Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৪-০১-২০১৯

‘কাচের মেয়ে’ উচ্চশিক্ষার কদর্য রূপ

সালাহ উদ্দিন মাহমুদ


‘কাচের মেয়ে’ উচ্চশিক্ষার কদর্য রূপ

চাণক্য বাড়ৈকে আমি মূলত কবি হিসেবেই জানতাম। তবে আজ তার কথাশিল্পের সঙ্গে পরিচিত হলাম। দ্বিধাহীন চিত্তে বলতে পারি, কবি এবং লেখক হিসেবে চাণক্য বাড়ৈ আমাকে মুগ্ধ করেছেন।

তার উপন্যাস ‘কাচের মেয়ে’ পড়ে এক অচেনা জগতের সঙ্গে পরিচিত হলাম। উচ্চশিক্ষা নিতে যাওয়া এক শিক্ষার্থীর লাঞ্ছনা-তিরস্কার-বঞ্চনা ফুটে উঠেছে এই উপন্যাসে। জন্ম থেকে লড়াই করে যাওয়া তরুণী সানিয়া মেহজাবীন উচ্চশিক্ষা নিতে গিয়ে অবশেষে আত্মহননের পথই বেছে নিয়েছে। উপন্যাসে সানিয়ার পরাজয় আমাদের ব্যথিত করে। পুরুষ শাসিত সমাজ ব্যবস্থাকে ধিক্কার জানায়। কাহিনিতে সানিয়া একাই পরাজিত হয়নি, পরাজিত হয়েছে প্রত্যেক বিবেকবান মানুষ। কলুষিত হয়েছে শিক্ষাব্যবস্থা। কালিমা লেপন করা হয়েছে জাতির পথপ্রদর্শক মহান শিক্ষকদের গায়ে।

চাণক্য বাড়ৈর ‘কাচের মেয়ে’ উপন্যাসটি উত্তম পুরুষে বর্ণনা করা হয়েছে। উত্তম পুরুষে যিনি ঘটনাটি বলছেন; তিনি একজন নারী। তার নাম সানিয়া মেহজাবীন। তিনি উচ্চশিক্ষা নিতে আসেন রাজধানীতে। শুরু হয় তার অন্য এক জীবন সংগ্রাম। মা হারা সানিয়া সবসময় যেন নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন। তিনি বলেন, ‘আমার বয়স যত বেড়েছে, আমার পেছনে বাবার খরচও তত বেড়েছে। এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মফস্বলের কলেজ রেখে আমি যখন একটা বিশ্ববিদ্যালয়ের বারন্দায় পা রাখব, খরচ তখন যে আরো কয়েক গুণ বেড়ে যাবে, এটাও সত্য।’ ফলে পড়তে এসে তার আশ্রয় হয় দুর্সম্পর্কের এক ফুপুর বাসায়। 

সেই রেহানা ফুপুর বড় ছেলে সালাউদ্দীন। একটা বীমা কোম্পানিতে চাকরি করেন। বিয়ে করেছিলেন। দীর্ঘ চার বছরের বনিবনাহীন দিন গুজরানের পরিণতিতে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়। সংসার টিকিয়ে রাখার শেষ চেষ্টা স্বরূপ একটা সন্তানের প্রত্যাশাও অপূর্ণ থেকে যায় তাদের। ফুপুর ছোট ছেলে আলাউদ্দীন থাকেন ওমান। ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার দায় হিসেবে প্রায় আড়াই বছর আগে তাকে প্রবাসজীবন মেনে নিতে হয়েছে। যদিও এখন পরিবারের সবাই মনে করছে, আলাউদ্দীন পাস করে দেশে রয়ে গেলে বরং পরিবারের বোঝা হয়েই তাকে থাকতে হতো। এমন একটি পরিবারে আশ্রয় নেওয়া সানিয়ার জন্য চরম অস্বস্তির ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়।

কথক বলেন, ‘কাওসার মামাই আমাকে শিখিয়ে দিয়েছিলেন, আমি যেন রেহানা ফুপুর বাসাতেই উঠে যেতে রাজি হয়ে যাই। বাবার সঙ্গে কোনোপ্রকার বাক-বিতণ্ডাতে না জড়াই। আমার কাছেও এই প্রস্তাব উত্তম মনে হলো। আমি চুপ করে রইলাম। আমার নির্বাক ভূমিকা বাবাকে বুঝিয়ে দিল যে, আমি রাজি। বাবা নিজে আমাকে তার ‘রেহানা বুবু’র বাসায় রেখে গেলেন। আর আমি বন্দি হয়ে গেলাম চার দেয়ালের খাঁচায়।’ একটি স্বপ্ন যেন অংকুরেই বিনাশের পথে এগিয়ে যাচ্ছিল। তবুও হাল ছাড়েন না সানিয়া।  

ভর্তি হওয়ার দিন মালিহা নামের একটি মেয়ের সঙ্গে কথা হয়েছিল তার। এভাবেই ক্রমান্বয়ে পরিচিতের সংখ্যা বাড়ে। নানামুখী সংকটের মুখে পড়তে হয়, আবার কখনো কখনো আশার আলো দেখতে পায়। ফুপুর বাসা ছেড়ে হোস্টেলে ওঠার পরিকল্পনা করেন। এমনকি পরিস্থিতির কারণে একদিন হোস্টেলেও রাত কাটায় সে। হোস্টেলে গিয়ে জানতে পারে বহুবিধ রঙ-তামাশা। সানিয়া দেখে চার নম্বর হলে বেশি না, দুই-তিনটা মেয়ে আছে। সরকারি দলের বড় ভাইদের কাছ থেকে দেহের বিনিময়ে সুবিধা নেয়। এতে মাইন্ড করারও কিছু নেই। যা সত্যি, তা-ই। সহপাঠীরা বলে, ‘ভর্তি যখন হয়েছিস, ধীরে ধীরে সবই জানতে পারবি। ওদের দাপটে হলটার পরিবেশ নষ্ট। যাকে-তাকে অপমান করে। সাধারণ ছাত্রীরা ভয়ে তটস্থ থাকে সারাক্ষণ। ওই দুই-তিনটা খানকি-টাইপ মেয়ের জন্য চার নম্বর হলে এত অশান্তি। আর এই অশান্তির ইমপ্যাক্ট পড়ে সারা ক্যাম্পাসে। এরাই লোভী আর অর্থসঙ্কটে ভোগা মেয়েদের পলিটিক্যাল লিডারদের কাছে এন্টারটেইনার হিসেবে সাপ্লাই দেয়। এরাই নিরীহ ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েদের বাগে পেলে র‌্যাগ দেয়। ভয় দেখিয়ে জিম্মি করে রাখে।’ প্রথমত এমন অস্বস্তিকর পরিবেশ তাকে ভাবিত করে। তবুও ফুপুর বাসার জিম্মি দশা তাকে মুক্তির পথ খুঁজে নিতে বাধ্য করে। অথচ ছোট ছোট কিছু নিষেধ আর উপদেশ ছিল মায়ের। ‘মাথায় স্কার্ফ না পরে স্কুলে যাবি না, দরকার না হলে ছেলেদের সাথে কথা কবি না, খিল খিল করে ছোট মাইনষের মতো হাসবি না, বাজারের উপর দিয়ে একা যাওয়া-আসা করবি না’ এরকম একগাদা ‘না’ এসে পথ আটকে দাঁড়াত সানিয়ার। কারণ ‘বড় হলে মেয়েদের এভাবে চুপসে যেতে হয়!’

ক্যাম্পাস জীবনে সানিয়ার মনে পড়ে গ্রামের কথা। তাদের গ্রামের মেরাজের স্মৃতি ভেসে ওঠে চোখের সামনে- ‘মেরাজ ভাই সেবার আমাকে একটা মোবাইল ফোন দিলেন উপহার হিসেবে। আমাদের গ্রামের আমার বয়সী কোনো মেয়েরই তখন মোবাইল ফোন ছিল না। আমিও প্রথমে নিতে রাজি হইনি। কিন্তু শেষপর্যন্ত নিতে হলো। প্রথম প্রথম লুকিয়ে চুরিয়ে রাখা বেশ মুশকিল হলো মোবাইলটা। বুবলির বিয়ে হয়ে গেছে ততোদিনে। কথা বলা শেষ হলে মোবাইলটা সুইচ অফ করে ওর ছোট বোন টুবলির কাছে রেখে আসতাম।’ সেই মেরাজের মৃত্যু হয় একদিন। জীবনের প্রথম প্রেম বলতে ওই মেরাজ। তবুও দমে যায় না সানিয়া। এই ভালোবাসা তার জীবনে খুব বেশি প্রভাব ফেলতে না পারলেও জিলানী নামের একজন তার জীবনে দুর্বিসহ যন্ত্রণা হিসেবে উপস্থিত হয়।

সেই জিলানী সুযোগ পেয়ে সানিয়াকে অপহরণের চেষ্টা করতে গিয়ে মারা যায়। সবাই জানে সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যু হয়েছে। সেই জিলানী সম্পর্কে সানিয়া বলেন, ‘জিলানী তবু মরে বেঁচে গেল। আমার সামনে সবাই ঝুলিয়ে দিল বিশাল এক প্রশ্নবোধক চিহ্ন, জিলানির মোটরসাইকেলে আমি কেন উঠতে গেলাম? সারা গ্রামে, পাড়ার চায়ের আড্ডায়, মেয়েদের চুলার পাশে, স্কুলগামী ছাত্রছাত্রীদের জটলায় আমার চরিত্র নিয়ে কানাঘুষার নীরব বিষ্ফোরণ ঘটে গেল। কোনো ভালো মেয়েরই জিলানীর মোটরসাইকেলে চড়ার কথা নয়। বাবার কাছে, মামাদের পরিবারের লোকজন, প্রিয় শিক্ষকদের কাছেও সন্দেহের পাত্রে পরিণত হলাম।’

যদিও পৃথিবীতে একমাত্র কাওসার মামাই তার কথা বিশ্বাস করলেন। তাকে যে জিলানী অপহরণ করতে চেয়েছিল, তার বাবাও সে কথা পুরোটা বিশ্বাস  করেননি। সৎমা মরিয়ম সানিয়ার বাবাকে বুঝিয়েছিল, সেদিন জিলানীর সঙ্গে তিনি পালিয়ে যাচ্ছিলেন। সানিয়ার ধারণা, আজও তার বাবা সে কথাই বিশ্বাস করেন।

সানিয়ার পড়ালেখা মফস্বলের কলেজে। সেখানে শিক্ষা নিয়ে বাণিজ্যের বিষয়ে তেমন কিছুই শোনেননি। ভাবারও সময় পাননি এসব নিয়ে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ে আসার পর থেকে এটা নিয়ে অনেক কথাই শুনছেন। অথচ যারা শিক্ষা বাণিজ্যের বিরুদ্ধে স্লোগান দেন, তারাই এখানে কোচিং সেন্টার চালান। অবশেষে হলে ওঠার পর বাধ্য হয়েই সানিয়াকে একটা কোচিং সেন্টারে যোগ দিতে হয়। কেমন যেন কনট্রোভার্শিয়াল মনে হয় ব্যাপারটা।

পড়াশোনা ছাড়াও বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে যায় অনেক ঘটনা। মূলত সেসব কিছুকেই সামনে তুলে ধরা হয় উপন্যাসে। লেখকের ভাষায়, ‘জাহানারা ইমাম হলের পেছনের দিকটা তুলনামূলকভাবে অন্ধকার। এখানে কয়েকটি কাঁঠাল গাছের ছোট জটলা। এর মাঝেই প্রেম করছে কয়েকটি যুগল। একটি জুটিকে বেশ বেসামাল দেখা গেল। রাস্তা থেকে তিন-চার হাত নেমে একটি মাঝারি কাঁঠাল গাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মেয়েটি। ছেলেটি তার ওষ্ঠাধর চুম্বন করছে। 

সাপে কাটা রোগীর ক্ষতস্থানে ঠোঁট বসিয়ে জাঁদরেল ওঝা যেভাবে বিষ বের করে আনে, অনেকটা সেভাবে। এর চেয়েও বেশি ঘনিষ্ঠ যুগল এখানে হরহামেশাই দেখা যায়, কিন্তু এতটা প্রকাশ্যে নয়। যেকারো কাছেই এটি বেশ দৃষ্টিকটু মনে হবে।’

নানাবিধ অসঙ্গতির পরেও সানিয়া ভাবেন, ‘একটা অভিশপ্ত জীবন থেকে আমি মুক্তি পেতে শুরু করেছি। আমার স্মৃতি থেকে কয়েকটি মুখ ঝাপসা হয়ে আসতে থাকে। সে মুখগুলো মরিয়মের, সে মুখগুলো জিলানীর, সে মুখগুলো আমার বাবার, সে মুখগুলো সালাউদ্দীনের। দিনে দিনে এই ক্যাম্পাস যতটা আপন হতে থাকে, ওই অপচ্ছায়াগুলোও ততখানি বিলীন হয়ে আসে। আমাকে মুক্তি দিতে থাকে।’ 
 
শুরু হয় সানিয়ার ক্যাম্পাসযুদ্ধ। এ ক্যাম্পাসে নানা ধরনের মানুষের সঙ্গে পরিচয় ঘটে তার। সহপাঠী, রুমমেট, শিক্ষক, রাজনৈতিক কর্মী, সাংস্কৃতিক কর্মী কোন কিছুই এড়ায় না তার চোখ থেকে। হলের রুমমেটদের কদর্যতাও ভাবিত করে তাকে। সানিয়া ভাবেন, ‘প্রমা আর কোহিনূর আপু থাকেন স্বামী-স্ত্রীর মতো। খুব ঘৃণ্য আর নিষিদ্ধ একটা সম্পর্ক তাদের মধ্যে। সরকারি দলের বড় বড় ছাত্রনেতাদের সাথে ভালো সম্পর্ক রেখে চলেন। পাশাপাশি কোনো রাজনৈতিক প্রোগ্রাম হলে হল থেকে সাধারণ মেয়েদের চাপ দিয়ে মিছিলে জড়ো করেন। তাই তাদের বেলায় কোনো আইন-কানুন নেই। আর এ কারণেই তাদের এই নিষিদ্ধ সম্পর্ক নিয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না। তবে আঁড়ালে-আবডালে সুযোগ পেলে এসব নিয়ে মস্করা করতেও ছাড়ে না।’

অতীতের সব ভুলে নতুন পথে পা বাড়ায় সানিয়া। নিজে প্রেমে পড়েন এক অধ্যাপকের। আর সানিয়ার প্রেমে পড়ে সহপাঠী আবীর। সম্পর্কটা একপাক্ষিক না হলেও সানিয়া গায়ে পড়ে ভালোবাসা প্রকাশ করে না। সানিয়ার ভাষায় বলতে গেলে, ‘একটা অনাস্বাদিত শিহরণ অনুভব করলাম। আমার বাহু দুটো টেনে নিয়ে আবীর তার দুই ঘাড়ের ওপর চড়িয়ে দিল। তারপর আমার পুরো শরীরের সঙ্গে মিলে এক হয়ে দাঁড়াল। তার পেশিবিরল হাড়প্রধান শক্ত বাহু দিয়ে গভীরভাবে জড়িয়ে করে ধরল আমাকে। আমি বাধা দিলাম না, নাকি বাধা দেয়ার শক্তি হারিয়ে ফেললাম, তা-ও জানি না। দুই হাত দিয়ে আবীর আমার মুখমণ্ডল সামান্য ওপরে তুলে ধরল। তারপর কপালে এঁকে দিল উষ্ণ চুমুর দাগ। এরপর ওর ঠোঁট মিশে গেল আমার ঠোঁটে। মোবাইলে ভাইব্রেট হলে যেমন হয়, সেইভাবে কাঁপতে থাকা আমার নিচের ঠোঁট চুইংগামের মতো টেনে নিল ওর মুখের ভেতরে। কপালে, যেখানে আবীর চুম্বন করেছিল সেখানে তখন শীতল একটা অনুভূতি টের পেলাম।’

শিক্ষার পাশাপাশি প্রেম, যৌনতা, রাজনীতি একে অন্যের সঙ্গে যেন মিশে আছে। তবে শুধু শিক্ষা ছাড়া অন্য কিছুতে আগ্রহ জন্মায় না সানিয়ার। রাজনীতি বুঝতেও সাহায্য নিতে হয় অন্য কারো। যেমন আবীর তাকে বোঝায়, ‘তুমি যেমন ভাবছ, তেমন কিছু নয়। চিকা মানে চামচিকা না। চিকা মারা হলো দেয়াল লিখন। দেখো না, ভার্সিটির প্রায় প্রতিটি ভবনের দেয়ালে বিভিন্ন রকমের স্লোগান, দাবি, রাজনৈতিক প্রতীক, আল্টিমেটাম, আর প্রতিবাদী ছবি আঁকা থাকে। একেই চিকা মারা বলে। আর এই কাজটা হয় সাধারণত রাতে। ছাত্র সুহৃদ, ছাত্রমুক্তি, ছাত্রজোট এদের সক্রিয়তা কেবল দেয়ালের ওপরই বেশি।’

ক্যাম্পাসে মিছিল-মিটিং ভাবিয়ে তোলে তাকে। খুব বেশি আগ্রহ বোধ করেন না সানিয়া। সানিয়ার মনে হয় ‘সরকারি দলের মিছিলে শত শত ছাত্রছাত্রী থাকলেও ক্যাম্পাস তা টের পায় না। মনে হয় শোকের বহর নিয়ে একটা মৌনমিছিল যাচ্ছে। কারণ অধিকাংশ ছাত্র-ছাত্রীকে জোর করে ধরে আনা হয় এসব মিছিলে। তারা বাধ্য হয়ে আসে। আর যারা স্বেচ্ছায় আসে, তারাও মনেপ্রাণে এটা পছন্দ করে না, আদর্শ দূরে থাকুক। স্বার্থ হাসিলের ধান্দায় থাকে। ক্যান্টিনে ফাও খাওয়া, আইবুড়ো হয়ে গেলেও হলের সিট দখল করে থাকা, ছোটখাটো চাঁদাবাজি করা, মাতবরি ফলানো, অস্ত্রবাজি এইসব হলো তাদের জীবনের একমাত্র আরাধ্য।’

উপন্যাসটি সমকালীন তা বুঝতে খুব বেশি অসুবিধা হয় না। কারণ সানিয়াও একসময় জড়িয়ে পড়েন ফেসবুক নামের এক অদ্ভুত জগতের সঙ্গে। ফেসবুক ব্যবহার করে তার কিছু বোধ জন্ম নেয়। যেগুলো নিয়ে তিনি খুবই বীতশ্রদ্ধ। সানিয়া বলেন, ‘ফেসবুকে যারা আমার বন্ধু নয়, তাদের মন্তব্যই বেশি। আমি একটা একটা করে সব মন্তব্য পড়ে ফেললাম। অধিকাংশ মন্তব্যই ভীষণভবে অগ্রহণযোগ্য আর অশোভন। একজন লিখেছে, সানিয়া মির্জা অব আওয়ার ক্যাম্পাস। তার নিচে অন্য একজন লিখেছে, আমি তো জানতাম সানি লিওন অব আওয়ার ক্যাম্পাস। এ ছবিটিও আমি সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেললাম। মনটাই খারাপ হয়ে গেল। অনেক মেসেজ এসে ভরে গেছে ইনবক্স। তারও অধিকাংশ কুরুচি আর কুপ্রস্তাবযুক্ত। অনেক পরিচিত বন্ধুও লিখেছে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা। বন্ধুত্বের অন্তরালে লুকিয়ে থাকা ওইসব যৌনবিকৃত পশুগুলোকেও দেখতে পেলাম আমি। আমার ভুল ভেঙে গেল। যারা বন্ধুত্বের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে বলে বিশ্বাস জন্মেছিল মনে, দেখলাম মূলত তারা উত্থিত করে রেখেছে তাদের অসংযত শিশ্ন।’ এ জগতটিকে খুবই কদাকার মনে হয় সানিয়ার কাছে। এতো এতো অসঙ্গতিকে পাশ কাটিয়ে তবু এগিয়ে চলে নিজের লক্ষ্যে। ফলাফলে ঈর্ষণীয় সাফল্যও আসে। সানিয়ার জগতটা নিজের ভাবনার চেয়ে বেশি উজ্জ্বল হয়ে এগিয়ে যেতে থাকে।
জীবনের যাবতীয় গ্লানি উপেক্ষা করে সানিয়া যখন সাফল্যের শীর্ষে আরোহন করতে থাকে; তখনই শিক্ষক নামের এক নরপশুর অশুভ ছায়া পড়ে তার ওপর। সানিয়ার ভাষ্য এমন ‘স্যারের বাহুর নিচে, টুলের ওপরে আমি হাঁটুভাঙা ‘দ’-এর মতো এমনভাবে বসে আছি যে, নিজেকে সেখান থেকে সরিয়ে নেয়ার উপযুক্ত বল খাটাতে পারছিলাম না। তবু, যতটুকু গুঁটিসুটি হওয়া সম্ভব, সেভাবেই রইলাম। কেবলই ভাবছিলাম, এই সময়ে কেউ স্যারের রুমে এসে পড়লে আমার জন্য বরং ভালোই হতো। কিন্তু কেউই তো আসে না! আমি আরো জড়োসড়ো হয়ে গেলাম এবং স্যারকে বললাম ছেড়ে দিন স্যার, প্লিজ। আপনার পায়ে পড়ি। আপনি আমাকে ভুল বুঝছেন। আমি পারব না। আমার চোখের কয়েক ফোঁটা পানি ঝরে আমার পায়ের ওপরে গিয়ে পড়ল। আমি তার উষ্ণতা টের পেলাম।’

এ ঘটনাই তার জীবনের কাল হয়ে দাঁড়ায়। শিক্ষকের কবল থেকে নিজেকে মুক্ত করতে পারলেও অশুভ ছায়া তার পিছু ছাড়ে না। সানিয়াকে কেন্দ্র কওে উত্তাল হয় ক্যাম্পাস। সংবাদপত্রের পাতাজুড়ে শিক্ষকের কুকীর্তি। সানিয়া নিজেকে এসব থেকে আড়াল করতে চাইলেও পারে না। সানিয়া বড় আপুদের বলেন, ‘এসবের দরকার নেই। সারা ক্যাম্পাস জানাজানি হয়ে যাবে। আমাদের গ্রামের মানুষজন জেনে যাবে। সারা দেশে রটে যাবে কথাটা। আমি আর বাড়ি ফিরতে পারব না। এমনিতেই আমাকে এখানে ভর্তি করতে চাননি বাবা। আর ক্যাম্পাসে জানাজানি হয়ে গেলে এখানেও কাউকে মুখ দেখাতে পারব না। প্লিজ আপা, কেউ যেন না জানতে পারে যে, সেই মেয়েটা আমি। আপনি এই ব্যবস্থাটা করে দেন। আর কীভাবে টিউটেরিয়ালের নম্বরটা পেতে পারি, সেই পরামর্শ দেন।’

কে শোনে কার কথা? নিজের ঘটনার প্রতিবাদ শুনতে পায় সানিয়া নিজেই। তার কানে আসে ‘বিশ্ববিদ্যালয়ে আবারো এক শিক্ষক এক ছাত্রীর সঙ্গে যৌন অসদাচরণ করেছে বলে সে শুনেছে। সেই শিক্ষককে এখনো অবরুদ্ধ করে রাখা হয়েছে। রেজিস্ট্রার বিল্ডিং আর ভিসির বাসভবন অভিমুখে ছাত্রছাত্রীরা মিছিল নিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে। যতক্ষণ না শিক্ষককে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চাকরিচ্যুত করা হবে, ততক্ষণ তাকে এভাবে অবরুদ্ধ করে রাখা হবে। বেলা দুইটার দিকে জেরিন এসে বেশ কিছুক্ষণ ঝাঁজালো বক্তব্য ছাড়ল। সে মিছিল করে এসেছে, ভবিষ্যতেও প্রয়োজনে মিছিলে যাবে, তবু নিরীহ মেয়েদের প্রতি শিক্ষকদের লোল জিহ্বা বের করতে দেবে না।’

সারাদিন রুম থেকে বের হয় না সে। এসব শুনে সানিয়াও ভাবে ‘একদিন আমিও রাস্তায় নেমেছিলাম প্রতিবাদে। স্লোগান ধরেছিলাম কাপুরুষদের বিরুদ্ধে। এখন আমি নিজেই প্রতিবাদীদের মুখে স্লোগান হয়ে গেছি। দেয়ালে দেয়ালে লাল হলুদ রঙের পোস্টার আর প্লাকার্ডে কেবল কালো অক্ষরের একটি অপয়া নাম হয়ে গেছি। হয়তো আগামীকাল দেশের সমস্ত খবরের কাগজে চার কলামের শিরোনাম হয়ে যাব আমি। বেশ তো! এটাই তবে ভবিতব্য ছিল!’
 
ভাবতে ভাবতে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না সানিয়া। বাধ্য হয়েই আত্মহননের পথ বেছে নেন। সানিয়া বলেন, ‘আমার চোখে আবছা ভেসে ওঠে নিশা জেরিন নাদিয়া আপুর ঊর্ধ্বে তুলে ধরা মুষ্ঠিবদ্ধ হাত, চকচকে রোদ্দুরে ঝলসে ওঠা স্লোগানমুখর মুখ, মিছিলে সার দিয়ে এগিয়ে চলা ধুলা জড়ানো অসংখ্য পা। সেই সার দেয়া পায়ের তালে তালে আমার দুই চোখের পাতাজুড়ে কালঘুম নেমে আসে। কানে বাজা স্লোগানের অস্পষ্ট ধ্বনি একটু একটু একটু করে মিলিয়ে যেতে থাকে দূরে। যতই উচ্চকিত হোক সেই ধ্বনি, আমি আর জাগব না ভেবে দুই চোখ দিয়ে দুই ফোঁটা উষ্ণ আনন্দ-অশ্রু গড়িয়ে পড়ে বালিশে।’

উপন্যাসের শেষে আমরা ঘুমের অনেকগুলো ওষুধ খেয়ে ঘুমিয়ে পড়তে দেখি সানিয়াকে। হয়তো সানিয়া আর জাগবেন না। কিন্তু আমাদের বিবেক কি জেগে উঠবে? হয়তো বলতে পারি, আত্মহত্যাই সমাধান নয়। হবে হয়তো। কিন্তু সানিয়াদের জন্য কতটুকু সদ্বিচার আশা করা যায় রাজনৈতিক মারপ্যাচের মধ্যে? বলতে পারি পুরো উপন্যাসের ঘটনাটি সত্য কিংবা আদৌ সত্য নয়। তবে বুকে হাত দিয়ে কি এটুকু বলতে পারবো, ক্যাম্পাসে এমন ঘটনা কখনোই ঘটেনি। মাথা নিচু হয়ে আসবে আমাদের। কেননা কোনো উত্তর নেই। মফস্বল থেকে উঠে আসা সানিয়ারা স্বপ্ন দেখেই যান। বাস্তবে তা পূরণের সুযোগ পান না।

ঔপন্যাসিককে এমন সাহসী পদক্ষেপের জন্য বিশেষ ধন্যবাদ। একটি ক্যাম্পাসকে কেন্দ্র করে এমন একটি সত্যনির্ভর উপন্যাস উপহার দিয়ে পাঠককূলকে উপকৃত করেছেন। ভবিষ্যৎ সানিয়ারা সতর্ক হয়ে উঠুক। শিক্ষাই হোক মূলমন্ত্র। নারীলোভী নরপশুদের ধ্বংস অনিবার্য হয়ে উঠুক। আদৌ সেই স্বপ্ন সফল হবে কিনা- তা কেবল ভবিষ্যতই বলে দিতে পারে। চাণক্য বাড়ৈর ‘কাচের মেয়ে’ মানুষের কদর্য রূপ তুলে ধরেছে।

উপন্যাস : কাচের মেয়ে
প্রকাশক : ভাষাচিত্র
মূল্য : ৩৯৮ টাকা

এমএ/ ০৭:০০/ ০১ এপ্রিল

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে