Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৪ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৭-২০১৯

সাপ কি তার খোলস বদল করবে?

আবদুল গাফফার চৌধুরী


সাপ কি তার খোলস বদল করবে?

সাপ বারবার খোলস বদল করে। কিন্তু স্বভাব ও চরিত্র পাল্টায় না। জামায়াতও দেশে দেশে তার রাজনীতির খোলস বহুবার বদলেছে। কিন্তু তার চরিত্র বদলায়নি। জনগণকে ধোঁকা দিয়ে কার্য হাসিলের জন্য রাজনৈতিক কৌশল পাল্টেছে, ছলচাতুরীর আশ্রয় নিয়েছে। মিথ্যা প্রচারে গোয়েবলসকে হারিয়েছে। কিন্তু স্বভাব ও উদ্দেশ্য পাল্টায়নি। মিসরে তারা নাম পাল্টে ক্ষমতায় গিয়েছিল। তুরস্কে নাম পাল্টে ক্ষমতায় গেছে। এখন আশা করছে, বাংলাদেশেও বারবার জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত হওয়ার পর নাম পাল্টে আবার দেশটির রাজনীতিতে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে পারবে, এমনকি আবার ক্ষমতায় যেতে পারবে।

মিসর থেকে মরক্কো, তিউনিসিয়া পর্যন্ত দেশগুলোতে নাম পাল্টে জামায়াতের সাফল্য লাভের কারণ, সেসব দেশে ডিক্টেটরশিপ, রাজতন্ত্র ও সাম্রাজ্যবাদী প্রভুত্বের বিরুদ্ধে আন্দোলনে জামায়াতিরা জড়িত ছিল। তারা গৃহযুদ্ধে জড়িত হয়েছে, কিন্তু বিদেশি হানাদারদের গণহত্যায় শরিক হয়নি, সেসব দেশে সেক্যুলার আন্দোলনগুলোর ডিক্টেটরশিপের প্রতি আনুগত্য এবং পশ্চিমাঘেঁষা রাজনীতিও ধর্মভিত্তিক রাজনীতির জনপ্রিয়তা অর্জনের কারণ।

উপমহাদেশে, বিশেষ করে বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে জামায়াতের ভূমিকা সম্পূর্ণ ভিন্ন। জামায়াত প্রকৃত ইসলামের অনুসারী নয়। তারা সৌদি আরবের রাজতন্ত্র দ্বারা পৃষ্ঠপোষিত কট্টর ওয়াহাবিবাদের অনুসারী। সৌদি আরবের পৃষ্ঠপোষকতায় উপমহাদেশে জামায়াতের জন্ম। পাকিস্তান-আন্দোলনের সময় জামায়াত নেতা মওলানা আবুল আলা মওদুদী এই আন্দোলনকে কুফরিস্তান প্রতিষ্ঠার আন্দোলন আখ্যা দিয়ে পাকিস্তান-আন্দোলনের বিরোধিতা করেন।

পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মওলানা মওদুদী দিল্লি থেকে লাহোরে চলে যান এবং তাঁর দল পাকিস্তান ও ইসলামের হেফাজতকারী সাজে। কিন্তু পাকিস্তানেও ইসলাম প্রচার ও সাধারণ মানুষের কল্যাণের কোনো কর্মসূচি জামায়াতের ছিল না। শিগগিরই জামায়াত আমেরিকারও পৃষ্ঠপোষকতা লাভ করে এবং পাকিস্তানে মার্কিন স্বার্থ রক্ষার জন্য রক্তাক্ত শিয়া-সুন্নি বিরোধ উসকে দেয়। মুসলমানদের ঐক্যে সাম্রাজ্যবাদী স্বার্থে বিভাজন ঘটানোর জন্য মওলানা মওদুদী লাহোরে যে শিয়া ও আহমদিয়াবিরোধী দাঙ্গার উসকানি দেন, তাতে ৫০ হাজার মুসলমান নিহত হয়। এই দাঙ্গা ঘটানোর দায়ে আদালতের বিচারে মওলানা মওদুদীর মৃত্যুদণ্ডাদেশ হয়েছিল। রিয়াদ ও ওয়াশিংটনের অনুরোধে সে দণ্ড মওকুফ করা হয়।

সাবেক পূর্ব পাকিস্তান ও বর্তমান বাংলাদেশেও জামায়াতের একই ভূমিকা। তৎকালীন পশ্চিম পাকিস্তানে জামায়াত নেতা মওদুদী আহমদিয়াবিরোধী দাঙ্গায় ৫০ হাজার স্বধর্মের মানুষ হত্যা করেছেন, আর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষ যখন (সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশই মুসলমান) স্বাধীনতার আন্দোলনে নেমেছে, তখন মওলানা মওদুদীর উপযুক্ত শিষ্য গোলাম আযম এই আন্দোলন দমনে আগত পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীকে ৩০ লাখ বাঙালি হত্যা ও চার লাখ নারী ধর্ষণ ও নির্যাতনের কাজে সহায়তা জুগিয়েছেন।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরও জামায়াত তার একাত্তরের বর্বরতার জন্য ক্ষমা চায়নি, নিজেদের অপরাধ স্বীকার করেনি, দলের চরিত্র সংশোধন করেনি। বরং ক্ষমতালোলুপ এক জেনারেলের দ্বারা গঠিত দলের সঙ্গে হাত মিলিয়ে ক্ষমতায় বসে দেশটির মুক্তিযুদ্ধের আদর্শগুলো ধ্বংস করার ও ক্ষমতার বাইরে থাকার সময়েও হাতকাটা, রগকাটার যে রাজনীতি শুরু করেছিল এবং পেট্রলবোমায় সাধারণ মানুষ হত্যার যে নজির সৃষ্টি করেছে, তাকে বর্বরতা ছাড়া আর কিছু বলা যায় না।

সাবেক পশ্চিম পাকিস্তানে মওদুদীর আহমদিয়া নিধন আন্দোলনের মতো সাবেক পূর্ব পাকিস্তানে এবং বর্তমান বাংলাদেশে তাঁর শিষ্য গোলাম আযম আহমদিয়াবিরোধী সন্ত্রাসী আন্দোলন শুরু করতে চেয়েছিলেন। আহমদিয়াদের অমুসলমান ঘোষণার চেষ্টা হয়েছে। তাদের ওপর হামলা হয়েছে। তাদের মসজিদ ধ্বংস করা হয়েছে। বিএনপি ছিল জামায়াতের এই ধ্বংসাত্মক নীতির সহায়ক। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর আহমদিয়া সম্প্রদায় নিরাপত্তা পায়।

উপমহাদেশে জন্মলগ্ন থেকে জামায়াতের কোনো সাম্রাজ্যবাদবিরোধী ভূমিকা নেই, সন্ত্রাসবিরোধী রাজনীতি নেই। মধ্যপ্রাচ্যে মুসলিম দেশগুলোতে পশ্চিমা দেশগুলোর ধ্বংসযজ্ঞের কোনো প্রতিবাদ নেই। বরং তাদের রাজনীতির ইতিহাস স্বদেশি ও স্বধর্মীদের নির্যাতন ও নিধনের ইতিহাস। এটা এখন ওপেন সিক্রেট ইসরায়েলের বর্বর গোয়েন্দা সংস্থা মোসাদ সৌদি আরবের ইরান ও সিরিয়াবিরোধী নীতি নির্ধারণ করে। তারা এখন জামায়াতেরও পরামর্শদাতা। বাংলাদেশে এক প্রখ্যাত রাজনৈতিক নেতার ঘরেই মোসাদের এজেন্টের অনুপ্রবেশ ঘটেছে। একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বানচাল করার জন্য মোসাদের এজেন্টরা লন্ডন, দিল্লি ও ঢাকায় জামায়াত ও বিএনপি নেতাদের সঙ্গে গোপন বৈঠক করেছে এবং তাদের অনুগৃহীত বিদেশের বড় বড় আইনজীবী ও বুদ্ধিজীবী দ্বারা ঢাকার আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালকে হেয় এবং ট্রাইব্যুনালকে প্রশ্নবিদ্ধ করার চেষ্টা করেছে, বিশ্বময় প্রোপাগান্ডা চালিয়েছে।

উপমহাদেশে এই চেহারা ও কর্মকাণ্ড যে জামায়াতের, ৩০ লাখ মানুষ হত্যায় যারা জড়িত ছিল তারা মিসর, তুরস্ক, মরক্কো, তিউনিসিয়ার মতো নাম পাল্টে সামরিক সাফল্য অর্জন করতে পারবে, তা মনে করার কোনো কারণ নেই। গত ৩০ ডিসেম্বর বিএনপির কাঁধে চড়েও নির্বাচনে গো-হারা হারার পর চতুর জামায়াতিদের মধ্যে এই বোধোদয় হয়েছে। কিন্তু কট্টরপন্থীদের মধ্যে এই বোধোদয় হয়নি।

সোভিয়েত ইউনিয়নের বিলুপ্তি এবং সেখানে কমিউনিস্ট পার্টির ভাঙনের সময় যেমন দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টির (বাংলাদেশেও) বিলুপ্তি ঘটিয়ে নতুন নামে দল গঠনের জোয়ার দেখা দিয়েছিল, বাংলাদেশে জামায়াতিদের বেলায়ও সেই জোয়ারের আভাস দেখা যাচ্ছে। সেই সময় নাম পাল্টানোর সমর্থক কমিউনিস্ট নেতাদের একটা অংশ কার্ল মার্ক্সকে ছেড়ে ড. কামাল হোসেনের হাতে বায়াত নিয়েছিল। তাদের আজ ‘না ঘরকা না ঘাটকা’ অবস্থা। আর যাঁরা কট্টরপন্থী দলের পুরনো নাম আঁকড়ে ধরে আছেন, তাঁদের এখন হারাধনের দশটি ছেলের অবস্থা।

জামায়াতের মধ্যে এটা সবাই বোঝেন, একাত্তরের ভূমিকার জন্য ক্ষমা প্রার্থনা এবং সংগঠনের চেহারা-চরিত্র বদল করা বহু আগেই উচিত ছিল। এবং বিএনপির সঙ্গে জোট বাঁধা তাদের উচিত হয়নি। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয় এই বোধোদয় আরো স্পষ্ট করেছে। দলের কট্টরপন্থীরা তবু এই ভুলটাকে আঁকড়ে ধরে থাকতে চান, দলের আরেক অংশ একাত্তরের অপরাধের কথা স্বীকার করে দেশবাসীর কাছে ক্ষমা চেয়ে নতুন নামে দল গঠন করতে চায়। দলের ভেতরে এই মতবিরোধ এখন প্রকাশ্য হয়ে গেছে সংগঠনের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাকের পদত্যাগের ফলে।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক তাঁর পদত্যাগের দুটি বড় কারণ হিসেবে বলেছেন, ‘জামায়াত ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার জন্য জনগণের কাছে ক্ষমা চায়নি এবং একবিংশ শতকের বাস্তবতার আলোকে ও অন্যান্য মুসলমান সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের রাজনৈতিক পরিবর্তনকে বিবেচনায় এনে নিজেদের সংস্কার করতে পারেনি।’ তিনি দাবি করেছেন, তিনি বহুদিন ধরে চেষ্টা করে আসছেন, দল একাত্তরের অপরাধ স্বীকার করে জনসাধারণের কাছে ক্ষমা চাক এবং দলের সাংগঠনিক সংস্কার করা হোক।

ব্যারিস্টার রাজ্জাকের এই বোধোদয় যদি হয়ে থাকে, তবে এটাকে বিলম্বিত বোধোদয় বলতে হবে। আমার ধারণা, এটা বোধোদয় নয়, এটা দলকে ও নিজেকে রক্ষার জন্য একটা নতুন কৌশল। জামায়াত-রাজনীতি বাংলাদেশে সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছে। তাই সাপের মতো খোলস পাল্টে জামায়াত তার পুরনো নীতি ও লক্ষ্য হাসিল করতে চায় নতুন নামে ও নতুন চেহারায়।

ব্যারিস্টার রাজ্জাক কাদের ধাপ্পা দেবেন? জামায়াত বাংলাদেশে গণহত্যায় শরিক হয়েছে ১৯৭১ সালে। তিনি জামায়াতি রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন ১৯৮৬ সালে। এই ১৫ বছর কি তাঁর মনে জামায়াতের এই অপরাধের কথা একবারও মনে পড়েনি? মনে পড়ে থাকলে তিনি এই অপরাধীদের কার্যকলাপের নিন্দা ও বিরোধিতা না করে ২০১০ সালে তাদের প্রধান আইনজীবী হিসেবে কী করে আদালতে দাঁড়ান?

শুধু আদালতে দাঁড়ানো নয়, এই অপরাধীদের শাস্তির হাত থেকে রক্ষার জন্য বিদেশে প্রোপাগান্ডা ও নানা ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য অর্থ সংগ্রহ ও বিদেশিদের সমর্থন আদায়ে প্রকাশ্যে ও গোপনে নানা তৎপরতা চালান? এটা তো স্পষ্ট, একাত্তরের যুদ্ধাপরাধীদের—বিশেষ করে কাদের মোল্লার ফাঁসির পর (২০১৩) চরম হতাশ এই নেতা দেশ ছাড়েন এবং এই হতাশা ও ব্যর্থতাই তাঁর বর্তমানের দল ত্যাগের আসল কারণ। এখন তিনি আর দল করবেন না, নতুন দলও গঠন করবেন না এবং আইনজীবীর পেশায় ফিরে এলেন বলে যতই কথা বলুন, তা কি লোকে সহজে বিশ্বাস করবে?

আমার একটি ধারণা, ব্রিটিশ ক্যাপিটালিস্ট এবং তাদের প্রভাবিত এস্টাবলিশমেন্ট যেমন একসময় লেবার পার্টি ভেঙে সোশ্যাল ডেমোক্র্যাট দল গঠন করেছিল, তেমনি বাংলাদেশের জামায়াতের দেশি-বিদেশি বিগ ফিন্যানসিয়াররাও এখন বুঝতে পেরেছেন বাংলাদেশে জামায়াতের রাজনীতির কোনো ভবিষ্যৎ নেই। তা ছাড়া অচিরেই দেশটিতে জামায়াত হয়তো নিষিদ্ধ হবে। সুতরাং সময় থাকতে পুরনো ডাল ছেড়ে নতুন ডাল ধরা আবশ্যক। তাই মিসর ও তুরস্কের উদাহরণ দিয়ে নতুন বোতলে পুরনো মদ বিক্রি করতে চান। তাঁরা হয়তো ভুলে গেছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে জামায়াতের বিদেশি হানাদারদের সঙ্গে মিশে ৩০ লাখ মানুষ হত্যার বর্বরতার ইতিহাস নেই। তাই নাম পাল্টে সুবিধা করতে পেরেছে। কিন্তু বাংলাদেশে জামায়াতের এই অপরাধ ঢাকার কোনো উপায় আছে কি? দেশটির মানুষের স্মৃতিশক্তি এতই দুর্বল কি?

বাংলাদেশে কমিউনিস্ট পার্টির একাংশ যেমন নাম পাল্টেও সুবিধা করতে পারেনি, জামায়াতও পারবে না। অনেকের সন্দেহ, যুদ্ধাপরাধী মীর কাসেম আলী এখন নেই। এখন ব্যারিস্টার রাজ্জাকের মাধ্যমে বিপুল অর্থায়ন দ্বারা নতুন নামে জামায়াতকে চাঙ্গা করে তোলার চেষ্টা করা হবে। রাজ্জাক সাহেব এখন যতই সে সম্ভাবনা অস্বীকার করুন, তবে আমার ধারণা, বিভক্ত পুরনো নামের এবং নতুন নামের জামায়াত-কমিউনিস্ট পার্টিও তাদের নেতাদের মতো নামসর্বস্ব দল ও নেতা হয়ে থাকবে। নামের খসম আজিজ মিছিরের মতো। তার আগে জামায়াত নামটি ও দলটি যদি বাংলাদেশে নিষিদ্ধ হয়, তাহলে একটি আন্ডারগ্রাউন্ড দল হিসেবে কোনোভাবে টিকে থাকবে।

আর/০৮:১৪/২৭ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে