Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, শনিবার, ১৬ নভেম্বর, ২০১৯ , ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (12 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-১৩-২০১৯

এক পা সবল, অন্য পা অচল হলে গণতন্ত্র হাঁটতে পারবে কি?

আবদুল গাফফার চৌধুরী


এক পা সবল, অন্য পা অচল হলে গণতন্ত্র হাঁটতে পারবে কি?

বাংলাদেশে প্রধান রাজনৈতিক দল দুটি। একটি আওয়ামী লীগ এবং অন্যটি বিএনপি। ৩০ ডিসেম্বরের সাধারণ নির্বাচনের পর অবস্থার পরিবর্তন ঘটেছে। একটি প্রধান দল ক্ষমতায়। অন্যটি নির্বাচনে শোচনীয়ভাবে পরাজিত হয়ে জাতীয় সংসদে যেমন প্রায় অস্তিত্বহীন, তেমনি জাতীয় রাজনীতিতেও তাদের অবস্থান প্রায় শূন্যের কোঠায়। গত দশম সংসদে তারা স্বেচ্ছায় অনুপস্থিত ছিল। কিন্তু সংসদের বাইরে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে সরব এবং সক্রিয় ছিল।

এখন তাদের অবস্থা মুণ্ডহীন রাজা কনিষ্কের মতো। ধড় আছে মুণ্ড নেই। ফলে ধড় সচল। নেত্রী কারাগারে এবং ভারপ্রাপ্ত নেতা বিদেশে পলাতক। দলের মাঝারি নেতারা দল ঠিক রাখতে না পারায় সমমনা দলগুলো নিয়ে একটি ঐক্যফ্রন্ট গঠন করে অন্য শিবির থেকে রাজনৈতিক নেতাকে ফ্রন্টের নেতৃত্বে হায়ার করে আনা হয়েছিল। তিনি বহুদিন আগে জনগণ কর্তৃক প্রত্যাখ্যাত নেতা। ফলে ঐক্যফ্রন্ট ‘ঐক্যফ্রডে’ পরিণত হয়েছে।

এখন বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রধান বিরোধী দল হিসেবে গণ্য হতে পারে এমন দল নেই। জামায়াত এবং জামায়াতের মতো মৌলবাদী দলগুলো আন্ডারগ্রাউন্ডে দল পাকানোর জন্য ব্যস্ত রয়েছে। এ অবস্থা দেশের ও গণতন্ত্রের জন্য বিপজ্জনক। এ অবস্থা আমাদের বিরাট প্রতিবেশী ভারতে দেখা গিয়েছিল ১৯৪৭ সালে স্বাধীনতা লাভ করার পরপরই। পার্লামেন্টে কংগ্রেসের ছিল একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা। প্রধানমন্ত্রী নেহরু দেশের আরেক প্রভাবশালী নেতা জয়প্রকাশ নারায়ণকে ডেকে অনুরোধ জানিয়েছিলেন, ‘প্লিজ, আপনি পার্লামেন্টে একটি শক্তিশালী বিরোধী দল গঠন করুন। আমরা আপনাকে সাহায্য করব।’ জয়প্রকাশ তাঁর অনুরোধ রাখেননি।

নেহরু ঠিকই বুঝেছিলেন, শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে ভারতে গণতন্ত্রবিরোধী শক্তি কংগ্রেসের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠতে পারে। কালক্রমে ক্ষমতা দখলও করতে পারে। তাহলে ভারতে গণতন্ত্র বিপন্ন হবে। দীর্ঘকাল পর ভারতে তা-ই হয়েছে। উগ্র হিন্দুত্ববাদ ক্ষমতা দখল করে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ ভারতের জন্য এক বিরাট চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।

নেহরুর শাসনামলে ভারতে দ্বিতীয় বৃহত্তম রাজনৈতিক শক্তি হয়ে দাঁড়িয়েছিল অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি। রাশিয়া-চীন ঝগড়ার সময় তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বে কমিউনিস্ট পার্টি বহুধাবিভক্ত হয়। শক্তি সঞ্চয় করতে থাকে কিছু আঞ্চলিক দল এবং হিন্দুত্ববাদী বিজেপি। ক্ষমতা দখলের দৌড়ে বিজেপি বিরাটভাবে জিতেছে। মাঝখানে সোনিয়া গান্ধীর নেতৃত্বে কংগ্রেস আবার ক্ষমতায় ফেরে। তখন কংগ্রেসের স্লোগান ছিল ভারতে ধর্মনিরপেক্ষতা ফিরিয়ে আনা। ভারতের জনগণ কংগ্রেসকে আবার ভোট দিয়েছিল।

কিন্তু কংগ্রেস হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে টেক্কা দেওয়ার জন্য নিজেরা এখন শ্যাডো হিন্দুত্ববাদী সেজেছে। আরেকটি সাধারণ নির্বাচন সামনে নিয়ে কংগ্রেসের সভাপতি রাহুল গান্ধী শিবভক্ত সেজেছেন এবং শিবমন্দিরে ধরনা দিয়ে বেড়াচ্ছেন। তাঁর বোন প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কুম্ভ মেলায় ছুটে গিয়ে পুণ্য অর্জন করছেন। এ অবস্থায় আর যা-ই হোক, হিন্দুত্ববাদীদের চেয়েও নিজেদের বড় হিন্দুত্ববাদী সাজিয়ে কংগ্রেস কি আসন্ন সাধারণ নির্বাচনেও নরেন্দ্র মোদিকে হটাতে পারবে? হটাতে না পারলে গান্ধী-নেহরুর গণতান্ত্রিক ভারতের পরিণতি কী দাঁড়াবে?

বাংলাদেশেও একই অবস্থা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা আছে, যদি সময় থাকতে আওয়ামী লীগের বিকল্প কোনো শক্তিশালী এবং গণতান্ত্রিক বিরোধী দল সংসদের ভেতরে-বাইরে দ্রুত গড়ে না ওঠে। শেখ হাসিনা যত দিন ক্ষমতায় আছেন তত দিন বাংলাদেশে গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার আদর্শ নিরাপদ। কিন্তু তারপর? একটি গণতান্ত্রিক এবং মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে বিশ্বাসী শক্তিশালী বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে কি বঙ্গবন্ধু ও হাসিনার হাতে গড়া সেক্যুলার বাংলাদেশ স্বাধীনতার আদর্শবিরোধী ধর্মান্ধ ও সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর ‘ঐক্যফ্রডে’র হাতে তুলে দিয়ে যেতে হবে? যেমন গান্ধী-নেহরুর গণতান্ত্রিক ভারত তুলে দেওয়া হয়েছে উগ্র হিন্দুত্ববাদী শিবসেনা ও বিজেপির হাতে।

এবারের নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াত গোষ্ঠীর অস্তিত্ব প্রায় বিলীন হওয়ায় আমি খুশি। এরা গণতান্ত্রিক বিরোধী দল ছিল না। এদের পরাজয়ে দেশের মহাকল্যাণ হয়েছে। গণতন্ত্র বিপত্মুক্ত হয়েছে। সংসদে তাদের অনুপস্থিতিতেও আমি খুশি। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের যারা বিরোধী, সংসদে বা জাতীয় রাজনীতিতে তাদের শক্তিশালী অবস্থান কারো কাম্য হতে পারে না। কিন্তু তাই বলে কোনো গণতান্ত্রিক দেশের রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের আসন দীর্ঘকাল শূন্য রাখা যায় না। তা ভয়ানক ক্ষতিকর। কোনো দেশের জাতীয় রাজনীতিতে গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের আসন দীর্ঘকাল শূন্য থাকলে তা শূন্য থাকে না। সে আসনে উড়ে এসে জুড়ে বসার সুযোগ পায় জনগণের শত্রু এবং প্রতিক্রিয়াশীল অপশক্তি। ভারতে তা ঘটেছে। বাংলাদেশেও তা আবার ঘটতে পারে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পরপরই ১৯৭৩ সালে যে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, তাতে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। ওই সংসদে দু-একজন বিরোধী নেতা নির্বাচিত হলেও বিরোধী দল ছিল না। সংসদের বাইরেও কোনো গণতান্ত্রিক ও শক্তিশালী বিরোধী দল ছিল না। এই সংসদে ন্যাপ (মোজাফ্ফর) ও মণি সিংহ কমিউনিস্ট পার্টির একজন সদস্যও নির্বাচিত হননি। এ অবস্থায় জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ) যখন গঠিত হয় তখন আশা করা গিয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণকারী যুব নেতাদের নেতৃত্বে যখন এই দল গঠিত হয়েছে তখন তারা গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের শূন্যস্থান পূরণ করবে এবং ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদেও শক্তিশালী অবস্থান নেবে।

জাসদ এই প্রত্যাশা পূর্ণ করেনি। সদ্য স্বাধীন যে দেশটিতে গণতন্ত্র যখন মাত্র প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে, সেই অবস্থায় সরকারের গণতান্ত্রিক বিরোধিতার বদলে ‘বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র’ প্রতিষ্ঠার হাস্যকর স্লোগান তুলে সন্ত্রাস ও ধ্বংসাত্মক তৎপরতা দ্বারা সরকার উচ্ছেদের চেষ্টা তারা চালায়। তাদের তৎপরতায় একাত্তরের পরাজিত ও নিষিদ্ধ দলগুলো উৎসাহিত হয় এবং সরকার উচ্ছেদের জন্য সংগঠিত হতে থাকে। জাসদের কার্যকলাপ এই ধর্মান্ধ প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে রক্তাক্ত সামরিক অভ্যুত্থান ঘটাতে সাহায্য জোগায়।

সিপিবি ও ন্যাপ (মোজাফ্ফর) তখনকার এই দুটি বড় দলও সরকারের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় গণতান্ত্রিক বিরোধিতার আসনটি শূন্য পড়ে থাকে। আমি এ সময় এক ঘরোয়া সভায় কমরেড মণি সিংহের দেখা পেয়ে বলেছিলাম, ‘মণিদা, গণতান্ত্রিক বিরোধিতার আসন শূন্য থাকলে তা অপদেবতা দখল করে। সিপিবি যা-ই করুক, ন্যাপ-মোজাফ্ফরের উচিত বিরোধী দলের ভূমিকা গ্রহণ করা। ন্যাপ তো গণসংগঠন। তাত্ত্বিক দল নয়।’ মণিদা আমার কথায় সায় দেননি। পরের পরিস্থিতি এখন ইতিহাস।

বর্তমানে হাসিনা সরকারের বিশাল নির্বাচন জয়ে আমি আনন্দিত এবং অভিভূত। বিএনপি-জামায়াত নির্বাচনে নিশ্চিহ্ন হওয়ায় আমি দুঃখিত নই, বরং আনন্দিত এ কারণে যে এরা গণতান্ত্রিক বিরোধী দল ছিল না। গণতন্ত্র ও স্বাধীনতার শত্রুপক্ষের সমন্বয়ে গঠিত এটি এমন একটি জোট, যারা দেশের রাজনীতিতে অভিশাপ, আশীর্বাদ নয়। তাদের পতনে দুঃখ পাওয়ার কিছু নেই। এতে দেশের গণতান্ত্রিক রাজনীতির কোনো ক্ষতি হয়নি। আমার দুঃখ, স্বাধীনতার ৪৮ বছরেও দেশে একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গড়ে ওঠেনি। বাম বা ডান কোনো পক্ষই তা পারেনি। যারা পারত তারাও নিজেদের মধ্যে বিবাদের জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়েও ঐক্য ধরে রাখতে পারেনি।

দেশের প্রবীণ নেতাদের মধ্যে ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা প্রমুখ পারতেন, গণফোরামের ও বিকল্পধারার মতো অশ্বডিম্ব না পেড়ে শক্তিশালী বিরোধী দল গড়ে তুলতে। কিন্তু তাঁরা পারবেন কী করে? কলকাতার এক সাংবাদিকের ভাষায় ‘উভলিঙ্গ’ রাজনীতিক হলেন কামাল। কখনো মধ্য বাম, কখনো চরম ডান। এখনো একেবারে বিএনপি-জামায়াতের কোলে উঠে বসতেও বিবেকপীড়া বোধ করছেন না। ডা. বদরুদ্দোজা, যাঁর বাবা আওয়ামী লীগের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা নেতা, বৃদ্ধ বয়সে হার্টের রোগ নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেওয়ার জন্য মুজিবনগরে চলে গিয়েছিলেন, তাঁর ছেলে রাজনৈতিকজীবনের বেশির ভাগ কাটালেন এক সামরিক ডিক্টেটরের পদসেবা করে।

তাঁদের পরবর্তী প্রজন্মের বেশির ভাগ নেতার একই অবস্থা। একটা উদাহরণ দিই। আ স ম আবদুর রব ছিলেন বঙ্গবন্ধুর শিষ্য। হলেন বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রী, এরপর এরশাদের গৃহপালিত বিরোধীদলীয় নেতা হওয়ার পর হাসিনার মন্ত্রী। এবার নির্বাচনে বিএনপি-জামায়াতের কোলে উঠে বসেছিলেন। এই বর্ণচোরা সুবিধাবাদী প্রবীণ ও নবীন নেতাদের দ্বারা কি সুস্থ এবং গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গড়াও সম্ভব?

এখন অপেক্ষা করতে হবে দেশে দ্বিদলীয় সুস্থ গণতন্ত্র গড়ে তোলার জন্য নতুন প্রজন্মের নতুন নেতৃত্বের। সেই নেতৃত্বকেও গড়ে ওঠার জন্য সাহায্য ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে হবে বর্তমানের প্রবীণ নেতৃত্বেরই সৎ ও নীতিবান অংশকে। শেখ হাসিনা এখন দলনেতা নন, জাতীয় নেতা। তিনি কি পারেন না দলীয় ও পারিবারিক সীমাবদ্ধতার ঊর্ধ্বে উঠে দেশে যাতে গণতান্ত্রিক বিরোধী দলের ক্ষেত্রে শূন্যতা বিরাজ না করে সে জন্য ভারতের নেহরুর মতো উদ্যোগ ও সহযোগিতার হাত বাড়াতে? নইলে দেশে গণতন্ত্রের এক পা যতই সবল হোক, আরেক পা অচল হলে সেই গণতন্ত্র হাঁটতে পারবে না। আর হাঁটতে না পারলে অপদেবতারা বসে থাকবে কি?

এমএ/ ০০:০০/ ১৩ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে