Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৮ জুলাই, ২০১৯ , ২ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০৮-২০১৯

যানজট: একজন যাত্রীর দৃষ্টিতে

ড. সেলিম রশিদ


যানজট: একজন যাত্রীর দৃষ্টিতে

ঢাকার যানজট সমস্যাটি একাধারে অসহনীয় এবং অনিবার্য একটি বিষয় হয়ে উঠেছে। এর ফলে যাতায়াত ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি কমেছে অবসর ও বিশ্রামের সময়। যদিও একটা সময় ঢাকা ছিল মনোরম ও বাসযোগ্য এক নগরী। তবে অতিরিক্ত জনসংখ্যার ফলে এক ধরনের চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এখন যদি প্রশ্ন করা হয়, বিদ্যমান পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে চলার মূল্যটা কী? অবসর সময় মূল্যায়নে অত্যাধুনিক প্রগতির ধারণাকে ধারণ করতে হয়, তবে কর্মঘণ্টা হিসেবে আর্থিক ক্ষতির বিষয়টি সরাসরি সংখ্যাগত।

যানজটের দরুন বাড়তি সময়ক্ষেপণের ফলে মানুষের আয়ের ওপর প্রভাব পড়ছে বা এটি মানুষের উপার্জনকে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই প্রত্যেকের কাজের ধরন অনুসারে কর্মঘণ্টার বিষয়টি মূল্যায়ন করা যেতে পারে। এক্ষেত্রে নিম্ন জীবনযাত্রার মানের দিকটি ভুলে গিয়ে, যা কিনা ঢাকাকে ঘিরে নেতিবাচক মানসিকতা তৈরি করে, যাতায়াতের জন্য যে অতিরিক্ত সময় লাগছে, তার অর্থনৈতিক মূল্য নির্ণয়ে মনোযোগী হওয়াটাই শ্রেয়। সবার কাছ থেকে জানার উদ্দেশ্যে আমরা প্রশ্ন রাখি, আপনার চোখে সুনির্দিষ্ট ও বহুল পরিচিত রাস্তা কোনটি?

মালিবাগ থেকে কুড়িলের প্রশস্ত সড়ক, রামপুরা, বাড্ডা ও বসুন্ধরা পর্যন্ত স্বচ্ছন্দে যান চলাচলের জন্য যথাযথ নির্দেশনা প্রদান করা হয়েছে। তবে এখনো ব্যস্ত সময়গুলোয় বিশেষ করে সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত যাত্রীদের এ দূরত্বটুকু অতিক্রম করতে বাড়তি ১ ঘণ্টা সময় ব্যয় করতে হয়। উদাহরণস্বরূপ, কেউ যদি এ রাস্তায় গাড়িতে যাতায়াত করেন, তাহলে ২৫ মিনিটের বদলে তাকে ১ ঘণ্টা ২৫ মিনিট সময় ব্যয় করতে হয়। বিষয়টি আমরা কীভাবে জানি? উত্তর হচ্ছে, ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ভিন্ন ভিন্ন যানবাহন ব্যবহার করে ওই দূরত্ব অতিক্রমের পর দেখা যায়, গড়ে তাদের ১ ঘণ্টা করে যাতায়াত সময় অপচয় হয়েছে।

যাতায়াতের সময় অপচয়ের সূত্র ধরে পরবর্তীতে আমরা জানতে চেষ্টা করি, বিভিন্ন ধরনের যানবাহন— বাস, ব্যক্তিগত গাড়ি, রিকশা ইত্যাদি ব্যবহারকারী ভুক্তভোগী মানুষের সংখ্যা কত। জরিপ থেকে আমরা জানতে পারি, সড়কটি দিয়ে প্রতিদিন গড়ে ৫২০টি প্রাইভেট কার, ৩০৬টি সিএনজি ও ১৪১টি বাস যাতায়াত করে। ফুটওভার ব্রিজের ওপর থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা উল্লিখিত সময়ে সড়কটি দিয়ে যেসব যান চলাচল করেছে, তার সংখ্যা গণনা করেছে। তারা এটি করেছে দুই সপ্তাহের বেশি সময় নিয়ে। এক্ষেত্রে বিভিন্ন দিনে সকাল ৮টা থেকে ১০টা এবং বিকাল ৪টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত সড়কটি দিয়ে চলাচলকারী যানবাহনের সংখ্যা গণনার ভিত্তিতে জরিপটি সম্পাদিত হয়েছে। তাছাড়া দেখা গেছে, বাসপ্রতি যাত্রীর সংখ্যা গড়ে প্রায় ৩৮ জন। সেক্ষেত্রে মালিবাগ-কুড়িল সড়কে ব্যস্ত সময়ে প্রতি ঘণ্টায় ১৪১ থ ৩৮=৫,৩৫৩ জন যাত্রী বাসে যাতায়াত করেন।

জরিপের শেষ অংশটি ছিল যানজটে অপচয় হওয়া সময়ের মূল্য নিরূপণ। আমাদের সব নাগরিকরাই মূল্যবান, তবে তাদের সবার সময়ের মূল্য হয়তো সমান নয়। তাই যাত্রীর ধরনভেদে আমাদের যানজট প্রবাহকে আলাদা করা প্রয়োজন এবং যাতায়াতের ক্ষেত্রে ব্যক্তি কোন ধরনের যানবাহন বেছে নিচ্ছেন, তার ওপর ভিত্তি করে একটি আনুমানিক পার্থক্য নির্ণয় করা যেতে পারে। যেমন একজন ব্যবসায়ী তার ব্যক্তিগত গাড়িতে করেই যাতায়াত করেন, আবার পণ্য বা সরবরাহ বিলির কাজগুলো সাধারণত বাস কিংবা ভ্যানের মাধ্যমে করা হয়ে থাকে। সেক্ষেত্রে বিভিন্ন শ্রেণীর যাত্রীর ক্ষেত্রে আমরা কীভাবে তাদের যাতায়াত সময়ের মূল্য নির্ধারণ করে একটি সংখ্যাগত সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি? সৌভাগ্যবশত, সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) ২০০৪-০৫ সালের সড়ক ব্যয়ের বার্ষিক প্রতিবেদনটি আমরা খুঁজে পাই। সেখানে দেখা যায়, একটি সাধারণ মানের বাসে যাতায়াত খরচ (যাত্রী/ঘণ্টা) ২৪ টাকা ২১ পয়সা, গাড়ির ক্ষেত্রে ৩৯ টাকা ৯৪ পয়সা এবং সিএনজির ক্ষেত্রে ২৫ টাকা ৭২ পয়সা। ২০১৯ সালে এসে আমরা কীভাবে ওই তথ্যগুলোকে হালনাগাদ করতে পারি? যদি ২০০৬ সাল থেকে হিসাবটি করা হয়। তাছাড়া ওই অর্থের অংকের মধ্যে পরিবেশগত খরচ, যেমন বায়ুদূষণের বিষয়টি হিসাব করা হয়নি।

কিংবা আমরা কেন সড়ক ও জনপদের (সওজ) ২০১৯ সালের পরিসংখ্যান ব্যবহার করছি না? এর উত্তর হচ্ছে, ২০০৫ সালের পর থেকে দুর্ভাগ্যজনকভাবে সওজ কর্তৃপক্ষ সড়ক ব্যয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে জরিপ কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা বোধ করেনি। তাই নিজেদের সাধারণ জ্ঞানের ভিত্তিতে ২০০৫ সালের পরিসংখ্যানটি আমাদের হালনাগাদ করতে হয়েছে। প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার থেকে আমরা প্রতিটি ধারাবাহিক বছরের জন্য প্রকৃত যাতায়াত খরচ সমন্বয় করেছি। উদাহরণস্বরূপ, প্রকৃত জিডিপি বৃদ্ধির হার যদি ৬ দশমিক ৭ শতাংশ হয়, সেক্ষেত্রে একজন গাড়ির যাত্রীর ৩৯ টাকা ৯৪ পয়সা সড়ক ব্যয়কে আমরা ১ দশমিক শূন্য ৬৭ দিয়ে গুণ করেছি। ২০০৬ সালের মূল্যস্ফীতির পরিমাণ যদি ৭ শতাংশ হয়, তাহলে আগের ১ দশমিক শূন্য ৭ শতাংশ দ্বারা গুণ করা হয়েছে। সেক্ষেত্রে ২০০৬ সালের হিসাবটি সমন্বয় করা হয়েছে এভাবে, ৩৯.৯৪ থ ১.০৬৭ থ ১.০৭।

একই পদ্ধতিতে ২০১৮ সাল পর্যন্ত ধারাবাহিকভাবে হিসাব করে যাতায়াত খরচের পরিমাণটি নির্ণয় করা হয়েছে। জিডিপির প্রবৃদ্ধি হারের সঙ্গে মূল্যস্ফীতির হারের সমন্বয় করে ২০১৮ সালে যাতায়াত খরচ হিসেবে আমরা যে তথ্যটি পাই, তা হলো যাতায়াত খরচের পরিমাণ বাসের জন্য ১৫৪ টাকা, গাড়ির ক্ষেত্রে ২২৩ ও সিএনজির জন্য ১৪৩ টাকা বৃদ্ধি পেয়েছে। এবার আমরা বিভিন্ন যানবাহনভেদে মোট যাতায়াত খরচ নির্ণয় করতে পারি। যেমন ব্যস্ত সময়ে চলাচলকারী ১৪১টি বাসের প্রতিটিতে যদি ৩৮ জন করে যাত্রী থাকেন এবং প্রতিজন যাত্রীকে যাতায়াত ব্যয় বাবদ ১৫৪ টাকা দিতে হয়, সেক্ষেত্রে মোট যাতায়াত খরচ দাঁড়ায়: ১৪১ থ ৩৮ থ ১৫৪ = ৮ লাখ ২৫ হাজার ১৩২ টাকা। একইভাবে প্রাইভেট কার, সিএনজি ও রিকশা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যয় হয় যথাক্রমে ৩ লাখ ৪৭ হাজার ৮৮০ টাকা, ৮৭ হাজার ৫১৬ ও ৭১ হাজার ৮৫০ টাকা। এভাবে ১ ঘণ্টায় মোট যাতায়াত ব্যয় ১৩ লাখ ৩২ হাজার ৩৭৮ টাকা। ওই একটি সড়কেই মোট যাতায়াত খরচ চার গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেয়ে ৫৩ লাখ ২৯ হাজার ৫১২ টাকা হয়েছে। তাহলে এক মাসে ২২ কর্মদিন হিসেবে মোট যাতায়াত খরচ হবে ১১ কোটি ৭২ লাখ ৪৯ হাজার ২৬৪ টাকা!

ব্যস্ত সময়ে যানজটের ফলে শুধু একটি সড়কেই মোট যাতায়াত খরচ (টোটাল ট্রাভেল কস্ট) হিসেবে এত বিশাল পরিমাণের অর্থ আমাদের ব্যয় করতে হয়। যদিও এখানে যানজট বৃদ্ধির ফলে ঝুঁকিপূর্ণ বায়ুদূষণের ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয় না, কিংবা হিসাব করা হয় না সড়কে অগণিত মৃত্যুর মিছিলের ক্ষতির বিষয়টিও।

উল্লিখিত গণনাটি যদি সঠিক হয়, তাহলে মালিবাগ থেকে কুড়িল পর্যন্ত স্বাভাবিক ট্রাফিক প্রবাহ নিশ্চিত করে আমরা প্রতি মাসে ১১ কোটি টাকা খরচ বাঁচাতে পারি। এ পরিমাণ অর্থের চেয়ে কম খরচে নতুন কোনো ট্রাফিক ব্যবস্থা প্রণয়নের মাধ্যমে আমরা কি যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারি না?

ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নগর গবেষণা ও টেকসই উন্নয়ন কেন্দ্র (সিইউএসএসডি) এমন একটি বিকল্প ট্রাফিক প্যাটার্ন নিয়ে কাজ করেছে, যেখানে মোট যাতায়াত খরচ এক-তৃতীয়াংশ কম হয়। বিকল্প প্যাটার্নটি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে কুড়িল ও মালিবাগ সড়কের শেষ প্রান্তে রাস্তার বিভক্তি। শেষ মাথায় এসে রাস্তাটি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে যাওয়ায় ব্যস্ত সময়ে স্বাভাবিক যানবাহনের চাপ থাকলেও সড়কটি সম্ভবত তা ধারণ করতে পারবে না। নগর ট্রাফিক সর্বোপরি একটি আন্তঃসংযোগ ব্যবস্থা, তাই এর ক্ষুদ্র কোনো অংশের ওপর পরীক্ষা চালিয়ে সমাধানে পৌঁছানো অকার্যকর বা ব্যর্থ চেষ্টায় পরিণত হতে পারে।

ধারণা করা যায়, বাংলাদেশের বাইরে এ ধরনের বিষয় গণনাটা অনেকটাই অবাস্তব বলে প্রতীয়মান হবে। নগর পরিকল্পনাবিদদের ব্যবহূত মান অনুযায়ী, যাতায়াত সময় অতিরিক্ত ১ ঘণ্টা বৃদ্ধির ফলে কর্মদক্ষতা দ্রুত হারে হ্রাস পেতে থাকে। তবু এ একটি সড়কে ১ ঘণ্টা অতিরিক্ত সময়ক্ষেপণের ফলে স্বাভাবিকভাবেই যাতায়াতের মোট সময় অনেক বেড়ে যায়। এ ধরনের প্রতিবন্ধকতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ যদি ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জনে সক্ষম হতে পারে, তাহলে একবার কল্পনা করুন তো, যানজট সমস্যার সমাধান আর যাতায়াতের সময় বাঁচানোর মধ্য দিয়ে আমরা কতটা অগ্রসর হতে পারি।

পরিশেষে জরিপে অংশগ্রহণকারী সবচেয়ে আগ্রহী দুই শিক্ষার্থী শারমীন আকতার ও জেরিন সুলতানার অভিজ্ঞতাটি বোধকরি আমাদের সমস্যা সম্পর্কে মনোযোগী হতে সাহায্য করবে। ফুটওভার ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে তারা যখন যানবাহনের সংখ্যা গণনা করছিলেন, তখন একজন নারী তাদের প্রশ্ন করেছিলেন, ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে তারা কী করছে? নিজেদের কাজ সম্পর্কে বর্ণনার পর শিক্ষার্থীদ্বয় পুনরায় ওই নারীর কাছে জানতে চাইলেন, তিনি এ সময় ব্রিজের ওপর দাঁড়িয়ে কী করছেন? তিনি উত্তরে বলেছিলেন, ‘আমার কিছু করার ও কোথাও যাওয়ার নেই, তাই আমি এখানে এসেছি। কারণ একমাত্র ব্রিজের ওপরই আমি নিজের মতো আয়েশ করে হেঁটে বেড়াতে পারব’, যা কিনা ঢাকার নগরজীবনের মান সম্পর্কিত একটি জঘন্য মন্তব্য। নীতিনির্ধারকদের সাধারণ মানুষের এ বিষয়টিতে নজর দেয়া জরুরি।

লেখক: অর্থনীতিবিদ; ইউনিভার্সিটি অব ইলিনয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ও ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির অধ্যাপক।

আর/০৮:১৪/০৮ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে