Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ১৩ নভেম্বর, ২০১৯ , ২৮ কার্তিক ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৩-০২-২০১৯

কাশ্মীর: যুদ্ধ কি সমস্যার সমাধান?

আবদুল গাফফার চৌধুরী


কাশ্মীর: যুদ্ধ কি সমস্যার সমাধান?

কাশ্মীর সমস্যার বয়স কত বছর হলো? ভারত ভাগ ও উপমহাদেশ স্বাধীন হওয়ার বছর থেকেই এ সমস্যার শুরু। সে হিসেবে এই সমস্যার বয়স হলো ৭২ বছর। আর ২৮ বছর পার হলেই আমরা কাশ্মীর সমস্যার শতবর্ষ পালন করতে পারব; কিন্তু সমস্যার সমাধান হবে কি? নাকি আইরিশ সমস্যার দীর্ঘায়ুকেও তা হার মানাবে? এই সমস্যার আসল জনক ব্রিটিশরাজ। প্রতিপালন করেছেন জিন্নাহ ও নেহরু। এখন তার দায় পোহাতে হচ্ছে ভারতের মোদি সরকার ও পাকিস্তানের ইমরান সরকারকে। এই দুই সরকারেরই কাশ্মীর নিয়ে যুদ্ধ যুদ্ধ খেলার ইচ্ছা নেই। কিন্তু পেছুবারও উপায় নেই। অতীতের দুই দেশের সব সরকারই সমস্যাটি নিয়ে এমন বিপজ্জনক খাদ তৈরি করেছে যে, কোনো পক্ষই এখন পেছুতে চাইলে পেছনে পতনের ভয়ঙ্কর খাদ। মরো আর বাঁচো, এখন এই উপত্যকায় দাঁড়িয়ে তলোয়ার ঘোরাতেই হবে দু'পক্ষকে।

গত ৭২ বছরে কাশ্মীর প্রশ্নে ভারত ও পাকিস্তানের জনমত এত বেশি কাঠিন্য লাভ করেছে যে, কোনো সরকারের পক্ষে এই বরফ গলানো অসম্ভব। দুই দেশের যে সরকারই এই বরফ গলাতে চেয়েছে, তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ করা হয়েছে। বিজেপি প্রথম দফায় ক্ষমতায় এলে প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি বাসে চেপে লাহোরে গিয়েছিলেন কাশ্মীর প্রশ্নে পাকিস্তানের তৎকালীন নওয়াজ শরিফ সরকারের সঙ্গে একটা আপস করার জন্য। নওয়াজ শরিফও উদ্‌গ্রীব ছিলেন একটা আপসের জন্য। কিন্তু পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর কট্টরপন্থিরা এই প্রচেষ্টা বানচাল করে দেয় কারগিলে যুদ্ধ বাধিয়ে।

পরে তো জানা গিয়েছিল, পাকিস্তানে সামরিক ক্যু দ্বারা নওয়াজ শরিফের সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ ও নিজে ক্ষমতা দখলের উদ্দেশ্যে কারগিল যুদ্ধ বাধানো হয়েছিল। মূল হোতা ছিলেন জেনারেল পারভেজ মোশাররফ। নওয়াজ শরিফকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদ করে তিনি তার মনের ইচ্ছা পূর্ণ করেছিলেন। কারগিলের যুদ্ধ ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কের চরম অবনতি ঘটিয়েছিল। তার রেশ শেষ হতে না হতেই গত সপ্তাহে ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় ৪০ জনের বেশি ভারতীয় সৈন্যের মৃত্যু পরিস্থিতিকে আবার যুদ্ধের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়েছে। 

ভারত এই জঙ্গি হামলার জন্য পাকিস্তানকে দায়ী করেছে। এই হামলার দায়িত্ব স্বীকার করেছে জইশ-ই-মোহাম্মদ নামে একটি জঙ্গি প্রতিষ্ঠান। জইশ-ই মোহাম্মদ এবং লস্করে তৈয়েবা এই দুই জঙ্গি প্রতিষ্ঠানেরই শক্ত ঘাঁটি আছে পাকিস্তানে। পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আজাদ কাশ্মীরে প্রতিশোধাত্মক বিমান হামলা চালিয়েছে ভারত। তাতে বহু জঙ্গি নিহত হয়েছে বলে তারা দাবি করে। অন্যদিকে পাকিস্তান দাবি করে, তারা ভারতের দুটি ফাইটার প্লেন ভূপাতিত করেছে। ধৃত একজন ভারতীয় পাইলটের ছবি তারা প্রকাশ করেছে।

এই যুদ্ধের যাতে বিস্তৃতি না ঘটে, সে জন্য কয়েকটি বৃহৎ শক্তি ভারত ও পাকিস্তানের কাছে আবেদন জানিয়েছে। এটা একটা প্রথামাফিক আবেদন। যারা যুদ্ধ বাধায়, তারা যুদ্ধ থামায় না। তাই সিরিয়া ও আফগানিস্তানের যুদ্ধ এখনও থামেনি। এখন আবার ভেনিজুয়েলায় যুদ্ধ সম্প্রসারণের চেষ্টা চলছে। কাশ্মীরের সন্ত্রাসীদের সঙ্গে আফগান সন্ত্রাসীদের, বিশেষ করে তালেবানের গভীর যোগ আছে। তারা হুমকি দিয়েছে, কাশ্মীর পরিস্থিতির জন্য তারা শান্তি বৈঠকে বসবে না। 

একটা বিষয় এখন আরও স্পষ্ট, যুদ্ধ দ্বারা কাশ্মীর সমস্যার সমাধান করা যাবে না। কাশ্মীরি জঙ্গিদেরও দমন করা যাবে না। এই জঙ্গিদের শক্তিশালী ঘাঁটি এখন আফগানিস্তানে এবং ভারতের ভেতরেও রয়েছে। পাকিস্তান ও ভারত দুটি দেশই এখন পরমাণু অস্ত্রের অধিকারী। সুতরাং কাশ্মীর নিয়ে পরমাণু যুদ্ধের আশঙ্কা কম। তবে আশঙ্কা একেবারে নেই, সে কথা বলি না। দু'পক্ষের কোনো এক পক্ষ সংযম হারালে দুটি দেশই ধ্বংস হবে। জয়ী পরাজিত বলে কেউ থাকবে না। সুতরাং দিল্লি ও ইসলামাবাদ পরস্পরকে যতই চোখ রাঙাক, পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধে তারা যাবে বলে মনে হয় না।

অতীতে এমন একটা সময় ছিল, যখন কাশ্মীরের শক্তিশালী সেক্যুলার সংগঠন এবং তার নেতা শেখ আবদুল্লাহকে ভারতের কংগ্রেস সরকার ষড়যন্ত্রপূর্বক ক্ষমতাচ্যুত না করে তাকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি পালন করলে কাশ্মীরের জনগণই ঐক্যবদ্ধ হয়ে পাকিস্তানের হামলার মতো তাদের মদদপুষ্ট সন্ত্রাসীদেরও জঙ্গি তৎপরতা রুখে দাঁড়াত। শেখ আবদুল্লাহ ভারত ভাগের সময় শর্তসাপেক্ষে ভারতে যোগদানে রাজি হয়েছিলেন। কাশ্মীর ভারতের অঙ্গরাজ্য হবে না, হবে বিশেষ স্ট্যাটাসের স্বায়ত্তশাসিত রাজ্য। কাশ্মীরের মন্ত্রিসভার প্রধানকে প্রধানমন্ত্রী বলা হবে। কাশ্মীরের নিজস্ব সংবিধান ও পতাকা থাকবে। প্রধানমন্ত্রী নেহরু এসব শর্ত মেনে নেওয়ার পরই শেখ আবদুল্লাহ ভারতে যোগ দিতে সম্মতি জানান।

শেখ আবদুল্লাহ যতদিন তার দল ন্যাশনাল কনফারেন্সের নেতা এবং কাশ্মীরের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, ততদিন কাশ্মীরি মুসলমানরাও পাকিস্তানে যোগ দিতে চায়নি। বরং পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের রুখেছে। জিন্নাহর হুকুমে পাকিস্তানি সৈন্য কাশ্মীরে হামলা চালিয়ে কিছু অংশ দখল করে নিলে পাকিস্তানি হামলা রোখার জন্য ভারতীয় সেনাদের সহযোগিতাকে তারা স্বাগত জানিয়েছে। 

কাশ্মীর বিরোধের জন্ম ভূস্বর্গ নামে পরিচিত এই দেশটি দখল করার জন্য পাকিস্তানের কখনও আগ্রাসন, কখনও সশস্ত্র অনুপ্রবেশকারী পাঠিয়ে অন্তর্ঘাত সৃষ্টির চেষ্টা এবং অন্যদিকে রাজ্যটির স্বায়ত্তশাসিত বিশেষ স্ট্যাটাস লুপ্ত করে তাকে অঙ্গরাজ্যে পরিণত করার ভারতীয় প্রচেষ্টা থেকে। পাকিস্তানি অনুপ্রবেশকারীদের সন্ত্রাসে যেমন কাশ্মীরি জনজীবন পীড়িত হচ্ছে, তেমনি কাশ্মীরে সন্ত্রাস দমনের নামে মোতায়েন ভারতীয় সৈন্যদের কার্যকলাপও কাশ্মীরের জনগণের কাছে অসহনীয় হয়ে উঠেছে।

কাশ্মীরকে ভারতের অঙ্গরাজ্য করার প্রতিবাদ ওঠে প্রথমে শেখ আবদুল্লাহর অনুসারী সেক্যুলারিস্ট কাশ্মীরিদের কাছ থেকে। তারা পাকিস্তানে যোগ দিতে চায়নি। চেয়েছে স্বায়ত্তশাসিত কাশ্মীর। আইয়ুব খান যখন পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট, তখন ৫০ হাজার পাঞ্জাবি ও পাঠানকে অস্ত্র চালনার ট্রেনিং দিয়ে মোজাহেদিন নাম দিয়ে কাশ্মীরে ঢোকানো হয়েছিল গেরিলা যুদ্ধ চালানোর জন্য। কাশ্মীরি জনগণের প্রতিরোধের মুখে তাদের একজনও বেঁচে থেকে পাকিস্তানে ফিরতে পারেনি।

নেহরু তার শেষ জীবনে রাজনৈতিক চালে এখানেই বড় ভুলটি করেন। তিনি কাশ্মীরের আগের স্বায়ত্তশাসিত স্ট্যাটাসের দাবি করে যে সেক্যুলার কাশ্মীরিরা আন্দোলন পরিচালনা করছিলেন, তাদের কঠোরভাবে দমন করার নীতি গ্রহণ করেন। এই দমননীতি কাশ্মীরের মানুষকে ক্রমে ভারতবিমুখ করে তোলে এবং তার সুযোগ গ্রহণ করে পাকিস্তানের ট্রেনিং দেওয়া অনুপ্রবেশকারীরা। উগ্র মৌলবাদী সন্ত্রাসীরা কাশ্মীরের সেক্যুলার আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করতে শুরু করে। এই সময়টায় ইস্ট অ্যান্ড ওয়েস্ট কোল্ড ওয়ার (পূর্ব-পশ্চিম স্নায়ুযুদ্ধ) তুঙ্গে উঠে আসে। নেহরু যে কাশ্মীর প্রশ্নে বিরোধ বাধিয়ে রেখে গোটা উপমহাদেশকেই বিপজ্জনক স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে ফেলেছেন, এটা বুঝতে পারেন ধীরে ধীরে। 

নেহরুর সোভিয়েতঘেঁষা পররাষ্ট্রনীতি, নিরপেক্ষ জোট (ন্যাম) গঠন পশ্চিমা বিশ্বের নেতা আমেরিকাকে রুষ্ট করে। নেহরুকে শায়েস্তা করার জন্য আমেরিকা পাকিস্তানের সঙ্গে মৈত্রী করে। পাকিস্তান-মার্কিন সামরিক চুক্তি হয়। কাশ্মীর বিরোধে পাকিস্তানকে ওয়াশিংটন অন্ধ সমর্থন দেয়। ভারত নিয়ন্ত্রিত কাশ্মীরে পাকিস্তানের সন্ত্রাসী পাঠানোর নীতিকেও প্রশ্রয় দেয়। 

নেহরু বুঝতে পারেন, তার কাশ্মীর নীতিতে গোটা উপমহাদেশকেই দুই বিশ্ব জোটের স্নায়ুযুদ্ধে জড়িয়ে ফেলা হয়েছে। জাতিসংঘে গৃহীত কাশ্মীরে গণভোট গ্রহণের প্রস্তাবও ঠেকিয়ে রাখা ঠিক হয়নি। এখন গণভোটের ব্যবস্থা করলে তা হিতে বিপরীত ঘটাবে। ভারতের দমন নীতির মুখে কাশ্মীরের সেক্যুলার শক্তি দুর্বল হয়েছে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ভারতের প্রতি বিরূপতা জন্ম নিয়েছে। তার সুযোগ নিয়ে পাকিস্তান রাজ্যটিতে তাদের সমর্থন বাড়িয়েছে এবং তাদের পাঠানো সন্ত্রাসীরা এখন আগের মতো গণবিরোধিতার সম্মুখীন হচ্ছে না। 

নেহরু পাকিস্তানের সঙ্গে সরাসরি আলোচনায় কাশ্মীর প্রশ্নের মীমাংসা করার উদ্যোগ নেন। তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট আইয়ুবের সঙ্গে আলোচনার জন্য পাকিস্তানের পার্বত্য শহর মারিতে ছুটে যান। আলোচনা ব্যর্থ হয়। নেহরু তাতে হাল ছাড়েননি। তিনি তার এককালের বন্ধু শেখ আবদুল্লাহকে জেল থেকে মুক্তি দেন এবং পাকিস্তান ও কাশ্মীরিদের কাছে গ্রহণযোগ্য সমাধান তৈরির জন্য তার সঙ্গে আলোচনা করেন। তাদের দু'জনের মধ্যে আলোচনাক্রমে যে মীমাংসা ফর্মুলাটি তৈরি হয়, ঠিক হয় তা নিয়ে শেখ আবদুল্লাহ পাকিস্তানের নেতাদের সঙ্গে আলোচনার জন্য লাহোরে যাবেন। পাকিস্তান এই আলোচনায় আগ্রহ দেখায় এবং শেখ আবদুল্লাহকে রাষ্ট্রনায়কের মর্যাদায় পাকিস্তানে আমন্ত্রণ জানায়। 

শেখ আবদুল্লাহ যেদিন লাহোর পৌঁছেন, সেদিন লাহোর বিমানবন্দরে শুধু মানুষ আর মানুষ। তিলধারণের স্থান ছিল না। মানুষের মুখে স্লোগান : শেরে কাশ্মীর জিন্দাবাদ। শেখ আবদুল্লাহ বিমানবন্দরের টারমাকে দাঁড়িয়ে জনতার অভিবাদন গ্রহণ করেন। সংবাদপত্রে সেই ছবি দেখে আমার মনে হয়েছিল, যুদ্ধ ছাড়াই কাশ্মীর সমস্যার সমাধান সম্ভবত হতে যাচ্ছে। 

ঠিক এই সময় বিনা মেঘে বজ্রপাত হলো। নেহরু আকস্মিকভাবে মারা গেলেন। লাহোরে বসে শেখ আবদুল্লাহ অঝোর ধারায় কাঁদলেন। সাংবাদিক সভায় অশ্রুভেজা কণ্ঠে বললেন, 'এই মৃত্যুতে  কাশ্মীর সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধানের আশাও বুঝি শেষ হয়ে গেল।' 

তাই হলো, শেখ আবদুল্লাহকে লাহোর থেকে শূন্য হাতে শ্রীনগরে ফিরতে হয়েছিল। (আগামী  সপ্তাহে সমাপ্য)

 


আরএস/ ০২ মার্চ

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে