Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৯ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-২৭-২০১৯

যে-জিনিসের নাম নেই

ভি এস নাইপল


যে-জিনিসের নাম নেই

১২ আগস্ট প্রয়াত হলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত ওয়েস্ট ইন্ডিজের ত্রিনিদাদে জন্ম নেওয়া ব্রিটিশ নাগরিক নোবেল সাহিত্য পুরস্কার বিজয়ী স্যার বিদিয়াধর সূরজপ্রসাদ নাইপল (বিদ্যাধর সূর্যপ্রসাদ নাইপল)। নিজের পরিচিতি-সংকট নিয়ে লিখেছেন : ‘ইংল্যান্ডে আমি ইংরেজ নই, ভারতে আমি ভারতীয় নই, ১০০০ বর্গমাইলের একটি জায়গায় আমি শেকলে বাঁধা, তার নাম ত্রিনিদাদ।’

তিনি বলেছেন : ‘আমার প্রেক্ষাপট একই সঙ্গে অত্যন্ত সরল ও অত্যন্ত বিভ্রান্তিপূর্ণ। আমার জন্ম ত্রিনিদাদে। ভেনিজুয়েলার বিশাল অরিলোনো নদীর মোহনায় এই দ্বীপটির অবস্থান। কাজেই ত্রিনিদাদ না পুরোপুরি দক্ষিণ আমেরিকান, না ক্যারিবিয়ান। জায়গাটা নব্য বিশ্বের আবাদি উপনিবেশ, সেখানে ১৯৩২ সালে আমার যখন জন্ম, ত্রিনিদাদের চার লক্ষ মানুষের দেড় লাখই ভারতীয় হিন্দু ও মুসলমান এবং প্রায় সকলেই গাঙ্গেয় অববাহিকা থেকে উঠে আসা কৃষক শ্রেণির মানুষ।’

তাঁর বাবা ছা-পোষা সাংবাদিক, নিজেও লিখতেন, সংসার ছিল দারিদ্র্যপীড়িত। ঔপনিবেশিক সমাজ একদিকে, অন্যদিকে প্রথাগত কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দুসমাজ – এখান থেকে নাইপল পালাতে চেয়েছেন এবং রীতিমতো বৃত্তিধারী হয়ে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন।

দশ বছর বয়স থেকে জানতেন, তিনি লেখক হবেন। বাকি জীবনের প্রয়াস লেখালেখিতেই। তবে তিনি বরাবরই দুর্বিনীত, বিতর্ক সৃষ্টিকারী।

২০০১ সালে নাইপল নোবেল পুরস্কার পান। ২০১৬-তে ঢাকা লিট ফেস্টে ভি এস নাইপল এসেছিলেন। তিনিই ছিলেন উৎসবের প্রধান আকর্ষণ। দীর্ঘ সময়ের প্রশ্নোত্তর পর্বে তিনি মুগ্ধ করেছেন বাংলাদেশের সাহিত্যপ্রেমিকদের। প্রয়াত নাইপলকে শ্রদ্ধা জানাতে ÔThing without A NameÕ ভাষান্তরিত হলো। এটি মিগেল স্ট্রিট থেকে নেওয়া একটি এপিসোড।

যে-জিনিসের নাম নেই

মিগলে স্ট্রিটের পোপো, যে নিজেকে বলত কাঠমিস্ত্রি, সে তার জীবনে একটিমাত্র জিনিস তৈরি করেছিল তা হচ্ছে পেছনের উঠোনে আমগাছের নিচে কলাই করা টিনের একটি ছোট ওয়ার্কশপ। আবার সেটাও যে পুরোপুরি শেষ করেছে তা নয়। ছাদের টিনে যে পেরেক মারবে অতটুকু করার ফুরসত তার নেই, কাজেই চালের ওপর বড় ওজনের পাথর বসিয়ে রেখেছে। যখন ছাদে ঝড়ো বাতাস লাগত, ভয়-ধরানো শব্দ হতো আর মনে হতো চালটা এখনই উড়ে যাবে।

তারপরও পোপোকে কখনো আলসে বলা যাবে না। সবসময়ই সে ব্যস্ত, হাতুড়ি মারছে, করাত চালাচ্ছে কিংবা একটা না একটা পরিকল্পনা করছে। পোপো কাজ করছে – দেখতে আমার ভালো লাগত। কাঠের গন্ধ আমার ভালো লাগত – সাইপ্রেস, সেডার, ক্র্যাপড কাঠ। রাঁদা করা কাঠের রং আমার ভালো লাগত। কাঠের গুঁড়ো যেভাবে পোপোর প্যাঁচানো চুল ঘিরে থাকত, আমার তা দেখতে ভালো লাগত।

আমি জিজ্ঞেস করি, ‘মিস্টার পোপো, কী বানাচ্ছ?’

পোপো বলল, ‘আরে বেটা, সেটাই তো প্রশ্ন। আমি নামছাড়া একটা জিনিস বানাচ্ছি।’

আমি পোপোকে সেজন্যেই পছন্দ করতাম। আমি বুঝতাম সে কবি-টাইপের মানুষ।

আমি একদিন পোপোকে বললাম, ‘আমাকে কিছু একটা বানাতে দাও তো?’

পোপো বলল, ‘তুমি কী বানাতে চাও?’

‘আমি কী চাই তা ভেবে বের করা আমার পক্ষে কঠিন কাজ।’

পোপো বলল, ‘দেখলে তো, তুমিও নামছাড়া একটা জিনিসের কথা ভাবছ।’

শেষ পর্যন্ত আমি ডিম রাখার জন্য একটা এগ-স্ট্যান্ড বানানোর সিদ্ধান্ত নিলাম।

পোপো জিজ্ঞেস করল, ‘কার জন্য বানাবে?’

‘মা।’

পোপো হেসে ওঠে, ‘সে কি এটা ব্যবহার করবে?’

এগ-স্ট্যান্ড পেয়ে আমার মা খুশি হয় এবং এক সপ্তাহ এটা ব্যবহার করে। তারপর এটার কথা বেমালুম ভুলে যায় এবং আগের মতোই প্লেটের ওপর, পেয়ালার ওপর ডিম রাখতে শুরু করে।

ব্যাপারটা যখন বললাম পোপো হেসে উঠল। বলল, ‘বেটা  সেজন্যেই বলেছি একমাত্র সে-জিনিসই বানাতে হবে, যার নাম নেই।’

আমি বোগার্টের জন্য রং-তুলিতে দর্জির দোকানের সাইনবোর্ড লিখে দেওয়ার পর পোপো আমাকে দিয়েও নিজের জন্য একটা লিখিয়ে নিল। কানের ওপর লাল পেনসিলের যে-গুঁড়িটা গুঁজে রেখেছিল সেটি হাতে নিয়ে সাইনবোর্ডে কোন শব্দ ব্যবহার করবে তা নিয়ে ধন্ধে পড়ে গেল। প্রথমে সে নিজেকে আর্কিটেক্ট হিসেবে ঘোষণা করতে চেয়েছিল, কিন্তু আমি তাকে নিরুৎসাহিত করতে সমর্থ হয়েছি। অবশ্য আর্কিটেক্টের সঠিক বানানটা কী হবে তাও সে নিশ্চিত ছিল না। শেষ পর্যন্ত সাইনবোর্ডটা এমন দাঁড়াল :

বিল্ডার অ্যান্ড কন্ট্রাক্টর

কার্পেন্টার

অ্যান্ড ক্যাবিনেট মেকার

পোপো হচ্ছে নির্মাতা ও ঠিকাদার, কাঠমিস্ত্রি ও আলমারির কারিগর। নিচে ডান কোণে শিল্পী হিসেবে আমার নাম লিখলাম।

পোপো এই সাইনবোর্ডের সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে পছন্দ করত। কিন্তু যারা তাকে চিনত না তারা যখন খোঁজখবর নিতে শুরু করল পোপো কিছুটা আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।

পোপো জবাব দিত, ‘সেই  রাজমিস্ত্রি? সে এখন এখানে থাকে না।’ আমি পোপোকে বোগার্টের চেয়ে অনেক বেশি ভালো মানুষ মনে করেছি। বোগার্ট আমার সঙ্গে সামান্যই কথা বলত, কিন্তু পোপো কথা বলার জন্য সবসময়ই তৈরি। পোপো সিরিয়াস বিষয় নিয়ে কথা বলত – যেমন জীবন, মৃত্যু এবং কাজ; তার সঙ্গে কথা বলতে আমার ভালো লাগত।

তারপরও পোপো আমাদের রাস্তায় কোনো জনপ্রিয় মানুষ নয়। অন্যরা তাকে পাগল বা মূর্খ মনে করত না। হ্যাট আমাদের বলত, ‘বুঝলে, পোপো খুব আত্মম্ভরী মানুষ।’

পোপোকে এ-কথা বলা অযৌক্তিক। প্রতিদিন সকালে রাস্তায় দাঁড়িয়ে এক গ্লাস রাম পান করার অভ্যাস তার ছিল। সে কখনো চুমুক দিয়ে রাম খেত না। যখন সে কাউকে দেখত, হাতের মাঝখানের আঙুলটা রামের গ্লাসে চুবিয়ে দিত, তারপর আঙুল চুষত এবং মানুষটার দিকে হাত নাড়ত।

হ্যাট বলত : ‘আমরাও রাম কিনতে জানি, কিন্তু পোপোর মতো লোক-দেখানো কাজ করি না।’

পোপোর ব্যাপারটাকে আমি নিজে কখনো এভাবে দেখিনি, একদিন আমি পোপোকে জিজ্ঞেস করলাম।

পোপো বলল, ‘বেটা সকালবেলায় যখন সূর্য উঠছে, তখনো বেশ ঠান্ডা, কেবল বিছানা থেকে উঠেছ, তখন যদি মনে হয় রোদে দাঁড়িয়ে রাম খাব, বেশ ভালো লাগবে – ব্যাপারটা তা-ই।’

পোপো কখনো টাকা বানাতে পারেনি। তার স্ত্রী বাইরে যেত এবং কাজ করত আর এটা সহজ ছিল কারণ তাদের কোনো বাচ্চা হয়নি। পোপো বলত : ‘মেয়েরা কাজ করার জন্য, পুুরুষ মানুষকে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়নি।’

হ্যাট বলত : ‘পোপো হচ্ছে নারী-পুরুষের মিশেল, যথার্থ পুরুষ নয়।’

আমার স্কুলের কাছে একটা বড় বাড়িতে পোপোর স্ত্রী বাবুর্চির কাজ করে। সে বিকেলে আমার জন্য অপেক্ষা করত, রান্নাঘরে নিয়ে যেত এবং আমাকে অনেক মজার জিনিস খেতে দিত। কিন্তু আমাকে খেতে দিয়ে সে যেভাবে বসে আমার দিকে তাকিয়ে থাকত – এটা আমি পছন্দ করতাম না। আমাকে বলে, আমি যেন তাকে অ্যান্টি ডাকি।

পোপোর স্ত্রী বড় বাড়িটার মালির সঙ্গে আমাকে পরিচয় করিয়ে দেয়। লোকটি সুদর্শন, বাদামি মানুষ; ফুল পছন্দ করত। সে যে-বাগানটির মালি, সে-বাগানটি আমারও পছন্দের। যে-মাটিতে ফুলের গাছ হয় সেই মাটির রং কালো এবং মাটিটা স্যাঁতসেঁতে, সবুজ ঘাস, ভেজা ভেজা, নিয়মিত কাটা হয়। কখনো কখনো আমাকে গাছে পানি দেওয়ার সুযোগ দেয়। কাটা ঘাসগুলো জমিয়ে ছোট ব্যাগে ভরে আমাকে দেয়, আমি মায়ের জন্য নিয়ে আসি। ঘাস মুরগির জন্য ভালো।

একদিন আমি পোপোর স্ত্রীকে মিস করলাম। সে আমার জন্য অপেক্ষা করছিল না।পরদিন সকালে আমি পোপোকে রাস্তায় দেখলাম না – সেই দৃশ্যটাও না যে, রামের গ্লাসে সে আঙুল ডুবিয়েছে।সেদিন সন্ধ্যায় আমি পোপোর স্ত্রীকেও দেখলাম না।

পোপোকে পেলাম তবে ওয়ার্কশপে, মন খারাপ করে আছে। সে একটা কাঠের তক্তার ওপর বসে আছে এবং রাঁদায় উঠে আসা কাঠের পাতলা চিলতে আঙুলে পেঁচাচ্ছে।

পোপো বলল, ‘তোমার অ্যান্টি চলে গেছে।’

‘মিস্টার পোপো, কোথায় গেছে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

নিজেকে সেখান থেকে টেনে তুলে বলল, ‘বেটা সেটাই তো প্রশ্ন।’

পোপো দেখল হঠাৎ জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। খবরটা তাড়াতাড়ি চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল। একদিন যখন এডোস বলল, ‘আমি অবাক হচ্ছি – পোপোর কী হলো? মনে হচ্ছে তার রাম ফুরিয়ে গেছে।’ অমনি হ্যাট লাফিয়ে পড়ে তার হাত প্রায় চেপে ধরে। তারপর ছেলেদের সবাই পোপোর ওয়ার্কশপে গিয়ে জমায়েত হয় এবং সেখানে গিয়ে মেয়েমানুষ ছাড়া অন্যসব বিষয় ক্রিকেট, ফুটবল, সিনেমা নিয়ে আলাপ জুড়ে দেয়, তাদের চেষ্টা পোপোকে হাসিখুশি করে তুলবে।

পোপোর ওয়ার্কশপে আর হাতুড়ি পেটানো ও করাত কাটার শব্দ শোনা যায় না। কাঠের ভুসির তাজা গন্ধ আর আসে না, এগুলো কালচে হয়ে গেছে, ময়লা, ধুলোবালির মতো। পোপো অনেক বেশি মদ পান করতে শুরু করেছে, যখন সে মাতাল অবস্থায় থাকে আমি তাকে পছন্দ করি না। তার শরীর থেকে রামের গন্ধ বের হয়, সে কাঁদতে থাকে, রেগে যায়, এবং সবাইকে মারতে যায়। এতে সবাই তাকে মিগলে স্ট্রিট গ্যাঙের একজন বলে মেনে নেয়।

হ্যাট বলল, ‘পোপোর ব্যাপারে আমরা চিন্তা করেছি, সে আমাদের যে-কারো মতোই একজন মানুষ।’

নতুন সান্নিধ্য পোপো পছন্দ করল। মনের দিক দিয়ে সবার সঙ্গে সে বকবক করার মতো মানুষ। রাস্তার মানুষের সঙ্গে সবসময়ই সে বন্ধুত্ব করতে চেয়েছে, কিন্তু তাকে পছন্দ করা হচ্ছে না দেখে সে অবাক হয়েছে। ব্যাপারটা এমন যেন তার যা প্রাপ্য তা-ই পেয়েছে। কিন্তু পোপো এতে সুখী ছিল না। তার বন্ধুত্ব বড্ড দেরিতে এসেছে, তাছাড়া এই বন্ধুত্ব যতটা ভালো লাগবে বলে ভেবেছিল, ততটা ভালো লাগছে না। হ্যাট পোপোকে অন্য নারীতে আগ্রহী করে তুলতে চেষ্টা করছে, কিন্তু পোপো আগ্রহী হচ্ছে না।

পোপো আমাকে খুব ছোট ছেলে মনে করে আমার কাছে কিছু বলা ঠিক হবে না বলে মনে করেনি।

একদিন বলল, ‘বেটা তুমি যখন আমার মতো বড় হবে তখন বুঝতে পারবে যে-জিনিস তুমি পেতে চেয়েছ কিন্তু পাওনি, কিন্তু সামর্থ্য হওয়ার পর যখন পেলে তখন আর সেরকম ভালো লাগছে না।’

ধাঁধার মতো এভাবেই সে কথা বলত।

তারপর পোপো একদিন আমাদের ছেড়ে গেল।

হ্যাট বলল, ‘সে কোথায় গেছে সেটা আমাকে তার বলার দরকার নেই। আমি জানি সে তার বউয়ের খোঁজে গেছে।’

এডওয়ার্ড বলল, ‘তুমি কি মনে করো সেই মহিলা পোপোর সঙ্গে ফিরে আসবে?’

হ্যাট বলল, ‘চলো অপেক্ষা করি এবং দেখি।’

আমাদের দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হয়নি। খবরের কাগজেই ছাপা হয়েছে। হ্যাট বলল, যা যে-আশঙ্কা করেছিল তাই হয়েছে। পোপো আরিমাতে একটি লোককে পিটিয়েছে, সে-লোকটিই তার স্ত্রীকে ভাগিয়েছে। এই লোকটি হচ্ছে সেই মালি, যে আমাকে ব্যাগভর্তি ঘাস দিত।

পোপোর বড় কোনো সাজা হয়নি। তাকে জরিমানা দিতে হয়েছে, তারপর ছেড়ে দিয়েছে। ম্যাজিস্ট্রেট বলেছেন, পোপো যেন তার স্ত্রীকে আর উৎপীড়ন না করে।

পোপোকে নিয়ে ক্যালিপসো গান বাঁধা হলো। সে-বছর এ-গান ছড়িয়ে পড়ল, কার্নিভালের রোড-মার্চে অ্যান্ড্রুজ সিস্টার্স গানের দল আমেরিকান রেকর্ডিং কোম্পানির জন্য গানটা রেকর্ড করল :

এক কাঠমিস্ত্রি বেটা গেল আরিমাতে

ইমেলদা নামের এক প্রিয়তমার খোঁজে।

রোড-মার্চের জন্য এটা একটা বিশাল ব্যাপার।

আর স্কুলে গিয়ে আমি বলতাম, ‘কাঠমিস্ত্রি বেটা আমার খুব, খুব ভালো বন্ধু ছিল।’ ক্রিকেট ম্যাচে, ঘোড়ার রেসে হ্যাট বলে বেড়াত, ‘তাকে চিনি কিনা? ওহ্ গড, আমি তার সঙ্গে দিনরাত মদ গিলতাম। সে টানতে পারত বটে।’

আমাদের কাছে আবার যখন ফিরে আসে, পোপো আর আগের মানুষ নেই। আমি যখন তার সঙ্গে কথা বলতে চাইলাম সে গর্জন করে উঠল, রামের বোতল নিয়ে হ্যাট ও অন্যরা যখন ওয়ার্কশপে এলো সে তাদের তাড়িয়ে দিলো।

হ্যাট বলল, ‘মেয়েমানুষ লোকটাকে পাগল বানিয়ে ফেলেছে, শুনেছ।’ কিন্তু পোপোর ওয়ার্কশপ থেকে পুরনো শব্দগুলো আবার আসতে শুরু করেছে। সে জোর পরিশ্রম করছে, আমরা অবাক হই – সে কি এখনো নামছাড়া সেই জিনিস বানিয়ে চলেছে? জিজ্ঞেস করতেও আমি ভয় পাচ্ছি।

ওয়ার্কশপে ইলেকট্রিক লাইট লাগিয়ে সে রাতের বেলা কাজ করতে শুরু করেছে। তার বাড়ির সামনে ভ্যান থামছে, কিছু জিনিস দিয়ে যাচ্ছে, কিছু নিয়ে যাচ্ছে। পোপো তার বাড়িটা রং করতে শুরু করেছে, ঘরে লাগায় উজ্জ্বল সবুজ এবং চালে লাগায় উজ্জ্বল লাল।

হ্যাট বলল, ‘মানুষটা সত্যিই পাগল হয়ে গেছে।’

হ্যাট আরো যোগ করল, ‘মনে হচ্ছে আবার সে বিয়ে করতে যাচ্ছে।’

হ্যাট খুব ভুল কিছু বলেনি। দুই সপ্তাহ পর একদিন পোপো ফিরে এলো, তার সঙ্গে একজন মেয়েমানুষ। এ তো তারই স্ত্রী, আমার অ্যান্টি।

হ্যাট মন্তব্য করল, ‘দেখলে তো মেয়েমানুষ কী জিনিস? মেয়েমানুষের কী পছন্দ দেখলে তো। পুরুষমানুষটার জন্য নয়, এসেছে রংকরা নতুন বাড়ি ও ভেতরের আসবাবপত্রের জন্য। আমি বাজি রেখে বলতে পারি আরিমার লোকটার যদি একটা নতুন বাড়ি আর নতুন আসবাবপত্র থাকত তাহলে সে কখনো পোপোর সঙ্গে ফিরে আসত না।’ কিন্তু আমি কিছুই মনে করিনি। আমি খুশি হয়েছি। পোপো সকালবেলা তার রামের গ্লাস হাতে নিয়ে বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, রামের গ্লাসে আঙুল ডুবিয়ে দিয়েছে এবং বন্ধুদের হাত নেড়ে অভিবাদন জানাচ্ছে – এ-দৃশ্যটা আমার পছন্দের।

‘মিস্টার পোপো কী বানাচ্ছ?’

তার সেই পুরনো উত্তর, ‘বেটা, সেটাই তো প্রশ্ন। আমি নামছাড়া একটা জিনিস বানাচ্ছি।’

পোপো খুব তাড়াতাড়ি তার পুরনো জীবনে ফিরে আসে। নামছাড়া জিনিস তৈরিতে সে সময় দিয়ে চলেছে।

পোপো কাজ করা ছেড়ে দিয়েছে। তার স্ত্রী আমার স্কুলের পাশে একই জায়গায় কাজ পেয়েছে।

তার স্ত্রী ফিরে আসার পর মিগুয়েল স্ট্রিটের লোকজন পোপোর ওপর প্রায় চটেই আছে। তারা মনে করেছে, তাদের সব সহানুভূতির সঙ্গে কৌতুক করা হয়েছে এবং তা বিফলে গেছে।

হ্যাট আবার বলেছে, ওই অভিশপ্ত পোপোর দেমাগ বেড়ে গেছে। কিন্তু এবার পোপো কিছু মনে করেনি।

পোপো আমাকে বলত, ‘যাও বেটা, বাড়িতে গিয়ে প্রার্থনা করো যেন আমার মতো সুখী হতে পারো।’

এরপর যা ঘটল এমন আকস্মিকভাবে তা ঘটল যে, কী ঘটেছে তা আমরা জানতেই পারিনি।

খবরের কাগজে ছাপা না হওয়া পর্যন্ত হ্যাটও তা জানতে পারেনি। হ্যাট সবসময় কাগজ পড়ে। সকাল দশটা থেকে সন্ধ্যা ছটা পর্যন্ত সে পড়ে।

হ্যাট চেঁচিয়ে ওঠে, ‘কিন্তু আমি এ কী দেখছি?’ সে আমাদের সংবাদের শিরোনামটা দেখায় :

ক্যালিপসো রাজমিস্ত্রি কারাগারে

অদ্ভুত একটা গল্প। পোপো নির্বিচারে চুরি করে আসছিল। যেসব নতুন আসবাবপত্র দেখা যেত তার কোনোটাই পোপোর তৈরি নয় বলে হ্যাট জানায়। সে এসব চুরি করে এনে এটা-ওটা করে মডেলটা বদলে ফেলত। সে এত বেশি মাত্রায় চুরি করত যে, তার প্রয়োজন নেই এমন জিনিস বিক্রিও করত। এটা করতে গিয়েই সে ধরা পড়েছে। তখন আমরা বুঝতে পারি কেন পোপোর বাড়ির সামনে সবসময় ভ্যানের আনাগোনা চলত। এমনকি তার ঘর পুনরায় রং করতে যে রং ও ব্রাশ সে ব্যবহার করেছে তাও চোরাই।

হ্যাট যখন বলল, ‘লোকটা বোকা? নিজের চুরি-করা জিনিস তাকে বিক্রি করতে হবে কেন? আমাকে বলো, কেন?’ – এই কথাটা আমাদের সবার।

আমরা সবাই মেনে নিই, এটা তার খুব বোকামি হয়েছে। কিন্তু তারপরও আমরা আমাদের হৃদয়ের গভীরে অনুভব করি পোপো সত্যিই একজন মানুষ ছিল, সম্ভবত আমাদের সবার চেয়ে বড় মানুষ।

আর আন্টির বেলায় …

হ্যাট বলল, ‘তাকে কদিনের জেল দিয়েছে? এক বছর? সদাচরণের জন্য তিন মাস বাদ দিলে সবমিলিয়ে নয় মাস। সদাচরণের জন্য আমিও তার স্ত্রীকে তিন মাসের ছাড় দিই। আর তারপর বলে দিলাম, মিগলে স্ট্রিটে ইমেলদা বলে কেউ থাকবে না।’

কিন্তু ইমেলদা কখনো মিগলে স্ট্রিট ছেড়ে যায়নি। সে তার বাবুর্চির  চাকরিটাই কেবল ধরে রাখেনি, কাপড় ধোয়া আর ইস্ত্রি করার কাজও নিয়েছে। পোপো যে এমন লজ্জার একটা ঘটনায় কারাগারে, এ নিয়ে কেউ দুঃখবোধ করল না, আমাদের যে-কারো বেলায় এমনটা ঘটতে পারে। তারা দুঃখ করল ইমেলদার জন্য, যে-ইমেলদাকে লম্বা সময় একা থাকতে হবে।

পোপো বীর হয়ে আমাদের মধ্যে ফিরে আসে। সে আমাদের একজন হ্যাট হোক কি বোগার্ট – মানুষ হিসেবে সে তাদের চেয়ে ভালো। আমার বেলা সে বদলে গেছে, এই বদলে যাওয়ায় আমি ব্যথিত হয়েছি।

পোপো কাজ শুরু করল।

সে লোকজনের জন্য হেলান দেওয়ার মরিসচেয়ার, টেবিল এবং ওয়ারড্রব বানাতে শুরু করে। আমি যখন তাকে জিজ্ঞেস করি, ‘মিস্টার পোপো, নামছাড়া জিনিসটা তুমি কবে বানাতে শুরু করবে?’ সে গর্জন করে ওঠে।

পোপো বলে, ‘তুমি বড্ড প্যাঁচাল করো। তোমার গায়ে হাত তোলার আগে তাড়াতাড়ি সটকে পড়ো।’

অনুবাদ : এম এ মোমেন

এমএ/ ০৩:২২/ ২৭ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে