Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৩ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০৮-২০১৯

রাশিয়ান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ইতিকথা

হাসিব শাহ আমান


রাশিয়ান সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ইতিকথা

সাহিত্য, দর্শন কিংবা রাজনীতিতে রাশিয়া সর্বদাই এক অগ্রগামী নাম। তাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যে রয়েছে নানান জাতি, দেশ, ধর্ম এমনকি বিশ্ব রাজনীতির প্রভাব। আর এসব কিছুই মিলিয়ে গড়ে উঠেছে আজকের রাশিয়ার সংস্কৃতি। বর্তমানে রাশিয়ায় কিছু ছুটির দিন পালন করা হয়, যেগুলো এসেছে প্রাচীন স্ল্যাভদের সংস্কৃতি থেকে, যারা প্রকৃতপক্ষে প্যাগান ছিল। রাশিয়ার সে অঞ্চলে খ্রিস্ট ধর্মের প্রসার ঘটলে সেখানে তাদের প্যাগান সংস্কৃতি খ্রিস্ট সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে যায়।

রাশিয়ান বিপ্লবের পর খ্রিস্ট ধর্মের বিভিন্ন পবিত্র দিনগুলোকে তাদের সংস্কৃতি থেকে রাষ্ট্রীয়ভাবে বাতিল করা হলে তখন বিভিন্ন ছুটির দিন এবং প্রথাও বাতিল হয়ে যায়। যদিও কিছু সংখ্যক রাশিয়ান গোপণীয়তার সাথে সেগুলো পালন করা চালিয়ে যেতে থাকেন। বর্তমানে রাশিয়ানরা বিভিন্ন নিয়ামকের সমাহারে গড়ে ওঠা তাদের আজকের সংস্কৃতি উপহার বিনিময় কিংবা সম্পূর্ণই নিজেদের মতো করে পালন করে থাকেন। জেনে আসা যাক তাদের এমন কিছু সংস্কৃতি সম্পর্কে।

১. নতুন বছরের সূচনা
নতুন বছরের সূচনালগ্ন হল রাশিয়ানদের জন্য সবচেয়ে আনন্দের ও আকাঙ্ক্ষিত ছুটির দিনটি। সোভিয়েত ইউনিয়নকালীন সময়ে বড়দিন পালন নিষিদ্ধ হয়ে গেলে সে সময় থেকেই বড়দিনের উদযাপনের বিভিন্ন রীতি এই নতুন বছরের দিনটির উদযাপনের রীতির সঙ্গে মিশে যায়। উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে, এদিন রাশিয়ানরা ক্রিসমাস-ট্রি’র মোড়কে একে অন্যকে বিভিন্ন উপহার দিয়ে থাকেন। সোভিয়েত যুগ থেকেই অন্যান্য প্রথার পাশাপাশি এগুলোও জায়গা করে নিয়েছে। এদিনের বিশেষ আয়োজনে মোটামুটি প্রত্যেক রাশিয়ান ঘরেই থাকে বিশেষ রাশিয়ান সালাদ ‘আলিভিয়েহ’, ‘স্টুডেন’ নামের মাংসের এক বিশেষ রাশিয়ান খাবার এবং ‘হালাদাইয়েতস’। নতুন বছরের শুরুটা রাশিয়ানদের জন্য খুশির বন্যা নিয়ে আসে। তারা বিশ্বাস করে, সে রাতটি তারা যেভাবে শুরু করবে, নতুন বছর পুরোটাই সেভাবে কেটে যাবে। বিশেষ করে যে মুহূর্তে ঘড়ির কাঁটা মধ্যরাতের জানান দিয়ে পুরাতন বছরকে বিদায় জানায়, সে মুহূর্তটা সকলেই স্মরণীয় করে রাখতে সচেষ্ট থাকে। কেননা এই মুহূর্তটাই তাদের কাছে পুরো রাতের সবচেয়ে অর্থবহ সময়। এই রাতটি পালনে তারা নিজেদের বন্ধু বা আত্মীয়দের বাড়িতে চলে আসে। বিভিন্ন খাবার, পানীয় নিয়ে তারা পুরাতন বছরকে ধন্যবাদ জানায় এবং নতুন বছরকে বরণ করে নেয়।

২. বড়দিন
রাশিয়ানরা জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরণ করে জানুয়ারির ৭ তারিখের দিনটিকে বড়দিন হিসেবে উদযাপন করে থাকে। সোভিয়েত যুগ থেকে এই বড়দিন পালনে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও অনেক রাশিয়ানই বর্তমানে এই দিনটিকে পালন করে। বিভিন্ন প্রাচীন  সংস্কৃতি আজো রাশিয়ানদের মাঝে বিদ্যমান। তার মাঝে একটি হল, বড়দিনের সূচনালগ্নে তারা ভাগ্য-গণনা করিয়ে নেয়। তার মাঝে একটি বহুল প্রচলিত রীতি হল, ট্যারট কার্ডের বিভিন্ন অর্থ বের করে নিয়ে ভাগ্য গণনা। এ ব্যাপারটিকে রাশিয়ান ভাষায় ‘গাডানিয়া’ বলা হয়, যা তারা সাধারণত জানুয়ারির ৬ তারিখ থেকে শুরু করে জানুয়ারি মাসের ১৯ তারিখ পর্যন্ত করে থাকে। তবে বর্তমানে কিছু রাশিয়ান এই ‘গাডানিয়া’ ডিসেম্বরের ২৪ তারিখ থেকেই পালন করা শুরু করে।

৩. পুরাতন নতুন বছর     
রাশিয়ানরা যে জুলিয়ান ক্যালেন্ডার অনুসরন করে সে অনুযায়ী নতুন বছর পড়ে জানুয়ারির ১৪ তারিখ। বেশিরভাগ মানুষই তাদের ক্রিসমাস-ট্রি এই দিনটি পর্যন্ত রেখে দেয়। নিজেদের মাঝে কখনো ছোট-খাটো ধরণের উপহার আর কিছু বাড়তি খাবার পরিবেশনের মাধ্যমে মোটামুটি অনাড়ম্বরভাবেই তারা এই দিনটি পালন করে। এটি বড়দিন কিংবা নতুন বছরের মতো অতো বড় করে পালন করেনা তারা। মূলত তারা কাজে ফেরত যাবার আগে আরেকটি উৎসব পালনের মাধ্যমে নিজেদের মাঝে আনন্দ ছড়িয়ে দেয়ার একটি অজুহাত হিসেবেই এখনো এই দিনটিকে পালন করে যাচ্ছে।

৪. পিতৃভূমি রক্ষক দিবস
পিতৃভূমি রক্ষক দিবস রাশিয়ানদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি দিন। এদিন রাশিয়ায় সরকারি ছুটি জারি থাকে। এটি মূলত ১৯২২ সালে ‘রেড আর্মি’ গঠনের দিবসটিকে গণনা করে পালন করা হয়। এদিন পুরুষ এবং বালকদের বিভিন্ন উপহার ও পুরষ্কার প্রদান করা হয় এবং অভিনন্দন জানানো হয়। এছাড়া মিলিটারিতে কর্মরত নারীদেরও উপহার ও অভিনন্দন জানানো হয়। তবে দিবসটি মূলত পুরুষদের জন্যই পালন করা হয়।

৫. মাসলেনিৎসা
মাসলেনিৎসার রীতিটি ছিল মূলত প্যাগানদের, যখন প্রাচীন রুশ অধিবাসীরা সূর্যের পূজা করত। খ্রিষ্ট ধর্মের আগমনের পর বেশিরভাগ পুরনো রীতি মানুষ ভুলে গেলেও কিছু রীতি তাদের নতুন ধর্মের সঙ্গে সহাবস্থান করে নিয়ে চমৎকার একটি সংস্কৃতি গড়ে তুলতে সাহায্য করেছে। আধুনিক রাশিয়াতে মাসলেনিৎসার মুখটি তৈরি করা হয় প্যানকেক দিয়ে যা সূর্যের প্রতিরূপ ধরা হয়। এবং পুতুলটির শরীরের বাকি অংশ তৈরি করা হয় খড় দিয়ে। পুতুলটিকে এই উৎসবের সপ্তাহের শেষ দিনে পোড়ানো হয়। মাসলেনিৎসা অনুষ্ঠানটি হল মূলত শীতকে বিদায় এবং বসন্তকে বরণ করে নেয়ার একটি উৎসব। পুরো সপ্তাহজুড়ে চলে এই উৎসব। প্যানকেক প্রতিযোগীতা, ক্লাউনদের কিছু সাংস্কৃতিক অভিনয়, রাশিয়ান গল্পের চরিত্রায়ন, তুষার-বল নিক্ষেপ এবং হার্পের মিউজিকের মাধ্যমে তারা পুরো সপ্তাহ জুড়ে উৎসবটি পালন করে। বিভিন্ন খাবারের আয়োজন করা হলেও এই সময়কার মূল আকর্ষণ হিসেবে প্রতিটি ঘরেই থাকে প্যানকেক যা মধু, ক্যাভিয়ার, সাওয়ার ক্রিম, মাশরুম এবং ভ্যাড়িয়েনিয়ে নামক বিশেষ জ্যাম দিয়ে খাওয়া হয়।

৬. আন্তর্জাতিক নারী দিবস  
আন্তর্জাতিক নারী দিবস রাশিয়াতে বেশ ঘটা করে পালন করা হয়। এদিনে রাশিয়ান পুরুষেরা নারীদের ফুল, চকলেট এবং অন্যান্য উপহার দিয়ে থাকে। অন্যান্য দেশগুলোতে এই দিনটি নারী অধিকারের জন্য পালন করা হলেও রাশিয়াতে দিনটি মূলত দিনটি নারীদের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শনের জন্যই পালিত হয়। এমনকি রাশিয়াতে দিনটি একেবারে ভ্যালেন্টাইন দিবসের আদলেই পালন করা হয়।

৭. ইস্টার  
রাশিয়ান অর্থোডক্স খ্রিস্টানদের জন্য এই দিনটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কুলিচ এবং পাশকাহ নামক রুটি এই দিনের জন্য রাশিয়ানদের প্রধান খাবার হয়ে থাকে। এদিনে রাশিয়ানরা একে অপরকে ‘খ্রিস্টোস ভ্যাস ক্র্যয়েস’ বলে অভিবাদন জানায়, যার অর্থ হয়, যিশু খ্রিস্ট জেগে উঠেছেন এবং এর প্রত্যুত্তরে তারা বলে, ‘ভ্যা এস্তেনো ভ্যাস ক্র্যয়েস’ যার অর্থ হলো হ্যাঁ, সত্যিই যিশু খ্রিস্ট জেগে উঠেছেন।

৮. বিজয় দিবস
৯ মার্চ হল রাশিয়ার বিজয় দিবস। এ দিনটিতেই নাজি বাহিনী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশিয়ানদের নিকট আত্মসমর্পণ করে। এদিন প্যারেড, আতশবাজি পোড়ানো, স্যালুট এবং বিভিন্ন প্রদর্শনীর মাধ্যমে দিনটি পালন করে। এছাড়াও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভেটেরান যোদ্ধাদের সঙ্গে দেখা করে, তাদের সম্মান প্রদর্শনও এই দিনটির একটি বড় দিক। এদিন মস্কোতে বাৎসরিক সবচাইতে বড় মিলিটারি প্যারেড করা হয়।

৯. রাশিয়া দিবস
জুন মাসের ১২ তারিখ রাশিয়া দিবস পালিত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে দিনটি রুশ জনগণের কাছে দেশপ্রেম প্রদর্শনের একটি দিন হিসেবে বেশ গুরুত্ব পাচ্ছে। এদিন মস্কোর রেড স্কোয়ারে প্রচুর পরিমাণে আতশবাজি পোড়ানো হয়।

১০. আইভান কুপালা
অর্থোডক্স বড়দিনের ঠিক ৬ মাস পর, জুলাই মাসের ৬ তারিখ এই দিবসটি পালিত হয়। মূলত রাশিয়ান অর্থডক্স বড়দিনের মত করে পালিত হলেও, আইভান কুপালা খ্রিস্ট ও প্যাগান ধর্মের বিভিন্ন রীতির মিশ্রণে পালিত একটি উৎসব। ব্যাপিস্ট জন, যার রাশিয়ান নাম আইভান এর ‘আইভান’ এবং রুশ উর্বরতা, আনন্দ ও পানির দেবী ‘কুপালা’ এর নাম অনুসারে উৎসবটির নাম হয়েছে আইভান কুপালা। এদিনে তারা বিভিন্ন ঐতিহ্যবাহী রোমান্টিক কাজ করে থাকে। যেমন: প্রেমিক-প্রেমিকাযুগল একে অপরের হাত ধরে আগুনে ঝাঁপ দিয়ে পরীক্ষা করে তাদের ভালোবাসা কতটুকু শক্তিশালী। অবিবাহিত নারীরা পানিতে ফুল ভাসিয়ে দেয় আর পুরুষগণ সেই ফুলগুলো উদ্ধার করে এনে সেই ফুলের মালিক নারীটিকে মুগ্ধ করার চেষ্টা করে।  

আর/০৮:১৪/০৮ এপ্রিল

জানা-অজানা

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে