Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৮ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১৯-২০১৯

ঘোরের মধ্যে

আনিসুল হক


ঘোরের মধ্যে

ভেবেছিলাম, এই লেখাটা লিখব ঘোরের মধ্যে। 'খুশিতে, ঠ্যালায়, ঘোরতে' নয়। একেবারে ঘোরগ্রস্ত হয়ে। অবচেতনের মধ্যে ডুবে থেকে লিখব; কী লিখব, ঠিক জানবও না। অনেক পরে ঘোর কেটে গেলে তাকিয়ে দেখব, হায় হায়! কী লিখেছিলাম এসব? কীভাবেই বা লিখেছিলাম! কিন্তু ঘোর তো আর বলে-কয়ে আনা যায় না। ঘোরগ্রস্ত আপনাআপনিই হতে হয়। পরিকল্পনা করে কেউ ঘোরগ্রস্ত হয় না। 

ঠিক প্রেমে পড়ারই মতো। পরিকল্পনা করে কেউ প্রেমে পড়ে না। প্রেমে পড়তে হয়তো মন চাইতে পারে, তার নানা পরিকল্পনাও থাকতে পারে। কিন্তু প্রেমে পড়াটা একটা নিতান্তই দৈব দুর্ঘটনা। এবং প্রেমে পড়তে পারা সৌভাগ্যেরও ব্যাপার বটে। সবাই প্রেমে পড়তে পারে না। সব সময়ও পারা যায় না। ওটা হয়ে যায়।

প্রেমে পড়লে মানুষের যেমন বাস্তব কাণ্ডজ্ঞান লোপ পেয়ে যায়; ঘোর হলো সেই দশা। মানুষ কখনো কখনো ঘোরে থাকে। কিছু মানুষ অবশ্য আছেন, জন্মগ্রহণ করেন ঘোর নিয়ে। একটা জীবন তার কেটে যায় ঘোরের মধ্যে। জীবনানন্দ দাশ ছিলেন সেই রকম এক মানুষ। সারাটা জীবন ছিলেন কবিতার নিশি-পাওয়া মানুষ। কলেজের শিক্ষক ছিলেন, কিন্তু ভালোমতো পড়াতেও পারতেন না। তার নাকি জিভ শুকিয়ে যেত ছাত্রদের সামনে লেকচার দিতে গিয়ে। 'ঘোর' নিয়ে সেরা বর্ণনাটা অবশ্য আমরা তাঁর কবিতাতেই পাই-

'আলো-অন্ধকারে যাই- মাথার ভিতরে

স্বপ্ন নয়, কোন্‌ এক বোধ কাজ করে;

স্বপপ্ন নয়- শান্তি নয়- ভালোবাসা নয়,

হৃদয়ের মাঝে এক বোধ জন্ম লয়;

আমি তারে পারি না এড়াতে,

সে আমার হাত রাখে হাতে,

সব কাজ তুচ্ছ হয়- পণ্ড মনে হয়,

সব চিন্তা- প্রার্থনার সকল সময়

শূন্য মনে হয়,

শূন্য মনে হয়।'

তিনি যে কবি ছিলেন, কবিতার ঘোরে নিমগ্ন ছিলেন, সব মানুষের চেয়ে আলাদা ছিলেন, তাও আছে এই কবিতায়-

'সকল লোকের মাঝে ব'সে

আমার নিজের মুদ্রাদোষে

আমি একা হতেছি আলাদা?

আমার চোখেই শুধু ধাঁধা?

আমার পথেই শুধু বাধা?'

এবং সেই অপূর্ব লাইনটা এই কবিতাতেই আছে- সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়-

'আমি সব দেবতারে ছেড়ে

আমার প্রাণের কাছে চ'লে আসি,

বলি আমি এই হৃদয়েরে:

সে কেন জলের মতো ঘুরে-ঘুরে একা কথা কয়!

অবসাদ নাই তার? নাই তার শান্তির সময়?

কোনোদিন ঘুমাবে না? ধীরে শুয়ে থাকিবার স্বাদ

পাবে না কি?'

এই ঘোর নিয়ে কবিরা জন্মগ্রহণ করেন। তারা মানুষের মধ্যে থেকেও আলাদা থাকেন। শিল্পী মাত্রই তা-ই। তারা মানুষের সঙ্গে মিশতে পারেন না। সমাজ-সংসার তাঁদের ভুল বোঝে।

কবি নির্মলেন্দু গুণ তাঁর স্মৃতিকথায় লিখেছেন কবি আহসান হাবীবের সঙ্গে দৈনিক পত্রিকার অফিসে দেখা করার কথা। নির্মলেন্দু গুণ থাকেন নেত্রকোনায়। ঢাকায় এসে তিনি দৈনিক কাগজের সাহিত্য সম্পাদক কবি আহসান হাবীবের চেম্বারে গেছেন। নির্মলেন্দু গুণের সামনেই আহসান হাবীব চা খেলেন। খানিক পরে তিনি তার অফিস-সহকারীকে ডেকে বললেন, তোমার কাছে চা চেয়েছিলাম। চা দিলে না কেন?

দিয়েছি তো স্যার।

কখন?

আপনি খেলেন তো স্যার।

নির্মলেন্দু গুণ বললেন, জি আপনি একটু আগেই চা খেয়েছেন।

নির্মলেন্দু গুণ বুঝলেন, কবি হতে গেলে ভুলে যেতে পারতে হয়। তিনি ফিরে গেলেন নেত্রকোনায়। রাতের বেলা খেয়ে-দেয়ে শুয়ে পড়লেন। ম্যালা রাতে বিছানা ছেড়ে উঠে বলতে লাগলেন, মা, মা, তোমরা তো আজকা আমারে ভাত দিলা না।

নির্মলেন্দু গুণের মা ঘুম ভেঙে জেগে উঠে কাঁদতে লাগলেন। হায় হায়! আমার ছেলের কী হয়েছে? ছেলে কি পাগল-টাগল হয়ে গেল?

তার বোন সোনালি বলল, আমি জানি দাদার কী হইছে? দাদা আমারে কইছে। দাদা আসলে কবি হইতে চায়।

নির্মলেন্দু গুণের ওই ঘোর ছিল বানানো। কিন্তু তার সারাজীবনের কবিত্বের ঘোর খাঁটি আর স্থায়ী। কবিতার জন্য তিনি সবকিছু ছেড়েছেন। সমাজ-সংসার, বৈষয়িক উন্নতি। এখন তাঁর নতুন ঘোর- তিনি কবিতাকেন্দ্র বানাচ্ছেন। এর আগে বানিয়েছেন স্কুল। 

মানুষের জীবনের খুব পরিচিত এবং সবচেয়ে খাঁটি ঘোরের নাম প্রেম। প্রেমের কাছে সব তুচ্ছ। প্রেমে পড়া লোকের কী দশা হয়?-

রূপ লাগি আঁখি ঝুরে গুণে মন ভোর।

প্রতি অঙ্গ লাগি কাঁদে প্রতি অঙ্গ মোর।।

হিয়ার পরশ লাগি হিয়া মোর কাঁদে।

পরাণ পিরীতি লাগি থির নাহি বাঁধে।।

প্রতিটা অঙ্গের জন্য প্রতিটা অঙ্গ কাঁদতে থাকে। আবার আলিঙ্গনে থেকেও তারা কাঁদে, আসন্ন বিচ্ছেদের কথা ভেবে-

এমন পিরীতি কভু দেখি নাই শুনি।

পরাণে পরাণ বাঁধা আপনা আপনি।।

দুহুঁ কোরে দুহুঁ কাঁদে বিচ্ছেদ ভাবিয়া।

তিল আধ না দেখিলে যায় যে মরিয়া।।

তবে এমন যে সর্বস্ব হরণকারী প্রেম, এই যে দুকূলপ্লাবী অনুভূতি, যা জগতের আর সবকিছুকে তুচ্ছ করে দেয়, সেই ঘোরও কিন্তু বেশিদিন টেকে না। থাকে না। সেটা অতিঅল্প বয়সে লিখে গেছেন মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, তার দিবারাত্রির কাব্য উপন্যাসে। তিনি বলেছেন :

'ভালবাসা কতদিনের? কতকাল স্থায়ী হয় ভালবাসা? প্রেম অসহ্য প্রাণঘাতী যন্ত্রণার ব্যাপার। প্রেম চিরকাল টিকে থাকলে মানুষকে আর টিকতে হত না। প্রেমের জন্ম আর মৃত্যুর ব্যবধান বেশি নয়।'

এটাও সত্য। প্রেম আসলে বেশিদিন টেকে না। প্রেম টিকলে জগৎ টিকত না। প্রেম হলো সকল ঘোরের সেরা ঘোর।

আমি যখন উপন্যাস লিখতে শুরু করি, প্রথম প্রথম পারি না। সারাদিন কেটে যাচ্ছে, সারারাত কেটে যাচ্ছে, একটা লাইনও লিখতে পারছি না। এইভাবে দুই চারদিন যায়। তারপর সারাদিনে হয়তো দুশ' শব্দ লিখি। তারপর আস্তে আস্তে জিনিসটার মধ্যে আমি ঢুকে যাই। ডুবে যাই। হারিয়ে যাই। জগৎ-সংসার ভুলে যাই। নাওয়া-খাওয়ার কথা মনে থাকে না। লিখছি। ভাবছি। চন্দ্রগ্রস্তের মতো অবস্থা। ওই ঘোরটা না আসা পর্যন্ত পারব না। ঘোর এলে পারি। তারপর একদিন ঘোর ভেঙে যায়। আবার বাস্তব জগতে ফিরে আসি। যতদিন ঘোরগ্রস্ত ছিলাম, মনে হতো, এই লেখাটাই পৃথিবী। এই লেখা না লিখতে পারলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। যেই না ঘোর কেটে গেল, আর অমনি মনে হতে থাকে, কী লিখলাম এটা! কোনো মানে হয়! 

একটা জনসমষ্টিও কিন্তু কখনো কখনো ঘোরগ্রস্ত হতে পারে। যেমনটা হয়েছিল, ১৯৬৯ সালে। ১৯৬৯ সালে এই দেশের প্রতিটা রাজপথ পরিণত হয়েছিল মিছিলে। মানুষ পাগল হয়ে গিয়েছিল। একই অবস্থা হয়েছিল ১৯৭১ সালের মার্চ মাসে। তারপর তো এলো সেই মহান মুক্তিযুদ্ধ। পুরো দেশ একদেহ, একমন। বঙ্গবন্ধুর তর্জনীর নির্দেশে চলছে দেশ- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

আবার পুরো জনগোষ্ঠী ঘুমিয়েও পড়তে পারে। গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেসের ওয়ান হান্ড্রেড ইয়ারস অব সলিচুডে আছে সেই বিবরণ।

মাকান্দো নামের জনপদটিতে হঠাৎ অনিদ্রা দেখা দিল। ওই জনপদের প্রতিষ্ঠাতা হোসে আর্কাদিও বুয়েন্দিয়া বলেন, 'কখনও আর যদি না ঘুমোয় তো খুবই ভালো হয়। জীবনের কাছ থেকে আরও অনেক কিছু পাওয়া যাবে।'

কিন্তু যেটা হলো, ওই জনপদের সবাই অনিদ্রার সঙ্গে সঙ্গে স্মৃতিভ্রষ্ট হয়ে যেতে লাগল। সবকিছুর নাম ও ব্যবহার তারা ভুলে যাচ্ছে। তা ঠেকাতে তারা জিনিসপাতির গায়ে নাম ও তাদের ব্যবহার লিখে রাখতে শুরু করল। যেমন গরুর গায়ে তারা লিখে রাখল, 'এটা হলো গরু। যাতে সে দুধ উৎপাদন করতে পারে, সে জন্য রোজ সকালে তাকে অবশ্যই দোহাতে হবে। আর সেই দুধ অবশ্যই জ্বাল দিতে হবে, যাতে করে কফির সঙ্গে মিশিয়ে কফি ও দুধ বানানো যায়।' 

এই রকম ঘুমের ঘোরে ছিলেন কবি নির্মলেন্দু গুণ। তিনি লিখেছেন :

কে যেন হঠাৎ দরজার কাছে এসে

পাগলের মতো ডেকেছিল ভালোবেসে :

'ওরে ওঠ, সর্বনাশ হয়ে গেছে তোর।'

তবুও আমার ভাঙেনি ঘুমের ঘোর।

 

আজ মনে পড়ে, তাই তো, তাই তো-,

আমি সে ডাকের উত্তর দিই নাই তো।

সর্বনাশের রেফের দ্বিত্ব ধ্বনি

শুনিয়া পরান উঠেছিল উন্মনি :

'ওরে ওঠ, সর্বনাশ হয়ে গেছে তোর।'

তবুও আমার ভাঙেনি ঘুমের ঘোর।

কবিতার জন্য ঘোর লাগে। প্র্রেমের জন্য ঘোর লাগে। শিল্পের জন্য ঘোর লাগে। কবি শার্ল বোদলেয়ার বলেছেন :

You have to be always drunk. That’s all there is to it—it’s the only way. So as not to feel the horrible burden of time that breaks your back and bends you to the earth, you have to be continually drunk.
But on what? Wine, poetry or virtue, as you wish. But be drunk.

মদে, কবিতায় বা পুণ্যে মাতাল হতে হবে।

পরাবাস্তববাদ বা সুররিয়ালিজমে সেই চেষ্টা ছিল। ঘোরগ্রস্ত দশাটাকে শিল্পে ধরা। সেই অনুভূতিগুলোকে ছবিতে, কিংবা লেখায় প্রকাশ করা। তারা চেয়েছিলেন অটোমেটিক রাইটিং। ক্যানভাসের সামনে শিল্পী রঙতুলি নিয়ে দাঁড়ালেন, যা মনে আছে, তাই আঁকলেন। যা মনে আছে, কবি তাই লিখলেন। ঘোরের মধ্যে। অবচেতনাতাড়িত হয়ে।

আদ্রেঁ ব্রেতোঁ পরাবাস্তবতার ইশতেহারে ঘোষণা করেছিলেন :

Psychic automatism in its pure state, by which one proposes to express — verbally, by means of the written word, or in any other manner — the actual functioning of thought. Dictated by thought, in the absence of any control exercised by reason, exempt from any aesthetic or moral concern.

ঘোরের মধ্যে লিখতে হবে। কোনো রকমের চুক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হওয়া যাবে। স্বতঃস্ম্ফূর্তভাবে লিখে বা এঁকে যেতে হবে।

চেয়েছিলাম ঘোরগ্রস্ত হয়ে এই লেখাটা লিখব। এতে কোনো যুক্তি থাকবে না। এতে কোনো কারণ থাকবে না। শুধু স্রোতে গা দেব ভাসিয়ে। কলম যেদিকে নিয়ে যায়, ভেসে যেতে থাকব। তা হলো না। 

কাজেই থামতে হচ্ছে।

আচ্ছা তাহলে সেই যে প্রমথ চৌধুরী তাঁর বর্ষা প্রবন্ধে লিখেছিলেন, 'আবার ঘোর করে এলো। বাতি না জ্বালিয়ে আর লেখা সম্ভব নয়।' সেই ঘোরের মানে কী?

সেই ঘোর মানে অন্ধকার। অভিধানে ঘোর শব্দের প্রথম অর্থ অন্ধকার। তারপর বাকিগুলোন আছে, আচ্ছন্নতা, আবেশ। মোহ, ভ্রান্তি। বিশেষণ হিসেবে ভয়ঙ্কর। যেমন ঘোর দুর্দিন। 

ঘোর কেটে যাচ্ছে। আর লেখা যাচ্ছে না। কিছুদিন আগে আমি যখন বইমেলার জন্য উপন্যাস লিখছিলাম, তখন কী ঘোরগ্রস্তই না ছিলাম! লেখাটা প্রকাশকের হাতে তুলে দেবার পর আমি গাড়িতে ঘুমিয়ে পড়লাম। একটা জায়গায় কাজে গিয়ে সবার সামনে চেয়ারে বসে ঘুমিয়ে পড়লাম। বাসায় এসে সন্ধ্যার সময় সোফায় ঘুমিয়ে পড়লাম। কোনো রকমে রাতের খাবার শেষ করে বিছানায় গেলাম। পরের দিন সকাল দশটায় আমার স্ত্রী ডেকে তুললেন আমাকে- কী ব্যাপার, অফিসে যাবা না? 

আমি তখন ফেসবুকে লিখেছিলাম, উপন্যাস লেখা মানে নিজের আয়ু ধ্বংস করা। একটা করে শব্দে লেখকের একটা করে রক্তের ফোঁটা মিশে থাকে। লেখক নিজেকে নিঃশেষ করে উপন্যাস লেখেন। কেন লেখেন, কে জানে!

এর নামই হয়তো ঘোর।

এখন ঘোর কেটে যাচ্ছে। কাজেই শেষ করতে হচ্ছে। 

এমএ/ ০৩:২২/ ১৯ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে