Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৯ , ২ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১৭-২০১৯

কবি আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

কবি মোহাম্মদ সাদিক এবং কবি শামীম রেজা


কবি আল মাহমুদের অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার

আল মাহমুদ আধুনিক বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি। কবিতা ছাড়াও তিনি উপন্যাস, ছোটগল্প ও শিশুসাহিত্যে বিশিষ্টতা অর্জন করেছেন। ১৯৩০-এর কবিদের হাতে বাংলা কবিতায় যে আধুনিকতার উন্মেষ, তার সোনালি শস্য আল মাহমুদ বিংশ শতাব্দীর মধ্যভাগ থেকে ব্যবহার করে চলেছেন। তবে তা ইউরোপীয় বন্দর থেকে বাংলার লোকজ জীবনের দিয়ে চোখ রেখে।

তিনি জন্মেছেন ১৯৩৬ সালের ১১ জুলাই,  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মোড়াইল গ্রামে। গতকাল ১৫ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। ২০১৪ সালের মে মাসের প্রথম সপ্তাহে কবির মগবাজারের বাসায় তার ব্যক্তি জীবন ও সাহিত্য নিয়ে আলাপচারিতার নির্বাচিত অংশ প্রকাশ করা হলো। 

মোহাম্মদ সাদিক : শরীর কেমন আছে?

আল মাহমুদ : মোটামুটি ভালোই, তবে...

মোহাম্মদ সাদিক : গোল্ডলিফ সিগারেট খান যখন—তখন তো শরীর ভালোই আছে!

আল মাহমুদ : কথা হলো—বয়স হলো তো।

মোহাম্মদ সাদিক : কই বয়স হলো আপনার?

শামীম রেজা : কোথায় বয়স হয়েছে? আপনাকে তো সেই তরুণই লাগছে!

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার এই শার্টটা দেখে তো মনে হচ্ছে আপনার মতো খুব তরুণ বয়সের নাসিরুদ্দিন (সম্পাদক : সওগাত) স্যারকে আমি একবার হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামাবার চেষ্টা করেছিলাম। উনি আমাকে বলেছেন, “তুমি আমার হাত ধরো কেন? আমি কি বুড়ো হয়ে গেছি?” আপনি তো সেই প্রজাতির লোক। আপনি তো কখনো বুড়ো হতে পারেন না।

শামীম রেজা : আপনি ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ লিখেছিলেন তারপরে ওরকম করে আত্মজৈবনিক লেখা অনেক পেয়েছি আপনার টুকরা টুকরা- এখানে ‘আমি ও আমরা’ এরকম করে- ওরকমের কোন আত্মজৈবনিক লেখা লিখেছেন এরপরে?

আল মাহমুদ : একটা লেখা বোধহয় লিখেছিলাম। ‘বিচূর্ণ আয়নায় কবির মুখ’।

শামীম রেজা : হ্যাঁ। সে কথা অবশ্য ওরকম করে আসে নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার মনে আছে বোধকরি আশির দশকের ফরিদ কবির, আমি আসতাম আপনার কাছে, আপনার পঞ্চাশ বছরের প্রেমের কবিতা, ছবি, আপনার হাতের লেখা এগুলোও ছেপেছিলাম। তখন আপনি খুব উৎসাহ দিয়েছিলেন, তার আবার অনুবাদও বেরিয়েছিলো।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : তখন বেশ সময় আমরা কাটিয়েছিলাম আর আপনি বিশ্বসাহিত্যকেন্দ্রে একবার বলেছিলেন “পঞ্চাশের দশকে যখন লিখতে শুরু করি তখন বারো কিংবা তেরো নম্বরে ছিলো আমার সিরিয়াল। বুঝতে পারছ, তোমাদের ঐ শামসু মিয়া এক নম্বরে ছিলো। যুদ্ধ যখন শুরু হলো তখন দেখলাম একে একে সব বীরেরা ধরাশায়ী হয়ে গেছে। মঞ্চে রক্তাক্ত তরবারি হাতে দাঁড়িয়ে আছি আমি আর শামসুর রাহমান। কই একটা দামি সিগারেট দাও দেখি”-মনে আছে?

এখন আমাদের জানতে খুব ইচ্ছে, এই প্রশ্নের আপনি সহস্রবার উত্তর দিয়েছেন যে আপনি কেন কবিতা লেখেন? অন্য কিছু করলেন না কেন?

আল মাহমুদ : এটা তো খুব জটিল প্রশ্ন। সংজ্ঞা নাই। কারণ কবিতা যারা লেখে তারা কিন্তু অল্প বয়স থেকেই এই ইচ্ছাটা ধারণ করে “কবি হব”। তা আমারও এই রকম ইচ্ছা ছিলো যে কবি হব।

মোহাম্মদ সাদিক : সেটা কোন বয়সে?

আল মাহমুদ : কথা হলো যে কবির কাজ কী? এই প্রশ্নটা উঠে যে কবি কি করে? কবির কাজ হলো— আমার ধারণা- তার জাতিকে স্বপ্ন দেখানো। সুখের স্বপ্ন। মানে স্বপ্নের মধ্যে রাখা। এটা হলো কবির প্রধান কাজ। কম-বেশি এই কাজটিই আমি আমার জীবনে করে গেছি। এখন কথা হলো আমাদের দেশে মূল্যায়নটা হয় ঠিকই, কিন্তু বিলম্বে হয়। তা আমার কবিতা আমি লিখেছি এবং কবিতার পক্ষে বলেছি। এর একটা মূল্যায়ন আমি আশা করতাম, তা আমাকে পে করতে হবে বা দিতে হবে আশা করি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কি মনে করেন আপনার মূল্যায়ন করতে এ জাতি দেরি করেছে?

আল মাহমুদ : সেটা ঠিক বলা যাবে না। কারণ প্রতিদিনই তো দেখছি, টিভিতে দেখছি, ইয়েতে দেখছি আমাকে নিয়ে কথাবার্তা হয়, কমবেশি কিন্তু হয়, এটা তো এক ধরনের...

মোহাম্মদ সাদিক : হ্যাঁ, আপনি যখন কবিতা দেন তখন তো তা লিড কবিতা হিসেবে যায়, সব সংকলনে।

শামীম রেজা : কিন্তু আপনার কি মনে হয়নি কখনো যে— আপনি মূল্যায়নের কথা বলছেন—যে লেখাটা আপনি লিখতে চেয়েছেন, তা লিখতে পেরেছেন? বা এখনো লিখতে পারেন নাই, চেষ্টা করছেন?

আল মাহমুদ : প্রশ্নটা হলো...

মোহাম্মদ সাদিক : খুবই জটিল।

আল মাহমুদ : শুধু জটিলই না প্রশ্নটা, যিনি প্রশ্নটা করলেন...

শামীম রেজা : তুমি বলেন।

আল মাহমুদ : তুমিই বললাম তোমাকে। প্রশ্নটার মধ্যে কিন্তু এটার জবাব লুকিয়ে আছে। এটা আমি মনে করি যে প্রথম জানতে হবে কবি কাকে বলে। কবি হলো, কবি সেই ব্যক্তি যিনি অন্যকে কিছু বলেন। অন্যকে নির্ভুল ও সত্য যিনি বলেন, যদিও আমরা কবিদের বলি কল্পনার মধ্যে থাকে। এই সেই...

শামীম রেজা : সত্যদ্রষ্টা।

আল মাহমুদ : কিন্তু কবিরা কি সত্যিই শুধু স্বপ্নের মধ্যে থাকে, কল্পনার মধ্যে থাকে? না, কবিরা বাস্তবের মধ্যেও থাকে। বাস্তবের পথেও চলতে হয়, পড়ে যায় না। একটু জটিল হয়ে যায় কিন্তু ইশারায় বুঝানো যাবে না।

মোহাম্মদ সাদিক : কবে, কখন, কোথায়, কার কবিতা পড়ে বা কোন আবেগময় মুহূর্তে আপনি ধরে নিলেন যে কবিতাই আপনাকে লিখতে হবে? অথবা আপনি মনে করলেন কবিতা ছাড়া আপনি নিজেকে প্রকাশ করতে পারছেন না। সেই লগ্নটা কবে?

আল মাহমুদ : আমি যখন নিচের ক্লাসে পড়ি তখনই আমার মধ্যে এই বোধ সৃষ্টি হয় যে আমি কবি হব। এটা কিন্তু হয়। আর এখন তো দেখছি লোকে আমাকে কবি বলে।

শামীম রেজা : আপনি লিখেছেন, আপনার দাদা মর্সিয়া সাহিত্য, জারি-সারি গান লিখতেন এবং গাইতেন। আপনি কি মনে করেন জিনের ধারাবাহিকতার প্রভাব পড়েছে আপনার মধ্যে?

আল মাহমুদ : হতে পারে, হতে পারে, আমার দাদা খুব পণ্ডিত ব্যক্তি ছিলেন, অসাধারণ পড়াশোনাও ছিলো।

শামীম রেজা : ফারসি সাহিত্যে?

আল মাহমুদ : ফারসি সাহিত্য... গভীর পড়াশোনা করতেন এবং এর মধ্য দিয়ে জীবন কাটিয়েছেন।

শামীম রেজা : দাদাকে দেখেছেন?

আল মাহমুদ : আবছা মনে পড়ে।

শামীম রেজা : তার কোন পাণ্ডুলিপি বা কোন লেখা?

আল মাহমুদ : সেটা তো আমি পাইনি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি একটা কথা বলেছেন মাহমুদ ভাই, সেটা হচ্ছে আপনাদের পরিবারে এইসব কাসিদাসহ বাংলা সাহিত্যও পঠন-পাঠন বা গাওয়া হয়। আপনার কি মনে পড়ে, কি ধরণের বা কোন পর্বের- এটি কি কোনো মর্সিয়া সাহিত্য, পদাবলী বা মঙ্গলকাব্য, মানে বাংলা সাহিত্যের বা বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের কোন ধারাটি প্রচলিত ছিলো?

আল মাহমুদ : বাংলা সাহিত্যের শুরু হয়েছে তো...

শামীম রেজা : চর্যাপদ থেকে। তবে মধ্যযুগ থেকেই বৈষ্ণব পদাবলী, শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে।

আল মাহমুদ : চর্যাপদ থেকে।

মোহাম্মদ সাদিক : হ্যাঁ, আমরা চর্যাপদ থেকেই বলবো। তারপর মধ্যযুগ থেকে ‘লাইলি মজনু’, ‘বৈষ্ণব পদাবলী’, ‘মঙ্গলকাব্য’ এগুলো?

আল মাহমুদ : এরকম ভাষা ছিলো— “সসুরা নিদ গেল বহুড়ী জাগঅ।/কানেট চোরে নিল কাগই মাগঅ”।

মোহাম্মদ সাদিক :  চর্যাপদ?

আল মাহমুদ : এটা হলো বাংলা ভাষার আদি রূপ। 

শামীম রেজা : মর্সিয়া সাহিত্য নিয়ে কথা হচ্ছিলো।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার পরিবারে কোন ধরনের বা কোন ধারাটা আপনি শুনেছেন? মর্সিয়া, জারি কোন ধরনের?

আল মাহমুদ : সবগুলো মিলিয়ে।

মোহাম্মদ সাদিক : মুসলমান পরিবারে তখন যে রকম থাকে আর কি?

শামীম রেজা : মর্সিয়া সাহিত্যে কিন্তু দেখতে পাই সিয়া এবং সুন্নির একটা ব্যাপার আছে। আপনার পরিবারের পূর্বপুরুষ

সিয়া সম্প্রদায়ের ছিলেন কি না?

আল মাহমুদ : না, জানা নেই। আমরা মধ্যবর্তী সুন্নি মুসলমান।

মোহাম্মদ সাদিক : এটি বিভিন্ন কারণে প্রচলিত ছিলো। আপনার কি মনে হয় আপনি যদি কবিতা না লিখতেন বাংলা সাহিত্যে...

শামীম রেজা : একটা অপূর্ণ জায়গা থাকতো?

মোহাম্মদ সাদিক : বাংলা সাহিত্যে কী ক্ষতি হতো?

আল মাহমুদ : কোনোই ক্ষতি হতো না।

শামীম রেজা : এটা আপনি বলছেন কিন্তু আমি আমার জায়গা থেকে বলছি যে রোমান্টিকতার...

মোহাম্মদ সাদিক : যাই হোক, আপনার কি মনে হয় না বাংলা সাহিত্যে...

শামীম রেজা : একটা জায়গা সংযোজন করেছেন?

মোহাম্মদ সাদিক : যেটি আপনি মনে করেন বাংলা সাহিত্যে অনুপস্থিত ছিলো?

আল মাহমুদ : যে কাজটা আমি করি... আমি একটু গীতিময়তার পক্ষে। সে জন্য আমি প্রেমের কবিতা পছন্দ করি। প্রেমের কবিতাই লিখেছি। সেটা অবশ্য সবসময় ঠিক থাকেনি। প্রেম, হৃদয়বৃত্তি, আত্মার আকুতি- এইসব মিলিয়েই যে রসবোধ তৈরি হয়, সেটাই—

মোহাম্মদ সাদিক : আপনাদের সময় তো আগ্রাসী কবি জীবনানন্দ দাশ। তার কাছ থেকে আপনি বেরিয়ে আসতে চেষ্টা করেছেন?

আল মাহমুদ : এটা বলা ঠিক না যে তিনি আগ্রাসী কবি ছিলেন। তার প্রভাব ছিলো অত্যন্ত বেশি। তাহলেও জীবনানন্দ দাশের প্রতিভার বিশেষ বিষয় আছে। যাতে জীবনানন্দ দাশকে আমাদের সাথে সম্পর্কের সেতুবন্ধন করে। সেটা হলো যে, জীবনানন্দ দাশ চিত্ররূপময়তার কবি, তিনি যে উপমা দিতেন তা সাথে সাথে আমাদের মধ্যে, মনে ধারণক্ষমতায় এসে যেতো, কবি হিসেবে তিনি আমার বিশ্বাস খুব বেশি ইংরেজি সাহিত্য থেকে অনুপ্রেরণা নিয়েছেন।

শামীম রেজা : কিন্তু মাহমুদ ভাই, ‘রূপসী বাংলা’য় কিন্তু আমরা ঐ প্রবণতা ছাড়িয়ে আঞ্চলিকতা দিয়ে আন্তর্জাতিকতা ছুঁইতে দেখি। এরকমের একখানা সনেটের বই আলাদা একটা তর্ক, আপনি ধরুন আপনার চৌদ্দটা সনেট ‘সোনালী কাবিন’-এ লিখেছেন। জীবনানন্দ ওখানে একাত্তর থেকে একশটা ছেপেছেন। ‘রূপসী বাংলা’ তো নাম ছিলো না মূলত। তো আপনার এর পরে ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গনে’ কিছু সনেট আছে। পরম্পরা কমবেশি বেশ কিছু বইতে দু-চারটা সনেট আছে। জীবনানন্দ যে কাজটা করলেন ‘রূপসী বাংলা’য় সেই কাজটা দেখি ইন্দ্রের রাজসভায় আমাদের বেহুলাকে নাচাচ্ছে। আর বেহুলার পায়ের সাথে বাংলার নদীমাতৃককে তুলে ধরেছেন। এখানে কিন্তু ইউরোপের ছোঁয়া পাই না। শুধুমাত্র সনেটের গড়ন ছাড়া।

মোহাম্মদ সাদিক : কেন জীবনানন্দকে বলা হয়েছে ইংরেজি সাহিত্যের?

আল মাহমুদ : যে ভাষাতেই আপনি কবিতা পড়েন কবিতার কিন্তু জাতটা বদল হয় না, ভাষা বদল হয়। কবিতা বুকের ভিতর ভেতর আঙুল ঢুকিয়ে দেয়।

শামীম রেজা : আপনি যে ফারসি অনুবাদ সাহিত্যের কথা বলছেন এতে কবিতা হারায়?

আল মাহমুদ : বাদ তো হয়ই, কমিউনিকেশন তো লাগবে, আমি ব্যক্তিগতভাবে ইয়েটস্-এর কবিতা পর্যন্ত পড়াশোনা করেছি। একসময় পড়তাম। জানতাম তো দুটো মাত্র ভাষা—একে তো বাংলা জানতাম। খুব যে ভালো ইংরেজি জানতাম তা না। তবে পড়তে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেছি। কবিতার সারাৎসার, সারমর্ম হলো আমার যেটা কবিকাব্য এটা ছায়ার মতো। যেটাকে বলে ছায়ার মতো। ছায়ানট। ঘুঙ্গুর পায়ে পায়ে চলতে থাকে নৃত্যমিল আছে, ছন্দ আছে, গদ্য আছে। কবিতার সারাৎসার বর্ণনা করা তো কবির পক্ষে সম্ভব নয়। কবিতা পড়তে হয়। কবিকে জানতে হয় কবিতা কী। আপনার মন চাইছে আপনি কবিতার বই নিয়ে বিছানায় শুয়ে আস্তে আস্তে পড়লেন। এই যে কাজটা কবিতা করে, বাধ্য করে, টানে, টান তৈরি করে। সব মিলিয়ে কবিতা হলো কবিদের কাজ। কবির সততা, বুদ্ধিবৃত্তি, তিনি কিছু বলেন অন্যরা শোনেন।

মোহাম্মদ সাদিক : তাহলে ‘রূপসী বাংলা’র কবি বলে যাকে চিহ্নিত করা হয় তারও মূল অনুপ্রেরণা ছিলো ইংরেজি সাহিত্য—যেটি আপনি উপলব্ধি করেছেন। এটি যদি আমাদের বলতেন তিরিশের কবিদের থেকে পঞ্চাশের কবিরা কীভাবে পৃথক হলেন?

আল মাহমুদ : পঞ্চাশের কবি হলাম আমরা। আমাদের গোড়ার দিকে আমরা ত্রিশের কবিদের খুব পছন্দ করতাম মানে আপন মনে করতাম। কিন্তু পঞ্চাশ দশকে আমরা বুঝতে পেরেছিলাম যে কবিতার ধারাটা, আধুনিক কবিতার ধারাটা বদলে ফেলতে হবে।

শামীম রেজা : জীবনানন্দ থেকে মুক্তি পেতে হবে?

আল মাহমুদ : আমরা এটা চেষ্টাও করেছিলাম। চেষ্টা করিনি তা না। তার প্রমাণ আমাদের কবিতা।

মোহাম্মদ সাদিক : আমরা বলতে কারা কারা?

আল মাহমুদ : আমি, শামসুর রাহমান, শহীদ কাদরী, ফজল শাহাবুদ্দিনের নামও বলা যায়। আবু জাফর ওবায়দুল্লাহ অবশ্য খুব বেশি কাজ করেননি। তবে তার নামও বলা যায়।...

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কি পশ্চিম বাংলার কারো কথা বলবেন?

আল মাহমুদ : আমি পশ্চিম বাংলা খুব ভালো করে পড়েছি। খুব সূক্ষ্ম জিনিসটি—আমাদের আর ঐ কবিদের মধ্যে ভাষাগত, উপমা, উৎপ্রেক্ষা, শব্দ পৃথক, একেবারেই পৃথক নয় তবে পৃথক হয়।

শামীম রেজা : পশ্চিম বাংলায় আপনার যারা বন্ধু ছিলেন?

মোহাম্মদ সাদিক : শক্তি চট্টোপাধ্যায় তো আপনার ভালো বন্ধু ছিলেন।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : তার সাথে কখনো এসব শেয়ার করেছেন?

আল মাহমুদ : দুঃখের কথা বলতে হয়— আমার বন্ধু ছিলেন তবে এসব মুহূর্ত নিয়ে কথা হয় নাই। যে সময়ের কথা বলছেন শক্তির মধ্যে সেন্স অব প্রপোরশন ছিলো না। মদ্যপান করতে করতে এমন একটা পরিস্থিতি হয়ে গিয়েছিলো যে সবসময় কাঁপতো।

শামীম রেজা : সেটা কি কবিতায় প্রভাব ফেলেছে?

আল মাহমুদ : না। এটা তার ব্যক্তিগত কিছু দোষ। মদ্যপান করে নিজেকে নষ্ট করে দিলো। কিছুদিনের মধ্যেই মরে গেল।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু কবিতা, মদ্যপান না করেও তো যে কোনো সময় মরতে পারে। কিন্তু কবিতার জন্য তো তিনি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন। আপনার কী মনে হয়?

আল মাহমুদ : এটা তো আপনি বলছেন। কিন্তু তিনি হিউম্যান বিং। অতিরিক্ত মদ্যপান এবং বিশৃঙ্খল জীবনের জন্য এতবড় এ্কজন কবি শেষ হয়ে গেল। আপনি দেখেন শক্তির কবিতা বের করে, দেখেন সংখ্যায় খুব অল্প। একজন মেজর পয়েট যাকে বলি তার কাজ তো পরিপূর্ণ থাকতে হবে।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু পৃথিবীর অনেক বড় কবিই তো সুশৃঙ্খল জীবনযাপন করতে পারেননি। আপনি শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের কাছে তা আশা করছেন কেন?

আল মাহমুদ : শক্তির তো প্রতিশ্রুতি ছিলো।

মোহাম্মদ সাদিক : মাইকেল মধুসূদন দত্তেরও তো প্রতিশ্রুতি ছিলো। মাত্র আটচল্লিশ বয়সে মারা গেলেন।

আল মাহমুদ : অনেক তর্ক এসে যাবে। ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্ররা বলেন— মাইকেল মধুসূদন দত্ত। আপনি বলেন, মাইকেল কখনো নিজেকে মাইকেল বলে পরিচয় দিয়েছিলো?

মোহাম্মদ সাদিক : নাম তো নিয়েছিলেন।

আল মাহমুদ : শ্রী মধুসূদন দত্ত বলতেন। মাইকেল দত্ত বলতেন। (সম্ভবত হবে—'মাইকেল মধুসূদন দত্ত বলতেন না'- জা. সো.)

শামীম রেজা : পঞ্চাশ দশক নিয়ে কথা হচ্ছিলো। শক্তি আপনার বন্ধু। কখনো শঙ্খ ঘোষ, বিনয় মজুমদার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়—এদের সাথে আপনার সম্পর্ক হয়েছিলো কি না? বা এদের কবিতা আপনার ভালো লাগে কি না?

আল মাহমুদ : এরা তো আমার সমসাময়িক বন্ধু ছিলো। কবিতা তো মনে নাই। নিত্য পড়ি না। তবে এরা খুব কাছের ছিলো।

শামীম রেজা : শক্তি বাদে এদের মধ্যে কার কবিতা ভালো লাগত আপনার?

আল মাহমুদ : আমার শক্তিকেই ভালো লাগতো।

শামীম রেজা : শক্তি কিন্তু আপনার কথাই বলতো। ‘মাহমুদ আর আমি’। এজন্যই কি ভালো লাগে? নাকি সত্যিই কবিতা ভালো লাগে তার?

আল মাহমুদ : কী সে বলেছিলো তা মনে নাই। কারণ তার দুষ্টুমির কোনো সীমা ছিলো না। কোনো কথা নাই বার্তা নাই ঐ আনন্দবাজারের অফিসের নিচে প্যান্টের জিপার খুলে পেসাব করে দিতো। এগুলো তো করেছে সে। জীবনটাতো অসহনীয় করে চলেছে। আমি বলতে চাই না কিন্তু আমি জানি অনেক কিছুই। বলা যাবে না, ক্যামেরার সামনে তো নয়ই। সভ্য মানুষ হিসেবে এদের মাঝে মাঝে চিনতে অসুবিধে হয়।

মোহাম্মদ সাদিক : এরকম দু'একটি ঘটনা থাকতেই পারে। মানুষ নানা রকম। এখন যা বলতে চাই পঞ্চাশের কবিরা কী করে আলাদা হলো, তিরিশ থেকে বাইরে আসার পর্বগুলো কী?

শামীম রেজা : কীভাবে আমরা আপনাদের চিহ্নিত করতে পারি?

আল মাহমুদ : গোড়ার দিকেই আমরা একটা জিনিস ধরতে পেরেছিলাম যে আধুনিক সাহিত্য বলতে কবিতাকে বলা হচ্ছে। আমাদের স্টাডি ছিলো— আধুনিক সাহিত্য বলতে আধুনিক গদ্য সাহিত্যকে বলতে হবে। বাংলাদেশে অন্যরকম হবে কারণ ঐ সময়ের কয়েকজন কবি কবিতাকে নিয়ে এমনভাবে মেতেছিলেন যে একটা বিভ্রান্তি তৈরি হয়ে গিয়েছিলো। কবিতায় আধুনিক সাহিত্যের ভাষা। আমি বিতর্ক করেছিলাম। কিন্তু আমাকে কেউ ছেড়ে কথা বলেনি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কিন্তু নিজেও কথাসাহিত্যের চর্চা করেছেন। আপনার কি মনে হয়েছে আপনি যা বলতে চান তা শুধু কবিতায় বলে মুক্তি পাচ্ছেন না? এজন্যই কি আপনি কথাসাহিত্য রচনা করেছেন? আপনার কথাসাহিত্য সমৃদ্ধ কথাসাহিত্য।

শামীম রেজা : ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’ আপনার প্রথম...

মোহাম্মদ সাদিক : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’ বা আরো কিছু গল্প। আপনার কি মনে হয়েছে কবিতায় আপনি এ জিনিসগুলো বলতে পারছেন না, কথাসাহিত্যে বলতে হবে। যেটা আপনি বলছিলেন আধুনিক ভাষা কবিতার হবে না কথাসাহিত্যের হবে।

আল মাহমুদ : আমি কবি মাত্র। আমি কিন্তু নিজেকে সবসময় কবি হিসেবেই...। আমি কিন্তু অসাধারণ না হলেও অনেক সুন্দর গদ্যও লিখেছি। সেটা বাংলাদেশে অস্বীকৃত হয়নি। তো যাই হোক আমার মনে হয় যে পঞ্চাশ দশকের কবিরা...

শামীম রেজা : এমন গল্প লেখেননি। আবুল হোসেন লিখেছেন আপনার উপর। যেহেতু গদ্যের মধ্যেই চলে এলাম, আপনি যে শৈশবের ‘জলবেশ্যা’র মধ্যে আবিদের শৈশবের প্রতিমূর্তির কথা বলেছেন—নারীর কথা—নৌকায় উঠে বেহুলা লক্ষীন্দরের স্মৃতিচারণ করছেন—এটা অভিজ্ঞতা বা কল্পনার ঢঙেই লেখা—এ ধরনের কোনো স্মৃতি গল্প লেখার—যেটা আপনি কবিতায় লিখতে না পেরে গল্পে লিখেছেন?

আল মাহমুদ : আমাদের দেশে সেই সময়ে হাটের দিনে লোকসমাবেশ হতো কিন্তু সন্ধ্যার পরে নৌকার ঐ পাড়ে ছোট ভাসমান গ্রাম থাকতো। তারা বাতি জ্বালিয়ে আহ্বান করতো টাকাওয়ালা দালালদের। এটাই আমি ঐ জলবেশ্যায় লিখেছি।

শামীম রেজা : আমি আপনাকে ধরিয়ে দিই ‘কেমন কাবিন মেঘনার পানিৎ লোহার ঢেউয়ের কাবিন নেহি’— এই যে ভাষাটা এটা তো ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ভাষা। আর এই যে ভাসমান বাইদানিদের কথা বলছেন এরা তো বিভিন্ন জায়গার, নাকি ওখানকার লোকাল?

আল মাহমুদ : না।

শামীম রেজা : তাহলে তো ভাষাটা নিয়ে অনেক কথা বলা যায়। আরো অনেক কথা আছে। যেমন গর্ভবতীর গান, নারীর স্তনের বর্ণনা দিচ্ছেন—যে বর্ণনা আবিদের মুখ দিয়ে করেছেন সে ভাষা কি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আঞ্চলিক ভাষা না অন্য?

আল মাহমুদ : আমার তো মনে নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার ‘পানকৌড়ির রক্ত’ তো খুব আলোচিত গল্প। এবং আপনার বর্তমানে যে সব কবিতার মধ্যে যেসব পঙ্ক্তি আবেগ উচ্চারিত হচ্ছে, পানকৌড়ির রক্ত থেকে তা অনেকসময় বিচ্ছিন্ন করা যায়— এ তারুণ্যকে আপনি কীভাবে বহন করেছেন?

আল মাহমুদ : পানকৌড়ির রক্তে বিচিত্র গল্প আছে। আমার ধারণা আমাদের সাহিত্যে আমিই প্রথম আই ক্রিয়েট মানে আমি সৃষ্টি করেছি। এছাড়া কালার বা রংয়ের বিবর্তনে যে প্রভাবিত হয় সেটা আমি দেখানোর জন্য পানকৌড়ির হত্যাটাকে দেখাতে চেষ্টা করেছি। এটা পেইন্টারের কাজ। যেহেতু আমি কবি আমি সাধ্যমত সাজাতে চেষ্টা করেছি। আমার বক্তব্য হলো—এরকম একটি রচনা আমার সমসাময়িক কালের লেখার মধ্যে আর হয়তো নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার এই যে ‘পানকৌড়ির রক্ত’, ‘জলবেশ্যা’ এসব লেখার সাথে পরবর্তীকালের লেখা মিলিয়ে দেখলে এগুলো অনেক উচ্চ হয়ে ওঠে। এতে কী আপনি কখনো নিজেকে যাচাই করেছেন যে এ ধারাকে কেনো আপনি এগিয়ে নেন নাই, নাকি অন্য নতুন কিছু করতে চেয়েছেন?

আল মাহমুদ : আমি তো আসলে কবি। তবে আমি সাহিত্যের ভাষা যেটা—আমি যে ভাষায় লিখেছি এর মধ্যে অনেক কাজ আছে—সাধারণ কবি সেটা পারে না।

মোহাম্মদ সাদিক : গল্পগুচ্ছ সম্পর্কে একটা অভিযোগ আছে কোনো কোনো সমালোচকের— যদিও আমি এটাকে বড় করে দেখছি না—গল্পগুচ্ছের গল্পগুলো গীতিধর্মী একটু। এখন কথাসাহিত্যে যখন কবির প্রভাব বড় হয়ে ওঠে তখন কথাসাহিত্য কোনোভাবে আহত হয় কি না?

আল মাহমুদ : আমার মনে হয় না।

শামীম রেজা : আরো বেশি সমৃদ্ধ হয়। কবিতা নিয়ে বারবার আপনার ইন্টারভিউয়ে, লেখায়, স্মৃতিতে বলেছেন, ''আমার কবিতার প্রধান বিষয় নারী এবং প্রকৃতি— এ দুটোই''। আমি আপনার কবিতায় শুরু থেকেই যেমন জীবননান্দকে টানি যে ‘ঝরা পালক’ তারপর ১৯৩৪-এ ‘রূপসী বাংলা’ ১৯৩৬-এ ‘ধূসর পাণ্ডুলিপি’ বের হয়। ‘রূপসী বাংলা’ বের হয় অনেক পরে। তো তার প্রত্যেকটা ধরনই আলাদা, ‘রূপসী বাংলা’ থেকে আলাদা ‘বনলতা সেন’ একটা সাধারণ নারীকে পদবীধারী করে 'সেন' দিয়ে মহাকাব্য পরে ‘মহাপৃথিবী’-তে অন্যজগত, ‘বেলা অবেলা কালবেলা’-তে আরেকটা ভুবন, আপনার মধ্যে দেখতে পাই যে প্রথম ‘কালের কলস’ আপনার ‘লোক লোকান্তর’ তেষট্টিতে প্রকাশিত। এরপর তেষট্টিতে ‘কালের কলস’, ‘সোনালী কাবিন’ ১৯৭৩-এ এই যে তিনখানা কাব্যগ্রন্থ। আমি যদি বলি এ ট্রিলোজি ধারাবাহিকতার চূড়ান্ত ফসল ‘সোনালী কাবিন’। পরে কিছুটা এক্সটেনশন পাই আপনার ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গন’-এ। এই সদ্য ৯০-তে এসে। এই তিন কাব্যগ্রন্থের মধ্যে আমরা দেখতে পাই যে আপনার নারী এবং প্রকৃতি সমানভাবে সমন্বিত হয়েছে। কিন্তু এখানে একটা অভিযোগ আছে— সেটা আমাদের তরুণদের— সেই অভিযোগে কিছুই আসে যায় না— তবে আপনার ঐ মহান কবিতাগুলো অন্যরকমের একটি জায়গা— সেটা হচ্ছে যে এখানে শরীরপ্রধান— যেটা আমরা ফেরদৌসির শাহনামা, আলাওল, ভারতচন্দ্র আমি একটু পারস্যে যাই কারণ প্রচুর ফারসি এবং আরবি শব্দের ব্যবহার আছে এই তিনখানা কাব্যগ্রন্থের মধ্যে— এখানে শরীরপ্রধান বলছি কারণ মনটাকে খুব খুঁজতে হয়। আপনার কী মনে হয় এ নিয়ে?

আল মাহমুদ : সাহিত্য যত ছদ্মবেশই ধারণ করুক আমি শরীর খুঁজি।

শামীম রেজা : না, শরীর না হলে মন কোথায় যাবে?

আল মাহমুদ : আর এটা অবয়ব। লবণ ছাড়া ডিম খাওয়া যেমন যায় না। আপনি লবণ ছাড়া ডিম খেতে পারবেন না- একটু লবণ লাগবে। সাহিত্য যত ছদ্মবেশই ধারণ করুক শরীরটা হলো প্রধান। শরীরের সাথে কাম আছে। কামের সাথে নানারকম কামজ উপাদান জড়িয়ে আছে। এটাতো আমি বললে হবে না। মানুষের প্রবৃত্তি— 'তুমি তাই তাই গো আমার পরাণ যাহা চায়'।

শামীম রেজা : আমি একটু বিস্তারিত করি। ‘লোক লোকান্তর’-এ আমরা যখন দেখতে পাই যে, “আমার চেতনা যেন সাদা এক সত্যিকারের পাখি, বসে আছে সবুজ অরণ্যে এক চন্দনের ডালে।” পরে আরেকটু রোমান্টিকতার সম্প্রসারণ দেখি ‘কালের কলস’-এ “এই দল কলসের ঝোঁপে আমার কাফন পরে আমি কতকাল কাত হয়ে শুয়ে থেকে দেখে যাবো সোনার কলস” এরপরে পূর্ণতা আসে ‘সোনালী কাবিন’-এ “বধূ বরণের গান গাহিয়াছে মহামাতৃকুল, গাঙের ঢেউয়ের মত কবুল কবুল”। এখানে একই সাথে ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি আসছে যেটা খুব স্পষ্ট। যেটা আমি বলতে চাই যে জীবনানন্দে আড়াল আছে একটা। দেহটাকে যখন বিস্তার করছেন—সাধারণ নয়—অসাধারণ কবিতাবোধের কথা বলছি।

মোহাম্মদ সাদিক : আড়াল কী? জীবনানন্দ দাশে কোনো আড়াল আছে?

শামীম রেজা : আছে। যেমন “মানুষ কাউকে চায় তার নিহত উজ্জ্বল ঈশ্বরের পরিবর্তে অন্য কোনো সাধনার ফল’। এই যে জগতে নিয়ে যাচ্ছে কিংবা “আমি সব দেবতারে ছেড়ে আমার প্রাণের কাছে চলে আসি” এই প্রশ্নটা আপনাকেও যে আপনি যখন বলেন যে 'আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বণ্টন' ঠিক জীবনানন্দেরা আগে বলেন “আমি সব দেবতারে ছেড়ে আমার প্রাণের কাছে চলে আসি” এ প্রাণের কাছে চলে আসা মানে সুফিজম। যা বলে আমার ভেতরে ঈশ্বর। এ কারণেই আমি মর্সিয়া সাহিত্য নিয়ে কথা তুলেছিলাম যে আপনার পূর্বপুরুষ সুফিবাদী বা সিয়া কি না। তো জীবনানন্দ যে কথা বলেন আপনি সে কথা আরো অসাম্প্রদায়িকভাবে বলেন “আমাদের ধর্ম ফসলের সুষম বন্টন” একথা যখন বলেন সেই কথা কি আবার কৌম ধর্মের কথা বলছেন? আমরা যে লোকজধর্মের মধ্য থেকে আসছি তারপর না আমাদের এখান থেকে অন্য ধর্ম বিস্তার করেছে। সুফিবাদ মতে যে জায়গাটা ঈশ্বর বা আল্লা মনের মধ্যে থাকে আপনার এই বিশ্বাস আপনার লেখায় পাই ‘সোনালী কাবিন’-এ। পরবর্তীকালে পাই না।

মোহাম্মদ সাদিক : ‘সোনালী কাবিন’-এ আবহমান বাংলার সামাজিক সাংস্কৃতিক যে চেতনা তার একটি অসাধারণ চেতনা পাই। মুকুন্দরামের রক্ত লেগে আছে মাটির গায়ে। আপনি শেষ পর্যন্ত সোনালী কাবিনের চেতনাকে সম্প্রসারিত করেছেন বা চেষ্টা করেছেন না কি সেখান থেকে সরে  এসেছেন?

আল মাহমুদ : করেছি, গদ্যে করেছি, পদ্যে করেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি এখনও বিশ্বাস করেন “আমাদের ধর্ম হোক ফসলের সুষম বন্টন”?

আল মাহমুদ : কবিতার ভেতরেই কবির বিশ্বাস।

শামীম রেজা : আপনি যেমন ‘বখতিয়ারের ঘোড়া’-তে লিখেছেন আরব্য রজনী নাজায়েয। আমরা আপনার দুটো পার্ট এই যে ট্রিলোজির কথা বললাম (লোক লোকান্তর থেকে সোনালী কাবিন) ঠিক এরকম বখতিয়ারের ঘোড়া থেকে ‘দ্বিতীয় ভাঙ্গন’ এর আগ পর্যন্ত  যেটা মানে ‘দোয়েল ও দয়িতা’, ‘আমি দূরগামী’ সেখানে ধর্মীয়বোধ মনে হয় আরোপ করা- মানে যা আপনার কবিতা বলে মনে হয়— আবার মনে হয় না। কারণ অনেক কিছু আরোপ করা মনে হচ্ছে। এটাকে আপনি কীভাবে খণ্ডণ করবেন?

আল মাহমুদ : এটা কেনো আপনার মনে হলো বোঝা দরকার।

শামীম রেজা : সেটা আমি উদাহরণ দিচ্ছি।

আল মাহমুদ : আমি কাব্যে রহস্য রাখলেও ঠিকমতো কমিউনিকেট করি। আমি খোলাখুলি বলেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : একাত্তরে আপনি কোথায় ছিলেন?

আল মাহমুদ : আমি কলকাতায় ছিলাম।

মোহাম্মদ সাদিক : কবে কীভাবে আপনি কলকাতায় গিয়েছিলেন? যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেই গিয়েছিলেন না যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর?

আল মাহমুদ : আমার যতটুকু মনে আছে দেশে তো থাকতে পারছিলাম না। আমি গোহাটি হয়ে...

মোহাম্মদ সাদিক : আগরতলা হয়ে। আপনি ঢাকা থেকে বের হয়েছিলেন নাকি ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে?

আল মাহমুদ : এতটা মনে নাই। এটুকু মনে আছে আমি ট্রেনে করে গোহাটি হয়ে কলকাতা যাই। আমার ভগ্নিপতি ছিলেন। তৌফিক ইমাম আমার বোনজামাই। আমি তার সাথে যাই।

মোহাম্মদ সাদিক : ঐ সময়ের আগে কখনো কলকাতায় গিয়েছিলেন?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ গিয়েছিলাম।

মোহাম্মদ সাদিক : তখন কলকাতার কবিদের সাথে দেখা হয়নি আপনার?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার তো সংকলনও বের হয়েছিলো কলকাতা থেকে। শ্রেষ্ঠ কবিতা তো আপনার ওখান থেকেই বের হয়।

শামীম রেজা : শিবনারায়ণ রায় আপনার একটা বইয়ে ভূমিকা লিখেছিলেন। মনে পড়ে আপনার? একাত্তর নিয়ে বলি- তাজউদ্দিন সরকারের তো একজন কর্মকর্তা ছিলেন আপনি। তিনি আপনাকে একটা দায়িত্ব দিয়েছিলেন। বিভিন্ন লেখায় পড়েছি। কোন ডিপার্টমেন্টের?

আল মাহমুদ : একটা চাকরি দেওয়া হয়েছিলো। মোটিভেশন। বাংলাদেশের যে উত্থান তার পক্ষে কথা বলার জন্য। আই অ্যাম অলসো মোটিভেটেড। আমি কাজ করতাম। মাইনে বেতন ছয়শো টাকার মতো। কিন্তু মাইনে দেবার সময় অর্ধেকটা কেটে রেখে দিতো। ত্রাণের জন্য। তিনশো টাকা আমাকে দেওয়া হতো। এই টাকা সম্বল করে চলতাম। কলকাতায় খুব চ্যালেঞ্জিং দিন ছিলো। কষ্ট ছিলো।

মোহাম্মদ সাদিক : সেই সময়টার কোন স্মৃতিকথা লেখেন নাই কেন?

আল মাহমুদ : আমি তো লিখেই যাচ্ছি দিনরাত।

শামীম রেজা : লিখছেন কিন্তু ওইরকম করে। একাত্তরের ডায়রি নামে তো লেখা লিখতে পারেন।

আল মাহমুদ : মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছি।

শামীম রেজা : আপনি অংশগ্রহণ করেছিলেন। সার্টিফিকেট নিয়েছেন?

আল মাহমুদ : আনন্যাচারাল টকিং।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু এটা তো একটা গৌরবের সময়। আপনি যে জাতিকে স্বপ্ন দেখালেন যে জাতি শৌর্যবীর্য নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়ালো সেই সময় আপনি যখন ছিলেন, তার স্মৃতিকথা নিয়ে তো লিখতে পারতেন।

আল মাহমুদ : আমি তো লিখেছি। আমার যখন মনে পড়ে আমার সব লেখা মনে হয় পড়েননি। আমি কিন্তু বলেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : এবার একটু বলবেন কি— জাস্ট আপনার কাছ থেকে শুনে রাখার জন্য— প্রাচীনকালের চর্যাপদ থেকে আল মাহমুদ বা শামীম রেজা কারা কারা প্রধান কাজ করেছেন বা কারা কারা গুরুত্বপূর্ণ?

আল মাহমুদ : প্রথম কথা হলো, সবচেয়ে বড় কাজ যিনি করেছেন তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। রবীন্দ্রনাথ পড়লে তিনি যে কত বড় ছিলেন জানা যায়। তারপরে অবশ্য গুছিয়ে বলতে পারবো না। তারপর মডার্ন তিরিশের কবিরা— চোখ ধাঁধিয়ে দেয়া আধুনিক স্বাদ, তারা বহুবিচরণশীল ছিলেন ব্রহ্মাণ্ডের। তারপর চল্লিশের কবিরা ফররুখ আহমদ, আহসান হাবীব দুজনেরই কিন্তু খুব সুন্দর কবিতা আছে। এরা যে কত উজ্জ্বল কাজ করেছেন আধুনিকতার!

মোহাম্মদ সাদিক : যাক, আপনি আহসান হাবীবের কথা বলেছেন। আমরা একটা জিনিস লক্ষ করি আমাদের কবিরা তাদের অনুজ কবিদের সম্পর্কে তেমন বেশি কিছু বলতে চান না। সংগত কারণেই হয়তো বলতে চান না। কিন্তু আপনি কিছু বলেছেন। আপনার এটি কি মনে হয় আপনি তো অগ্রজদেরও অগ্রজ এখন। কেনো তারা অনুজদের সাহিত্য মূল্যায়নে খুব বেশি আগ্রহী হন না? এটা তো একটা স্বাভাবিক প্রবণতা। অনুজ কবিদের নিয়ে বলবেন এটাই স্বাভাবিক।

আল মাহমুদ : কথা হলো যে এটা ঘটে যায়। কেনো যে ঘটে যায়!

মোহাম্মদ সাদিক : আচ্ছা আপনি কাজী নজরুল ইসলামের কথা একবারও উচ্চারণ করেননি বাংলা সাহিত্যধারা আলোচনায়। এটি স্মৃতির কারণে নাকি?

আল মাহমুদ : কাজী সাহেবের কথা আমি বলি— একজন অসাধারণ কবিপ্রতিভা। তার বিদ্রোহী কবিতার মতো ওমন একটি কবিতা বাংলা সাহিত্যে নাই। সমস্ত বাংলা সাহিত্যে নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : তার প্রেমের কবিতাগুলো?

আল মাহমুদ : তার যে গান আছে, প্রেমের গান। অসাধারণ। গানের ভাষাপদ্ধতি, গানের যে মর্মবাণী সেটা উনি কিন্তু ক্লাসিক্যাল থেকে সব নিয়েছেন।

মোহাম্মদ সাদিক : উনি বলেছেন আর কোথাও কিছু না দিতে পারলেও গানের রাজ্যে আমি বিচরণ করি।

শামীম রেজা : রাগ এবং রাগিনী নিজে তৈরিও করেছেন।

মোহাম্মদ সাদিক : একটা জিনিস আপনার কবিতায় লক্ষ করি আপনি চলে যাওয়ার কথা বলেন, চলে যাওয়ার সময় হয়েছে ইত্যাদি, ইত্যাদি। কানা মাহমুদ, আল মাহমুদ এরকম নিজেকে নিয়ে স্যাটায়ার করেন এটা ভালো, অসাধারণ। কিন্তু আপনার কবিতায় মৃত্যুচেতনা কিন্তু সেভাবে আমাদের চোখে পড়ে না।

শামীম রেজা : শুরুর দিকে ছিলো।

আল মাহমুদ : সবচেয়ে বেশি চিন্তা করি মৃত্যুর।

শামীম রেজা : কিন্তু কবিতায় আসে জীবনের কথা, কামের কথা, ভালোবাসার কথা, প্রেমের কথা।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি কখনো কখনো খুব প্রবলভাবে সামাজিক অঙ্গীকারের কথা বলেছেন।

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : কিন্তু কখনো কখনো আপনার লেখা পড়ে মনে হয়েছে যে সাহিত্য সামাজিক অঙ্গীকারের বিষয় নয়। সাহিত্য তার বাইরের কিছু। এ সম্পর্কে আপনি একটু বলেন।

আল মাহমুদ : আসলে আমি ঐ ধারার কবি যে ভালোবাসা প্রেম...

শামীম রেজা : মাহমুদ ভাই, বিশ বছর আগে আপনার মগবাজারের বাসায় গিয়েছিলাম। তখন আপনি আপনার অভিজ্ঞতার কথা বলেছিলেন। প্রেমের কথা বলেছিলেন, আপনার জীবন অভিজ্ঞতা, প্রেমের কথা বলেছিলেন খুব মজা করে।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনার নিজের বেড়ে ওঠা বা প্রথম স্পন্দন কোন চরিত্রের মাধ্যমে তুলে ধরলেন? আলকির কথা মনে পড়ে? এই জীবন্ত...

আল মাহমুদ : ওর সম্পূর্ণ নাম হলো আলেকজান বিবি।

শামীম রেজা : কলকাতায় আপনি একাত্তরে যখন অবস্থান করছিলেন তখন আপনার কবিতার প্রেমে আপনার অনেক বান্ধবী ছিলো। আপনার মনে পড়ে?

আল মাহমুদ : কত মিশেছি টিশেছি। এখন...। তখন কিন্তু মনটা খুবই ক্ষতবিক্ষত ছিলো। যুদ্ধ যে কি জিনিস!

মোহাম্মদ সাদিক : ধর্মের বিষয় আপনার লেখায় আসে। আমাদের এই যে...

আল মাহমুদ : ভাই আমি ধর্মে বিশ্বাস করি।

শামীম রেজা : এটা তো ভালো। এটা নিয়ে আপত্তি নাই।

মোহাম্মদ সাদিক : আমি বলছি সুফি তো ভালো।

আল মাহমুদ : সুফিজম ?

মোহাম্মদ সাদিক : সুফি, ফকির দরবেশ এদের একটি ব্যাপক ভূমিকা আছে এই বাঙালি মুসলমানের উপর। আপনি তাদেরকে বা তাদের অবদানকে কীভাবে বিচার করেন?

আল মাহমুদ : মওলানা রুমির একটা দল ছিলো। তাদের বলা হতো ড্যান্সিং মওলানা, যারা নাচতো। নাচতে নাচতে...

শামীম রেজা : ফানাবিল্লাহ বাকাবিল্লাহ?

আল মাহমুদ : ঐগুলো আমি কখনো লিখিনি। যদি লিখি তবে অনেক কথাই লিখতে হবে। আমি লিখবো। হোয়েন দ্য টাইম কাম।

মোহাম্মদ সাদিক : ধন্যবাদ মাহমুদ ভাই যে আপনি বিষয়টা লিখবেন।

আল মাহমুদ : এই যে মওলানাস ওহ হো...

মোহাম্মদ সাদিক : ইশক্ এর যে বর্ণনা

আল মাহমুদ : অসাধারণ কিছু আছে।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি আপনার আগামী লেখার পরিকল্পনা যে করছেন কী লিখবেন বলে? একটা তো সুফিবাদ।

আল মাহমুদ : একটা আপাতত, আমার খুঁটিনাটি অনেক কিছু উল্লেখ করে যতটুকু মনে পড়ে আত্মজীবনী লিখবো।

শামীম রেজা : কাউকে কি প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন?

মোহাম্মদ সাদিক : সেটা কি শৈশব থেকে শুরু করবেন আপনি?

আল মাহমুদ : না, আমি শৈশব তো লিখে ফেলেছি।

মোহাম্মদ সাদিক : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’র মধ্যে আপনি ঢাকায় যখন আসলেন সেখানে এসে কিন্তু শেষ করে ফেললেন, ঢাকার জীবন আর ওরকম লেখেননি। আপনি যে আত্মজৈবনিক লিখবেন তা পূর্ণাঙ্গ হবে?

আল মাহমুদ : না না পূর্ণাঙ্গ হবে।

শামীম রেজা : ‘যেভাবে বেড়ে উঠি’র পরের পার্ট না একদম শুরু থেকে?

আল মাহমুদ : শুরু থেকেই। প্রতিশ্রুতি না দিলেও আমি এটি কোথাও কোথাও বলেছি।

শামীম রেজা : আমরা আপনাকে সর্বোচ্চ সম্মানী দিয়ে এটি নিতে চাই।

মোহাম্মদ সাদিক : কবি শামসুর রাহমান সম্পর্কে আপনার কাছে জানতে চাই। আপনার বন্ধু এবং আপনার সঙ্গে শামসুর রাহমানের নাম সবসময় উচ্চারিত হয়েছে। আপনার এখানে আপনার এবং শামসুর রাহমানের ছবিও আছে। পিএটিসিতে সর্বশেষ আপনি এবং শামসুর রাহমান একসঙ্গে কবিতা পড়তে গিয়েছিলেন এবং তার পাশাপাশি সময়ে কুমিল্লায় যখন ডি. সি. আমিনুর রহমান সাহেব দাওয়াত দিয়েছিলেন তখন আপনি ও শামসুর রাহমান একসঙ্গে গিয়েছিলেন। অনেক রাত অব্দি কবিতা পড়েছিলেন। তারপর আপনাদের একসাথে দেখিনি। এটা পঁচাশি-ছিয়াশি সালের পর।

আল মাহমুদ : অনেকে মনে করে যে শামসুর রাহমানের সাথে আমার বোধহয় কোন দ্বন্দ্ব ছিলো। এসব কিছুই ছিলো না। খুবই ভালো বন্ধু ছিলাম। শামসুর রাহমান চুপচাপ ছিলো। আমার বাসায় নীরব একটি জায়গায় চুপচাপ বসতো। আমি বলতাম, কী ব্যাপার? বলতেন, আমি বসছি, ভালো লাগছে না। উনি তো আবার সিগারেট খেতেন না। আমি সিগারেট ধরিয়ে কাছে বসতাম। চোখ বন্ধ করে বসে থাকতেন। কী যেন ভাবতেন। আমার জানা ছিলো যে শামসুর রাহমানের ভেতরে একটা দ্বন্দ্ব ছিলো। এটা হলো তার বিশ্বাসের ব্যপার।

শামীম রেজা : ধর্মের বিশ্বাস?

মোহাম্মদ সাদিক : না ধর্ম না।

আল মাহমুদ : ছিলো এটা। এটা তাকে খুব কষ্ট দিয়েছে। তিনি আমার বন্ধু ছিলেন।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনারা দুজনেই তো সুদর্শন।

শামীম রেজা : আপনি মদীনায় কবি হাসান ইবনে সাবিদের কবর খুঁজতে গিয়েছিলেন। মনে কি আছে আপনার? অনেক লোককে জিজ্ঞেস করেছেন। আপনার লেখায় পড়েছি তার সাথে মহানবী (সঃ) এর কাছে উপঢৌকন হিসেবে মিশরের দুই নারীকে পাঠানো হয়েছিলো। একজনকে বিয়ে দেওয়া হয়েছিলো এই কবির সাথে। হাসান ইবনে সাবিদ।

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি খুঁজেছিলেন, মনে পড়ে আপনার?

আল মাহমুদ : মনে পড়ছে না।

শামীম রেজা : আপনি তো ইংল্যান্ডে গেছেন, আয়ারল্যান্ডে গেছেন? ইয়েটস্ এর বাড়ি খোঁজা কিংবা অন্য কারো?

আল মাহমুদ : আয়ারল্যান্ডে আমি যাইনি।

শামীম রেজা : ইংল্যান্ডে শেকসপীয়ার?

আল মাহমুদ : এখন খুব আফসোস হয়।

মোহাম্মদ সাদিক : লন্ডনে তো গেছেন?

আল মাহমুদ : হ্যাঁ।

মোহাম্মদ সাদিক : শেকসপীয়ারের বাড়ি তো গেছেন?

আল মাহমুদ : গেছি মানে কি! ঘণ্টার পর ঘণ্টা খুব ভোরবেলা লন্ডনের রাস্তা দিয়ে হেঁটে ফিরে আসছি। মনে মনে বলছি এই তো বিলাত। এখানে আসার জন্য কি না করেছে আমাদের দেশের লোক।

মোহাম্মদ সাদিক : আমাদের দেশের কোনো কবির সমাধিতে যেতে ইচ্ছে করে কি না আপনার?

আল মাহমুদ : এরকম নাম তেমন মনে পড়ছে না।

শামীম রেজা : যেমন কাজী নজরুল ইসলাম। তার সমাধিতে তো বিভিন্ন অকেশনে গিয়েছেন। আত্মার টানে যেতে ইচ্ছে করে? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তিনি বলতেন হাফিজ, আমরা বলি হাফেজ। তিনি হাফিজের কবরের পাশে গেলেন এরকম আপনার কাউকে ধরা যাক রুমির কবরের পাশে, হাফিজের কবরের পাশে যাওয়ার কোন আগ্রহ বা গিয়েছেন কি না?

আল মাহমুদ : না  যেতে পারিনি তো। আসলে আগ্রহ তো আছেই।

মোহাম্মদ সাদিক : সাধারণভাবে কবির কাছে সব লেখাই মূল্যবান। আপনার সব লেখাই মূল্যবান। আমরা বাংলাদেশে জীবননানন্দ দাশের ‘রূপসী বাংলা’ যেমন, তেমন আপনার ‘সোনালী কাবিন’ এর কথা সবাই বলি— এখন আপনার বিচারে কাব্যগ্রন্থ বা কথাসাহিত্য বা গল্পগ্রন্থে- আপনার কোন সন্তান বেশি আদরের? এরকম কোন কাব্যগ্রন্থের নাম বলবেন, এরকম কোন কবিতার নাম।

আল মাহমুদ : সোনালী কাবিন, নিঃসন্দেহে।

শামীম রেজা : আনন্দের সন্তান।

আল মাহমুদ : ইচ্ছা করলেও আমি ওরকম আর...

শামীম রেজা : আপনার কবর নিয়ে একটা কবিতা আছে- “ফররুখের কবরে কালো শেয়াল”।

আল মাহমুদ : ওটা তো একটা টাইমকে বুঝানোর জন্য।

শামীম রেজা : বুদ্ধদেব বসুর ‘কবিতা’ পত্রিকায় আপনার কবিতা ছাপা হলো । আপনার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মরণীয় ঘটনার মধ্যে একটি।

আল মাহমুদ : যখন ‘কবিতা’ পত্রিকার একটা চিঠি আসছিল আমার এখানে—চিঠিটা হলো “তোমার একটি বা দুটি কবিতা ছাপা যাবে মনে হচ্ছে।”

মোহাম্মদ সাদিক : তাতেই আনন্দিত?

আল মাহমুদ : বুদ্ধদেব বসু! ভাবা যায়!

শামীম রেজা : এরকমের আরো কোনো আনন্দের অনুভূতির কথা বলতে পারেন?

আল মাহমুদ : না, এ আনন্দ আর কোনো সময় হয় নাই।

শামীম রেজা : কোনো প্রেমিকার সাথের অনুভূতিও কি?

মোহাম্মদ সাদিক : আধুনিক কবিতা লিখতে গিয়ে লালমাটিয়ায় বাংলা পড়ান। এটি লিখেছেন সরাসরি কবিতায়, আধুনিক কবিতা লালমাটিয়ার বাংলা বিভাগে কেনো আবদ্ধ হয়ে গেল আর কোথাও যেতে পারছে না কেনো? আপনার কবিতায় আয়েশা আক্তার জীবনানন্দ দাশের কবিতায় বনলতা সেন এসব চরিত্রগুলো কি বাস্তব না?

আল মাহমুদ : আয়েশা বাস্তব

মোহাম্মদ সাদিক : আপনি যদি কবি না হতেন আপনি আর কি হতে চাইতেন?

আল মাহমুদ : যদি আমি কবি না হতাম তবে আমি সঙ্গীতজ্ঞ হতাম।

মোহাম্মদ সাদিক : যদি আপনাকে আপনার গ্রামে নিয়ে যাওয়া হয়, যদি আপনার বয়স ফিরিয়ে দেয়া হয়, যে বয়সে আপনি গ্রামে ছিলেন, আপনি কাকে খুঁজবেন?

আল মাহমুদ : কিন্তু এটা আমি বলতে চাই না।

মোহাম্মদ সাদিক :  ঢাকা শহরে বিউটি বর্ডিং-এর আড্ডার সময় সেই বয়স আপনাকে দেওয়া হলে আপনি আগে কাকে ডাকবেন? কার ঘরে টোকা দেবেন?

আল মাহমুদ : নামটা নাই বললাম।

শামীম রেজা : আপনার জীবন-অভিজ্ঞতা আপনার লেখার মধ্যেই পেতে চাই। সেটা কি আপনি সহজ করে লিখবেন?

আল মাহমুদ : আমি চেষ্টা করবো।

শ্রুতিলিখন : আমিনুল ইসলাম

এমএ/ ০০:৪৪/ ১৭ ফেব্রুয়ারি

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে