দ পর্যন্ত করতে পারিনি।
 
এলাকাবাসী জানান, শহরের গাঙ্গিনার পাড় এলাকায় কয়েক মাস আগে আলীম জুয়েলার্সে ডাকাতি হয়। এতে প্রায় কয়েক কোটি টাকার স্বর্ণ লুট হয়। ওই ঘটনার অভিযোগের তীর রয়েছে শান্ত ও তার ক্যাডার বাহিনীর দিকে। যুক্তি তুলে ধরে এলাকাবাসী জানান, এতবড় লুটের ঘটনায় মামলা হলেও এখন পর্যন্ত কোন আসামি গ্রেফতার হয়নি। এমপি ও তার পরিবারের পক্ষ থেকে ওই ঘটনা নিয়ে কোন ধরনের ভূমিকা পালন করেননি। এছাড়া জায়গা-জমি দখলের নামে ক্যাডার বাহিনী এ পর্যন্ত বেশ কয়েক ব্যক্তিকে আহত করেছে। টাকার বিনিময়ে জমি জবর দখলে এ বাহিনী মুখ্য ভূমিকা পালন করে। সম্প্রতি মিনাক্স বিউটি পার্লারের মালিক রফিককে তার দখলে থাকা জমি থেকে উচ্ছেদ করেছে শান্ত’র পেটোয়া বাহিনী।
 
টার্গেট এখন রেলওয়ের জমি: সম্প্রতি এমপি প্রিন্সিপ্যাল মতিউর রহমানকে এ সরকারের আমলে নতুন গঠিত রেলওয়ে মন্ত্রণালয় বিষয়ক সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি করা হয়েছে। পিতার এ ক্ষমতার পূর্ণ সুযোগ নিতে এখন ব্যস্ত শান্ত। ময়মনসিংহসহ বেশ কিছু এলাকায় রেলওয়ের জমি দখলের চেষ্টা করছেন তিনি। শহরের ছোটবাজার এলাকার একজন চা দোকানদারকে শান্তর কথা বলতেই তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠলেন। বললেন, ছেলেটি আগে ভাল ছিল। এবার বাবা এমপি হওয়ার পর দু’হাতে টাকা কামাচ্ছে। কোনটা উচিত আর অনুচিত তা ভেবে দেখছে না। আওয়ামী লীগের সমর্থক আমি। তার কারণে এ পরিচয় দিতে লজ্জা হয়। তিনি বলেন, একজন মানুষের কত টাকা লাগতে পারে বলতে পারেন? প্রিন্সিপাল সাহেব যেভাবে আমাদের কাছে দলের মূর্তি হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠা করেছেন ছেলে শান্ত তা একেবারে ডুবিয়েছে। আর কয়দিন মাত্র আছে। ৫ বছরের খেসারত পাবে আগামীতে।
 
বড়লোক হওয়ার কারণ আমার কাছে অজানা- শান্ত: সাড়ে চার বছরে কিভাবে এত টাকার মালিক হলেন তা নিজেই জানেন না বলে জানালেন যুবরাজ নামে খ্যাত শান্ত।
তিনি বলেন, আমি কিভাবে বড়লোক হয়েছি এটা আমার কাছে এখনও অজানা। সাধারণ মানুষের কাছে কমন পারসেপশন হয়েছে- আমি বড়লোক হয়েছি। টেন্ডার সন্ত্রাস প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আমার নিজের কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নেই। আমি নিজেও কোন ঠিকাদারি করি না।। তারপরও আমার নাম কিভাবে আসে জানি না। তবে এটুকু নিশ্চয়তা দিতে পারি ময়মনসিংহ শহরে চাঁদাবাজি আর সন্ত্রাসী এই সরকারের আমলে হয়নি। ‘তবে টেন্ডার নিয়ে আপনার বিরুদ্ধে রয়েছে বিস্তর অভিযোগ, এমনকি ৫ পার্সেন্ট নেয়ার কথাও প্রচলিত রয়েছে’- এ প্রশ্নে তিনি বলেন, এ বিষয়ে আমি আপনাকে এভয়েড করছি না। এটুকু বলতে পারি, আমি কোনভাবেই ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নই। শান্ত বলেন, আমার একমাত্র অপরাধ আমি এমপি প্রিন্সিপ্যাল সাহেবের ছেলে। রাজনৈতিকভাবে স্বার্থ হাসিলের জন্যই আমার বিরুদ্ধে এ ধরনের অপপ্রচার চালানো হয়েছে। তিনি বলেন, ময়মনসিংহ শহরে আমি কারও কোন ক্ষতি করিনি। আমার তো ইচ্ছা মানুষের সেবা করা। রেলওয়ের জমি দখল অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রেলওয়েতে আমি কখনও যাইনি। এমনকি রেলওয়ের কোন কর্মকর্তাও আমাকে চেনেন না। যদি কেউ বলে থাকেন রেলওয়ের কোন জায়গার জন্য তদবির করেছি তাহলে তা মাথা পেতে নেবো।

ময়মনসিংহ

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে