Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-১৯-২০১৯

এই সাপ একদিন ওঝাকেই দংশন করবে

আবদুল গাফফার চৌধুরী


এই সাপ একদিন ওঝাকেই দংশন করবে

নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চে শুক্রবার জুমার নামাজের দিনে দুটি মসজিদে মূলত একজন গানম্যানের হামলায় ৪৯ জনের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। এটাকে কোনো শ্বেতাঙ্গ চরমপন্থীর মুসলমানদের বিরুদ্ধে শুধু হেইট অ্যাটাক ভাবলে ভুল করা হবে। আবার রেসিয়াল অ্যাটাক ভাবলেও তা ঠিক হবে না। ২৮ বছর বয়সী ব্রেন্টন হ্যারিসন টারান্ট নামে শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী এবং ইমিগ্র্যান্টবিদ্বেষী এক যুবক এই বর্বর হত্যাকাণ্ডের জন্য অভিযুক্ত হয়েছেন বটে, তাঁকে এবং তাঁর পূর্বতন হত্যাকাণ্ডের শ্বেতাঙ্গ নায়কদেরও হত্যাকারীতে রূপান্তর ঘটিয়েছে পশ্চিমা শাসকদের এবং মিডিয়ার বর্তমান ইসলাম-ফোবিয়া ও ইমিগ্র্যান্টবিরোধী প্রচারণা। মধ্যপ্রাচ্য সম্পর্কে পীড়িত যে হাজার হাজার নর-নারী ইউরোপে শরণার্থী হয়েছে, তাদের বেশির ভাগই সিরিয়ান মুসলমান।

ইংরেজিতে একটি বহু ব্যবহূত প্রবাদ আছে, Society prepers crime, criminals commit it —সমাজ অপরাধ তৈরি করে, অপরাধীরা তা সম্পন্ন করে মাত্র। বর্তমান যুগে হিন্দু, মুসলমান, বৌদ্ধ, খ্রিস্টান সব সম্প্রদায়ের মধ্যে এই অপরাধীদের পাওয়া যাবে। পশ্চিমা ধনবাদী শাসক শক্তি তাদের প্রয়োজনমতো একেক সময় একেক সম্প্রদায়কে সন্ত্রাসবাদী বানায়। তাদের প্রয়োজন ফুরিয়ে গেলে এই সন্ত্রাস দমনের নামে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস ভয়াবহ মূর্তি ধারণ করে।

গত ১৫ মার্চ শুক্রবার নিউজিল্যান্ডে যে বর্বরতার অনুষ্ঠান হলো, গোটা সভ্য জগতেই তার বিরুদ্ধে সরব নিন্দাবাক্য শোনা যাচ্ছে। এর আগে এই ধরনের বড় বড় হত্যাকাণ্ডে একই নিন্দাবাক্য ও প্রতিবাদ শোনা গেছে। এতে সন্ত্রাস দমন হয়নি। এক সন্ত্রাসীকে শাস্তি দেওয়া হলে ১০ সন্ত্রাসী তার স্থান পূর্ণ করেছে। তালেবান নেতা, নিউ ইয়র্কে ৯/১১-এর ধ্বংসযজ্ঞের নায়ক বলে কথিত ওসামা বিন লাদেনকে তো বিনা বিচারে অবৈধভাবে হত্যা করে লাশ গুম করা হলো। এতে তালেবান বা ইসলামী জঙ্গিদের চূড়ান্তভাবে পরাজিত করা সম্ভব হয়েছে কি? না, লাদেনপুত্র নতুন তালেবান নেতা হয়ে আবির্ভূত হয়েছেন।

নিউজিল্যান্ড একটি শান্তির দেশ। এর অবস্থান পৃথিবীর এক প্রান্তে। সে দেশে হোয়াইট সুপ্রিমেসি তত্ত্বে বিশ্বাসী শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাসীদের অস্তিত্ব আছে এবং তা এত শক্তিশালী, এটা দুই দিন আগেও কেউ বললে বিশ্বাস করা কঠিন হতো। কিন্তু ক্রাইস্টচার্চের ঘটনা প্রমাণ করল তা বিশ্বাস করার মতো সত্য। লন্ডনের গার্ডিয়ানের কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ড তাঁর ১৬ মার্চের কলামে স্বীকার করেছেন, ‘To stop this we must confront the sight’s hate preachers.’’ এই বর্বরতা বন্ধ করতে হলে ডানপন্থী বিদ্বেষ প্রচারকদের মোকাবেলা করতে হবে।

এখন প্রশ্ন ডানপন্থী প্রতিক্রিয়াশীলদের মধ্যে এই hate preacher বা বিদ্বেষ প্রচারক কারা? তিনি বিনা দ্বিধায় ডোনাল্ড ট্রাম্পসহ শক্তিশালী পশ্চিমা শাসক ও মিডিয়াকে এ ব্যাপারে দায়ী করেছেন। বলেছেন, ট্রাম্প, তাঁর মতো শক্তিশালী এক শ্রেণির ইউরোপিয়ান রাজনীতিবিদ, মিডিয়া নিউজিল্যান্ডে মসজিদে ঢুকে নিরীহ মুসলমান হত্যার চিরাচরিত নিন্দা জানাবেন। কিন্তু তাঁরা ও তাঁদের পূর্বসূরিরা বছরের পর বছর ইসলাম পাশ্চাত্যের উন্নত জীবনধারার শত্রু এবং শত্রু নিধনের জন্য এখনই প্রস্তুতি দরকার বলে যে প্রচার চালিয়েছেন এবং ইসলাম-ফোবিয়া তৈরি করেছেন, তা কি এখন সারা পশ্চিমা জগতে ছড়িয়ে পড়েনি?

সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ব্রিটেনের তদানীন্তন প্রধানমন্ত্রী পশ্চিমা বিশ্বকে এই বলে সাবধান করে দিয়েছিলেন যে ‘কমিউনিজমের পতনে আমাদের আনন্দিত হওয়ার কিছু নেই।’ ইসলামের নাম উচ্চারণ না করে আভাসে ইসলামের দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করে তিনি বলেন, পশ্চিমা সভ্যতার এক নতুন শত্রু প্রস্তুত হচ্ছে। ডোনাল্ট ট্রাম্প ২০১৭ সালে ওয়ারশতে বলেন, ‘খ্রিস্ট ধর্ম আজ বিপন্ন। যারা তাকে ধ্বংস করতে চায় তাদের নিধন করা ও প্রতিরোধ করার সাহস আমাদের আছে কি?’

আমেরিকার আরেক প্রেসিডেন্ট জর্জ বুশ জুনিয়র ইরাকের সাদ্দাম হোসেনের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে যুদ্ধ শুরু করার পর ঘোষণা করেছিলেন, ‘এটা মুসলমানদের বিরুদ্ধে খ্রিস্টানদের ক্রুসেড।’ তখনকার ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী টনি ব্লেয়ার ছিলেন বুশের সাঙাত, ধূর্ত রাজনীতিবিদ। বুশের ঘোষণায় সারা মুসলিম বিশ্ব খেপবে, এটা বুঝতে পেরে তিনি তাড়াতাড়ি বুশকে দিয়ে তাঁর মন্তব্য প্রত্যাহার করান এবং লন্ডনের মসজিদে মসজিদে ঘুরে মুসলমানদের আশ্বাস দিতে থাকেন, ‘ইরাকের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধ ক্রুসেড নয়।’

বিশ্বব্যাপী এই ভয়াবহ সন্ত্রাসের জন্য আমি একতরফা পশ্চিমা শক্তিকে দায়ী করতে চাই না। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, কমিউনিজম ঠেকাতে গিয়ে ধনতন্ত্রী আমেরিকা ও তার সহযোগী পশ্চিমা দেশগুলো এবং তাদের বিগ মিডিয়া এই টেররিজমের জন্ম দিয়েছে। টেররিজম আগেও ছিল। আমেরিকার কু ক্লাক্সক্লান সন্ত্রাসীদের নাম কে না জানে! এরা উগ্র খ্রিস্টান। তাই বলে এদের খ্রিস্টান জঙ্গি বলে প্রচার করা হয়নি। এদের দৌরাত্ম্যও আমেরিকায় সীমিত। কিন্তু আফগান যুদ্ধ থেকে উদ্ভূত জঙ্গিবাদ সারা বিশ্বে ছড়িয়েছে।

আমেরিকাই এই জঙ্গিদের স্রষ্টা। আবার তারাই এর নাম দিয়েছে ইসলামী জঙ্গি। ইসলাম প্রকাশ্য ধর্মযুদ্ধ সমর্থন করে। এর নাম জিহাদ। যেমন খ্রিস্টানদের ধর্ম যুদ্ধের নাম ক্রুসেড। জিহাদ ও ক্রুসেড সন্ত্রাস নয়। কিন্তু আমেরিকা আফগানিস্তান থেকে কমিউনিস্ট শাসন উত্খাতের জন্য বিপুল অর্থ ও অস্ত্র সাহায্য দিয়ে তালেবান, আল-কায়েদা ইত্যাদি নামে বহু সন্ত্রাসী গ্রুপ তৈরি করে। নাস্তিক কমিউনিস্টদের কবল থেকে ইসলাম ও ইসলামী দেশগুলো রক্ষার নামে এই সন্ত্রাসী দলগুলোকে মোটিভেটেড করা হয়। আল-কায়েদার নেতা ওসামা বিন লাদেন ছিলেন বুশ পরিবারের ঘনিষ্ঠ বন্ধু, তাদের তেলের ব্যবসার পার্টনার এবং নিউ ইয়র্কেই ছিল তাঁর হেডকোয়ার্টার।

আফগানিস্তানে কমিউনিস্ট শাসন উত্খাতের পর এই সন্ত্রাসী গ্রুপগুলো বুঝতে পারে আমেরিকা তাদের ধোঁকা দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তা ধাপ্পা। আমেরিকা গোটা মধ্যপ্রাচ্যে তার তেলস্বার্থ ও আধিপত্য রক্ষা করতে চায়। এখন তাদের প্রয়োজন ফুরিয়েছে। তাই ইসলামকে এখন তুলে ধরা হয়েছে সন্ত্রাসী ধর্ম হিসেবে। জিহাদকে বলা হচ্ছে সন্ত্রাস এবং সন্ত্রাসীদের বলা হচ্ছে জিহাদিস্ট। এভাবে সারা বিশ্বের অমুসলমানদের মনে ইসলাম-ফোবিয়া বা ইসলামভীতি ও বিদ্বেষ তৈরি করা হয়। এই বিদ্বেষ থেকেই তৈরি হয় পাল্টা মুসলিমবিরোধী সন্ত্রাস। ব্রিটেনসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশে, আমেরিকায় মুসলমানদের ওপর, তাদের মসজিদের ওপর হামলা শুরু হয়। নিউজিল্যান্ডের ক্রাইস্টচার্চের দুটি মসজিদে বর্বর হামলা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়।

সারা বিশ্বে ইসলামের সুনাম ক্ষুণ্ন করা এবং মুসলমানদের নিরাপত্তা খর্ব করার ব্যাপারে মধ্যপ্রাচ্যভিত্তিক বিভিন্ন নামে গঠিত এই তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর দায়িত্ব কম নয়। এরা ইসলাম ও জিহাদের নাম ভাঙিয়ে যে বর্বর হত্যাকাণ্ড শুরু করে, তার শিকার হয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম জনগোষ্ঠীই। এই জঙ্গিরা মার্কিন অস্ত্র ও অর্থ সাহায্যে গঠিত হয়েছে এবং আমেরিকার উদ্দেশ্য পূরণেরই সহায়ক হয়েছে। এটা এখন ওপেন সিক্রেট, এই জঙ্গিদের সামরিক ট্রেনিং দিয়েছে ইসরায়েলের সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ। ইরাক ও সিরিয়া সেক্যুলার দেশ। এতে ইসলামী জঙ্গিদের অস্তিত্ব ছিল না। তথাপি আমেরিকা ইরাক আক্রমণ করে। সিরিয়াতেও জঙ্গি হামলা ও সেনা বিদ্রোহ ঘটায়।

ফিলিস্তিনিদের মুক্তিসংগ্রাম দমন এবং তাদের পৃষ্ঠপোষক ইরানকে শায়েস্তা করার জন্য ইরাক ও সিরিয়ার অংশবিশেষ দখল করে সন্ত্রাসী আইসিসের আস্তানা বানানো হয় এবং তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্র, খিলাফত প্রতিষ্ঠা করা হয়। এদের উদ্দেশ্য ছিল সিরিয়ায় আসাদ সরকারের পতন ঘটানো এবং আমেরিকা ও ইসরায়েলকে ইরান আক্রমণের সুযোগ করে দেওয়া। একই সঙ্গে এই জঙ্গিদের কোনো কোনো গ্রুপ নিরীহ নর-নারীদের (বেশির ভাগই মুসলমান) ধরে নিয়ে তাদের মুণ্ডু কাটাসহ অন্যান্য নৃশংস অত্যাচার শুরু করে। অসংখ্য তরুণীকে জিহাদি বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে সিরিয়ায় তাদের তথাকথিত ইসলামী রাষ্ট্রে নিয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করে।

এই জঙ্গিদেরই আরেক অংশ ফিলিস্তিনে ইসরায়েলের চরম নির্যাতন, গুপ্তহত্যা, ফিলিস্তিনিদের ভূমি এবং গোটা জেরুজালেম দখলে নেতানিয়াহুকে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সহযোগিতা ইত্যাদি কারণে ইউরোপীয় ভূখণ্ডে, বিশেষ করে লন্ডন ও প্যারিসে অতর্কিত জঙ্গি হামলা চালিয়ে বহু নিরীহ নর-নারীকে হত্যা করে। এই বর্বরতা দ্বারা জঙ্গিরা ইসলামের সুনাম অথবা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলমানদের নিরাপত্তা বাড়ায়নি, বরং শ্বেতাঙ্গ খ্রিস্টান অথবা ইহুদি সন্ত্রাসীদের হাতে মুসলমান ও তাদের মসজিদের ওপর হামলা চালানোর অজুহাত তুলে দিয়েছে।

ট্রাম্প ও তাঁর ইউরোপীয় মিত্রদের আধিপত্যবাদী ইচ্ছাপূরণের জন্য এই জঙ্গিরাই ইসলাম-ফোবিয়া প্রচারের সুযোগ করে দিয়েছে। এ জন্য অনেক নিরপেক্ষ ইউরোপীয় পর্যবেক্ষক মনে করেন, তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর বেশির ভাগই নামে মুসলমান হলেও তারা আমেরিকার সিআইএ ও ইসরায়েলের মোসাদের ট্রেনিংপ্রাপ্ত এবং তাদের নির্দেশে চালিত। তারা প্রকৃত মুসলমান হলে আরেকটি মুসলমান দেশে সন্ত্রাস চালিয়ে নিরীহ মানুষ হত্যা করতে পারত না। হাজার হাজার তরুণীকে (বেশির ভাগই মুসলমান) বিয়ের লোভ দেখিয়ে অথবা জিহাদি হওয়ার টোপ দেখিয়ে এনে তাদের সম্ভ্রমহানি করে বন্দি জীবনযাপনে বাধ্য করত না। তাদের এই কাজ পশ্চিমা দেশগুলোর স্বার্থ ও উদ্দেশ্য পূরণ করে এবং ইহুদি ও খ্রিস্টান সন্ত্রাসীদের বর্বরতার কারণ হিসেবে দর্শানোর সুযোগ সৃষ্টি করে।

বাংলাদেশে একটি গ্রাম্য ছড়া আছে :

‘কতো কেরামতি জানোরে বান্দা

কতো কেরামতি জানো

মাঝনদীতে ফেলে জাল

ডাঙায় বসে টানো।’

এই কেরামতিই বিশ্বব্যাপী সন্ত্রাসের ব্যাপারে পশ্চিমা ধনতান্ত্রিক দেশগুলো দেখাচ্ছে। বিশ্বে দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ-পরবর্তী উপনিবেশ ও আধা-উপনিবেশগুলোতে স্বাধীনতার জোয়ার ঠেকানোর জন্য বর্ণবাদ ও সন্ত্রাস সৃষ্টি করেছে তারা। আবার এই সন্ত্রাস দমনের নামে আন্তর্জাতিক যুদ্ধও শুরু করেছে তারা। সিরিয়া ও ইরাক ছিল অর্থনৈতিকভাবে উন্নয়নশীল এবং রাজনৈতিকভাবে স্থিতিশীল দেশ। সাদ্দাম ও আসাদ ডিক্টেটর হতে পারেন; কিন্তু তাঁদের শাসনে দেশ দুটির মানুষ সুখে-শান্তিতে ছিল। তথাকথিত ইসলামী জঙ্গিরা এই দুটি দেশে ঘাঁটি গাড়তে পারেনি।

আমেরিকা ও ব্রিটেন মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করে (জাতিসংঘেরও অনুমোদন না নিয়ে) এবং দেশটিকে জঙ্গিদের হাতে তুলে দেওয়ার ব্যবস্থা করে। সিরিয়াকেও ধ্বংস করার জন্য দেশটিতে গৃহযুদ্ধ বাধানো হয়। রাশিয়া ও ইরানের হস্তক্ষেপে প্রেসিডেন্ট আসাদকে সাদ্দাম হোসেনের মতো হত্যা করা সম্ভব হয়নি; কিন্তু পশ্চিমা মদদে এখনো যে গৃহযুদ্ধ চলছে, তাতে দেশটি ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। এই ধ্বংসস্তূপ থেকে পালিয়েছে লাখ লাখ নর-নারী, শিশু শরণার্থী হয়ে ইউরোপের দেশে দেশে খাদ্য ও আশ্রয়ের আশায়। সমুদ্রে নৌকাডুবিতে মারা গেছে তাদের একটা অংশ।

তাদের ভাগ্য নিয়েও দাবা খেলেছে আমেরিকাসহ ইউরোপীয় কয়েকটি দেশ। ট্রাম্প সাহেব তো কয়েকটি দেশের (বেশির ভাগই মুসলিম দেশ) গায়ে সন্ত্রাসী ছাপ মেরে তাদের নাগরিকদের আমেরিকা গমন বন্ধ করে দেন। কোনো কোনো সরকার এই শরণার্থীরা যাতে তাদের দেশে ঢুকতে না পারে সে জন্য সীমান্তে সেনা পাহারা বসায়। জার্মানির মার্কেল শরণার্থীদের প্রতি উদার মনোভাব দেখানোর দরুন তাঁর জনপ্রিয়তা হারান।

গোটা ইউরোপে চরম ডানপন্থী শ্বেতাঙ্গরা শরণার্থীদের বিরুদ্ধে হেইট ক্যাম্পেইন শুরু করে। ফলে কোথাও কোথাও দাঙ্গা-হাঙ্গামা হয়। প্রচার করা হয় সিরিয়া ও ইরাক থেকে আগত শরণার্থীদের ভেতর থেকে জঙ্গি রিক্রুট করা হচ্ছে এবং তারা নানা অপরাধে লিপ্ত। সিরিয়া ও ইরাককে অন্যায় ও অবৈধ যুদ্ধে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে লাখ লাখ মানুষকে ইউরোপে শরণার্থী হয়ে মানবেতর জীবনযাপনে বাধ্য করেছে পশ্চিমা শক্তিই। আবার তাদের উগ্র ডানপন্থীরা এই অসহায় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে হেইট ক্যাম্পেইন চালিয়ে তাদের গায়ে সন্ত্রাসী ছাপ মেরে সাধারণ শ্বেতাঙ্গদের মনে ইসলাম-ফোবিয়া এবং মুসলমানবিদ্বেষ বাড়াচ্ছে। ফলে নিউজিল্যান্ডের মতো বিশ্বের এক প্রান্তবর্তী দেশেও মসজিদের ওপর হামলা হয়। ৪৯ জন নিরীহ মানুষকে মরতে হয়।

ইউরোপ-আমেরিকার এক শ্রেণির প্রভাবশালী রাজনীতিকই শুধু নন, তাঁদের এক শ্রেণির বিগ মিডিয়াও সুকৌশলে এই হেইট ক্যাম্পেইনের অংশীদার। গার্ডিয়ানের কলামিস্ট জনাথন ফ্রিডল্যান্ড যথার্থ সত্যের দিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করেছেন এবং বলেছেন, মুসলমানদের বিরুদ্ধে এই বিদ্বেষ প্রচারকারীদের (hate preachers) শক্তভাবে মোকাবেলা করা হলেই মাত্র নিউজিল্যান্ডের মতো বর্বরতা বন্ধ করা যাবে। অন্যথায় এর পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে।

ইতিহাসের কী পুনরাবৃত্তি! গত শতকে ইউরোপে ফ্যাসিবাদ ইহুদিবিদ্বেষ মূলধন করে আত্মপ্রকাশ করেছিল। এই শতকে ইসলাম ও মুসলমান বিদ্বেষকে মূলধন করে ইউরো-আমেরিকান ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিচ্ছে। একদিকে তারা মধ্যপ্রাচ্যে তেল ও আধিপত্যের স্বার্থে এবং ইসরায়েলকে প্রটেকশন দানের জন্য কৌশলে ইসলামী জঙ্গি সৃষ্টি করছে, অন্যদিকে তাদের দমন অর্থাৎ সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধের নামে একদিকে রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের আশ্রয় নিচ্ছে, অন্যদিকে নানা চেহারার উগ্র শ্বেতাঙ্গ সন্ত্রাস উসকে দিচ্ছে। এর পরিণাম, সাপ যেমন ওঝাকেই দংশন করে, তেমনি ইউরোপ-আমেরিকাকেও একদিন নিজেদের সৃষ্ট ফ্রাংকেনস্টাইনের মোকাবেলা করতে হবে।

আর/০৮:১৪/১৭ মার্চ

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে