Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০৩-০৮-২০১৯

বেইজিংয়ের পথে প্রান্তরে

মিনহাজুল ইসলাম জায়েদ


বেইজিংয়ের পথে প্রান্তরে

আর্থিক ব্যবস্থাপনা বিষয়ক প্রশিক্ষণে অংশ নিতে সম্প্রতি দ্বিতীয়বারের মতো যাওয়া হয় কনফুসিয়াসের দেশ চীনে। ঈদের ছুটি থাকায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে অংশগ্রহণকারীদের তথ্যাদি ঢাকাস্থ চীনা দূতাবাসে পাঠাতে না পারায় একই ফ্লাইটে পুরো দলের যাত্রার ব্যবস্থা হয়নি। ২০ জনের দলকে যেতে হলো তিন কিস্তিতে।

দ্বিতীয় দলের প্রতিনিধি হিসেবে বেইজিং পৌঁছাই এক দুপুরে। তৃতীয় দলের বেইজিং পৌঁছার সময় ছিল এক ঘণ্টা পর। তাই গুয়ানজুতে ৫ ঘণ্টার যাত্রাবিরতিসহ ১২ ঘণ্টার দীর্ঘ ভ্রমণে বেইজিং পৌঁছেও অপেক্ষা করতে হলো। এক ঘণ্টা পরের সেই বিমান বেইজিংয়ের মাটি স্পর্শ করল দুই ঘণ্টা পর। সহ-প্রশিক্ষণার্থীর লাগেজের খোঁজ পাওয়াসহ মোট সাড়ে তিন ঘণ্টা পর বিমানবন্দরের সীমানা ছাড়লাম। অভ্যর্থনাকারী আমাকে জানাল, যানজট থাকলে অনিশ্চিত নতুবা ঘণ্টাখানেকের মধ্যে পৌঁছা যাবে নির্ধারিত গন্তব্যে। অবশেষে কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই মিনিট ৫০-এর মধ্যে আমাদের গাড়ি থামে  'Free Comfort Holiday Hotel'-এ। হেইডিয়ান জেলার দক্ষিণ সুইউয়ান সড়কের হোটেলটির অবস্থান চমৎকার। বেইজিং শহরের দক্ষিণ প্রান্তে অবস্থিত। হোটেলের পাশ ঘেঁষেই রয়েছে মেট্রোরেললাইন। রুম থেকে শোনা যাচ্ছিল মেট্রোরেলের অনবরত আসা-যাওয়ার শব্দ। আট তলাবিশিষ্ট হোটেলের প্রতিটিতেই রয়েছে ৮০টি অতিথি কক্ষ। 

পরদিন সকালে শুরু হলো আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পর্ব। চীনের সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্স অ্যান্ড ইকোনমিক-এর উদ্যোগে আয়োজিত প্রশিক্ষণ কোর্সের উদ্বোধন করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুল অব ট্রেনিংয়ের সহকারী ডিন মেং সিপিং। তবে বক্তব্য রাখলেন তার মাতৃভাষা মেন্দারিনে। দোভাষীর ভূমিকা পালন করেন লি পিং পিং।

বিকেলে দেখা হয় বেইজিং চিড়িয়াখানা। হোটেল থেকে মিনিট ত্রিশের যাত্রায় পৌঁছে যাই কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে। চিড়িয়াখানার প্রবেশমুখেই পাওয়া গেল দর্শনার্থীদের দীর্ঘ সারি। ১৯ ইউয়ানের বিনিময়ে প্রাপ্তবয়স্ক যে কেউ ঘুরে দেখতে পারেন পুরো চিড়িয়াখানা। আমাদের হয়ে আয়োজকরাই মিটিয়ে দেন প্রবেশ ফি। ভালুক, বানরসহ নানা ধরনের প্রাণী থাকলেও দর্শনার্থীদের মূল আকর্ষণ বিলুপ্তপ্রায় প্রাণী পান্ডা নিয়েই। গাইড সুফিয়া জানান, মোট পাঁচটি পান্ডা আছে এখানে। তিনটির দেখা মিলল বাইরে। অন্য দুটি নিজেদের ঘরে অবস্থান করছে। তবে দেখা পাওয়া তিনটি আবার গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। নানা কসরত করেও দর্শনার্থীরা ভাঙাতে পারেননি তাদের সুখনিদ্রা। তাই ঘুমন্ত পান্ডাকে ক্যামেরাবন্দি করে ফিরতে হলো সবাইকে। 

পরের গন্তব্য ছিল বেইজিং সামার প্যালেস। ১১৫৩ খ্রিষ্টাব্দে নির্মিত এই রাজদরবারটি গ্রীস্ককালে রাজাদের অবকাশ যাপনের জন্য ব্যবহূত হতো। ১৯২৪ সালে এটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১৯৯৮ সালে তা ইউনেস্কোর বিশ্বঐতিহ্যের স্বীকৃতি পায়। জনপ্রতি প্রবেশ ফি ৩০ ইউয়ান। এখানেও আমাদের হয়ে তা মিটিয়ে দেন গাইড সুফিয়া। রাজপ্রাসাদের প্রধান দুটি উপাদান হচ্ছে লনজিভিটি পর্বত ও কানিং হ্রদ। পর্বতের ঠিক পাদদেশে রয়েছে ৭২৮ মিটার লম্বা একটি করিডোর, যা যুক্ত করেছে প্রাসাদের অন্যান্য ভবনকে। সুফিয়া জানান, এটি পৃথিবীর দীর্ঘতম করিডোর। পশ্চিম প্রান্তে রয়েছে ৩৬ মিটার দীর্ঘ একটি মারবেল পাথর। করিডোরের কাঠ নির্মিত ছাদ আর কাঠের খুঁটি খচিত নানা রঙের আলপনায় পাওয়া যায় অতীত দিনের চিত্রশিল্পের নমুনা। করিডোরের দক্ষিণেই অবস্থান ২৯০ হেক্টরের কানিং লেকের। লেকের উত্তর-পূর্ব প্রান্তে পানিতে ভাসছে অসংখ্য পদ্ম গাছ। ফুটে রয়েছে বেশ কিছু লাল পদ্ম। পৃথিবীর নানা প্রান্তের, নানা বর্ণের, নানান বয়সের অগণিত মানুষের কোলাহলে মুখরিত হ্রদ অঞ্চল। আছে নৌকা ভ্রমণের ব্যবস্থা। জনপ্রতি ৩০ ইউয়ান দিয়ে উপভোগ করা যায় নৌকা ভ্রমণ। ব্যক্তিগত খরচে দলের অনেকে পানিতে ভাসতে চাইলেও গাইডের অনুমোদন না পাওয়ায় সে শখ পূর্ণ হলো না। দীর্ঘ এই করিডোরে কথা হয় ব্রিটিশ তরুণ জেমসের সাথে। বাবা-মা ও বোনকে নিয়ে চীন ভ্রমণে এসে দেখতে এসেছেন এই বিশ্বঐতিহ্য। বিশাল এই হ্রদ দেখে আসাটাই সার্থক হয়েছে বলে জানালো জেমস।

পরদিন সকালে যাওয়া হয় বিশ্বখ্যাত মহাপ্রাচীরে। ২০ জনের দলের ৪ জনের আগেই মধ্যযুগের এই সপ্তাশ্চর্য দেখা হয়েছে। বাকি ১৬ জন প্রথমবারের মতো পা রাখতে যাচ্ছেন গ্রেটওয়ালে। তাদের উচ্ছ্বাস যেন থামছে না। গাইড সুফিয়া সকাল ৮টায় আমাদের নিয়ে ছুটলেন মহাপ্রাচীরের দিকে। দুই ধারে নানা জাতের বৃক্ষরাজি, মাঝখানে মসৃণ পিচঢালা পথ দিয়ে ছুটে চলল আমাদের গাড়ি। বেইজিং শহরের সীমান্ত ছাড়তেই দেখা গেল রাস্তার দুই পাশে উঁচু-নিচু অনেক পাহাড়। সবুজে আচ্ছাদিত পাহাড়ের গায়ে যেন হেলান দিয়ে মেঘ ঘুমায়। বেশ কয়েকটি টানেল পাড়ি দিয়ে মিনিট ৫০ পর গাড়ি থামল গ্রেটওয়ালের নিচে।

বেইজিং শহর থেকে ৬০ কিলোমিটার দূরের মহাপ্রাচীরের এই অংশটির নাম বেডালিং গ্রেটওয়াল। বেইজিংয়ের ইয়ানজিং জেলায় অবস্থিত মহাপ্রাচীর এ অংশটি নির্মিত হয় ১৫০৫ সালে। ১৯৫৩ সালে বেডালিং মহাপ্রাচীরের ৩,৭৪১ মিটার পর্যটকদের জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। ১৯৮৭ সালে ইউনেস্কো মহাপ্রাচীরের এ অংশকে সাংস্কৃতিক বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করে। ২০০৭ সালে এটি নতুন বিশ্বের সপ্তাশ্চর্যের নাম্বার ওয়ান হিসেবে স্বীকৃতি পায়।

সকাল বেলার গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টি সত্ত্বেও আমরা পৌঁছার আগেই শতাধিক পর্যটক বাস অবস্থান নেয় গ্রেটওয়ালের পাদদেশে। স্বদেশি ও বিদেশি পর্যটকের পদভারে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ইউরোপিয়ান থেকে আফ্রিকান, আমেরিকান থেকে অ্যারাবিয়ান, এশীয় থেকে ওশেনিয়ান- বিশ্বের সব প্রান্তের সব মানুষের মিলন মেলা যেন বসেেেছ গ্রেটওয়ালের পাদদেশে। আগের বার গোয়ান জোহং অংশ দিয়ে মহাপ্রাচীরে উঠেছিলাম, যেখানে কোনো কেবল কার ছিল না। বেডালিং প্রান্তে আছে কেবল কারের ব্যবস্থা। জনপ্রতি ৪৫ ইউয়ান দিয়ে ঢোকা যায় গ্রেটওয়ালের এই প্রান্তে। আর কেবল কারে যাওয়া-আসা করলে গুনতে হয় আরও ১৪০ ইউয়ান। চীনের রাজস্ব আয়ের বড় একটা অংশ যে গ্রেটওয়াল থেকে আসে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আয়োজকদের বদৌলতে কেবল কারে চড়ে বসলাম দলের সবাই। 

অর্ধেক পথ যেয়ে থেমে যায় কেবল কারের পথচলা। আরও ওপরে উঠতে হলে চরণ যুগলই ভরসা। কেবল কার থেকে নেমে প্রয়োজনীয় পরামর্শসহ দেড় ঘণ্টা সময় বেঁধে দিয়ে সবাইকে নিজের মতো ঘোরার সুযোগ করে দেন গাইড সুফিয়া। ইতিপূর্বে একবার টূড়ায় ওঠা হয়েছে, তদুপরি আগের দিন পায়ে হালকা চোট পাওয়ায় আমার পক্ষে তেমন ওপরে ওঠা হলো না। নাহিদ ম্যাডাম ও নজরুল স্যারও আমার মতো আশপাশ ঘুরেই ক্ষান্ত হলেন। কিন্তু অন্যরা যে কোথায় হারিয়ে গেল! নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কারো খোঁজ নেই। তাদের খুঁজে বের করতে গিয়ে স্বেচ্ছাসেবী গাইড এডারসনের অবস্থা কাহিল। অবশেষে সবার দেখা মিলল দুই ঘণ্টা পর। জীবনের প্রথমবার গ্রেটওয়াল দেখছে, তাই সময়সীমা না মানলেও এ ক্ষেত্রে দলনেতা শিবলী স্যার কারও প্রতি আড়ষ্ট হলেন না। ওপরে দু'ঘণ্টা ছোটাছুটি আর মোবাইল ক্যামেরার ক্লিক ক্লিক করেও যেন অনেকের মন ভরছে না। আরও কিছুক্ষণ দেখতে চাই। তাই কেবল কার থেকে নেমেও গ্রেটওয়ালকে পেছনে রেখে নিজেদের ক্যামেরাবন্দি করতে ব্যস্ত হয়ে ওঠেন। ওয়ালের পাদদেশে নানা ধরনের পণ্যের পসরা সাজিয়েছে অনেক দোকানি। কোনো পর্যটক দল দেখামাত্র হাঁক-ডাকে তাদের দৃষ্টি আকর্ষণের নিরন্তর চেষ্টা। আগে থেকেই গাইড এখান থেকে কিছু কিনতে বারণ করায় দলের কারও কিছুই কেনা হলো না।

মহাপ্রাচীর দর্শনের পরদিন এক সপ্তাহের জন্য বেইজিং ছাড়তে হয়। এবারের গন্তব্য প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার দূরের হুনান প্রদেশের রাজধানী চাংসা। পুরো সপ্তাহ প্রায় তিন হাজার বছরের পুরনো এই শহরের নানা ঐতিহ্যগত ও দর্শনীয় স্থান ঘুরে আবারও ফিরে এলাম বেইজিংয়ে। পরদিনই নিয়ে যাওয়া হলো তিয়েনআনমেন স্কয়ার ও নিষিদ্ধ নগরীতে। রাস্টত্মায় যানজট হতে পারে এই আশংকায় সকাল সাড়ে আটটায় আমাদের নিয়ে যাত্রা করল সুফিয়া। দুই/তিনবার স্বল্প সময়ের জন্য সিগন্যালে অপেক্ষা করা ছাড়া বাধাহীনভাবে গন্তব্যে গাড়ি পৌঁছাই ৩০ মিনিটের মধ্যে। 

বাস থেমে নেমেই চক্ষুু চড়ক গাছ। সকাল ৯টা, অথচ এরই মাঝে কয়েকশ' গাড়ির সমাহার! বাংলাদেশে প্রধান দুটি রাজনৈতিক দলের সমাবেশ শেষে ঢাকার রাজপথে যেমন জনস্রোত বয়ে যায়, তিয়েনআনমেন স্কয়ার কিংবা নিষিদ্ধ নগরীমুখী পর্যটকদের স্রোতও ছিল তেমনি। বিশ্বের প্রায় সব প্রান্তের মানুষের সমাগম এখানে। এ যেন বিশ্ববাসীর মিলন মেলা। অথচ অত্যন্ত সুশৃঙ্খলিত, নেই কোনো হুড়াহুড়ি, হল্লা-চিৎকার। পান্ডার ঝান্ডা নিয়ে চলছে গাইড সুফিয়া ও তার সহকারী ক্যানিস। আর পিছু পিছু চলছি আমরা ২০ বঙ্গসন্তান।

প্রথমেই দেখা হয় তিয়েনআনমেন স্কয়ার। মুক্তমঞ্চ হিসেবে এটি পরিচিত। ১০৯ একর জায়গাজুড়ে নির্মিত এ স্কয়ারে এক সাথে ৫০ হাজার মানুষ সমবেত হতে পারেন। ১৯৪৯ সালের ১ অক্টোবর আধুনিক চীনের স্থপতি মাও সে তুং এই তিয়েনআনমেন স্কয়ারেই ঘোষণা করেন সমাজতান্তিক চীনের। তাই ১ অক্টোবরেই পালিত হয় চীনের স্বাধীনতা দিবস। ১৯৪৯ সালের ঘটনা তিয়েনআনমেন স্কয়ারকে যেমন বিশ্ববাসীর কাছে নতুন চীনের বার্তা দিয়েছে; এর ঠিক ৪০ বছর পর এখানকারই একটি ঘটনা বিশ্ববাসীর নিন্দা কুড়িয়েছে। ১৯৮৯ সালে গণতন্ত্রের দাবিতে তিয়েনআনমেন স্কয়ারে সমবেত হয়ে আন্দোলন শুরু করলে হাজারো আন্দোলনকারীকে হত্যা করে পরিস্থিতি সামাল দেয় তৎকালীন সরকার। নির্মম এ ঘটনায় নিহতদের স্মৃতি রক্ষার্থে হংকংয়ে নির্মাণ করা হয়েছে পিলার অব শেম। অবশ্য বেইজিং কিংবা তিয়েনআনমেন স্কয়ারে এ নিয়ে কোনো স্মৃতিফলক নেই। এমনকি বর্তমান প্রজন্ম এ ঘটনাটি জানুক- তা-ও চায় না চীন সরকার। টেলিভিশন ও ইন্টারনেট থেকে এ আন্দোলনের বইপত্র মুছে ফেলার চেষ্টা করছে সরকার। ২০১৪ সালে এএফপি প্রকাশিত এক রিপোর্টে তাই জানানো হয়।

তিয়েনআনমেন স্কয়ারের দক্ষিণের ভবনে রয়েছে মাও সে তুংয়ের মরদেহ। নেতার মরদেহ দেখতে চীনাদের আগ্রহ অত্যধিক। অনেক দীর্ঘ লাইন লেগে আছে সেখানে। গাইড জানান, ১০ বছর আগে প্রায় তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়িয়ে একবার প্রাণহীন মাও সে তুংকে দেখতে পেরেছিলেন। শুধু মুখমণ্ডল উন্মুক্ত; পুরো দেহ দলীয় পতাকায় আবৃত।

তিয়েনআনমেন স্কয়ারের উত্তরদিকে একটু সামনে হাতের ডানে পাওয়া গেল বিশাল ফুলের বাগান। অগণিত প্রস্টম্ফুটিত ফুলের সৌরভে সুরভিত পুরো বাগান। বাগানটি এমনভাবে সৃজিত যে, ফুল দিয়ে তৈরি হয়েছে নানা আকৃতি, যা এক কথায় অসাধারণ। হাজারো ফুলের সৌরভে বিমোহিত পর্যটকদের ছবি তুলতে ব্যস্ত দেখা গেল। এখানেই কথা হয় হুইল চেয়ারে আসা মার্কিন নাগরিক এলিজাবেথের সাথে। ভাইপো মার্ক স্মিথের সাথে এসেছেন চীন ভ্রমণে। ফুলের জলসা দিয়ে শেষ হয়েছে তিয়েনআনমেন স্কয়ার। তার উত্তরে রয়েছে একটি রাস্তা, আর রাস্তার উল্টো পাশেই বিশাল দেয়াল ঘেরা প্রাসাদের অস্তিত্ব দেখা যায়। আন্ডারপাস দিয়ে আমরা অতিক্রম করলাম রাস্তাটি। প্রাসাদের দেয়ালের মাঝ বরাবর রয়েছে সুসজ্জিত এক গেট। গাইড জানান, এর নাম নর্দান গেট বা গেট অব ডিভাইন সাইট। গেটের পাশে রয়েছে পরিণত বয়সের মাও সে তুংয়ের বিশাল ছবি। গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই পাওয়া গেল কাঙ্ক্ষিত নিষিদ্ধ নগরী।

১৪০৬ সালে মিং সল্ফ্রাট ঝুডি এর নির্মাণ কাজ শুরু করেন এবং ১৪২০ সালে তা সমাপ্ত হয়। এখানে বসে মোট ২৪ জন সম্রাট তাদের শাসন কাজ পরিচালনা করেন। এটি মিং ও চীন শাসনামলের রাজপ্রসাদ। সাধারণের প্রবেশ নিষেধ ছিল বলে এর নাম রাখা হয় নিষিদ্ধ নগরী। চীনা ভাষায় এর নাম গুগং বা প্রাচীন নগরী। এটি বর্তমানে বিশ্বের সবচেয়ে প্রাচীন রাজপ্রাসাদ। ইউনেস্কো ১৯৮৭ সালে একে বিশ্বঐতিহ্য হিসেবে ঘোষণা করেছে। বর্তমানে এটি আর রাজপ্রাসাদ নয়; পুরোপুরি পর্যটন কেন্দ্র, যা মূলত চীনের ইতিহাস-ঐতিহ্য আর সংস্কৃতির পরিচায়ক। নর্দান গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই চোখে পড়ল বিশাল এক ক্যাম্পাস। 

এখানে টানানো বোর্ড পড়ে জানা যায়, এটি নিষিদ্ধ নগরীর মূল প্রাসাদ। বিভিন্ন অনুষ্ঠান, উৎসব আয়োজনে এটি ব্যবহূত হতো। মূল প্রাসাদেই রয়েছে তিনটি বিশেষ হল যথা- হল অব সুপ্রিম হারমনি, হল অব সেন্ট্রাল হারমনি এবং হল অব দ্য প্রিজার্ভিং হারমনি। আমাদের জন্য বরাদ্দ মাত্র এক ঘণ্টা। তাই সবকিছু খুঁটিয়ে দেখা সম্ভব হয়নি। ভাসা ভাসাভাবেই দেখে মেটাতে হয় চোখের ক্ষুধা। হল অব সুপ্রিম হারমনির ৩০ মিটার উঁচু ভবনটিই নিষিদ্ধ নগরীর সর্বোচ্চ ভবন।

সদর ভবনের পর বিশাল মাঠ সমেত উঠান পাড়ি দিয়ে পাওয়া গেল আরও কিছু ভবন। গাইডের সহায়তায় জানা হয়, এটি অন্দরমহল। সদর প্রাসাদের মতো এখানেও আছে তিনটি বিশেষ স্থাপনা। প্রথমটি হ্যাভেনলি পিস হল; পরেরটি হল অব ইউনিয়ন অ্যান্ড পিস। আর সবশেষটি হলো অব টেরিসট্রিয়াল ট্রাঙ্কুইলিটি। এখানে কথা হয় শিশুপুত্রসহ ভ্রমণে আসা ইসরায়েলি মিখাইলের সাথে। একটু সামনে গিয়েই দেখা পেলাম এ যুগের কয়েকজন রাজা-রানীকে। একশ' চায়নিজ মুদ্রা দিয়ে রাজকীয় পোশাক পরে রাজসিংহাসনে বসে ছবি তোলার সুযোগ রয়েছে সেখানে। সাথে বিশেষ ক্যামেরায় তোলা ছবিটিও পাওয়া যাবে।

রাজপ্রাসাদ থেকে বের হওয়ার পথে রয়েছে চমৎকার এক বাগান। অত্যন্ত পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন বাগানটিতে রয়েছে হরেক রকম গাছ। গাইড জানান, সেপরেস নামক এক প্রজাতির গাছ রয়েছে সেগুলোর বয়স ৩০০ থেকে ৫০০ বছর। দীর্ঘ পথচলার ক্লান্তি জুড়াতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিয়ে দলবদ্ধভাবে ফ্রেমবন্দি হলাম। বাগানের পাশেই রয়েছে দুটি স্যুভেনির শপ। ঢুঁ মেরে দেখি পণ্যমূল্য ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে নেই। তাই দেখে দেখেই খালি হাতে ফিরতে হলো। প্রবেশস্বারের মতো বহির্গমন পথেও অনেক মানুষের সমাগম। এখানে বাড়তি পাওনা বেশ কিছু ভাসমান হকার। কিছু ভিক্ষুুকের অস্তিত্বও দেখা গেল। সুহেল, ফিরোজ, মাহফুজারা ভাসমান হকারদের সাথে দর কষাকষি করে কিনে নেন প্রয়োজনীয় কিছু জিনিসপ্রত্র।

চীনে সাইকেলের ব্যবহার খুব বেশি। প্রতিটি কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান কিংবা শপিং মলের সামনে দেখা যায় সাইকেলের দীর্ঘ সারি। এ ছাড়া সাইকেল আরোহীদের জন্য রয়েছে রাস্তার উভয় পাশে পৃথক লেন। ইংরেজি জানা গাইড ছাড়া পথ চলা খুব কষ্টকর। কোথাও তেমন ইংরেজির বালাই নেই। আমাদের প্রাথমিক পড়ুয়া শিক্ষার্থীরা যে মাত্রায় ইংরেজি জানে, এখানকার বিশ্বখ্যাত চেইন শপের বিক্রয় প্রতিনিধিরা তাও জানে না। দরদাম করতে হয় ক্যালকুলেটর টিপে টিপে। তবে প্রযুক্তির কল্যাণে গুগল অনুবাদকের সহায়তায় স্বাভাবিক টুক-টাক কথাবার্তা চালিয়ে দেওয়া যায়।

স্থানীয় চীনারা যারা ইংরেজি জানে এবং ট্যুর গাইড হিসেবে কাজ করে (পেশাদার বা স্বেচ্ছাসেবী) সবারই একেকটা ইংরেজি নাম আছে। জন্মসূত্রে পাওয়া চীনা নাম বিদেশিদের মনে রাখা কঠিন বলে তারা নিজেরাই ইংরেজি নাম ধারণ করে। আবার কিছুদিন পরপর সে নাম পরিবর্তন করে নতুন নামকরণ করে। সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি অব ফাইন্যান্সের অর্থনীতির তৃতীয় বর্ষের ছাত্র ও স্বেচ্ছাসেবী ট্যুর গাইড এন্ডারসন জানান, এটি তার তৃতীয় ইংরেজি নাম। বিদেশিদের কাছে ইংরেজি নামে পরিচিত হলেও নিজেদের মাঝে তারা চীনা নামেই পরিচিত। একে অপরকে ইংরেজি নামে চেনেন না। 

এমএ/ ০০:৩৩/ ০৮ মার্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে