Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ , ৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-২১-২০১৯

হলুদ সাংবাদিকতার আদ্যোপান্ত

রাজ চৌধুরী


হলুদ সাংবাদিকতার আদ্যোপান্ত

ঢাকা, ২১ ফেব্রুয়ারি- আমাদের রোজকার জীবনের অন্যতম সঙ্গী হচ্ছে সংবাদপত্র। তবে অনেক সময় সংবাদপত্র কিছু মসলাদার শিরোনাম দিয়ে বেশ কিছু সংবাদ পাঠকদের কাছে অধিক পরিমাণে চটকদার করার চেষ্টা করে থাকে।

পাঠকরা শিরোনাম পড়েই সংবাদটির প্রতি আকৃষ্ট হন। কিন্তু পাঠকরা যখন তা পড়তে যান তখন দেখতে পান যে শিরোনামের সঙ্গে সংবাদের সামান্য সঙ্গতি নেই। এরই নাম হচ্ছে হলুদ সাংবাদিকতা। অর্থাৎ সহজ ভাষায় হলুদ সাংবাদিকতা হচ্ছে কোনো ভিত্তিহীন শিরোনাম দ্বারা পাঠকদের আকৃষ্ট করে সংবাদকে পণ্যের ন্যায় বিক্রি।

হলুদ সাংবাদিকতার ইতিহাস শতবর্ষ পুরনো। জোসেফ পুলিৎজার ও উইলিয়াম রেন্ডলফ হার্স্টের মধ্যকার দ্বন্দের পরিণতি হচ্ছে এই হলুদ সাংবাদিকতা। ইনারা দুজন বেশ কিছু ভিত্তিহীন ও অর্ধসত্য খবর তাদের পত্রিকায় ছাপিয়ে পত্রিকার পাঠকদের আকৃষ্ট করার মাধ্যমে তাদের পত্রিকা বিক্রির পরিমাণ বাড়ান।

কিশোর বয়সে রাস্তায় রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করা আর মানুষের দুঃখ-দুর্দশাকে কাছ থেকে দেখা পুলিৎজারের স্বপ্ন ছিল নিজের একটি পত্রিকা বের করার। সেখানে তিনি দরিদ্র মানুষের সংগ্রামের কথা লিখবেন এই ছিলো তার সংকল্প। তিনি সেন্ট লুইস পত্রিকায় প্রথম সাংবাদিকতা সুযোগ পান। সঠিক তথ্য যথাযথ উপস্থাপনের মাধ্যমে একই সঙ্গে সমাজের উঁচু শ্রেণীর মানুষ ও রাজনীতিকদের দুর্নীতি প্রকাশ করে পুলিৎজার অল্পদিনেই সংবাদপত্র জগতে পরিচিতি পেয়ে যান। এরপর খুব দ্রুতই একটি পত্রিকার মালিক হন তিনি।

১৮৮৩ সালে পুলিৎজার পাড়ি জমান যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কে এবং নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ড নামের একটি পত্রিকা কিনে নেন। সেই সময় নিউইয়র্কে নতুন অভিবাসীরা আসতে থাকেন। সেসব অভিবাসীদের জীবন চলছিলো বেকারত্ব ও দুর্দশায়। পুলিৎজার নিজেও ছিলেন একজন অভিবাসী। তিনি এসেছিলেন একদম ছোটকালে হাঙ্গেরি থেকে। তিনি ছোটবেলা রাস্তায় পত্রিকা বিক্রি করতেন। তাই একই অবস্থা থেকে উঠে আসা পুলিৎজার আশা করছিলেন এই অভিবাসী কর্মীদের খবর প্রকাশ করে তিনি পাঠকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন।

সে সময় সংবাদপত্রে শুধু সমাজের উচ্চস্তরের মানুষের খবর ছাপা হত। বেশিরভাগ পত্রিকাই রাজনৈতিক দল দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিল। তখনকার সংবাদপত্রগুলো ছিল খুবই বিরক্তিকর কারণ, তৎকালীন সংবাদপত্রের সংবাদের শিরোনাম থাকত না এবং সব সংবাদই একই রকম সাইজের হরফে ছাপা হতো। পুলিৎজার সর্বপ্রথম পত্রিকায় শিরোনামের ধারা প্রচলন করেন। মাত্র ছয় মাসের মধ্যেই পুলিৎজার পত্রিকা নিউইয়র্কে তিন গুণ বেড়ে গিয়ে পঁয়তাল্লিশ হাজারে পৌঁছায় এবং দেড় বছরের মাথায় এক লক্ষ গ্রাহক তার পত্রিকা পড়তে শুরু করে।

আবার ধনী পরিবারের প্রাচুর্য বেড়ে ওঠা হার্স্ট ছিলেন ছোটবেলা থেকেই উচ্চাভিলাসী। ১৮৮৭ সালে তার পিতার মালিকানাধীন পত্রিকার দায়িত্ব নেন, নিম্নমানের খবরের জন্য পত্রিকাটির ছিল খুবই খারাপ অবস্থা। তাই হার্স্ট পুলিৎজারের কৌশল অবলম্বন করে তার পত্রিকাতে শিরোনামের প্রবর্তন করেন। পুলিৎজারের মতো নতুন টাইপোগ্রাফির ব্যবহারও করেন তিনি। এভাবে তিনি তার পত্রিকাকে বাঁচিয়ে তুলেছিলেন।

এরপরে তিনি নিউইয়র্কে আসেন পুলিৎজারের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে। তবে তাদের একটা পার্থক্য ছিলো। পুলিৎজার আগ্রহী ছিলেন একটি বিশেষ পরিবর্তনে সমাজের খেটে খাওয়া মানুষকে তাদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে আর হার্স্টের আগ্রহ ছিল শুধুমাত্র আত্মোন্নয়ন এবং নিজেকে প্রভাবশালী করার। এজন্য হার্স্ট নিউইয়র্কে একটি পত্রিকা কিনে নেন। ঠিক সেইসময়ে পুলিৎজার নিউইয়র্কের বাইরে অবস্থান করায় তখন অপেক্ষায় থাকা হার্স্ট মোটা অংকের টাকার বিনিময়ে নিউইয়র্ক ওয়ার্ল্ডের পত্রিকার সেরা কর্মীদেরকে নিজের পত্রিকায় নিয়ে আসেন আর নতুন নাম হয় নিউইয়র্ক জার্নাল।

তার পত্রিকার প্রথম পাতার হেডলাইনগুলো ছিল অপরাধ ও স্ক্যান্ডাল জাতীয় সংবাদ এবং এর ফলে মাত্র তিন মাসের ব্যবধানেই নিউইয়র্ক জার্নালের পত্রিকা দ্বিগুণ গ্রাহক পায়। এরকম পরিস্থিতিতে পুলিৎজারের সঙ্গে একেবারে সমানভাবে পাল্লা দেয়ার জন্য হার্স্ট তার ১৬ পাতার পত্রিকার দাম কমিয়ে এক সেন্ট করেন যেখানে পুলিৎজারের পত্রিকার পাতার সংখ্যা ছিলো ৮ এবং মূল্য ছিলো দ্বিগুণ অর্থাৎ  দুই সেন্ট। এসময়ে পুলিৎজারের পত্রিকার পাঠকরা হার্স্টের পত্রিকার প্রতি আকৃষ্ট হয়ে যায়। এর ফলে জোসেফ পুলিৎজারও তার পত্রিকায় মসলাদার সংবাদ ছাপাতে থাকেন। মোট কথা তারা দুইজনেই এক অসুস্থ মানসিকতার পরিচয় দেন।

এই ঘটনার নাম হলুদ সাংবাদিকতা কেন দেয়া হলো এটা হয়তো অনেকেই ভাবছেন। এর পেছনেও এক ঘটনা আছে। পুলিৎজারের পত্রিকার এক কার্টুনিস্ট ছিলেন রিচার্ড আউটকল্ট। তার রচিত এক চরিত্র ছিলো মিকি ডুগান নামের এক বালক। পরবর্তীতে এই চরিত্রটি ইয়েলো কিড নামে পরিচিতি পায় বেশ। এই ইয়েলো কিডের জন্যে পুলিৎজারের পত্রিকা বেশ জনপ্রিয় ছিলো। তাই পরবর্তী বছরে হার্স্ট রিচার্ড আউটকল্টকে মোটা অংকের বেতন প্রস্তাব করে নিজের পত্রিকার জন্য সেই একই ইয়েলো কিড চরিত্র ছাপাতে থাকেন। তবুও পুলিৎজার থেমে থাকেননি। তিনি অন্য এক কার্টুনিস্ট দিয়ে সেই ইয়েলো কিড চরিত্রটি আঁকিয়ে নিজের পত্রিকায় ছাপাতে থাকেন। এভাবে দুইজনের মধ্যের দ্বন্দ বাড়তে থাকে। আর সাংবাদিকতার এই অসুস্থ প্রতিযোগিতার নাম দেয়া হয় ইয়েলো জার্নালিজম বা হলুদ সাংবাদিকতা।

হলুদ সাংবাদিকতা ও আমেরিকা স্পেন যুদ্ধ:
এই হলুদ সাংবাদিকতার জন্য দুই দেশ তথা আমেরিকা ও স্পেনের মধ্যে যুদ্ধ লেগে গিয়েছিলো। আমেরিকার হাভানা দ্বীপে ইউএস মেরিনের এক জাহাজ নোঙর ফেলার সময় দুর্ঘটনার শিকার হয়ে আড়াইশো জন মার্কিন নাবিক মারা গেলে হার্স্ট তার পত্রিকায় ছাপান যে এর পিছনে রয়েছে স্পেনের ষড়যন্ত্র। এই ঘটনাকে নিয়ে উভয় পত্রিকাই জল কম ঘোলা করেনি। চরম এই মুহূর্তে আমেরিকান কংগ্রেস স্পেনের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে।

আর/১০:১৪/২১ ফেব্রুয়ারি

মিডিয়া

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে