Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২১ জুলাই, ২০১৯ , ৬ শ্রাবণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-৩০-২০১৯

বনানীর অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপদ নগর

নজরুল ইসলাম


বনানীর অগ্নিকাণ্ড ও নিরাপদ নগর

মাত্র ৩৬ দিনের ব্যবধানে আবার বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড ঘটল বনানীর মতো অভিজাত এলাকার বহুতল ভবনে। নিহতের সংখ্যা ২৫। আহতদের কয়েকজনের অবস্থা সংকটাপন্ন। যেভাবে সুউচ্চ ভবনের ওপরতলা থেকে মানুষ প্রাণের ভয়ে লাফিয়ে পড়েছে, তা দেখে আমরা আঁতকে উঠেছি। আমরা ভাবতাম, এ রকম একটি ঘটনা পুরান ঢাকার চকবাজারের মতো অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পিত ও ঘিঞ্জি জায়গায় সংঘটিত হতে পারে। 

কিন্তু এখন দেখা যাচ্ছে, বনানীর মতো আধুনিক জায়গার এক বহুতল ভবনও এই অব্যবস্থাপনা, অপরিকল্পনা, দুর্নীতির বাইরে নয়। আমাদের দেশের বাস্তবতা হচ্ছে, একের পর এক দুর্ঘটনা ঘটে চলেছে, মানুষ মারা যাচ্ছে, সম্পদ পুড়ছে, তদন্ত কমিটি হচ্ছে। কিন্তু কার্যকর কোনো ব্যবস্থাই নেওয়া হচ্ছে না, কর্তৃপক্ষের যেন কিছু আসে যায় না, দায়ী ব্যক্তিরা শাস্তি পাচ্ছে না। আমাদের এ থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে জরুরি পদক্ষেপ হবে, বনানীর সংঘটিত অগ্নিকাণ্ডে এফ আর টাওয়ারের ত্রুটিপূর্ণ নির্মাণে দোষী ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা জরুরি। 

কোনো নগর গড়ে ওঠার পেছনে পরিকল্পনার প্রয়োজন হয়। তবে একটা সময় ছিল, নগর স্বাভাবিকভাবে গড়ে উঠত। এর পেছনে সুদূর কোনো পরিকল্পনা কাজ করত না। নতুন উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নিলে যুক্ত হতো পরিকল্পনা। বর্তমানে অবশ্য বিশ্বের অনেক নগরই প্রথম থেকে পরিকল্পনা নিয়ে গড়ে উঠেছে। ব্রাজিলের রাজধানী ব্রাসিলিয়া ও ভারতের চণ্ডীগড়ের কথা বলা যায়। 

কিন্তু ঢাকা, দিল্লি ও বেইজিংয়ের মতো পুরনো শহরগুলো এমনিভাবে গড়ে উঠেছিল। পরে উন্নয়নে যুক্ত হয়েছে অনেক পরিকল্পনা ও পেশাদারি ভাবনা-চিন্তা। ঢাকা গড়ে ওঠার ইতিহাস চারশ' বছরের। স্বাধীননতার পর বাংলাদেশের ভেতর ছোট ছোট কিছু নগর গড়ে উঠেছে; যেমন- শেরেবাংলা নগর, মোহাম্মদপুর ও উত্তরা ইত্যাদি। 

একেবারে পরিকল্পিত একটি শহর গড়ে তুলতে হলে তার আবাসিক অঞ্চল, তার শিক্ষাব্যবস্থা, বাণিজ্যিক অংশ, সড়ক ব্যবস্থাপনা, পরিবহন ব্যবস্থাপনা সবকিছুকে বিবেচনার মধ্য দিয়ে পরিকল্পনা করতে হয়। এ ছাড়াও আছে পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে তার কতটুকু সবুজের পরিমাণ থাকতে হবে, তাও চিন্তা করতে হয়। সাধারণত সবুজের পরিমাণ ১৫ থেকে ২৫ শতাংশের মতো ধরা হয়। তবে রাজশাহীতে এর পরিমাণ আরও বেশি ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। নীলেরও প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নীল মানে হচ্ছে জলাশয়।

যেমন- পুকুর, দিঘি, লেক, খাল ২০ শতাংশ রাখার প্রয়োজন রয়েছে। তবে মরু এলাকায় এতটা সম্ভব নয়- ৩, ৫, ৮ শতাংশের মতো হতে পারে। সমগ্র নগরের তুলনায় আবাসিক অঞ্চল কতটুকু হতে পারবে, তারও একটি হিসাব আছে। এটা একেক দেশে একেক রকম। তারপরও এটা একটা ফর্মুলা কিংবা অনুপাত অনুযায়ী হয়। আমেরিকায় হয়তো হয় ৬০ শতাংশ, আমাদের হয় ৪০ শতাংশ বা আরও কম। এ ছাড়াও একটা বিদ্যালয়ের জন্য কমপক্ষে এক একর জায়গা নেওয়া প্রয়োজন। 

প্রাচীন শহরগুলোর মতোই পুরান ঢাকা শহরের আছে ঐতিহ্য এবং নানা সৌন্দর্য। তার মধ্যে একটি হলো- এর সাংস্কৃতিক শক্তি, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। এই প্রাচীন ঢাকার প্রথম পরিকল্পনা করা হয়েছিল ১৯৫৯ সালে, পাকিস্তান আমলে। এ সময় তেজগাঁও শিল্প এলাকা, ধানমণ্ডি আবাসিক এলাকাও পড়ে। সম্প্রতি গড়ে ওঠা নতুন নগরগুলো হচ্ছে বনানী, গুলশান। প্রত্যেক এলাকাতে ভবনাদি আসলে কেমন হবে, কীভাবে গড়ে উঠবে- এসব জলবায়ুর সঙ্গে মিলিয়ে তৈরি করতে হবে। মরুভূমি অঞ্চলে যেভাবে ভবন গড়ে উঠবে, আমাদের মতো অঞ্চলে সেভাবে গড়ে উঠবে না। দক্ষিণের হাওয়া আসার জন্য আমাদের খোলা জানালা বা খোলা জায়গা থাকবে। সেই নগরে জনসংখ্যার কত ঘনত্ব হবে প্রতিবর্গ কিলোমিটারে? জনসংখ্যার দিক দিয়ে পৃথিবীতে ১০টি বড় শহরের একটা হচ্ছে ঢাকা। যেখানে খোলা জায়গা নেই বললেই চলে। একসময় এই নগরের চারপাশে মিষ্টিপানির নদী প্রবাহিত হতো। অথচ সেই পানি এখন ব্যবহারের অযোগ্য। উপরন্তু নদ-নদী, জলাধার ভরাট করে ফেলা হচ্ছে। তারপর ভবিষ্যতে ঢাকায় কোনো ভূগর্ভস্থ পানি থাকবে না। তাই প্রাকৃতিকভাবে পাওয়া এই নদীগুলোকে পুনরুজ্জীবিত করে ঢাকা সজীব করে তুলতে হবে। 

এদিকে নতুন ঢাকা সুউচ্চ ভবননির্ভর হয়ে গড়ে উঠছে। ঢাকায় ২২ তলা ভবন এমনকি ৩৮ তলা ভবনও আছে। অবশ্য সংখ্যায় তা কম। হংকং, সিঙ্গাপুর, দুবাই অঞ্চল সুউচ্চ ভবন দিয়ে ভরা। হংকংয়ের বেশিরভাগই ৫০ তলা ভবন। সেগুলো ভালোভাবেই টিকে আছে। মূলত এই স্থাপনাগুলোকে টিকে থাকতে হলে দুটি জিনিসের ওপর নির্ভর করতে হয়। এক. কতটা ভূমিকম্প প্রতিরোধক এবং দ্বিতীয়ত, অগ্নিকাণ্ডের বিষয়টা কতটা নিরাপদ। অথচ বনানীর ২২ তলা এই ভবনটি যথাযথভাবে আইন মেনে হয়নি। ১৭ তলার জায়গায় ২২ তলা নির্মাণ করা হয়েছে। সেখানে অগ্নিকাণ্ডের ব্যাপারেও প্রতিরোধ ব্যবস্থা মূলত কিছু ছিল না। নির্গমন ব্যবস্থা বা সিঁড়ি না থাকায় মর্মান্তিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। এফ আর টাওয়ার ছাড়াও পাশে যে ভবনগুলো রয়েছে, সেগুলোর মধ্যে একটুও খোলা জায়গা নেই। আগুন ছড়িয়ে পড়লে তা ভয়াবহ হয়ে উঠত। 

এ ছাড়াও আরেকটি কথা বলা জরুরি। আমাদের এই ঢাকা মহানগরীতে অগ্নিকাণ্ডসহ বিভিন্ন ধরনের দুর্যোগ মোকাবেলায় সবচেয়ে বড় ঘাটতি পূর্বপ্রস্তুতির অভাব। বলতে গেলে সমন্বিত কোনো পূর্বপ্রস্তুতিই নেই। কয়টি সংস্থা এই দুর্যোগ মোকাবেলায় জড়িত, বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অজানা। তবে পরিকল্পনায়, দাপ্তরিক নির্দেশনায় এসব সংস্থার নাম থাকে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্য যে পরিকল্পনা করা হয়েছে তাতে বলা আছে, দুর্যোগ মোকাবেলায় কোন দপ্তরের কী কী কাজ। কিন্তু এখানে সমন্বয়ক বা মূল দায়িত্বের জন্য যে বিভাগকে নির্ধারণ করা হয়েছে, সেই বিভাগটি হলো স্থানীয় সরকার বিভাগ। ঢাকায় দুটি সিটি করপোরেশন রয়েছে। সেগুলো স্থানীয় সরকার বিভাগের অধীনেই। এই দুই সিটি করপোরেশনের আওতাধীন এলাকায়ই বেশিরভাগ দুর্যোগ সংঘটিত হচ্ছে। ঘন ঘন অগ্নিকাণ্ড ঘটছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় স্ট্যান্ডিং অর্ডার অন ডিজাস্টারের ক্ষেত্রে মূল দায়িত্ব কাগজপত্রে সিটি করপোরেশনকে দেওয়া হয়েছে। অথচ সব সেবা সংস্থা, পুলিশ বা অন্য সংস্থাগুলো সিটি করপোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নেই। দুর্যোগ মোকাবেলায় এসব জটিলতা দূর করা জরুরি।

ঢাকা শহরের জন্য ২০৩৫ সাল পর্যন্ত ২০ বছরমেয়াদি একটি মাস্টারপ্ল্যান আছে। এটা রাজউক করেছে। এই মাস্টারপ্ল্যান করার আগে আমাদের ডাকা হয়েছিল, আমরা পরামর্শ দিয়েছি। অবশ্য তারা বেশিরভাগ সময়েই পরামর্শ নেয় না, সেটা ভিন্ন কথা। একটি নগরকে নিরাপদ করতে হলে পরিকল্পনামাফিক সাজাতে হবে। অতি দ্রুত 'বাংলাদেশ জাতীয় বিল্ডিং কোড' (বিএনবিসি)-এর সংশোধিত সংস্করণের সম্পাদন আশু ও জরুরি বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে প্রাণ বিপন্ন হবে, বিপর্যয়কর পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। একটি ভবন নির্মাণে প্রকৌশলী, স্থপতি, নির্মাতা বা যে বাস্তবায়ন করছে, ভবনের কাজ শেষ হলে ভবনটি ঠিকমতো হয়েছে কি-না, তার ছাড়পত্র নিতে হবে। রাজউক এগুলো যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত নেবে। সরকারের গৃহায়ন ও পূর্ত মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে দেখভাল করবে। এর ব্যত্যয় হলে এ ধরনের ঘটনা থেকে সহসা আমাদের মুক্তি ঘটবে না।

লেখক: নগরবিদ, নগর গবেষণা কেন্দ্রের সম্মানিত সভাপতি

এমএ/ ০৮:০০/ ৩০ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে