Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৬ জুলাই, ২০১৯ , ৩১ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৮-২০১৯

আসলে আমরা সবাই শ্লেভ

বোরহানউদ্দিন খান জাহাঙ্গীর


আসলে আমরা সবাই শ্লেভ

তুমি জানো কেন তোমাকে এখানে এনেছি?

না।

তোমার পেছনে দেখো একটা মাটির ঘর।

মাটির ঘর?

এখানে আমি জন্মেছি, এই মাটির বাড়িতে।

বিল ঘুরে দাঁড়ায়, তারপর হাঁটা শুরু করে। আমিও পেছন পেছন হাঁটি। দুজনকে বিকেল ঘিরে ধরে। চারপাশে গাছপালা নিথর। পায়ের নিচে পাতার শব্দ।

বিলের সঙ্গে আমার ভাব সম্পর্ক বিয়ে, এসবই আসেত্ম আসেত্ম হয়। ব্রিটিশ কলোনিয়াল দেশের বদলে ইংরেজভাষী দেশে আমি উচ্চশিক্ষার জন্য পড়াশোনা করতে চেয়েছি। যে-কারণে কানাডায় আমার আসা, সে-কারণে টরন্টোতে আমি থিতু হয়েছি। টরন্টোর উধাও পার্ক, উধাও রাস্তা, উধাও ঘরবাড়ি আমাকে মাতাল করেছে : বিলের পুরনো গাড়িতে চড়ে আমি আবিষ্কার করেছি টরন্টো, এই আবিষ্কার তুলনাহীন। কতদিন বিলের সঙ্গে বসে থেকেছি সেমিটারিতে, কতদিন বিলকে শুনিয়েছি মাটির বাড়িতে আমার জন্ম নেওয়ার বৃত্তান্ত।

কতদিন বিল বলেছে, চলো একবার বাংলাদেশে গিয়ে তোমার মাটির ঘর দেখে আসি।

আমি বলে উঠেছি, যাবে, সত্যি যাবে?

বিল খুব আসেত্ম বলেছে, যাব।

আমি আচমকা বলি, বিল বিল।

বিল বলে ওঠে, কী।

আমি বলে উঠি, দেখো দেখো।

কী।

আমি চারপাশ দেখি তবু আসেত্ম বলি, বৃষ্টিতে ভেজা গাছ সন্তের মতো হাত তুলে আছে।

আমরা এভাবে সন্তের মতো গাছপালা দেখি : এখানে টরন্টোতে, এখানে ঢাকায়; এ-দেখার শেষ নেই, সন্তের মতো বিলের হাত ধরে আমি ঘুরতে থাকি।

কোনো এক অটামের বিকেলে বিলের সঙ্গে ঘুরছি বিলের পুরনো গাড়িতে। চারপাশের গাছপালা খালি খালি, আকাশ সাদা। কুয়াশা জাঁকিয়ে পড়ছে। আমরা ক্যাথলিক সেমিটারিতে লুকনো নিরিবিলি স্তব্ধতার মধ্যে নিজেদের হারিয়ে ফেলি। জায়গাটি হচ্ছে ইমিগ্রান্টদের শেষ আস্তানা, যেখানে বিভিন্ন দেশের মানুষজন ঘুমিয়ে আছে। এখানে বিল আর আমি চেস্টনাট গাছের তলায় প্রায়ই বসে থাকি, ভাঙাচোরা কবরের ভেতরে, যেখানে কবরের লেখা গলে গেছে। এখানে, এই লুকনো জায়গায়, রাস্তার শব্দ পৌঁছোয় না, ঘাস লম্বা হয়ে চারপাশে জঙ্গলের একটা আবহাওয়া তৈরি করেছে, গাছের পাতা উড়ে উড়ে যায় বাতাসে, মনে হয় আমি আর বিল উড়ে যাচ্ছি কোথাও।

কখনো কখনো আমার মা-র কথা মনে পড়ে, মনে পড়ে মা-র পেটে যে-বাচ্চাটা মরে গেছে তার কথা। বাচ্চাটা হয়তো আমার বোন হতে পারত, হয়তো হতে পারত আমার ভাই। গ্রাম সুবাদে যে-খালা দাইমার কাজ করত, সেই দাইমা আর আমি ঘরের ভেতর দুপাশে দাঁড়িয়ে। দাইমা হাত ধরে আছে মা-র, কোনো অচেনা, আমি কিছুতেই ভাবতে পারি না, অচেনা মানুষটি বড় হয়েছে এভাবে মা-র পেটে, আমি বয়সে বড় বলে আমাকে থাকতে দিয়েছে ঘরের ভেতর। আমি কিছুতে বিশ্বাস করতে পারি না বাচ্চাটা পেটের ভেতর মরা। মা থেকে থেকে চিৎকার করছেন, আমি দৌড়ে যাচ্ছি, আমি আর দাইমা, চিৎকার এবং যন্ত্রণার দিকে যেন চিৎকার করছি : মা-র শরীর হচ্ছে কবর। মা যন্ত্রণায় মুচড়ে যাচ্ছে, প্রতিটি মুচড়ানো যেন প্রমাণ বাচ্চাটা জন্মানোর জন্য দাপাদাপি করছে। যদি বাচ্চাটা না বেরিয়ে আসে, তাহলে কী হবে। মা কাঁদছেন, কেঁদে কেঁদে হয়রান হচ্ছেন, কেঁদে কেঁদে দোয়া চাইছেন আল্লার কাছে। বাচ্চাটার উপস্থিতি সারা ঘর ভরা, বাচ্চাটার জানের ধুকধুক আমি শুনতে পাচ্ছি, এখানেও, এই টরন্টোতে, বাচ্চাটা জন্মানোর জন্য দাপাদাপি করছে।

টরন্টোতে, মাটির বাড়ি খুঁজে পাই না। অথচ মাটির বাড়ির ভেতর জন্মেছি বাংলাদেশে। একটা বাড়ির কথা : মাটির বাড়ির কথা কিছুতেই ভুলি না। একটা মাটির বাড়ি : আমি এঁকেছি বারবার। কাগজে সাদা-কালোয় : ৬৪ x ৩৩ সিএম, কাগজে আঁকা সেই মাটির বাড়ি আমার সঙ্গে সবসময় থাকে, এখানে টরন্টোতে, যেন স্পেসে একটা চিহ্ন আমি চোখ তুলে তাকাই : এটা কি স্মৃতি, টেনশন : জানি না। আসলে টেনশনই। স্টেনলেস স্টিলের একটি কাজ : ছবি তুলে এনেছি : ৯০০ x ৮০০ x ১০৫ সেমি. একটি কাজ, ২০০৩, এর কাজটি ঢাকার ইউনাইটেড হাউসে রক্ষিত; কিংবা স্টেনলেস স্টিলে তৈরি ৯০০ x  ৭০০ x ৩০০ সেমি. একটি কাজ ঢাকার ইউনিক ট্রেড সেন্টারে রক্ষিত। মানুষের পক্ষে সম্ভব মানুষকে মহিমা দেওয়া : দেখো বিল মানুষই মানুষকে স্থায়ী করে কাজের মধ্য দিয়ে। তুমি যেমন আমাকে ভালোবাসায় স্থায়ী করেছ। তেমনি তোমাকে আমি ভালোবাসায় স্থায়ী করেছি। বিল আমাকে চুমো খায়, আমি বিলকে চুমো খাই। আমাদের চারপাশে সন্ধ্যা নেমে আসে।

বিল।

বলো।

আমরা মরে যাওয়ার আগে পৃথিবীর অনেক অনেক দেশে যাব, অনেক অনেক শহরে ঘুরব। তা যদি না করি তাহলে বেঁচে থেকে লাভ কি।

সত্যিই তো, বেঁচে থেকে লাভ কি।

বিলের সঙ্গে থেকে শিখেছি সবকিছু আমার। কিংবা কিছুই আমার না।

গাছপালাগুলো আমার। কিংবা গাছপালাগুলো আমার না। আকাশের তারাগুলো আমার। কিংবা তারাগুলো আমার না। ঢাকা আমার। কিংবা টরন্টো আমার না। বিল আমার। বিলের কণ্ঠস্বর আমার। বিলের শরীর আমার। আমার শরীর একটা গাছ : বাংলাদেশের গাছপালা। টরন্টোর এই গাছটা আমার আর বিলের। এই বাতাসটা গাছে বাড়ি খেয়ে বলে চলেছে : ঢাকা ঢাকা, টরন্টো টরন্টো।

আমি বিলকে বলি, আমরা টরন্টো ছেড়ে কবে যাব।

বিল হেসে বলে, সামনের সপ্তাহে।

বিয়ের পর এই প্রথম আমরা টরন্টো ছেড়ে বাইরে বেড়াতে যাচ্ছি।

বিল আমাদের প্রথম স্টপ কোথায়?

সেনিগাল। ডাকার।

ঢাকা?

না, পাগল, ডাকার।

ডাকার কী।

ডাকার হচ্ছে সেনিগালের সবচেয়ে বড় শহর, রাজধানী। আটলান্টিকের পাড়ে। আটলান্টিক পারি দিলে আমেরিকা।

আমি বলে উঠি, ঢাকা হলে মন্দ হতো না।

একদিন ঢাকা হবে।

সেই আশায় আশায় আমার দিন যায়।

আমি ডাকার এবং ঢাকা এক করি। ঢাকায় আমার একটা অভ্যাস ছিল, কোথাও বেড়াতে গেলে, পরিচিত কেউ সঙ্গে থাকলে, কবিতা শোনানো।

বিল, কবিতা শুনবে?

কবিতা? শুনব।

আমরা একটা ভাঙাচোরা কবরের ওপর বসে পড়ি। ‘আমাদের কত শহরে দেখা হয়েছে। বন্দরে বন্দরে জাহাজের মাল খালাস করে আমরা দিন এবং রাতে ভালোবাসা করেছি। কবে আবার দেখা হবে জানি না। রাতে তুমি আমার হাত ধরে থেকো, আমার কণ্ঠস্বর আদর করো, আমাকে কোলে নিয়ে ঘোরো। আর আমিও তোমাকে কোলে নিয়ে ঘুরব।’

বিল আমার দিকে তাকিয়ে বলে, ভারি সুন্দর কবিতা।

বিল আমার চোখের দিকে কয়েক লহমা তাকিয়ে থাকে। পরে বলে, ডাকার তোমার পছন্দ হবে।

হয়তো হবে।

আমার পছন্দের জায়গা।

কেন, বলো তো।

আমি মরুভূমি দেখিনি। ওখানে মরুভূমি আছে।

আমি বলি, আমিও মরুভূমি দেখিনি।

আর, বিল বলে ওঠে, ডাকার গিয়ে আমি শেস্নভ রুট খুঁজব।

শেস্নভ রুট?

হ্যাঁ, শেস্নভ রুট।

আমি অবাক হয়ে তাকাই। হঠাৎ জোর বাতাস বয়। আমার ঢাকার কথা মনে পড়ে। আমার মা-র কথা মনে পড়ে। মা তো কবেই চলে গেছেন। বাবাকে তো দেখিইনি। আমাদের ঘিরে পাতা ঝরে, পাতা ঝরে।

বিল বলে ওঠে, ডাকার ছাড়িয়ে গেলে শেস্নভ রুট ধরা পড়ে। কোনো একসময় কালো মানুষদের মধ্য-আফ্রিকার জঙ্গল থেকে ধরে আনা হতো। তারপর ডাকার থেকে দাসদের জাহাজে আমেরিকায় বিক্রির জন্য সাদারা পাঠিয়ে দিত। সেই আমেরিকা এখন সভ্যতার মধ্যমণি, আর আফ্রিকা সেই তিমিরে। আফ্রিকার যেসব জায়গায় দাসদের পূর্বপুরুষদের ভিটেবাড়ি আছে সেসব খুঁজতে যাব। যাবে তুমি আমার সঙ্গে?

আমি অনেকক্ষণ চুপ থেকে বলি, যাব। আসলে আমরা সবাই শেস্নভ।

আর/০৮:১৪/২৭ ফেব্রুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে