Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বুধবার, ২১ আগস্ট, ২০১৯ , ৬ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (12 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৪-২০১৯

'ছন্দ ছিল আমার রক্তে'

'ছন্দ ছিল আমার রক্তে'

২০১১ সালের ১১ জুলাই ছিল আল মাহমুদের ৭৫তম জন্মদিন। জন্মদিনের আগে এক নিবিড় কথোপকথনে আল মাহমুদ নিজেকে অনেকখানি প্রকাশ করেছিলেন। কথোপকথনটির পুনর্পাঠ।  সাক্ষাৎকার নিয়েছেন মাহবুব আজীজ

আল মাহমুদের জন্ম ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মৌড়াইল গ্রামের মোল্লাবাড়িতে। সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় কিশোর গল্প 'তিতাস চরের ছেলে' [সত্যযুগ পত্রিকায় প্রকাশিত] দিয়ে তাঁর আত্মপ্রকাশ। ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের পক্ষে কবিতা লিখে গ্রেফতারি পরোয়ানার শিকার হয়ে পালিয়ে বেড়ান। সে সময় তিনি দশম শ্রেণির ছাত্র। 

দৈনিক মিল্লাত, কাফেলা ও ইত্তেফাকে দীর্ঘকাল সাংবাদিকতা করেন। প্রকাশনা কর্মকর্তা হিসেবে বইঘর প্রকাশনী সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশ নেন। স্বাধীনতার পর 'গণকণ্ঠ' সম্পাদক হিসেবে সাহসী ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭৪ সালে গ্রেফতার হয়ে কারাভোগ করেন ১ বছর। ১৯৭৫ সালে জেল থেকে মুক্তি পেয়ে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির প্রকাশনা বিভাগে নিযুক্ত হন। ১৯৯৩ সালে অবসর গ্রহণ করেন। 

আধুনিক বাংলা কবিতার অন্যতম প্রধান কবি আল মাহমুদ একাধারে গল্প, উপন্যাস রচনাতেও স্বতঃস্ম্ফূর্ত প্রতিভার পরিচয় দিয়েছেন। তবে কবিতার ক্ষেত্রে তাঁর নিজস্ব বলয় সমগ্র বাংলা সাহিত্যের প্রেক্ষাপটেই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার তিরিশি প্রবণতার সঙ্গে ভাটি বাংলার জনজীবন, গ্রামীণ দৃশ্যপট, নদীনির্ভর বেঁচে থাকা, প্রান্তিক মানুষের কর্মমুখর প্রাণধর্ম ও নর-নারীর চিরকালীন প্রেম-বিরহকে কবিতার বিষয় হিসেবে নির্বাচন করেছেন। তাঁর কাব্যগ্রন্থ 'লোক লোকান্তর' [১৯৬৩], 'কালের কলস' [১৯৬৬], 'সোনালী কাবিন' [১৯৭৩], 'মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো' [১৯৭৬], 'অদৃষ্টবাদীদের রান্নাবান্না' [১৯৮০], 'বখতিয়ারের ঘোড়া' [১৯৮৫], 'আরব্য রজনীর রাজহাঁস' [১৯৮৭], 'প্রহরান্তের পাশফেরা' [১৯৮৮], 'একচক্ষু হরিণ' [১৯৮৯], 'মিথ্যাবাদী রাখাল' [১৯৯৩], 'উড়াল কাব্য' [২০০৩] ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য। 

১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পরপর পত্রপত্রিকায় তাঁর গল্প প্রকাশিত হতে শুরু করে। উল্লেখযোগ্য গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে 'পানকৌড়ির রক্ত' [১৯৭৫], 'সৌরভের কাছে পরাজিত' [১৯৮৩], 'গন্ধবণিক' [১৯৮৮], 'ময়ূরীর মুখ' [১৯৯৪], 'নদীর সতীন' [২০০৪] ইত্যাদি। তাঁর উপন্যাসের মধ্যে 'ডাহুকী' [১৯৯২], 'কাবিলের বোন' [১৯৯৩], 'উপমহাদেশ' [১৯৯৩], 'কবি ও কোলাহল' [১৯৯৩], 'নিশিন্দা নারী' [১৯৯৫], 'আগুনের মেয়ে' [১৯৯৫], 'চেহারার চতুরঙ্গ' [২০০১] উল্লেখযোগ্য।

২.

আল মাহমুদের ৭৫তম জন্মবার্ষিকী সামনে রেখে তাঁর সঙ্গে একটি অন্তরঙ্গ কথোপকথনের পরিকল্পনার পর এই সত্য মেনে নিতেই হয় যে- তিনি বেশ অসুস্থ; কথা বলতে মাঝে মাঝে কষ্ট হয়। অবশ্য এ কথাও মানতে হয় যে, তাঁর বুদ্ধি এখনও প্রখর, স্মৃতিও সচল, প্রকাশভঙ্গিতেও আগের সেই দৃঢ়তা অলভ্য নয়। তবে বয়সের ঝাপসা কুয়াশা তাঁকে ক্রমেই আরও আচ্ছন্ন করে চলেছে; আমরা আষাঢ়ের এক সকালে 'অনিবার্য সেই কুয়াশা' সরিয়ে কবির সঙ্গে অন্তরঙ্গ কথোপকথন শুরু করি...

৩.
 
-মাহমুদ ভাই, সামনেই আপনার ৭৫তম জন্মদিন। এই দীর্ঘ ও পরিণত পথপরিক্রমার এই পর্যায়ে আপনার সাম্প্রতিক ভাবনা কী? যেসব কাজ করতে চেয়েছিলেন আপনি, এর কতটুকু করতে পেরেছেন বলে মনে করেন? 
 
--জীবনের দীর্ঘ পথপরিক্রমায় কিছু কাজ আমি করেছি। হয়তো আমার ইচ্ছানুযায়ী হয়নি; সেসব কাজ কাছাকাছি হয়েছে।
 
-এ ক্ষেত্রে আপনার কাজের কোন ক্ষেত্রকে প্রধান বিবেচনা করবেন- কবিতা, না কথাসাহিত্য?
 
--হ্যাঁ, আমি এ ক্ষেত্রে কবিতাকেই প্রাধান্য দেব। আমি চাই, কবি আল মাহমুদ পরিচয় চিরকাল বেঁচে থাকুক। সেটাই হওয়া উচিত। 
 
-আমরা জানি, কবির অনুভূতি সাধারণের চেয়ে তীক্ষষ্ট হয়। জীবনের এই প্রান্তে পরিণত বয়সে এসে আপনার বাবা-মায়ের কথা কি মনে পড়ে?
 
--বাবা-মায়ের কথা তো অবশ্যই মনে পড়ে। যখন স্মরণ করি তখন মনে পড়ে। 
 
-কখন বেশি মনে পড়ে? স্নেহানুভূতির অভাব যখন বোধ করেন তখন, না অন্য কোনো সময়ে?
--এ কথা সত্য- যখন স্নেহের অভাব বোধ করি তখন তো মনে পড়েই, আর এমনিতেও বাবা-মায়ের কথা মনে হয়। 
 
-আপনার ছেলেবেলার বন্ধুদের সম্পর্কে আমরা আপনার রচনার মাধ্যমে জেনেছি। ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে কি যোগাযোগ হয়? 
 
--আমার ছেলেবেলার বন্ধুদের সঙ্গে এখন আর যোগাযোগ নেই। তাদের অনেকেই বেঁচে নেই। কেউ হয়তো বেঁচে আছেন। তবে কারও সঙ্গেই এখন যোগাযোগ নেই। অনেক দিন যাইও না।
 
-শেষ কবে গিয়েছিলেন আপন শৈশবের এলাকায়? 
 
--শেষ কবে গিয়েছিলাম, এখন ঠিক মনে করতে পারছি না। 
 
-মাহমুদ ভাই, এবার আপনার সৃষ্টির প্রসঙ্গে আসি। আপনার প্রথম তিনটি বই 'লোক লোকান্তর', 'কালের কলস' আর 'সোনালী কাবিন'। আপনি এই তিনটি কাব্যগ্রন্থের মাধ্যমে বেশ তরুণ বয়সেই বাংলা সাহিত্যে সেরাদের কাতারে চলে এসেছিলেন। সেই সেরা হয়ে ওঠার প্রস্তুতি পর্বে কারা আপনার বন্ধু ছিলেন? 
 
--তখনকার কবি-সাহিত্যিকরাই আমার বন্ধু ছিলেন। শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী আমার ভালো বন্ধু ছিলেন। এক কথায় বলা চলে, সে সময় যারা ভালো লিখতেন- সবাই আমার ভালো বন্ধু ছিলেন।
 
-আপনার প্রথম ৩টি বই যে ধারার, লোকজ উপাদান সমৃদ্ধ, যা সেকালে সমকালীন অন্য কোনো কবির মাঝে ছিল না। এই লোকজ উপাদান ব্যবহারের কৌশল আবিস্কার করলেন কীভাবে? কারও কোনো প্রভাব ছিল এ ক্ষেত্রে? 
 
--কবিতায় লোকজ উপাদান ব্যবহার করা আমার স্বভাবের মাঝেই ছিল। কারও প্রভাব ছিল না এ ক্ষেত্রে। 
 
-আপনি কি ইংরেজি কবিতা পড়তেন সে সময়? কোনো কবির কি প্রভাব ছিল না সে সময় আপনার ওপর? 
 
--আমি সব সময়ই ইংরেজি কবিতা পড়তাম। তবে কারও প্রভাব ছিল না আমার কবিতার ওপর। 
 
-দু'একজন প্রিয় কবির নাম বলবেন? 
 
--এখন ঠিক মনে করতে পারছি না তেমন কারও নাম। 
 
-খেয়াল করেছি, আপনি অনেক কিছুই মনে করতে পারেন না এখন বা আরও ভালোভাবে বললে মনে করতে চান না। কিন্তু এ বয়সে এসেও আপনি ঠিকই ছন্দে কবিতা লিখছেন। আমাদের কি বলবেন এ ব্যাপারে? 
 
--ছন্দ আমার রক্তের মাঝেই ছিল। তা-ই কবিতা হয় হয়তো। আসলেই ছন্দ ছিল আমার রক্তে। 
 
-কবির ছন্দবুদ্ধি বা ছন্দে লেখার ক্ষমতা কি আপনা থেকেই হয়? নাকি এটা চর্চার ব্যাপার? আপনার অসাধারণ ছন্দবোধের নেপথ্য প্রেরণা বলবেন? 
 
--ছন্দ কিছুটা চর্চার ব্যাপার। আর অনেকটা আপনা থেকেই হয়ে যায়। আমাকে তেমন কেউ ছন্দ শেখায়নি। ছন্দ আমার মাঝেই ছিল। ছন্দ আপনা থেকেই এসেছে আমার মাঝে। 
 
-আপনি কি স্বভাব কবিত্বে বিশ্বাস করেন? আপনা থেকে হয়ে ওঠা তো স্বভাব কবির বৈশিষ্ট্য। 
 
--স্বভাব কবি বলতে যা বোঝায়, আমি তা নই। 
 
-আপনি বলতে চাইছেন, চিরকালীন কবি ও কবিতার যে পরম্পরা, ছন্দ তার মাঝে বিদ্যমান; পরবর্তী সময়ে পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতায় তা পুষ্ট হয়। গদ্যের ক্ষেত্রেও কি এ কথা বলবেন? আপনি গদ্যে, না ছন্দে লিখে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন? 
 
--গদ্যের নিজস্ব ঢং আছে, স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য আছে। আমি ছন্দে লিখেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করতাম। এখনও করি। 
 
-কোন ছন্দে আপনি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন?
 
--অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, স্বরবৃত্তই আমার প্রিয়। 
 
-ছন্দ যে আলাদা হয়- এগুলো জেনেই কি কবিতা লিখতে শুরু করেন, না লিখতে লিখতে শিখেছেন? 
 
--আমি কবিতা লিখতে লিখতেই ছন্দ শিখেছি। 
 
-আপনি কি কৈশোরেই বুঝতে পেরেছিলেন- কবি হওয়াই আপনার নিয়তি? 
 
--জানি না কবে বুঝতে পেরেছিলাম, তবে এই শহরে আমি কবিতা লিখতেই এসেছিলাম- এটা মনে পড়ে। 
 
-আপনার কবিতায় বাস্তব জীবনের অনেক চরিত্রের সন্নিবেশ দেখতে পাই আমরা। যেমন 'মেয়েটির নাম রোজেনা', 'চুল খোলা আয়েশা আক্তার'। বাস্তব কি রূপান্তরিত হয়েছে কাব্যে? নাকি সরাসরিই এসেছে? 
 
--এটাও স্বভাবের দ্বারাই ঘটেছে। থাক না কৌতূহল। সব জানানোর দরকার কী! 
 
-আপনার রচনায় রসবোধের ব্যবহার আমরা বরাবর দেখি। একটা উদাহরণ দিই- 'সপ্তাহে সাতটা চুম্বন থেকে পাঁচটা বাদ গেলে বিয়োগ ফল যে কত মর্মান্তিক হয় তা তুমি বুঝিয়ে না দিলেও ওগো শিক্ষয়িত্রী, আমি তা বুঝি।' এই রসবোধ আপনার গদ্যে এমনকি চিঠির মাঝেও দেখতে পাই আমরা। এটাও কি স্বভাবগত বলবেন? নাকি জীবনকে ভালোবাসতে গিয়ে আস্তে আস্তে এসে গেছে? 
 
--এটাও স্বভাবের অন্তর্গত। 
 
-কিছু চর্চা, অনুশীলন, বই পড়া তো থাকে এ ক্ষেত্রে নিশ্চয়ই? 
 
--তা তো থাকেই। 
 
-তরুণ কবিদের জন্য কিছু যদি বলতেন? 
 
--নিয়মিত পাঠের পাশাপাশি চর্চাও চালিয়ে যেতে হবে। কল্পনাকে ছড়িয়ে দিতে হবে, যতদূর সে যেতে চায়- ততদূর। 
 
-আপনার সময় কাটে কীভাবে এখন? 
 
--টিভি দেখে, পত্রিকা পড়ে। পত্রিকা তো আমি নিজে পড়তে পারি না। কেউ পড়ে শোনায়।
 
-টেলিফোনে কি কারও সঙ্গে যোগাযোগ হয়? শহীদ কাদরী, তার সঙ্গে কথা হয়? 
 
--মাঝে মধ্যে যোগাযোগ হয়। 
 
-বুদ্ধদেব বসুর পত্রিকায় আপনার কবিতা ছাপা হয়েছিল। আপনি জেলে বসে তাকে নিয়ে তার মৃত্যুর পর কবিতাও লিখেছিলেন। বুদ্ধদেব বসুর সঙ্গে দেখা হওয়ার স্মৃতির বিষয়ে কিছু বলবেন? 
 
--এক-আধবার দেখা হয়েছিল তার সঙ্গে। আমাকে স্নেহ করতেন। সম্পাদক হিসেবে, তিনি তরুণ কবিদের শিক্ষক ছিলেন। 
 
-সোনালী কাবিনের পর কবি আল মাহমুদের বিশ্বাসজনিত কিছু পরিবর্তন এসেছে। ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিশ্বাসের পরিবর্তনে কবি হিসেবে আপনার কোনো ক্ষতি হয়েছে বলে মনে করেন? 
 
--আমার কোনো ক্ষতি হয়নি বলে আমি মনে করি। 
 
-একজন সৃজনশীল মানুষ হিসেবে অসাম্প্রদায়িক প্রাণধর্ম থেকে সরে এসে আপনি ধর্মানুরাগী হলেন... 
 
--আমি সব সময়ই অসাম্প্রদায়িক ছিলাম। এখনও আমি অসাম্প্রদায়িক। 
 
-আপনি তাহলে বলতে চাইছেন- ধর্মবিশ্বাসের সঙ্গে অসাম্প্রদায়িকতার কোনো বিরোধ নেই? 
 
--ধর্মবিশ্বাস কখনও সাম্প্রদায়িকতাকে উস্কে দেয় না। 
 
-বাংলাদেশ যদি ইসলামী রাষ্ট্র হয়; তাহলে কীভাবে অন্য ধর্মের প্রতি সহনশীলতা বজায় থাকবে?
 
--বাংলাদেশ ইসলামী রাষ্ট্র হোক- আমি তো কখনও তা বলিনি। আমি বিশ্বাসের কথা বলেছি। 
 
-আপনি লিখেছেন- 'আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বণ্টন'। এক সময় তো আপনি অবিশ্বাসী ছিলেন। অবিশ্বাসী থেকে বিশ্বাসী হলেন কীভাবে?
 
--আমি ব্যক্তিজীবনে প্রথমদিকে ধর্মীয়ভাবে বিশ্বাসী ছিলাম কিছুটা। সেটাই পরবর্তীকালে প্রভাব রেখেছে হয়তো। 
 
-'সোনালী কাবিন' কাব্যগ্রন্থে আপনি প্রাণধর্মে বিশ্বাসী। পরবর্তীকালে আপনি লিখেছেন- 'মায়াবী পর্দা দুলে ওঠো', 'প্রহরান্তে পাশফেরা', 'বখতিয়ারের ঘোড়া'। আপনি বখতিয়ারের ঘোড়ায় চেপে পাশ ফিরেছেন। এই বিশ্বাসচ্যুতি কেন? কিছু কি মনে পড়ে? 
 
--এখন আর কিছু মনে পড়ে না আমার।
 
-আপনি কি কোনো রাজনীতির শিকার হয়েছিলেন? কিংবা আপনার অজান্তে আপনার সমসাময়িক কবিরা কি কোনো চক্রান্ত করেছিল?
 
--এতে কবির কোনো ক্ষতি হয় না বলে আমি মনে করি। আমি আমার স্বাভাবিক লেখাই লিখে গিয়েছি সব সময়। 
 
-আপনাকে তো একঘরে করে ফেলা হয়েছিল। বলা হতো, আপনি একটি বিশেষ সম্প্রদায় বা দলের কবি। আপনি কি নিঃসঙ্গবোধ করেন না? 
 
--এগুলো বাজে কথা এবং আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র। আমি কোনো সম্প্রদায় বা দলের কবি ছিলাম না কখনও। 
 
-মৃত্যুর পরের জীবনে কি আপনার বিশ্বাস বা আস্থা আছে? 
 
--এগুলো মানুষের স্বাভাবিক বিশ্বাস। 
 
-এই বিশ্বাস কি মানুষের অনিশ্চিত জীবনকে সামনে রেখেই তৈরি হয় না?
 
--আসলে এসব বাজে কথা। কোনো দাম নেই। 
 
-আপনি এসব বিষয়ে ভাবেন না তাহলে। মৃত্যুকে ভয় পান আপনি? 
 
--না, মৃত্যুকে ভয় পাই না আমি। 
 
-কেন ভয় পান না? মৃত্যুর পর আপনি আর প্রকৃতি দেখতে পাবেন না, কবিতা লিখতে পারবেন না। এই যে এত মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছেন, তা পাবেন না- খারাপ লাগে না তখন? 
 
--এ ধরনের কোনো মোহ আমার নেই। 
 
-জীবনে অনেক প্রেমে পড়েছেন, অনেক প্রেমের কবিতা লিখেছেন। যখন নতুন কোনো প্রেমে পড়েছেন তখন কি পুরনো প্রেম ভুলে গিয়ে নতুন অনুভূতি নিয়ে লিখেছেন? 
 
--প্রেম হলো গভীর অনুভূতির ব্যাপার। কখনও কখনও মানুষের মনে জাগ্রত হয়।
 
-প্রেমের অনুভূতি কি আপনাকে আনন্দ দেয় এখনও?
 
--তা তো কিছুটা দেয় বটে। 
 
-পুরনো প্রেমিকাদের কারও সঙ্গে কি যোগাযোগ হয় আপনার এখন? টেলিফোনে কথা কিংবা সাক্ষাৎ হওয়া? 
 
--আসলে এসব থেকে অনেক দূরে সরে এসেছি আমি। 
 
-এ জন্য কি হাহাকার বোধ করেন? খারাপ লাগে? 
 
--হয়তো লাগে। এসব আমি ঠিক বুঝি না এখন। 
 
-আপনার কোন কাব্যগ্রন্থগুলোর জন্য মানুষ আপনাকে মনে রাখবে চিরকাল? 
 
--এখন আমি ঠিক মনে করতে পারি না। অনেক তো লিখেছি। 
 
-সোনালী কাবিনের নাম কি আলাদা করে বলবেন? বা সোনালী কাবিনে যে কাব্যবিশ্বাস, তার থেকে কি আপনি সরে এসেছেন? আপনি কি অস্বীকার করবেন সেসব?
 
--কেন আমি অস্বীকার করব? আমার বিশ্বাস আগের মতোই আছে। 
 -তাহলে কেন আপনাকে বলা হয় জামায়াতে ইসলামীর কবি? বিশেষ দলের কবি?
 
--আমি কখনোই জামায়াতে ইসলামীর কবি ছিলাম না। আর তারাও আমাকে তাদের দলভুক্ত করার কোনো চেষ্টা করেনি কোনো সময়। 
 
-আপনার সমসাময়িক কবি শামসুর রাহমানের সঙ্গে আপনার প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা ছিল বলে আমরা জানি। এ ব্যাপারে কিছু বলুন। 
 
--শামসুর রাহমান ব্যক্তি হিসেবে ভালো ছিলেন। সবাই বলে, আমাদের মাঝে প্রতিদ্বন্দ্ব্বিতা ছিল। প্রকৃত প্রস্তাবে আমাদের মাঝে কোনো সমস্যা ছিল না। 
 
-তিনি কি আপনার বন্ধুস্থানীয় ছিলেন? 
 
--আমরা বন্ধু তো ছিলাম বটেই। 
 
-আপনি একটি বইয়ের উৎসর্গপত্রে লিখেছেন- 'শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, ফজল শাহাবুদ্দীন, আমাদের অতীতকালের বন্ধুত্ব ও সাম্প্রতিক কাব্য হিংসা অমর হোক।' তাহলে কি আমরা বলব, কাব্য হিংসা ছিল? আশির দশকে এশীয় কবিতা পরিষদ বানানো এমন কিছু কাজে?
 
--কাব্য হিংসা ছিল আমরা বলি হয়তো। আসলে তেমন কিছু ছিল না আমাদের মাঝে।
 
-আপনার দীর্ঘ জীবনে পৃথিবীর অনেক দেশই ঘুরেছেন। কোন কোন দেশ ভালো লেগেছে আপনার? নাম কি বলতে পারবেন? 
 
--ইউরোপের দেশগুলোই ভালো লেগেছে। 
 
-কেন ভালো লেগেছে? তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতার কারণে? 
 
--হ্যাঁ। 
 
-তাহলে সে প্রশ্নই আবার চলে আসে। ধর্ম তো আমাদের নানা বিধিনিষেধের বেড়াজালে আটকে ফেলে। ইউরোপের সমাজ ধর্মকে ব্যক্তিজীবনে স্থান দেয় না বলে তারা স্বাধীন জীবনযাপন করে। আসলেই কি রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ধর্মবিশ্বাসের কোনো দরকার আছে? কী মনে করেন আপনি? 
 
--ধর্ম মানুষের ব্যক্তিগত বিশ্বাসের ওপর নির্ভরশীল। 
 
-আপনি তো মদ্যপান করতেন এক সময়? 
 
--আমি তেমনভাবে পান করিনি কোনো সময়। অসুস্থ বোধ করতাম। 
 
-আপনার স্ত্রীর সঙ্গে আপনার সম্পর্ক কেমন ছিল? প্রেমের, না মায়ার? 
 
--প্রেমের সম্পর্ক ছিল। 
 
-আর আপনার পছন্দের নারী? তাদের কোন দিক আপনাকে আকৃষ্ট করত- সৌন্দর্য, নাকি বুদ্ধিমত্তা? 
 
--আমি এ ব্যাপারে এখন কোনো মন্তব্য করতে চাই না।
 

-তরুণ কবিরা কি আসে আপনার কাছে কোনো বিষয়ে আলোচনা করতে? 
 
--খুব বেশি আসে না। মাঝে মধ্যে কেউ কেউ আসে। 
 
-আপনি কি কোথাও যান? 
 
--কোথাও যাই না বলতে গেলে।
 
-মাহমুদ ভাই, যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হচ্ছে। এ নিয়ে আপনার মতামত কী? 
 
--আমিও চাই যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হোক। 
 
-আপনার দীর্ঘ পথচলা শেষে ৭৫তম জন্মদিনের আগমুহূর্তে কারও প্রতি কি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে চান? পরিবারের সদস্য, কবি বন্ধু কিংবা আর কারও প্রতি? 
 
--এই মুহূর্তে আমার বাবা মৌলভী আবদুর রব, মা রওশন আরা বেগম আর স্ত্রী নাদিরা বেগমের কথাই মনে আসছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য অন্য কারও নাম তেমন মনে করতে পারছি না। 
 
-শেষ প্রশ্ন করছি মাহমুদ ভাই এখন। আপনি কী স্বপ্ন দেখেন বা কী করবেন সামনে? 
 
--'Waiting for Godo' ছাড়া আর তেমন কিছুই করছি না। তবে আমি জীবনকে ভালোবাসি। এই ভালোবাসার কথা জানানোর জন্যই আমি লিখি। 

৪.

...টানা কথা বলতে বলতে কবির কষ্ট বেড়ে যাচ্ছিল। তাঁর পিঠের পেছনে দুটো বালিশ দেওয়া হলো। তিনি বিছানায় দু'পা লম্বা করে মেলে দিলেন। দম নিতেও কষ্ট হতে শুরু করে তাঁর... বললেন, 'শরীরটা আসলেই খারাপ...' বলে চোখ বন্ধ করে নিশ্চুপ থাকলেন কয়েক মুহূর্ত। আমরা নিশ্চিত জানি, এ অবস্থাতেও তিনি নির্ভুল ছন্দে মুখে মুখে নতুন একটা চতুর্দশপদী তৈরির সামর্থ্য রাখেন। ...এই অমিত কবিত্ব শক্তিই সব প্রতিকূলতা ছাপিয়ে আল মাহমুদকে বাংলা ভাষায় চিরবরণীয় করেছে। 

এমএ/ ০৪:০০/ ২৪ ফেব্রুয়ারি

সাক্ষাতকার

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে