Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ২ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-০৬-২০১৯

ভৈরবের গৌরব নেই, এখানে নদের অস্তিত্বও নেই!

শাহানুর আলম উজ্জ্বল


ভৈরবের গৌরব নেই, এখানে নদের অস্তিত্বও নেই!

যশোর, ০৬ ফেব্রুয়ারি- যশোরের চৌগাছা উপজেলার বুড়ি ভৈরব নদ ভূমি সন্ত্রাসীদের ছোবলে বর্তমানে অস্থিত্ব সংকটে ভুগছে। এক সময়কার প্রমত্তা বুড়ি ভৈরবে এখন আর নেই ঢেউয়ের শব্দ, চলে না পালতোলা নৌকা, আর নেই পাখিদের কলতান। নিষ্ঠুর ভূমি সন্ত্রাসীরা নদকে যথেচ্ছ ব্যবহার করে নদের মানচিত্র বদলে ফেলেছে। নদটি অচিরেই খনন বা সংস্কার করা না হলে যেটুকু আছে তাও বিলীন হয়ে যাবে বলে বিশেষজ্ঞরা জানিয়েছেন।  

জানা গেছে, ভৈরব হচ্ছে বাংলাদেশের মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ, যশোর, নড়াইল, খুলনা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা জেলায় অবস্থিত অন্যতম নদী। নদীটির দৈর্ঘ্য ২৪২ কিলোমিটার, গড় প্রস্থ ৬০ মিটার এবং এর প্রকৃতি সর্পিলাকার। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের ভৈরব নদের প্রদত্ত পরিচিতি নম্বর দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের নদী নং ৬৮। এটি দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশের একটি নদ। ভৈরব নদের তীরে খুলনা ও যশোর শহর অবস্থিত। নদের তীরে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ শহরগুলোর মধ্যে রয়েছে মুজিবনগর, মেহেরপুর, গাড়াবাড়িয়া, চুয়াডাঙ্গা, বড়বাজার, কোটচাঁদপুর, চৌগাছা, দৌলতপুর ও বাগেরহাট। হিন্দুদের কাছে নদটি পবিত্র হিসাবে সমাদৃত। ভৈরব এর অর্থ 'ভয়াবহ'। গঙ্গা ও পদ্মা নদীর মূল প্রবাহ এই নদকে প্রমত্তা রূপ দিয়েছিল বলেই ভৈরব নামটির উৎপত্তি। 

উপজেলায় ভৈরব নদটি বুড়ি ভৈরব নামে পরিচিত। এ নদ ঝিনাইদহের কালিগঞ্জ উপজেলা হয়ে আড়পাড়া, দক্ষিণ সাগর, মাড়ুয়া, কান্দি, ঝিনাইকুন্ড, সাদিপুর, পুড়াহুদা, ভবানীপুর, ইছাপুর, মুক্তদাহ গ্রামের গা ঘেঁষে চৌগাছার কপোতাক্ষ নদে এসে মিলিত হয়েছে। 

কালের স্বাক্ষী এক সময়কার প্রমত্তা বুড়ি ভৈরব নদ ছিল সকলের চেনা-জানা। কালের পরিক্রমায় এ নদকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে জেলে পল্লী। কৃষকের চাষবাসের ধরনও পাল্টে যায় নদের কারণে। এর অববাহিকায় হাজারও পাখি আর জীব বৈচিত্র্যের ছিল মিলনমেলা। কিন্তু বছরের পর বছর নদ পাড়ের অসাধু ভূমি সন্ত্রাসীরা আধিপত্য বিস্তারের মাধ্যমে এ নদকে করেছে খণ্ডিত। ইচ্ছেমতো পাড় নির্মাণ করে চালিয়েছে মাছ চাষ। এমনকি ভরাট করে দখল করে নিয়েছে। যথেচ্ছভাবে করেছে হালচাষ। ফলে ধীরে ধীরে নদ সঙ্কুচিত হয়ে এখন মরা খালে পরিণত হয়েছে। 

ভৈরব পাড়ের কিছু অসাধু ব্যাক্তিরাই নদটিকে দখল করে নিয়েছে। সুযোগ সন্ধানীরা পর্যায়ক্রমে নদকে দখল করে ভোগ করছে। নদের বুকে অনেকে তৈরি করেছে বিশাল বিশাল পুকুর। আবার অনেকে চাষ উপযোগী করে দখল করে নিয়েছে এই ভৈরব। দখলের করণে নদটি হারিয়েছে তার চিরচেনা যৌবন। এখন নদের বুকে গরু ছাগল চরানো হয়। যেখানে পালতোলা নৌকা, গাংচিল আর বিরল প্রজাতির মাছরাঙ্গাসহ বিভিন্ন পাখি প্রজাতি ও বুনো হাঁস বদলে ভৈরব এখন গোচারণ ভূমি। 

বর্ষা মৌসুমে কিছুটা পানি থাকলেও বছরের বেশির ভাগ সময় শুষ্ক অবস্থায় পড়ে থাকে নদটি। ফলে জেলেরা এখন তাদের পেশা পরিবর্তন করে বিভিন্ন পেশায় চলে যাচ্ছেন। শুধু তাই না, ভৈরব শুকিয়ে যাওয়ার প্রভাব পড়েছে জীব বৈচিত্র্যের ওপর। এই নদের অসংখ্য দেশি প্রজাতির মাছ হারিয়ে গেছে। সারা দিন ঝাঁকে ঝাঁকে বিভিন্ন ধরনের পাখি নদে আসতো।

আজ তা বন্ধ হয়ে গেছে। নদ পাড়ের বাসিন্দারা পানি দিয়ে চাষাবাদ করতেন। সেটিও বন্ধ হয়েছে শুধু পানি না থাকার কারণে। এছাড়া কৃষকরা ভৈরব নদে জন্মানো বিভিন্ন পট-কচুরি দ্বারা জৈব সার তৈরি করে মাঠে ফসল ফলাতেন। এ সবই এখন তাদের কাছে স্মৃতি। 
 
সরেজমিন মুক্তাদহ, ভবানিপুর, ইছারপুর, রোস্তমপুর প্রায় ৮ কিলোমিটার গিয়ে দেখা গেছে, নদের করুণ মৃত্যুর ছবি। নদ দখল অনেক কৃষি জমিতে পরিণত হয়েছে। নদের বুকেই কলাচাষ, বাঁশঝাড় আর বিভিন্ন চাষাবাদ করা হচ্ছে। মাত্র ৮/১০ হাত সরু খালের রূপ নিয়েছে ভৈরব। এ অঞ্চলের প্রায় ৪০০ অসাধু মানুষ নদটি বহু যুগ ধরে দখল করে আছেন। এখানে ভৈরব নদ ছিল, তা এখন অবিশ্বাস্য মনে হবে। 

ভৈরব পাড়ের বাসিন্দা মুক্তাদাহ গ্রামের গাউসুল আজম (৭০) জানান, তারা এক সময় এই ভৈরব নদে মাছ শিকার করে করতেন। এছাড়া বহু জেলেরা জীবন চালাতেন এই নদের ওপর ভরসা করে। কিন্তু বর্তমানে ভৈরব নদ ভূমি সন্ত্রাসীদের অত্যাচারে শেষ হয়ে গেছে। এখন জেলেপল্লীও নেই। 

ইছাপুর গ্রামের কারিম মোস্তাফা (৬৮), ভবানিপুরের হারুণ বিশ্বাস (৭৫), রোস্তমপুরের বাদল কারিগর (৭২) জানান, ছোট বেলায় আমরা এই নদে সাঁতার কাটতাম। নদের স্রোত ছিল বিশাল। কিন্তু এই নদটি এখন মৃত। নদের পাড়ে জনবসতি গড়ে উঠেছে। যে যার মত যুগ যুগ ধরে দখল করে নদটিকে আমরা শেষ করে দিয়েছি। তারা আরো বলেন, এই নদের সাথে এ অঞ্চলের মানুষের আত্মিক সম্পর্ক ছিল। সামাজিক সাংস্কৃতিক বন্ধনে ছিল এই নদ। পূজা, পার্বন, নানা অনুষ্ঠানে নদকে ব্যবহার করা হত। ধোয়া, মোছা, গোসল, বাড়ির নানা প্রয়োজনে পানি ব্যবহার করা হত। পাখিদের আবাসভূমি ছিল এই নদ। কিন্তু এই নদটি এখন শুধুই স্মৃতি। 

নদ পাড়ের বেশ কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আঁকাবাঁকা ভাবে গ্রাম আর মাঠের ভেতর দিয়ে বয়ে গেছে এই নদ। বর্তমানে মাঠান জমির সাথে বলা চলে পুরোপুরি মিশে গেছে নদটি। স্থানীয় প্রভাবশালীরা বহু বছর  আগে থেকেই এই নদটি দখল করে নিজের সম্পত্তি বানিয়েছে। তারা প্রশ্ন করে বলেন, এই নদ কী পুনরুদ্ধার করা সম্ভব? মৌজার নক্সা দেখে পুরো নদ উদ্ধার করা প্রয়োজন বলে তারা জানান। 

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার মারুফুল আলমের কাছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, নদী পুনরুদ্ধারের জন্য বর্তমান সরকার বিভিন্ন কার্যক্রম চালাচ্ছে। আমরাও সেই কার্যক্রমের সাথে আছি। ইতোমধ্যে কপোতাক্ষ নদের অবৈধ দখলদারীদের নাম ঠিকানা চিহ্নিতকরণের কাজ অব্যহত রয়েছে। কিছু স্থাপনা উচ্ছেদও করা হয়েছে। ভৈরব নদটিও বহু বছর ধরে ভোগ দখল করেছে স্থানীয় ব্যক্তিরা। আমরা দ্রুত তাদের তালিকা তৈরি করে নদের স্থান মুক্ত করার জন্য নোটিশ দেব। নোটিশের নির্দেশনা না মানলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।   

এমএ/ ১০:৪৪/ ০৬ ফেব্রুয়ারি

যশোর

আরও সংবাদ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে