Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ১৩ ডিসেম্বর, ২০১৯ , ২৮ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (53 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)


আপডেট : ০৮-১৩-২০১৩

ফতেপুরে ইয়াবার ছোবল


	ফতেপুরে ইয়াবার ছোবল

লক্ষ্মীপুর, ১৩ আগষ্ট-: মরণ নেশা ইয়াবা। প্রথমে প্রবেশ করে উচ্চবিত্ত পরিবারে। মধ্যবিত্ত পরিবারের কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও এখন আসক্ত হচ্ছেন এই ভয়াবহ নেশায়। বছর তিনেক আগে চাঁনখারপুল থেকে ইয়াবা প্রবেশ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট এবং ঢাকা মেডিকেল কলেজে। এখন বিস্তার ঘটছে গ্রামে-গঞ্জেও। লক্ষ্মীপুরের ফতেপুর গ্রামে ইয়াবার ছোবল নিয়ে অনুসন্ধানী রিপোর্ট করেছেন স্টাফ করেসপন্ডেন্ট মাজেদুল নয়ন।   
 
ইয়াবার ছোবলে ফতেপুর
লক্ষ্মীপুরের রামগঞ্জ উপজেলা থেকে ৫ কিলোমিটার ভেতরে ফতেপুর গ্রাম। এ গ্রামে মাধ্যমিক বিদ্যালয় নেই একটিও। রামগঞ্জ-লক্ষ্মীপুর সড়ক ঘেষে একটি মাত্র প্রাথমিক বিদ্যালয়। কিন্তু, অবস্থা খুবই করুন। পাশাপাশি আলিয়া মাদ্রাসা, স্থানীয় বড় হুজুরের কওমী মাদ্রাসা ও এতিমখানা। মাদ্রাসায় ভোলা, চাঁদপুর থেকেও শিক্ষার্থীরা পড়তে আসে। তবে এখন আর বড় বড় হাড়িতে রান্না করতে দেখা যায় না দুপুরের খাবার। শিক্ষার্থীও কমতে শুরু করেছে। প্রাথমিক শেষ করে মাধ্যমিকের শিক্ষার্থীদের যেতে হয় দশ কিলোমিটার দূরে চন্ডিপুরে। উপজেলা শহরে সরকারি স্কুল ছাড়াও রয়েছে দু’টি কলেজ।  
 
শিক্ষায় না এগোলেও এ এলাকার মানুষ আর্থিকভাবে স্বচ্ছল ও অবস্থাসম্পন্ন। গ্রামের বেশির ভাগ পুরুষ থাকেন মধ্যপ্রাচ্যে। পুরো গ্রাম ঘুরে এমন কোন বাড়ি পাওয়া যাবে না, যে বাড়ির একজন সদস্যও নেই মধ্যেপ্রাচ্যে। ঢাকার বঙ্গবাজার, গুলিস্তান হকার্সমার্কেট বা নীলক্ষেতেও ব্যবসা করছেন অনেকেই।  
 
বিএনপি’র ঘাঁটি বলে পরিচিত লক্ষ্মীপুর অঞ্চলকে প্রথম দর্শনেই উন্নত বলা যাবে। কারণ সেখানে মাটির কোন রাস্তা নেই। শিল্প-কারখানা বা বড় ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এখনো গ্রাস করেনি সবুজ ফতেপুর বা চন্ডিপুরকে।
 
সবুজে মোড়া এ গ্রামের তরুণদের দিকে এখন তাকানো যায় না। গেল বছর গ্রামটিতে গিয়ে শোনা যায় তাদের দূর্ভাগ্যের কথা। এবার ঈদে গিয়ে দেখা গেল তাদের অবস্থা আরও করুণ। মেথঅ্যাম্ফিটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি ইয়াবা ট্যাবলেট কেড়ে নিচ্ছে সেখানকার তারুণ্যকে। মাধ্যমিক ও কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী, রিক্সাওয়ালা, তরকারিওয়ালা, মাছ ধরা জেলে, বাজারের আড্ডাবাজ ও বখে যাওয়া তরুণ আর শিশুরাই আসক্ত হয়ে পড়ছে এই মরণ নেশায়। নেশার টাকা জোগাড় করতে এখন আর সুপারি বা নারকেল চুরি হয় না ওই এলাকায়। ছিনতাই আর চুরি করে অর্থ জোগাচ্ছে তারা।
 
সন্ধ্যার পর গ্রামের অন্ধকার রাস্তায় জমে ১৪ বছর বয়সী শিশু থেকে ৪০ বছরের তরুণদের ভিড়। গ্রামের কিছু বাড়িতে প্রকাশ্যেই বিক্রি হচ্ছে ইয়াবা। স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ম্যানেজ করেই চলছে এ অবৈধ ব্যবসা।
 
স্থানীয়রা জানান, সেখানকার তরুণদের মানিব্যাগেই এখন থাকে ইয়াবা ট্যাবলেট, পোড়ানোর জন্যে ফয়েল পেপার ও লাইটার।
 
বিক্রেতা ও ব্যবহারকারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মূলত রায়পুর উপজেলা থেকে ইয়াবা ট্যাবলেটের চালান যায় লক্ষ্মীপুর জেলা শহর, রামগঞ্জ, রামগতি ও কমলনগর উপজেলায়।
 
চাঁনখারপুল থেকে ফতেপুর
বছর তিনেক আগে চাঁনখারপুল ও বকশিবাজার থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট ও ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রবেশ করে ইয়াবা। ব্যবহারকারীরা জানায, চাঁনখারপুলের একটি চারতলা বাড়িতে তখন বিক্রি হতো এ ট্যাবলেট।
 
ব্যবহারকারীরা ঠোঁট ও জিহ্বা দিয়ে ঘনঘন কামড়ায়। অনেকে আবার এটি ধুমপানের সঙ্গে গ্রহণ করে। চাঁনখারপুল এলাকায় সন্ধ্যার পর গেলেই দেখা যাবে অনেক ঝিম মারা যুবক।

ইয়াবা ব্যবহারে লাগে ফয়েল পেপার। তাই ইয়াবাসেবীদের সুবিধার্থে চাঁনখারপুলের স্টেশনারী দোকানগুলোয় এখন বিক্রি হয় ফয়েল পেপার এবং ফয়েলে মোড়ানো চকলেট।

আর শিক্ষাঙ্গনের এ অঞ্চলের আবাসিক হলগুলোতেও এখন সহজলভ্য হয়ে উঠেছে ইয়াবা।  
 
লঞ্চ ট্রেনেও ইয়াবা
গত অক্টোবর বরিশাল যেতে লঞ্চেও বিক্রি হতে দেখা যায় ইয়াবা। লঞ্চের ছোট স্টেশনারী দোকানে বিক্রি হয় ফয়েল পেপারের চকলেট এবং লাইটার। ইয়াবা বিক্রি করেন লঞ্চের কর্মচারীরা। তরুণদের দেখলেই কৌশলে জিজ্ঞাসা করে প্রয়োজন আছে কিনা।
 
লঞ্চের একজন বেয়ারা জানায়, অনেক ইয়াবা সেবী লঞ্চে কেবিন ভাড়া করে সেখানে নেশা করে। সদরঘাটে ইয়াবা বিক্রির রয়েছে বড় নেটওয়ার্ক।
 
গত জুলাই মাসে ট্রেনে রাজশাহী যাওয়ার পথেও দেখা মেলে ইয়াবার। কর্মচারীদের যোগসাজসে তরুণরা ট্রেনের কেবিনে বসায় ইয়াবার আসর।  
 
কক্সবাজারে ইয়াবা
গত জানুয়ারিতে কক্সবাজারে গিয়ে দেখা যায় ইয়াবার ছোবল। রিকশাওয়ালা থেকে হোটেল বয়রাও ইয়াবা বিক্রেতা ও ব্যাবহারকারী। তরুণদের কাছে ইয়াবা সরবরাহ করে তারা।
 
কক্সবাজার এলাকার দোকান থেকে ভাংতি টাকা নিলেই কোনা পোড়া নোট পাওয়া যাবে।  
 
ইয়াবাসেবীর কথা
ইয়াবা সেবন করে আসক্ত হয়ে পড়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী। পরিবার বুঝতে পেরে তাকে মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্রে পাঠায়। বর্তমানে সুস্থ এই শিক্ষার্থী জানায়, অন্য সব নেশা ছাড়ার চাইতে এটি ছাড়া বেশ কঠিন।

কারণ এতে হেরোইনের গুঁড়া মেশানো থাকে। আর একবার খেলে তা বেশ বাজেভাবে কাজ করে। নেশা কেটে গেলে আবারও সেবন করতে ইচ্ছে করে।
 
ওই শিক্ষার্থী আরও জানায়, “প্রথমে বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে খাওয়া শুরু করি। পরে ধীরে ধীরে নিজে কিনে খেতে শুরু করি। প্রথমে একটি দু’টি পরে দিনে চার থেকে পাঁচটি সেবন করতাম। ইয়াবা কিনতে দিনে ব্যয় হতো গড়ে দেড় থেকে দুই হাজার টাকা। নেশায় আসক্ত হয়ে নিজের জীবনকে বিপণ্ন করে দিয়েছি। শিক্ষাজীবনে দীর্ঘ বিরতি হয়ে গেছে বলে অনুশোচনা প্রকাশ করেন তিনি।”
 
ইয়াবাসেবীর লক্ষণ ও আক্রান্ত রোগ
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মুনতাসীর মারুফ জানান, ইয়াবার রয়েছে প্রচণ্ড উত্তেজক ক্ষমতা। এটি ক্ষুধা ও ঘুম কমিয়ে দেয়। সেবনের পর থেকে বাড়তে থাকে ক্ষতিকর নানা উপসর্গও।

তিনি জানান, সেবনকারীদের শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়তে থাকে। মেজাজ খিটখিটে, গলা-মুখ শুকিয়ে ও প্রচণ্ড ঘাম আর গরমের অসহ্য অনুভূতি হয়। নাড়ির গতি, রক্তচাপ, দেহের তাপমাত্রা আর শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যায়।

দীর্ঘদিনের সেবনকারীরা উচ্চরক্তচাপে ভুগতে থাকে। মস্তিষ্কের ছোট রক্তনালিগুলো ক্ষয় হতে থাকে। এগুলো ছিঁড়ে অনেকের রক্তক্ষরণ শুরু হয়। স্মৃতিশক্তি কমে মানসিক নানা রোগের উপসর্গ দেখা দেয়। মেজাজ খিটখিটে, অহেতুক রাগারাগি ও ভাঙচুরের প্রবণতা বাড়ে। সব ক্ষেত্রে ব্যর্থতা বা পিছিয়ে পড়তে থাকায় আসক্ত ব্যক্তিরা বিষণ্নতায় ভোগে। কারও কারও মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতাও দেখা দেয়। দৃষ্টি ও শ্রুতিবিভ্রম আর অস্বাভাবিক সন্দেহ উপসর্গ থেকে সিজোফ্রেনিয়ার মতো জটিল মানসিক ব্যাধিও দেখা দেয়। ইয়াবা বেশি পরিমাণে গ্রহণ করলে শারীরবৃত্তীয় স্বাভাবিক কার্যক্রমের ব্যত্যয় ঘটে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে।

লক্ষীপুর

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে