Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ৯ এপ্রিল, ২০২০ , ২৬ চৈত্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.7/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৮-১৩-২০১৩

আমাদের প্রার্থনায় শহিদুল

মনীষ পাল



	আমাদের প্রার্থনায় শহিদুল

শহিদুলকে নিয়ে এভাবে লিখতে হবে ভাবি নি।  এরকম প্রানোচ্ছল একটি ছেলে দিনের পর দিন হাসপাতালে কাতরে পড়ে থাকবে, নিজের চোখে না দেখলে ঠিক বিশ্বাস করতে পারতাম না।  আজ এক মাসের ও বেশি হয়ে গেল, শহিদুল হ্যামিলটন এর সেন্ট জোসেফ হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে আছে।  সেদিন ছিল জুলাই এর প্রথম দিন।  ফোনের অপর প্রান্ত থেকে কামরুলের বিষন্ন স্বর, শহিদুলকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিটে ভর্তি করা হয়েছে। একেবারে থ মেরে রইলাম।  নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।  এই তো মাত্র দু মাসের ও কিছুদিন আগে মে’র আঠারো তারিখে ওকে শেষ দেখেছিলাম ড্যানফোর্থ এর বাংলাদেশ সেন্টারে, আমি ফোনে বলেছিলাম  এ বি ই ও র সম্মেলনে আসতে, কথা রেখেছিল।  নানান ব্যস্ততার মধ্যেও হ্যামিলটন থেকে টরন্টোয় এসেছিল যতটা না সম্মেলনের আগ্রহে, তার চেয়ে বেশি আগ্রহ আমাদের সবার সাথে দেখা হবে বলে ।  ওর  স্বভাবে খুব বেশি হৈ  চৈ নেই, কিন্তু মনের মধ্যে ছিল সবার সাথে মেশবার অন্যরকম এক আগ্রহ।  তাই দেখা যায় হ্যামিলটন থেকে যখনই আসে, কখনই একা আসে না।  মাকমাস্টার এর ক্যাম্পাস থেকে আরো কয়েকজনকে সাথে নিয়ে হাজির হয় টরন্টোয়।  তাই শহিদুল বলতেই একা কখনো আমি ভাবতে পারি না, আমার মনের মধ্যে সবসময় উকি দিয়ে যায় এক দঙ্গল তরুণ ছেলেপেলে, ওর কথা মনে হতেই মনে পড়ে যায় সুদীপ, তোফায়েল, সাদিক এমন আরো কিছু নাম। গত বছরের ডিসেম্বরে তীব্র শীতে আমরা টরন্টোয় বুয়েট এলামনাই এর নির্বাচন করছি, শহিদুল যথারীতি তার বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে হাজির। তখনও আমি জানতাম না, ওর এক বছরের শিশুসন্তানকে স্ত্রীর কাছে হ্যামিলটনে রেখে ও এই কনকনে শীতে আমাদের সাথে দেখা করবার জন্যই ভোটের অজুহাতে টরন্টোয় এসেছে।

নিজের সাথে নিজে একরকম যুদ্ধ করেছি - শহিদুলকে কিছুতেই অসুস্থ অবস্থায় দেখব না।  হাসপাতাল থেকে ছাড়া পেয়ে নিক আগে, তারপর যাব ওর বাড়িতে, দেখাও হবে, আড্ডাও দেয়া যাবে অনেকদিন পর।  কিন্তু ওর যা অসুখ,  তাতে সহজে ওর হাসপাতাল থেকে ছাড়া পাবার কথা নয়।  তাই একরকম নিজের সাথে যুদ্ধ করেই গতকাল ওকে দেখতে গেছি।  এর মধ্যে হঠাৎ একদিন জানতে পারলাম, টরন্টোয় আমাদের বন্ধু আহমেদ সম্পর্কে শহিদুলের মামা শ্বশুর।  আহমেদ আগেই ওকে দেখে এসেছে, বরাবরই ওর খোঁজ খবর রাখছে।  এবার যখন আমি ফোন করে জানালাম,  আহমেদ আবারো আমার সাথে যেতে আগ্রহী হলো।  আমাদের সাথে আরো ছিলেন বিদ্যুত্দা মানে আজকালের বিদ্যুত সরকার, ছিলেন শেখরদা মানে টরন্টোর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রিয় মুখ শেখর ই গোমেজ।  
আগেই যে ভয়টা করেছিলাম, পায়ে পায়ে শহিদুলের কেবিনে এগিয়ে যেতে সেটিই যেন ক্রমশ স্পষ্ট হতে লাগলো।  মাথার কাছে একগাদা স্যালাইনের নল ঝুলছে, কোনটাতে খাবার, কোনটাতে ওষুধ।  হাতে সুই ফোটানো।  আর খাটের  একটু উপরে সার্বক্ষনিক মনিটরিং এর জন্য লাগানো রয়েছে টিভির পর্দার মত একটা ডিসপ্লে।  
আমি এই রোগটার নাম,  গিলেন বেরি সিনড্রোম, সংক্ষেপে জি বি এস, শহিদুল আক্রান্ত হবার পর, এই প্রথম শুনলাম। শহিদুলের স্ত্রী নিজেই ডাক্তার।  শহিদুলের রোগটার ব্যাপারে আমাদেরকে  বললেন, ডাক্তাররা যাবতীয় জটিল পরীক্ষা নিরীক্ষার পর শেষে নার্ভ কনডাকসন স্টাডি করে এই রোগটি সনাক্ত করলেন। এটি একেবারেই বিরল একটি ভাইরাস এর সংক্রমণ।  প্রতি লাখে একজন কি দুজন আক্রান্ত হয়।  
আমি বিছানায় শোয়া, চোখ খানিকটা খোলা শহিদুলের মাথার কাছে দাড়িঁয়ে আছি কিন্তু ভাবছি আরেক শহিদুলের কথা।  শহিদুল বুয়েট থেকে বেরিয়ে আমেরিকায় গেছে, সেখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ে মাস্টার্স করেছে, পি এইচ ডি করেছে, তারপর কানাডায় এসে ভ্যাঙ্কুভার হয়ে ম্যাকমাস্টারে গবেষণার কাজ করছিল এই সেদিন পর্যন্ত।  ভাবছি কিভাবে আমরা সবাই মিলে শহিদুলকে আবার ফিরিয়ে দিতে পারি ওর পড়াশোনার, গবেষনার, কাজের সেই স্বাভাবিক জীবন।  সুস্থ তো হয়ে উঠবেই শহিদুল, জেনেছি বড় দীর্ঘ সেই প্রক্রিয়া কিন্তু আমরা যারা আছি, আমাদের তো হাত পা গুটিয়ে বসে থাকলে চলবে না।  পায়ে পায়ে আমাদেরকে এগিয়ে যেতে হবে শহিদুলের কাছে, ওর মধ্যে আবার জাগিয়ে তুলতে হবে আশা।  আমাদের কারো একার পক্ষে সেটা সম্ভব হতেও পারে, না ও হতে পারে।  তবে আমরা যদি সবাই মিলে উদ্যোগ নিই, কাজটি অনেক সহজ হয়ে যায়।  আমরা যে শহিদুলের জন্য ফান্ড সংগ্রহের একটা উদ্যোগ  নিয়েছি, মূল উপলক্ষ হচ্ছে এটিই যে, আমরা এই বার্তাটিই শহিদুলের কাছে এবং সেই সাথে নিজেদের কাছে ও, পৌঁছে দিতে চাই , আমরা আছি একে অপরের সুখে দুখে।  আজকে শহিদুলের জন্য আমরা করছি, কাল শহিদুল আমাদের জন্য করবে আরেকভাবে। 
আসলে শহিদুল অসুস্থ হবার আগ পর্যন্ত কিছু কাজ করেওছে।  দেশের সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য এডুকেশন  ফর আন্ডার প্রিভিলেজড টেলেন্টস প্রকল্পের নামে  ওরা কয়েকজন মিলে  কিছু কাজ নিয়ে  ইতিমধ্যে অনেকদূর এগিয়েছে। তা ছাড়া হ্যামিলটন থেকে আরো কিছু গবেষকের সাথে মিলে ওপেন এক্সেস ইন্টারন্যাশনাল জার্নাল ইন কেমিকাল সাইন্স এন্ড টেকনোলজি বের করছে।  তাই শহিদুলকে কখনো বসে থাকতে দেখিনি আমরা।  পড়াশোনা, গবেষনার পাশাপাশি নিজেকে যুক্ত করেছিল কখনো চ্যারিটেবল প্রকল্পে বা কখনো সৃষ্টিশীল কোনো কাজে।  
আমাদের মিলিত প্রার্থনাই হবে শহিদুলের সেরে উঠবার জন্য এমুহুর্তে সবচেয়ে বড় উপশম। শহিদুল আবার ফিরে আসবে সুস্থ স্বাভাবিক জীবনের ধারায়, ম্যাকমাস্টার এর ক্যাম্পাস থেকে এক ঝাঁক বন্ধুকে নিয়ে আবার ছুটে আসবে টরন্টোয় আমাদের মিটিঙে, আড্ডায়।  শহিদুল শুধু আমাদের ভাবনাতেই নয়, আমাদের সক্রিয় সহযোগিতায় শহিদুলকে আক্ষরিক অর্থেই ফিরিয়ে নিয়ে আসব আমাদের মাঝে, শহিদুলের ছোট্ট শিশুটির কাছে এই হোক আমাদের নিরব প্রত্যয়।

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে