Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৯ নভেম্বর, ২০১৯ , ৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১৯-২০১৯

ইতিহাসের তথ্য ও পর্যালোচনা

সঞ্জয় ঘোষ


ইতিহাসের তথ্য ও পর্যালোচনা

ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের মতোই বাংলাকেও বহুদিন একটি হিন্দুপ্রধান অঞ্চল বলে মনে করা হতো। কিন্তু ১৮৭২ সালে বাংলায় প্রথম আদমশুমারির পরই মূলত বাংলায় ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের সংখ্যা সম্পর্কে ঐতিহাসিকদের ধারণা বদলে যায়।

১৮৭২ সালের জনগণনাতেই প্রথম স্পষ্ট হয়, বাংলার প্রায় ৫০ শতাংশ লোক মুসলমান; এবং বিশেষ করে বাংলার পূর্বাঞ্চলে মুসলমান ধর্মাবলম্বীদের সুস্পষ্ট সংখ্যাধিক্য রয়েছে। সেই আদমশুমারিতে দেখা যায়, ভারতের মোট জনসংখ্যার ২১ দশমিক ৪ শতাংশ মুসলমান। অথচ শুধু বাংলা প্রদেশে মুসলমানের সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪৮ শতাংশ। মানে প্রায় অর্ধেক।

আরও পরে, যখন ১৯০০ সাল থেকে সমগ্র পৃথিবীর দেশগুলোর মুসলমানদের সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া শুরু হয়, তখন দেখা যায়, শুধু এই বাংলাদেশেই পৃথিবীর মোট মুসলমানের ১০ দশমিক ৭৫ শতাংশের বসবাস। এমনকি সে সংখ্যা তৎকালীন মুসলিম বিশ্বের সবচেয়ে বড় দেশের মোট জনসংখ্যারও দ্বিগুণ। বাংলায় মুসলমানদের এই সংখ্যাধিক্য ইতিহাসের একটি বড় ধাঁধা। 

ওপরের এই তথ্য বিশ্নেষণগুলো সম্প্রতি প্রকাশিত বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, প্রাবন্ধিক আকবর আলি খানের 'বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্য :একটি ঐতিহাসিক বিশ্নেষণ' নামক গ্রন্থ থেকে পাওয়া। সমগ্র বিশ্বের তুলনায় বাংলায় ইসলাম প্রচারের যে অভাবনীয় সাফল্য; এর কারণ ও বাস্তবতা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই চিন্তা ও কাজ করে আসছিলেন আকবর আলি খান। সেই কর্মপ্রচেষ্টার ফসল এ গ্রন্থটি। ইসলাম প্রচারের সফলতার ইতিহাস-অনুসন্ধানের হাত ধরে এ বইয়ে উঠে এসেছে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য অঞ্চলের বসতির তুলনায় আমাদের বাংলার গ্রামীণ বসতির অনন্যতার কথা। এসেছে বাংলায় ইসলাম প্রচারের ইতিহাস নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিকের মতবৈচিত্র্যের কথা; পার্থক্য ও বৈপরীত্যের কথা। প্রায় দেড়শ' বছর ধরে বাংলায় ইসলাম প্রচারের সাফল্যের কারণ নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে যে বিতর্কগুলো চলছে- আলোচনার সুবিধার্থে আকবর আলি খান এ বইতে তাদের বক্তব্যকে দুটি ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথম ভাগকে উপস্থাপন করেছেন পাঁচটি ঘরানা বা তত্ত্বের ভিত্তিতে। তত্ত্ব-ঘরানাগুলো এমন যে, বাংলাদেশের অধিকাংশ মুসলমান ধর্মান্তরিত; স্থানীয় হিন্দুদের বংশধর নয়। ইসলাম ধর্ম পৃথিবীর সর্বত্র তরবারির জোরে প্রচারিত হয়েছে। বাংলার উচ্চবর্ণের হিন্দুরা নিম্নবর্ণের হিন্দুদের শোষণ করত। ইসলাম তার বিপরীতে সৌভ্রাতৃত্বের সঞ্চার করেছে। তৎকালীন হিন্দুদের হাতে অত্যাচারিত বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণই এ অঞ্চলে ব্যাপক হারে ইসলাম প্রচারের সফলতার কারণ। আর পঞ্চম ঘরানাটি হলো সুফি, দরবেশ ও পীরদের আধ্যাত্মিক শক্তিতে অনুপ্রাণিত হয়ে এ অঞ্চলের মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করে।

ইতিহাস ও তথ্য পর্যালোচনার ক্ষেত্রে আকবর আলি খানের গুরুত্বপূর্ণ বিশেষত্ব হলো, তিনি সর্বদাই তথ্যকে পক্ষপাতহীন একটি সত্যের আলোকে উপস্থিত করার চেষ্টা করেন। সেই প্রচেষ্টার ব্যতিক্রম এ বইতেও নেই। যেমন ওপরের পাঁচটি ঘরানাকে তুলে ধরার সাথে সাথে তিনি সে ঘরানাগুলোর বাস্তবিক দুর্বলতাগুলোকে ব্যক্ত করেছেন ঐতিহাসিক সত্য দিয়েই। কোথাও বা প্রশ্ন রেখে গেছেন। পাঠককে তার আত্মানুসন্ধানের পথে আকবর আলি খান বাধাগ্রস্ত করেন না, বরং তথ্য-উপাত্তের সাবলীল উপস্থাপনার ভেতর দিয়ে বিচার-বিবেচনার স্বতন্ত্র দরজা খুলে দিতে পারেন। 

বাংলায় ইসলাম প্রচার সংক্রান্ত দ্বিতীয় প্রজন্মের বক্তব্যগুলো সম্পর্কে তিনি বলেছেন, ওপরে উল্লিখিত প্রথম প্রজনেন্মর ঘরানাগুলোর কোনো ব্যাখ্যাই দ্বিতীয় প্রজন্মের ঐতিহাসিকরা পুরোপুরি গ্রহণ করেন না। এ পর্যায়ে তিনি আরও চারটি ঘরানার কথা তুলে ধরেছেন।

বাংলায় ইসলাম প্রচারের নানা রকম কথা জনমনে এবং ঐতিহাসিকদের মধ্যে প্রচলিত। এ গ্রন্থের লক্ষ্য হলো এ সংক্রান্ত চলমান বিতর্কের মূল প্রশ্নগুলো আলোচনা করা। বইটি ১১টি অধ্যায়ে বিভক্ত। প্রতিটি অধ্যায়েই ভিন্ন ভিন্ন বিতর্ককে তথ্য ও বাস্তবতার নিরিখে পর্যালোচনা করেছেন লেখক। তুলে ধরেছেন, বাংলাদেশে মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠতার কারণ কারা? স্থানীয় হিন্দুরা, নাকি পশ্চিম এশিয়া থেকে আগত মুসলিম অভিবাসীরা? মুসলমান শাসকদের ভূমিকা; নিম্নবর্ণের হিন্দুদের ওপর ব্রাহ্মণ্যবাদের অত্যাচার বাংলায় ধর্মান্তরকরণে কী ভূমিকা রেখেছে; বৌদ্ধদের ইসলাম গ্রহণ, পীরদের ইসলাম প্রচারে ভূমিকা এবং তাদের কার্যকলাপ ইত্যাদি বর্ণনা করেছেন। তা ছাড়া উল্লেখযোগ্য বিতর্কের দুর্বলতা ও বাস্তবতার পাশাপাশি আকবর আলি খান এ বিষয়ে বিশেষ করে ইতিহাসবিদ অসীম রায় ও রিচার্ড এম ইটনের তত্ত্বগুলোকে বিশ্নেষণ এবং তাদের দুর্বলতাগুলো উপস্থাপন করেছেন। এবং সব ক্ষেত্রেই লেখক বাংলার গ্রামীণ সমাজব্যবস্থার নিজস্ব বৈশিষ্ট্য এবং ঐতিহাসিক বাস্তবতায় এখানকার অর্থনৈতিক, ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক অবস্থাকে পর্যালোচনার কেন্দ্রে রাখতে চেষ্টা করেছেন। এবং বলা যায়, প্রতিষ্ঠিত এ দুই ইতিহাসবিদের বক্তব্যগুলোকে আকবর আলি খান নাকচ করে দিয়েছেন এ বইয়ের মাধ্যমে। 

বাংলাদেশের ঐতিহাসিক পটভূমি তো বটেই, বর্তমান সমাজ-রাজনৈতিক বাস্তবতাকে বুঝতে এবং প্রচলিত ধারণার ভ্রান্তিগুলো সম্পর্কে পরিস্কার হতে যে কোনো পর্যায়ের পাঠককে এ বইটি সহায়তা করবে। সেই সঙ্গে ভবিষ্যৎ গবেষণার নানা ক্ষেত্রেও বইটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে- লেখক আকবর আলি খানের বিশ্নেষণ ও লেখনীস্বাতন্ত্র্যের কারণেই। 

এমএ/ ০৩:২২/ ১৯ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে