Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শুক্রবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৫ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২৩-২০১৯

'বঙ্গবন্ধু' উপাধির ৫০ বছর

তোফায়েল আহমেদ


'বঙ্গবন্ধু' উপাধির ৫০ বছর

প্রতি বছর ২৩ ফেব্রুয়ারি যখন ফিরে আসে, স্মৃতির পাতায় অনেক কথা ভেসে ওঠে। আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ এই দিনটিকে গভীরভাবে স্মরণ করি। ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারির পর থেকে বঙ্গবন্ধুর একান্ত সান্নিধ্য পেয়েছি। এবারে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি প্রদানের ৫০ বছর। দেখতে দেখতে অর্ধশত বছর পেরিয়ে গেল। প্রিয় নেতা তাঁর যৌবনের ১৩টি মূল্যবান বছর পাকিস্তানের কারাগারে কাটিয়েছেন। কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বসে যে নেতা প্রিয় মাতৃভূমি বাংলার ছবি হৃদয় দিয়ে এঁকেছেন, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে হাসিমুখে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই নেতাকে সেদিন জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি শুধু বাঙালি জাতিরই মহান নেতা ছিলেন না, সারাবিশ্বের নিপীড়িত মানুষের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নেতা ছিলেন।

আমাদের জাতীয় মুক্তিসংগ্রামের ইতিহাসে '৬৯-এর গণআন্দোলন এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। কালপর্বটি মহান মুক্তিযুদ্ধের 'ড্রেস রিহার্সেল' হিসেবে চিহ্নিত। জাতির মুক্তিসনদ ৬ দফা দেওয়ার কারণে বঙ্গবন্ধু মুজিবসহ সর্বমোট ৩৫ জনকে ফাঁসি দেওয়ার লক্ষ্যে 'রাষ্ট্র বনাম শেখ মুজিব ও অন্যান্য' তথা আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি করা হয় এবং নির্বিঘ্নে পুনরায় ক্ষমতায় আরোহণের এক ঘৃণ্য মনোবাসনা চরিতার্থে ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করে স্বৈরশাসক আইয়ুব খান। কিন্তু বাংলার মানুষ এর বিরুদ্ধে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বিক্ষুব্ধ মানুষকে দমাতে সরকার সান্ধ্য আইন জারি করে। আমরা সান্ধ্য আইন ভঙ্গ করে রাজপথে মিছিল করি এবং ২০ ফেব্রুয়ারি সমগ্র ঢাকা নগরীকে মশাল আর মিছিলের নগরীতে পরিণত করি। ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসে পল্টনের মহাসমুদ্রে আমরা ১০ ছাত্রনেতা প্রিয় নেতা শেখ মুজিবসহ আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় আটক সবার নিঃশর্ত মুক্তির দাবিতে স্বৈরশাসকের উদ্দেশে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম প্রদান করি। সমগ্র দেশ গণবিস্টেম্ফারণে প্রকম্পিত হয়। জনরোষের ভয়ে ২২ ফেব্রুয়ারি আইয়ুব খান আগরতলা মামলা সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করে বঙ্গবন্ধুসহ সব রাজবন্দিকে নিঃশর্ত মুক্তি দিলে দেশজুড়ে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়। প্রিয় নেতাকে কারামুক্ত করার মধ্য দিয়ে শপথ দিবসে প্রদত্ত স্লোগানের প্রথমাংশ 'মুজিব তোমায় মুক্ত করবো' এবং '৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধে হাতিয়ার তুলে নিয়ে যুদ্ধ করে প্রিয় মাতৃভূমিকে হানাদারমুক্ত করে স্লোগানের দ্বিতীয়াংশ 'মাগো তোমায় মুক্ত করবো' বাস্তবায়ন করেছিলাম।

ঐতিহাসিক ২৩ ফেব্রুয়ারি শুধু আমার জীবনে না, সমগ্র বাঙালি জাতির জীবনে এক ঐতিহাসিক দিন। কারণ এই দিনটিতে, যে নেতা কারাগারের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বছরের পর বছর কাটিয়েছেন, বারবার ফাঁসির মঞ্চে গিয়েছেন, সেই প্রিয় নেতাকে আমরা কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি দিয়েছিলাম। সেই সংবর্ধনা সভায় সভাপতিত্ব করার দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী আমি। ডাকসুর ভিপি থাকার কারণে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক, মুখপাত্র ও সমন্বয়ক ছিলাম। প্রতিটি সভায় সভাপতিত্ব করতাম। সভা পরিচালনা করতাম। অথচ অন্য যারা ছিলেন, তারা ছিলেন আমার চেয়েও বড় নেতা। সেদিনের সেই রেসকোর্স ময়দানের কথা আজ যখন ভাবি, তখন নিজেরই অবাক লাগে। আমার বয়স তখন ২৫ বছর ৪ মাস ১ দিন। এই অল্প বয়সে বিশাল একটি জনসভার সভাপতি হিসেবে প্রিয় নেতাকে, যাকে কেন্দ্র করে এই আয়োজন- 'তুমি' বলে সম্বোধন করে তাঁর আগেই বক্তৃতা করা, এটি আমার জীবনের এক ঐতিহাসিক ঘটনা। অবাক হই এই ভেবে যে, কী করে এটা সম্ভব হয়েছিল। আজকের সোহরাওয়ার্দী উদ্যান সেদিন ১০ লক্ষাধিক মানুষের উপস্থিতিতে কানায় কানায় পূর্ণ। সেই জনসমুদ্রের মানুষকে যখন জিজ্ঞাসা করেছিলাম, যে নেতা জীবনের যৌবন কাটিয়েছেন পাকিস্তানের কারাগারে, ফাঁসির মঞ্চে দাঁড়িয়ে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, সেই প্রিয় নেতাকে কৃতজ্ঞ বাঙালি জাতির পক্ষ থেকে কৃতজ্ঞচিত্তে একটি উপাধি দিতে চাই। ১০ লাখ মানুষ যখন ২০ লাখ হাত উত্তোলন করেছিল, সে এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। তখনই প্রিয় নেতাকে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধিতে ভূষিত করা হয়। পরবর্তীকালে এই উপাধিটি জনপ্রিয় হয়েছে, জাতির পিতার নামের অংশ হয়েছে এবং আজকে তো শুধু 'বঙ্গবন্ধু' বললেই সারাবিশ্বের মানুষ এক ডাকে চেনে।

নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু, মহাত্মা গান্ধী- রবীন্দ্রনাথ যাঁকে মহাত্মা উপাধি দিয়েছিলেন, দেশবন্ধু চিত্তরঞ্জন দাশ, শেরে বাংলা একে ফজলুল হকসহ পৃথিবীতে অনেকেই উপাধি পেয়েছেন। কিন্তু ফাঁসির মঞ্চ থেকে মুক্ত হয়ে, গণমানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে, এমন আনুষ্ঠানিকতার মধ্য দিয়ে কেউ উপাধি পাননি। সেদিন আমি বক্তৃতা শেষ করে 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি ঘোষণার পর এই প্রথম নাম ঘোষণা করলাম, এবার জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেবেন, বাংলার মানুষের নয়ণের মণি, পৃথিবীর নির্যাতিত-নিপীড়িত মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধু, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তিনি 'বঙ্গবন্ধু' হিসেবে এই প্রথম ভাষণ দিলেন। সে কী ভাষণ! স্মৃতির পাতায় আজও ভেসে ওঠে। এই ভাষণের শেষেই তিনি বলেছিলেন, 'আগরতলা মামলার আসামি হিসেবে আমাকে গ্রেফতার করে কারাগার থেকে মুক্তি দিয়ে পুনঃগ্রেফতার করে যখন ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাবে, তখন বুঝতে পেরেছিলাম যে, ওরা আমাকে ফাঁসি দেবে। তখন এক টুকরো মাটি তুলে নিয়ে কপালে মুছে বলেছিলাম, 'হে মাটি আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমাকে যদি ওরা ফাঁসি দেয়, মৃত্যুর পরে আমি যেন তোমার কোলে চিরনিদ্রায় শায়িত থাকতে পারি।' বক্তৃতার শেষে তিনি বলেছিলেন, 'রক্ত দিয়ে, জীবন দিয়ে তোমরা যারা আমাকে কারাগার থেকে মুক্ত করেছো, যদি কোনোদিন পারি নিজের রক্ত দিয়ে আমি সেই রক্তের ঋণ শোধ করে যাব।' তিনি একাই রক্ত দেননি, সপরিবারে বাঙালি জাতির রক্তের ঋণ তিনি শোধ করে গেছেন। তিনি চলে গেছেন, রেখে গেছেন তাঁর দুই কন্যা। জ্যেষ্ঠ কন্যার হাতে '৮১ সালের সম্মেলনে আমরা আওয়ামী লীগের পতাকা তুলে দিয়েছিলাম। স্বজন হারানোর বেদনা নিয়ে '৮১-এর ১৭ মে তিনি বাংলার মাটি স্পর্শ করেছিলেন। বঙ্গবন্ধুর দুটি স্বপ্ন ছিল। একটি বাংলাদেশের স্বাধীনতা; যা তিনি সম্পন্ন করেছেন। আরেকটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত সোনার বাংলা প্রতিষ্ঠা করা। সেই কাজটি তাঁরই সুযোগ্য কন্যা দক্ষতার সঙ্গে বাস্তবায়নের পথে এগিয়ে চলেছেন। বঙ্গবন্ধু চলে গেছেন; কিন্তু আমাদের জন্য রেখে গেছেন তাঁর গৌরবময় অমর কীর্তি।

আমার জীবনের সঙ্গে মিশে আছে '৬৮-এর ১৭ জানুয়ারির কথা। সেদিন আমি ডাকসুর ভিপি হই। সে রাতেই বঙ্গবন্ধু স্নেহমাখা এক চিঠিতে আমাকে উদ্দেশ করে লিখেছিলেন, 'জেলের মধ্যে বসে তোর ডাকসু নির্বাচনের খবর শুনে খুবই আনন্দিত হয়েছি। আমি বিশ্বাস করি, এবারের ডাকসু বাংলার মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠায় ঐতিহাসিক ভূমিকা পালন করবে।' ওই রাতেই শেষ প্রহরে বঙ্গবন্ধুকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামি হিসেবে গ্রেফতার করে ক্যান্টনমেন্টে নিয়ে যাওয়া হয়। চিঠিতে আমাকে উদ্দেশ করে বঙ্গবন্ধু যে আশাবাদ ব্যক্ত করেছিলেন, ডাকসু সত্যিকার অর্থেই সেই আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে সক্ষম হয়েছিল। এই দিনটার সঙ্গে আমার জীবন এমনভাবে মিশে আছে যে, প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে এই দিনটির কথা আমার মানসপটে ভেসে ওঠে। কত বড় একজন মহান নেতা, যিনি বাংলার মানুষের মুক্তির জন্য ৪৬৮২ দিন কারারুদ্ধ ছিলেন। সেই নেতার সঙ্গে থাকা, তাঁর স্নেহ-ভালোবাসা পাওয়া এ যে কত বড় সৌভাগ্যের ব্যাপার, আমি নিজে তা প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করি। তাই তো প্রতিদিন সকালে ঘুম ভাঙার পর নিচে নেমে পাঠকক্ষ ও ড্রইং রুমে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার যে স্মৃতিময় ছবি আছে, সেগুলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখি আর ভাবি,  পৃথিবীতে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এসেছেন, আরও আসবেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর মতো কেউ আসবেন না।

এত বড় মন। যিনি শত্রুরও দুঃখকষ্ট সহ্য করতে পারতেন না। এত বড় একজন হৃদয়বান মানুষ ছিলেন। আমি কাছে থেকে দেখেছি, কোনো মানুষকে তিনি কখনও অসম্মান করেননি। ছোটকে তিনি বড় করতেন এবং ছোটকে বড় করেই নিজে বড় হয়েছেন। মহৎ গুণাবলির অধিকারী 'বাঙালির বন্ধু' হিসেবে আস্থা অর্জনকারী, গরিব-দুঃখী-মেহনতি মানুষের বন্ধু এমন একজন মহান ব্যক্তিত্বের নামের অগ্রেই 'বঙ্গবন্ধু' উপাধি শোভনীয়। আজকের বাংলাদেশ অনেক উন্নতি করেছে, এগিয়েছে। একদা যে বাংলাদেশকে কিছু অর্থনীতিবিদ তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে বলতেন, 'বাংলাদেশ হবে দরিদ্র দেশের মডেল। বাংলাদেশ হবে তলাবিহীন ঝুড়ি।' আজকে তারাই বলেন, 'বিস্ময়কর উত্থান এই বাংলাদেশের।' এই যে উত্থান বাংলাদেশের, এর প্রত্যেকটির ভিত্তি বঙ্গবন্ধু স্থাপন করেছেন। আজ তিনি নেই আর কোনোদিন ফিরে আসবেন না। কিন্তু এই পৃথিবী যতদিন থাকবে, এই দেশের মাটি ও মানুষ যতদিন থাকবে, দেশের  মানুষের হৃদয়ের মণিকোঠায় জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অক্ষয় ও অমর হয়ে থাকবেন।

লেখক: আওয়ামী লীগ নেতা, সংসদ সদস্য, সভাপতি বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি।

আর/১১:১৪/২৩ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে