Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-১১-২০১৯

একুশের চেতনা ও বাংলা ভাষার বাস্তবতা

আহমদ রফিক


একুশের চেতনা ও বাংলা ভাষার বাস্তবতা

একুশের চেতনা ও বাংলা ভাষার বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে কিছু বলার আগে ব্যক্তিজীবনে, সমাজ জীবনে এমনকি রাষ্ট্রীয় জীবনে ভাষা তথা মাতৃভাষার ভূমিকা নিয়ে দু-চার কথা বলা দরকার। কারণ একটি ভাষিক জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব ও আত্মবিকাশ শুধু ভূখণ্ড ভিত্তিতে নয়, তার রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তিতে ঘটে থাকে এবং সে ক্ষেত্রে ভাষা একটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ ভিত্তি। তাছাড়া ভাষার রয়েছে সার্বজনীন ও শ্রেণি-নির্বিশেষ চরিত্র, যা নির্দিষ্ট ভাষিক জনগোষ্ঠীকে একসূত্রে বেঁধে রাখে।

আধুনিকতার পীঠস্থান হিসেবে বিবেচিত ইংরেজি, ফরাসি, জার্মান প্রভৃতি ভাষার দেশগুলোতে মাতৃভাষা ও ভাষিক জাতীয়তার চেতনাধৃত আবেগ কম নয়। এমন এক বাস্তবতার তাত্ত্বিক প্রকাশ দেখা যায় নৃতত্ত্ববিদ, ভাষাবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদ অনেকের লেখায়। একই কথা বিলেতি বিশ্বকোষের এমন মন্তব্য যে, মাতৃভাষা তার আপন শক্তিতে জাতিরাষ্ট্র ও ভাষিক জনগোষ্ঠীর সদস্যদের অন্তর্নিহিত সংহতি রক্ষা করে থাকে। ভাষার অভাব যেমন মানুষকে প্রায়-অস্তিত্বহীন করে তোলে, নির্দিষ্ট ভাষিক জনগোষ্ঠীর জন্য তার মাতৃভাষার অবস্থানও প্রায় একই পর্যায়ের। তাই মাতৃভাষা ব্যক্তিজীবনে, জাতীয় জীবনে প্রথম ভাষা হিসেবে স্বীকৃত, সে হিসেবেই এর গুরুত্ব। পরিণত বয়সে শেখা ভাষাগুলো তাই দ্বিতীয়-তৃতীয় ভাষা হিসেবে বিবেচিত। ভাষা ও জাতিসত্তার অবিচ্ছেদ্য সম্পর্কের বিষয়টি এতই গভীর যে, সেখানে অস্থানিক ধর্মীয় ভাষাও স্থায়িত্ব পায় না। মধ্যযুগের ইউরোপে ধর্মীয় ভাষা লাতিনের আধিপত্য হার মেনেছিল সেখানকার স্থানিক ভাষা জাতীয় ভাষাগুলোর কাছে। জন্ম নেয় কয়েকটি ভাষিক জাতিরাষ্ট্র। রবীন্দ্রনাথ এ পরিবর্তনকে স্বাগত জানিয়েছেন তার লেখায়।

মাতৃভাষা সেই ভাষিক জাতিগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক অগ্রগতির ধারকবাহক। রাজনীতি-রাষ্ট্রনীতি ব্যতিক্রম নয়। মাতৃভাষার বিকাশ এবং উন্নতি সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নতির সঙ্গে হাত ধরাধরি করে চলে, চলে পরস্পর নির্ভরতায়। মাতৃভাষার শক্তি-সামর্থ্য ও আর্থ-সামাজিক ভূমিকা ভাষিক জনগোষ্ঠীর (শিক্ষিত শ্রেণির) সচেতন তৎপরতার ওপর নির্ভর করে। অনেক সময় নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর জাতীয় পরিচয় তার ভাষিক পরিচয়ে যা জাতিসত্তা ও ভাষিক সত্তার আত্মিক সম্পর্ক চিহ্নিত করে থাকে। তাই অনেক সময় ভূখণ্ডের পরিবর্তন ঘটলেও ভাষিক জাতীয়তার পরিচয় পাল্টায় না। যেমন শ্রীলংকার তামিলভাষী জনগোষ্ঠী বা জাতি। উল্লেখ করা যেতে পারে ইহুদিদের প্রবল জাতীয় চেতনার কথা। কিংবা ইরাকে, তুরস্কে বসবাস করা কুর্দিদের জাতি-চেতনার বিষয়। উদাহরণ কম নেই। এ উপলক্ষে স্মরণযোগ্য তথ্য :ভাষা হতে পারে ভাষিক জনগোষ্ঠীর মুক্তিসংগ্রামের প্রেরণা।

দুই. মাতৃভাষার উল্লিখিত গুরুত্বের পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের ভাষা আন্দোলনবিষয়ক আলোচনা, যে আন্দোলন সংঘটিত হয় ভারত-বিভাগোত্তর পূর্ববঙ্গে (পরবর্তী নাম পূর্ব পাকিস্তান)। মুসলিম লীগ নেতাদের উর্দু রাষ্ট্রভাষাবিষয়ক বিবৃতির কারণে রাষ্ট্রভাষা বাংলার পক্ষে লিখিত তাত্ত্বিক প্রতিবাদ অবশ্য জুন-জুলাইয়ে (১৯৪৭)। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অব্যবহিত পূর্বে, প্রধানত লেখক-সাংবাদিক আবদুল হক, মাহবুব জামাল জাহেদী প্রমুখের রচনায়- ইত্তেহাদে, আজাদে। মিল্লাত লেখে বাংলার পক্ষে সম্পাদকীয় কলাম। একে কেউ কেউ ভাষা আন্দোলনের আদিপর্ব নামে উল্লেখ করে থাকেন। এর ধারাবাহিকতা চলেছে ১৯৪৭ সেপ্টেম্বর থেকে একাধিক লেখক ও সংগঠনের তৎপরতায়। যেমন ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, ড. মুহম্মদ এনামুল হক, আবুল মনসুর আহমদ, অধ্যাপক আবুল কাসেম প্রমুখের রচনায় বা বিবৃতিতে। এ সময়ের সাংগঠনিক তৎপরতায় তমদ্দুন মজলিস, যুবলীগ, গণআজাদী লীগ, ছাত্রলীগ, ছাত্র ফেডারেশন প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য নাম। ভাষা আন্দোলনের সংগঠিত, সংহত রূপ প্রকাশ পায় ১৯৪৮-এর ১১ মার্চের তৎপরতায় এবং এর পরিণত বিস্ম্ফোরক প্রকাশ ঘটে ১৯৫২'র ফেব্রুয়ারির ব্যাপক আন্দোলনে, যা একুশের আন্দোলন নামে বিশেষ খ্যাতি অর্জন করেছে। মধ্যবর্তী সময়ে মূলনীতি কমিটির রিপোর্টের মতো একাধিক ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় তাৎক্ষণিক বিক্ষোভ ও প্রতিবাদ একুশের বিস্ম্ফোরক পরিস্থিতি তৈরির সহায়ক হয়েছে। এসব ঘটনার নেপথ্য কারণ পাকিস্তানি শাসকশ্রেণির উর্দু চাপানোর জবরদস্তি। অবাঙালি শাসকদের বাঙালি বিরোধিতা সমাজ, রাজনীতি ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে এত প্রকট হয়ে ওঠে যে, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার কয়েক মাসের মধ্যেই বাংলা রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ভাষা আন্দোলন অনিবার্য হয়ে পড়ে। বায়ান্নর একুশে ফেব্রুয়ারিতে সূচিত ভাষা আন্দোলন কয়েকজন ছাত্র-অছাত্রের শাহাদাতবরণের মধ্য দিয়ে জাতীয় আন্দোলনের মর্যাদা অর্জন করে। প্রদেশব্যাপী সর্বত্র ছড়িয়ে যায় সে আন্দোলন। এমনকি অখ্যাত প্রান্তিক গ্রামের স্কুল পর্যন্ত তার বিস্তার। ২১ ফেব্রুয়ারি হয়ে ওঠে শহীদ দিবস। শহীদ স্মৃতি অমর করে রাখতে তৈরি হয় শহীদ মিনার প্রতিবাদী চেতনার প্রতীক হিসেবে। এ আন্দোলনের প্রভাব পড়ে সাহিত্য-সংস্কৃতিসহ জাতীয় জীবনের নানা স্তরে। সে প্রভাব সংশ্নিষ্ট খাতে গুণগত পরিবর্তন ঘটায়। সে পরিবর্তন গণতন্ত্র, জাতীয়তাবাদ, অসাম্প্রদায়িকতা ও প্রগতি চেতনার মিশ্ররূপ নিয়ে পরিস্ম্ফুট।

তিন. বায়ান্নর ফেব্রুয়ারির ভাষা আন্দোলনের আদর্শিক মর্মবস্তু একুশের চেতনা নামে পরিচিতি লাভ করেছে। মিছিলে-মিছিলে উচ্চারিত মূলত তিনটি স্লোগানে তা পরিস্ম্ফুট। রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই দাবিতে শুধু আক্ষরিক অর্থে অন্যতম রাষ্ট্রভাষার স্বীকৃতিই নয়, জাতিসত্তার আর্থ-সামাজিক অধিকার প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তার দাবিও প্রতিফলিত। রাজবন্দিদের মুক্তির দাবিতে সেক্যুলার গণতান্ত্রিক, রাজনৈতিক অধিকারের মতো বিষয়াদিও অন্তর্ভুক্ত। আর সর্বস্তরে বাংলা প্রচলনের দাবি প্রকৃতপক্ষে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে অর্থাৎ উচ্চশিক্ষা থেকে উচ্চ আদালতের মতো সর্বত্র মাতৃভাষা বাংলা ব্যবহারের দাবি নিঃসন্দেহে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ, যা ভাষিক জাতিরাষ্ট্রের পক্ষে আবশ্যিক শর্ত। এভাবেই একুশের চেতনা তার আদর্শিক উচ্চারণে সেক্যুলার বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রচ্ছন্ন আকাঙ্ক্ষা তুলে ধরে। আমার বিশ্বাস, চতুর পাকিস্তানি শীর্ষ আমলাতন্ত্র ও রাজনীতিকদের তা বুঝতে অসুবিধা হয়নি। এর উত্তর-প্রভাব তারা লক্ষ্য করেছে ষাটের দশকে জাতীয়তাবাদী রাজনীতির দ্রুত বিকাশে ৬ দফা ও ১১ দফার দাবিতে, যা পরিস্ম্ফুট। তাই প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের দাবি তাদের চোখে বিচ্ছিন্নতার দাবি হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। শেষ দিকে সে আশঙ্কার প্রকাশ্য উচ্চারণে তাদের দ্বিধা ছিল না, বিশেষ করে ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের একচেটিয়া বিজয়ের পর। আশঙ্কা ও আতঙ্কে তারা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধগুলোকে ধ্বংস করেছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের জনরায়কে প্রত্যাখ্যান করেছে। ক্ষমতা ধরে রাখতে শুরু করেছে সামরিক অভিযান, গণহত্যা ইত্যাদি।

চার. একুশের চেতনাধৃত আন্দোলনে বাঙালি জাতীয়তাবাদের উপস্থিতি ও জাতিরাষ্ট্রের সম্ভাবনা নিয়ে ভিন্নমতের তাত্ত্বিক বিতর্ক রয়েছে, যদিও তা ব্যাপক নয়। অনুপুঙ্খ বিচারে অস্বীকার করা চলে না যে, একুশের আন্দোলন, একুশের চেতনা প্রত্যক্ষ ও প্রচ্ছন্নভাবে পাকিস্তানি দ্বিজাতিতত্ত্বের আদর্শ ও তাতে নিহিত সম্প্রদায়বাদী চেতনা অস্বীকার করে সেক্যুলার বাঙালি জাতীয়তাবাদের বীজতলা তৈরি করেছিল, যেখান থেকে সেক্যুলার বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের

অঙ্কুর গজিয়েছে, যেখানে অর্থনৈতিক স্বাধিকারের বীজটিও প্রোথিত।

অবশ্য স্বীকার্য যে, যেমন একুশের তেমনি ৬ দফার দাবিতে স্বাধীন বাঙালি জাতিরাষ্ট্রের প্রকাশ্য উচ্চারণ ছিল না, উগ্র পাকিস্তানি দমননীতির মুখে তা সম্ভবও ছিল না। কিন্তু ওই চেতনার মর্মবস্তু সেখানে উপস্থিত ছিল, যা অনুকূল পরিবেশে পরিস্ম্ফুট হতে থাকে। রাজনৈতিক অনাচারে তা দেখা দিয়েছিল- একাত্তর তার প্রমাণ। এর আগে মাঝেমধ্যে সেই প্রত্যয়ের হঠাৎ ঝিলিক দেখা গেছে কিছু ছোটখাটো ঘটনায়। যেমন ১৯৪৮ ডিসেম্বর। ঢাকায় সাহিত্য সম্মেলনে ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ্‌র চমক লাগানো উক্তি : আমরা হিন্দু বা মুসলমান যেমন সত্য, তার চেয়ে বেশী সত্য আমরা বাঙালী। অন্যদিকে স্মর্তব্য একুশ দফার ১৯ সংখ্যক দফায় পূর্ববঙ্গের স্বায়ত্তশাসন ও সার্বভৌমত্ব দাবি (ডিসেম্বর, ১৯৫৩) এবং ১৯৫৭ ফেব্রুয়ারি কাগমারী সম্মেলন উপলক্ষে আওয়ামী লীগের কাউন্সিল অধিবেশনে পশ্চিম পাকিস্তানের দিকে আঙুল তুলে ভাসানীর বহু আলোচিত বিচ্ছিন্নতাবাদী উক্তি :আসসালামু আলাইকুম। কিন্তু এসব তাৎপর্যপূর্ণ রাজনৈতিক ফুলকি আত্মবিশ্বাসী পাকিস্তানের সামরিক-অসামরিক শাসকদের চেতনায় দাগ কাটেনি। তাদের সামরিক শক্তিনির্ভর আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরায়নি। এ বিষয়ে রাজনৈতিক বিচক্ষণতা তাদের সাহায্য করেনি। সমরশক্তির গর্বে স্ম্ফীত শাসকরা রাজনীতিকে সরাজ্ঞান করেছে। পরিণামে অনেক রক্তের ঋণ মেটাতে পাকিস্তানের অঙ্গচ্ছেদ, পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা, স্বাধীন ভাষিক জাতিরাষ্ট্র বাংলাদেশের অভ্যুদয়।

পাঁচ. এ ক্ষেত্রে প্রধান শক্তি মধ্যশ্রেণি নয়, তাদের তরুণ প্রজন্ম। এ ছাড়া একুশের ব্যাপক উত্তর-প্রভাব বিবেচনা করতে গেলে মূল উক্তি সঠিক মনে হয়। শহীদ দিবসের অসাধারণত্ব বিচার করেই বোধ হয় ইউনেস্কো কর্তৃক 'আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস' হিসেবে ২১ ফেব্রুয়ারির স্বীকৃতি (১৯৯৯)। এটা আমাদের জন্য গর্বের বিষয়। কিন্তু একুশে চেতনার বড় ট্র্যাজেডি হচ্ছে তার বাস্তবায়ন নিয়ে। স্বাধীন বাংলাদেশের সমাজে একুশের চেতনাধৃত গণতান্ত্রিক, সেক্যুলার মূল্যবোধ কতটা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সে ধারায় সমাজে কতটা গুণগত পরিবর্তন ঘটেছে, তা নিয়ে অনেকের অনেক যুক্তিসঙ্গত প্রশ্ন উঠে এসেছে। প্রথমত, সংবিধানে প্রজাতন্ত্রের রাষ্ট্রভাষা বাংলা, এমন ঘোষণা সত্ত্বেও জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে, বিশেষত উচ্চশিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, উচ্চ আদালতে বাংলার বদলে ঔপনিবেশিক রাজভাষার সুদৃঢ় অবস্থান। তাতে জনস্বার্থ, নিম্নবর্গীয় স্বার্থ ব্যাহত হচ্ছে। আরও হচ্ছে বিপুলসংখ্যক ইংরেজি মাধ্যমের বিভিন্ন স্তরের শিক্ষায়তনের কারণে। শিক্ষার্থী সমাজ ইংরেজি ও বাংলা মাধ্যমে দ্বিভাজিত। নতুন উপদ্রব ইংলিশ ভার্সন ব্যবস্থা। মাতৃভাষা ক্রমে পিছু হটছে। তাছাড়া রয়েছে মাদ্রাসা শিক্ষার ভিন্নধারা। ইংরেজির পক্ষে আন্তর্জাতিকতার অজুহাত যে ধোপে টেকে না, তার প্রমাণ চীন-জাপানের মতো একাধিক রাষ্ট্রে প্রাগৈতিহাসিক বর্ণমালা সত্ত্বেও উচ্চশিক্ষায় মাতৃভাষার ব্যাপক ব্যবহার। একই ঘটনা বিজ্ঞান শিক্ষা ও উচ্চ প্রযুক্তির গবেষণা ক্ষেত্রে। চীনা ভাষায়, জাপানি ভাষায় যদি মহাকাশ গবেষণা, আণবিক গবেষণা চলতে পারে, তাহলে উন্নত বাংলা ভাষায় তা চলবে না কেন? এ ক্ষেত্রে সমস্যার সমাধান শ্রমসাধ্য হলেও অসম্ভব নয়।

আসলে সমস্যা অন্যত্র। মাতৃভাষা নিয়ে আমাদের হীনমন্যতার কারণে আমরা মাতৃভাষাকে উচ্চশিক্ষার সঙ্গে, জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করিনি। পুরনো অভ্যাসমাফিক পুরনো রাজভাষার অভ্যস্ত বৃত্ত থেকে বেরিয়ে আসার শ্রম স্বীকার করতে চাইনি। ভাবিনি যে, আন্দোলনে-লড়াইয়ে যে তাৎক্ষণিক অর্জন ঘটে, তার ব্যবহারিক বাস্তবায়ন ঘটালে সে অর্জন স্থায়ী হয় না। একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার আদর্শিক সূত্রগুলোর বাস্তবায়নে আমরা অবহেলা করেছি। সে কারণে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে মাতৃভাষা বাংলা পিছিয়ে পড়েছে, এখনও পড়ছে। অথচ আমরা জানি, বিশ্বের অধিকাংশ জাতিরাষ্ট্রে জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে তাদের মাতৃভাষার সার্বিক ব্যবহার চলে আসছে, যা তাদের জাতীয় উন্নতির স্বচ্ছন্দপথ তৈরি করছে। মাতৃভাষা বাংলার প্রতি আমাদের অনাদর-অবহেলার আরও প্রমাণ সেই ভাষার মানসম্মত চর্চার অভাব। প্রাত্যহিক জীবনাচরণে বাংলা তার মননশীল চর্চায় যেন এক দুঃসময়ের পথ পাড়ি দিচ্ছে। এফএম রেডিওর বিনোদন অনুষ্ঠানে উদ্ভট ভাষার অনাচার সে যাত্রায় নতুন মাত্রা যোগ করছে। বিষয়টি এত আলেচিত যে, উদাহরণ টানার প্রয়োজন পড়ে না। দুর্ভাগ্যজনক যে, তরুণ প্রজন্ম এসবে আকর্ষিত হচ্ছে। আর ঘরে ঘরে হিন্দি ছবি বা সিরিয়ালের প্রভাব ছোটদের ওপরও পড়ছে। বাংলার স্থান মনে হয় একদিন দখল করে নেবে ইংরেজি ও হিন্দি শক্তিমান আগ্রাসনে। বাংলা টিকে থাকবে শুধু সাহিত্যে ও সংস্কৃতিচর্চায় এবং মুখের বুলিতে। বর্তমান পরিস্থিতিতে আমাদের কর্তব্য একুশের চেতনা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিস্ম্ফুট বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া, মাতৃভাষাকে সমাজের সর্বস্তরে প্রতিষ্ঠিত করার কাজে হাত লাগানো, তা সে কাজ যত শ্রমসাধ্যই হোক। আর দরকার সে কাজে তরুণ প্রজন্মকে উদ্বুদ্ধ করে তোলা। ইংরেজি দ্বিতীয় ভাষা হিসেবে শিখতে হবে; তবে মাতৃভাষার বিকল্প হিসেবে নয়। বড় কথা, দুটি ভাষাই ভালোভাবে শিখতে হবে এবং তা গোঁজামিলের শেখা নয় যে, শিক্ষার্থী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারবে না। আসলে সব শিক্ষাই যে উচ্চ মানের হতে হবে, সে বিষয়ে ভিন্নমতের কোনো অবকাশ নেই- হোক তা মাতৃভাষা বা বিদেশি ভাষা।

লেখক: ভাষাসংগ্রামী, রবীন্দ্র গবেষক, প্রাবন্ধিক, কবি।

আর/০৮:১৪/১১ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে