Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ , ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 1.8/5 (4 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০৭-২০১৯

বিশ্বের এক অনন্য ভাষণ

ড. খন্দকার বজলুল হক


বিশ্বের এক অনন্য ভাষণ

প্রাককথা-১৯৭১ সালের ৭ মার্চ। বাঙালির জাতীয় জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। এদিন সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) ১০ লাখের অধিক জনতার সমাবেশে জাতির উদ্দেশে এক গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। 

ভাষণটি শোনার জন্য শুধু মাঠে উপস্থিত জনতা নয়, গোটা পাকিস্তানের জনগণ তথা বিশ্ববাসী অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছিল। ভাষণটি ছিল কমবেশি ১৮ মিনিটের। একটি ভাষণ সেদিন একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র করে তুলেছিল। বস্তুত ৭ মার্চের এই ভাষণটিই আজকের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের জন্ম দিয়েছে।

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের পটভূমি কী ছিল? ভাষণটির বিষয়বস্তু কী ছিল? (উচ্চারিত ও অনুচ্চারিত) ভাষণটি যিনি দিলেন তার মধ্যে কী সম্মোহনী শক্তি ছিল? কী ছিল তার চারিত্রিক ঐশ্বর্য? বাঙালির স্বাধীনতা অর্জনে এই ভাষণের রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত গুরুত্ব কতটা ছিল? ব্রিটিশ ঐতিহাসিক Jacob. F. Field গত আড়াই হাজার বছরের মানবেতিহাসের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ৪১টি ভাষণের অন্যতম ভাষণ হিসেবে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণকে অন্তর্ভুক্ত করেছেন। যদি অন্তর্ভুক্ত না করতেন, তাহলে কি বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণটি তার প্রাপ্য মর্যাদা থেকে বঞ্চিত হতো?

বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজ 'বিশ্বঐতিহ্য দলিল'। জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কো মানবজাতির মূল্যবান সম্পদ হিসেবে ‘International Memory of World Register’-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদি বঙ্গবন্ধুর ভাষণ ইউনেস্কো কর্তৃক স্বীকৃতি না পেত, তাহলে কি ভাবীকালে ভাষণটি মানুষের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যেত? সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হচ্ছে, বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি কি অন্য দশটি ভাষণের মতো কেবল একটি প্রভাবশালী ভাষণ ছিল, না এর কোনো স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য ছিল, যা এ ভাষণটিকে অন্য দশটি ভাষণ থেকে আলাদা করেছে এবং যে কারণে আগামী দিনে এ ভাষণটি কেবল অন্যতম শ্রেষ্ঠ হিসেবে নয়, একটি অনন্য ভাষণ হিসেবে বিশ্বে স্থান করে নিতে পারবে।

এসব মৌলিক বিষয় জানতে এবং এ প্রসঙ্গে উত্থাপিত নানা প্রশ্নের জবাব খুঁজতেই আজকের এ প্রবন্ধ, আমার এ ক্ষুদ্র প্রয়াস।

দুই, ভাষণের পটভূমি :পাকিস্তানি শাসন-শোষণের নিগড় থেকে বেরিয়ে আসার লক্ষ্যে- ১৯৬৬ সালে 'আমাদের বাঁচার দাবি'খ্যাত বঙ্গবন্ধু তার ঐতিহাসিক ৬ দফা কর্মসূচি পেশ করেন। ৬ দফা ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। ৬ দফা সম্পর্কে বঙ্গবন্ধু ছাত্রনেতাদের বলেছিলেন, 'সাঁকো দিলাম, এবার এই সাঁকো বেয়ে তোদেরকে পৌঁছে যেতে হবে চূড়ান্ত লক্ষ্যে- স্বাধীনতায়।' কিন্তু মুক্তি সহজে আসেনি বরং ৬ দফা দেওয়ার পর শুরু হয় নানা ষড়যন্ত্র। ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে ১৯৬৮ সালের জানুয়ারি মাসে বঙ্গবন্ধুকে প্রধান আসামি করে ৩৫ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় 'আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা'। কিন্তু সে ষড়যন্ত্র ব্যর্থ হয়। তীব্র গণআন্দোলনের মুখে ১৯৬৯-এর ২২ ফেব্রুয়ারি বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তান সরকার। এক মানুষ, এক ভোট ও জনসংখ্যার ভিত্তিতে সংসদে আসন নির্ধারণ করে দেশে নির্বাচন দিতে বাধ্য হয় পাকিস্তানি সেনা শাসকরা। ৬ দফার ভিত্তিতে ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগ জাতীয় ও প্রাদেশিক উভয় পরিষদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এমন পরিস্থিতির জন্য আদৌ প্রস্তুত ছিল না। তারা বঙ্গবন্ধুর কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা হস্তান্তর না করে শুরু করে নানা কূটচাল। কথা ছিল, ৩ মার্চ বসবে Constituent Assemblyর প্রথম অধিবেশন। 

পাকিস্তানের তদানীন্তন প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৩ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য এই অধিবেশন ১ মার্চ স্থগিত ঘোষণা করেন। প্রতিক্রিয়ায় বঙ্গবন্ধু ২ মার্চ থেকে পূর্ব বাংলায় সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। গোটা পূর্ব বাংলা অচল হয়ে পড়ে। ২৫ মার্চের বর্বর সামরিক অভিযানের পূর্ব পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর নির্দেশেই পূর্ব বাংলা পরিচালিত হতে থাকে। তখন বঙ্গবন্ধুই হয়ে ওঠেন পূর্ব বাংলার সরকারপ্রধান। অবস্থা দেখে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী নতুন কৌশল অবলম্বন করে। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ৬ মার্চ রাতে দেশবাসীর উদ্দেশে এক বেতার ভাষণে ইতিপূর্বে অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত ঘোষিত Constituent Assemblyর সভা ২৫ মার্চ বসবে বলে ঘোষণা দেন। তিনি তার বক্তৃতায়, তার ভাষায় দেশের অখণ্ডতা রক্ষার প্রয়োজনে তার সরকারের যে কোনো চরম ব্যবস্থা গ্রহণের দৃঢ় সংকল্পের কথাও ব্যক্ত করেন। বঙ্গবন্ধুও বসে থাকেননি। তিনি জনসভার ঘোষণা দেন।

অবশেষে এলো সেই ঐতিহাসিক ৭ মার্চ। দিনটি ছিল রোববার। ফাল্কগ্দুনের এক পড়ন্ত দুপুর। নির্দিষ্ট সময়ে বঙ্গবন্ধু রেসকোর্সের সভাস্থলে এসে উপস্থিত হলেন। বাংলাদেশের অন্যতম শীর্ষ কবি নির্মলেন্দু গুণের ভাষায়- 'শত বছরের সংগ্রাম শেষে, রবীন্দ্রনাথের মতো দৃপ্ত পায়ে হেঁটে অতঃপর কবি এসে জনতার মঞ্চে দাঁড়ালেন।' শোনালেন তার অমর কবিতাখানি। কী ছিল সে কবিতায়? বলা বাহুল্য, কবিতার অনেকটা অংশজুড়ে ছিল বাঙালির সংগ্রামের কথা। কিন্তু শুধু কি সংগ্রাম? ছিল স্বপ্নের কথাও। ছিল স্বপ্ন বাস্তবায়নের অঙ্গীকার, সঙ্গে ছিল তা বাস্তবায়নের নানা পদক্ষেপের কলাকৌশলের কথা। বঙ্গবন্ধুর এই ভাষণটিই ছিল বস্তুত বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা।

তিন. ভাষণের বিষয়বস্তু :১৯৭১-এর ৭ মার্চ তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে (সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) বঙ্গবন্ধু মাত্র ১৮ মিনিটের যে ভাষণ দিয়েছিলেন, সেটি নিছক কোনো ভাষণ ছিল না। বিশিষ্ট রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ড. হারুন-অর-রশীদের মতে- সে ভাষণ ছিল 'স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত বাঙালি জাতির উদ্দেশে স্বাধীনতা অর্জনে চরম প্রস্তুতি, যুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং চূড়ান্ত বিজয় অর্জন না করা পর্যন্ত যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার এক উদাত্ত আহ্বান।' এই ভাষণটিই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছে। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন ঘটনা আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না; কিন্তু কী ছিল সেই ভাষণে? বঙ্গবন্ধু তার ভাষণের শুরুতে 'ভাইয়েরা আমার' বলে উপস্থিত সবাইকে সম্বোধন করেছেন। তিনি সেদিন রেসকোর্স ময়দানে যারা উপস্থিত ছিলেন, কেবল তাদের সম্বোধন করেননি, তিনি সব বাঙালি জাতিকে সেদিন সম্বোধন করেছিলেন। তার ভাষণের প্রথম উচ্চারিত শব্দ ছিল, 'আজ' অর্থাৎ বর্তমান। আসলে তিনি সেদিন কেবল বর্তমানকে ধারণ করেননি, তিনি সেদিন সব মহাকালকে ধারণ করেছিলেন।

সে যাই হোক, সেদিন বঙ্গবন্ধু তার ভাষণে যেসব কথা উল্লেখ করেছেন, যদি আমরা তার উচ্চারিত বক্তব্যের আক্ষরিক বিশ্নেষণ করি তাহলে দেখব, তিনি প্রথমে পূর্ব বাংলার বিভিন্ন স্থানে নিরপরাধ বাঙালিকে কীভাবে হত্যা করা হচ্ছে, সে কথা তুলে ধরেছেন। এরপর তিনি পাকিস্তানি শাসনামলের গোটা ২৩ বছরে বাঙালির প্রতি যে অবিচার-নিপীড়ন হয়েছে, তার চিত্র তুলে ধরেন। এরপর তিনি নির্বাচনের ফলাফল মেনে নিয়ে ক্ষমতা হস্তান্তর না করে পাকিস্তানি সেনা শাসকরা কীভাবে একের পর এক ষড়যন্ত্র করেছে, সে কথা উল্লেখ করেছেন। এ পর্যায়ে বাঙালির অধিকার আদায়ের প্রশ্নে তিনি তার দৃঢ় প্রত্যয়ের কথা বললেন। সবশেষে তিনি বাঙালি জাতিকে চরম প্রতিরোধ গড়ে তোলার নির্দেশ দিলেন। তিনি শেষ করলেন এই বলে, 'মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেবো। এই দেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ। এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।'

চার, ৭ মার্চের ভাষণে আমরা বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে পাই : বঙ্গবন্ধু বহুমুখী গুণের অধিকারী ছিলেন। তার রাষ্ট্রচিন্তা ও রাজনৈতিক দর্শন বুঝতে হলে দীর্ঘ আলোচনার প্রয়োজন। আমার আজকের এই ক্ষুদ্র প্রবন্ধে কেবল ৭ মার্চের ভাষণের মূল বক্তব্য এবং এর পূর্বাপর বিশ্নেষণ করে বঙ্গবন্ধুকে যেভাবে পাই, শুধু তাই সংক্ষেপে উল্লেখ করব।

বঙ্গবন্ধু অত্যন্ত মেধাবী ও বিচক্ষণ মানুষ ছিলেন। ৭ মার্চের ভাষণে তার শব্দচয়ন, বাক্য বিন্যাস ও মূল বক্তব্য পর্যালোচনা করলে সে কথাই স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নানা দিক থেকে চাপ থাকা সত্ত্বেও সেদিন তিনি সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। শুধু দেশের মধ্যে নয়, ঢাকায় উপস্থিত বিদেশি সাংবাদিকসহ বিশ্বের অধিকাংশ গণমাধ্যমের ধারণা ছিল, বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে সরাসরি স্বাধীনতার ঘোষণা দেবেন। কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি তার ভাষণে স্বাধীনতার কথা এমনভাবে উচ্চারণ করেন, যাতে দেশের মানুষ সেটিকে ঘোষণা হিসেবে দেখে; কিন্তু তার বিরুদ্ধে একতরফা স্বাধীনতা ঘোষণার অভিযোগ উত্থাপন করা সম্ভব না হয়। 

বলা বাহুল্য, যদি এমনটি হতো, তাহলে তিনি বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হতেন এবং বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন হয়তো সুদূরপরাহত হতো। এ ছাড়া মৃত্যুকে অনেকটা নিশ্চিত জেনেও ২৫ মার্চের রাতে ধানমণ্ডির ৩২ নম্বর বাড়ি ছেড়ে আত্মগোপনে না যাওয়ার সিদ্ধান্তও ছিল তার একটি প্রাজ্ঞসিদ্ধান্ত।

বঙ্গবন্ধু মানুষের অধিকারে বিশ্বাস করতেন, ক্ষমতার কোনো লোভ তার ছিল না। তিনি তার ভাষণের শুরুতেই বলেছেন, 'আমি প্রধানমন্ত্রিত্ব চাই না। আমরা এ দেশের মানুষের অধিকার চাই।' প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরও তিনি বলেছিলেন, 'বাংলার মানুষ যেদিন আমাকে ভালোবাসবে না, আমি সেদিন প্রধানমন্ত্রিত্ব ছেড়ে দেব- আমি ঢাকাতেও থাকব না, আমি টুঙ্গিপাড়া চলে যাব।'

রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনে তিনি যারপরনাই আত্মপ্রত্যয়ী ছিলেন। বঙ্গবন্ধু সবসময় নিজস্ব শক্তি ও সম্পদে বিশ্বাস করতেন। তিনি তার ভাষণের এক পর্যায়ে বলেছেন-নির্দেশ দিয়েছেন, 'তোমাদের কাছে অনুরোধ রইল, প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোলো। তোমাদের যা কিছু আছে তাই নিয়ে শত্রুর মোকাবেলা করতে হবে।' সাম্প্রতিককালে আমাদের নিজস্ব সম্পদ দিয়ে পদ্মা সেতুর মতো একটি মেঘা প্রকল্প বাস্তবায়িত হচ্ছে, যেটি আমি মনে করি বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনারই প্রতিফলন। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্যকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এ ধরনের প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়নের প্রেরণা তার পিতার কাছ থেকেই পেয়েছেন।

বঙ্গবন্ধু অসম সাহসী ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতা ছিলেন। তিনি তার ভাষণের এক পর্যায়ে বললেন, 'সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না। আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দমাতে পারবে না।' মাত্র ৯ মাসের যুদ্ধে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন তার কথার সত্যতাই প্রমাণ করে। বর্তমান বিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে বাংলাদেশের যে পরিচিতি, সেটি বঙ্গবন্ধুর কথারই প্রতিফলন।

পাঁচ, বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ কেন অনন্য :বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের এমন কিছু বিশেষ বৈশিষ্ট্য আছে, যেগুলো বিশ্ববিখ্যাত অন্য ভাষণে আমরা সেভাবে লক্ষ্য করি না। এসবের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে-ক. বঙ্গবন্ধুর ভাষণটি ছিল অলিখিত এবং স্বতঃস্ম্ফূর্ত; কিন্তু মোটেও অপরিকল্পিত ছিল না। বরং সেটি ছিল খুবই গোছানো এবং সুনির্দিষ্ট। কিন্তু সব গুরুত্বপূর্ণ কথা উঠে এসেছিল তার সে বক্তব্যে। তিনি সারাজীবন যে লক্ষ্যে কাজ করেছেন, তাই তিনি বলেছিলেন ৭ মার্চের ভাষণে। এমন সুপরিকল্পিত ও হৃদয় উৎসারিত ভাষণের উদাহরণ বিশ্ব ইতিহাসে আর একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

খ. বঙ্গবন্ধু যে পরিস্থিতির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে অত্যন্ত ধীরস্থির অথচ তেজোদীপ্ত কণ্ঠে শতভাগ নির্ভুল একটি বক্তব্য রেখেছিলেন, তার উদাহরণও পৃথিবীতে খুঁজে পাওয়া কঠিন। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধু যদি সেদিন আবেগ, ক্ষোভ কিংবা উত্তেজনাবশে কোনো ভারসাম্যহীন বক্তব্য দিতেন, তাহলে বাঙালির স্বাধীনতা লাভ সুদূরপরাহত হতে পারত। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, বঙ্গবন্ধুর সেদিনের ভাষণ শুধু ভারসাম্যপূর্ণই ছিল না, ভাষণটি ছিল কাব্যিক ও গীতিময়। আমেরিকান সাময়িকী ঘবংিবিবশ 

ভাষণটি সম্পর্কে লিখতে গিয়ে বঙ্গবন্ধুকে 'অ চড়বঃ ড়ভ চড়ষরঃরপং' হিসেবে উল্লেখ করেছে।

গ. ৭ মার্চের ভাষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, ভাষণটির শক্তিশালী ও বহুমাত্রিক প্রভাব। ভাষণটি ছিল যেমন তাৎক্ষণিক প্রেরণাদায়ী, তেমনি কালজয়ী। ভাষণটি মুহূর্তের মধ্যে একটি নিরস্ত্র জাতিকে সশস্ত্র জাতিতে পরিণত করে তোলে। এই একটি ভাষণ সেদিন সব বাঙালি জাতিকে নজিরবিহীনভাবে ঐক্যবদ্ধ করে এবং স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত করেছিল। এই ভাষণটিই আমাদের স্বাধীনতা এনে দিয়েছিল। তবে ভাষণটি শুধু তাৎক্ষণিকভাবে প্রেরণাদায়ী ছিল না, এটি ছিল সব সময়ের জন্য প্রেরণাদায়ী এবং সে জন্যই ভাষণটি কালজয়ী হয়েছে। বাংলাদেশের আগামী প্রজন্ম বঙ্গবন্ধুর ভাষণ থেকে যেমন দিকনির্দেশনা পাবে, তেমনি বিশ্বমানবতার মুক্তির সংগ্রামে পৃথিবীর দেশে দেশে, যুগে যুগে এ ভাষণ প্রেরণা জোগাবে; কিন্তু অন্যান্য ভাষণের ক্ষেত্রে সর্বত্র আমরা তেমনটি লক্ষ্য করিনি।

ঘ. শুধু প্রভাব বিস্তারের মানদণ্ডে নয়, ভাষণের বিষয়বস্তু ও তা বাস্তবায়নে নেতার ব্যক্তিগত উপস্থিতি এবং ফলাফল প্রত্যক্ষ করার সৌভাগ্য বিবেচনায়ও বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ নিঃসন্দেহে অনন্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, যুক্তরাষ্ট্রের বর্ণবাদবিরোধী আন্দোলনের প্রিয় নেতা মার্টিন লুথার কিং (জুনিয়র) তার দেশবাসীকে বর্ণবাদ অবসানের (দাসপ্রথা বিলুপ্তি) স্বপ্নের কথা বলেছিলেন- ‘I have a dream’. তিনি তার স্বপ্ন কীভাবে বাস্তবায়ন হবে, সে কথা বলেননি। বলা বাহুল্য, তিনি সেটি বাস্তবায়নও দেখে যেতে পারেননি। যুক্তরাষ্ট্রের ১৬তম প্রেসিডেন্ট Gattysburg Address  খ্যাত আব্রাহাম লিংকন দেশে বিদ্যমান দাসপ্রথা উচ্ছেদ করতে চেয়েছিলেন। তিনি তার এ উদ্যোগে সফলও হয়েছিলেন। কিন্তু লিংকনের দুর্ভাগ্য, যুক্তরাষ্ট্রে শাসনতান্ত্রিকভাবে দাসপ্রথা নিষিদ্ধ হওয়ার আগেই তিনি আততায়ীর হাতে নিহত হন। বঙ্গবন্ধু এখানেও স্বতন্ত্র। বঙ্গবন্ধু শুধু সংখ্যার গণতন্ত্রের কথা বলেননি, তিনি তার ভাষণে ন্যায্যতার কথাও বললেন, 'যদি কেউ ন্যায্য কথা বলে, আমরা সংখ্যায় বেশি হলেও একজন যদিও সে হয়, তার ন্যায্য কথা মেনে নেব।'

ঙ. ভারতবর্ষের জাতির পিতা মহাত্মা গান্ধী বিজয়ের হাতিয়ার হিসেবে অসহযোগ আন্দোলনকে ব্যবহার করেছেন; অন্যদিকে মহামতি লেনিন শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয়ের লক্ষ্যে সশস্ত্র বিপ্লবের ডাক দিয়েছিলেন। পক্ষান্তরে বঙ্গবন্ধুর ভাষণে, ব্যালট ও বুলেট দুটিরই প্রসঙ্গ এসেছে এবং বাস্তবে তিনি পর্যায়ক্রমে দুটিই ব্যবহার করেছেন।

তাই অন্যদের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রেখেও এ কথা বলা যায়, বঙ্গবন্ধুই একমাত্র নেতা, যিনি নিজে স্বপ্ন দেখেছিলেন, জাতিকে স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন, স্বপ্ন পূরণে নিজে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এবং তাকে সৌভাগ্যবানও বলা যেতে পারে, তিনি তার স্বপ্নের বাস্তবায়ন স্বচক্ষে দেখে গেছেন।

ছয়. উপসংহার :বিগত আড়াই হাজার বছরের বিশ্ব ইতিহাসে সবচেয়ে প্রভাব বিস্তারকারী ৪১ জন সামরিক ও বেসামরিক জাতীয় বীরের বিখ্যাত ভাষণ নিয়ে ব্রিটিশ ইতিহাসবিদ  Jacob. F. Field. 'We Shall Fight on the Beaches; The Speeches That Inspired History' শিরোনামে ২০১৩ সালে যে গ্রন্থ রচনা করেছেন, সেখানে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না, এতে বঙ্গবন্ধুর ভাষণের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে। গত ৩০ অক্টোবর ২০১৭ জাতিসংঘ সংস্থা ইউনেস্কো ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণকে 'বিশ্বঐতিহ্য-দলিল' হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে মানবজাতির মূল্যবান সম্পদ হিসেবে International Memory of the World Register-এ অন্তর্ভুক্ত করেছে। যদি এসব স্বীকৃতি না আসত, তাহলে ৭ মার্চের ভাষণের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ হতো অথবা মানুষের স্মৃতি থেকে, বিশেষ করে বাংলাদেশের মানুষের কাছে এই ভাষণের আবেদন হারিয়ে যেত বলে আমি তা মনে করি না। 

বঙ্গবন্ধুর ভাষণকে বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ভাষণের স্বীকৃতি কোনোভাবেই কম গৌরবের নয় এবং এতে বঙ্গবন্ধুর প্রতি কোনো অবিচার করা হয়েছে, তেমনটি আমি মনে করি না। তবে সার্বিক বিবেচনায় এ ভাষণকে কেন্দ্র করে বঙ্গবন্ধুর যে বিরল চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের পরিচয় আমরা পাই এবং ভাষণটির যে তাৎক্ষণিক ও দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব আমরা লক্ষ্য করি, তাতে ব্যক্তি বঙ্গবন্ধুর প্রতি এবং তার দেওয়া ভাষণের প্রতি আরও বেশি সুবিচার হবে; যদি ভাষণটিকে আমরা বিশ্বের এক অনন্য ভাষণ হিসেবে গ্রহণ করি। আমি নিশ্চিত, ভাবীকাল এ ভাষণটিকে সেভাবেই মূল্যায়ন করবে।

লেখক: অধ্যাপক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এবং সদস্য উপদেষ্টা পরিষদ, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ।

এমএ/ ১১:২২/ ০৭ ফেব্রুয়ারি

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে