Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ , ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-০৬-২০১৯

দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ

খোন্দকার ইব্রাহিম খালেদ


দ্রুতগতিতে অগ্রসর হচ্ছে বাংলাদেশ

বিদেশের গবেষক ও সমীক্ষকরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক উন্নতির পর্যালোচনা প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, বাংলাদেশ দ্রুতই অন্যান্য দেশকে টপকিয়ে যাচ্ছে এবং যে হারে এ দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হচ্ছে, তাতে করে আগামী ১৫ বছরের মধ্যে উন্নত ২৫টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশ স্থান করে নেবে।

এসময়ের মধ্যে বাংলাদেশ টপকিয়ে যাবে সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়ার মতো অনেক দেশকে।

কিছুদিন আগে এক পাকিস্তানির খেদোক্তি সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়েছিল। পাকিস্তানের নবনির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী জনগণকে আশ্বাস দিয়ে বলেছিলেন, তিনি ক্ষমতায় থাকলে আগামী পাঁচ বছরে পাকিস্তানকে অর্থনৈতিক উন্নতির মাপে সুইডেন বানিয়ে দেবেন।

একথার সূত্র ধরে একজন বিশিষ্ট পাকিস্তানি তাদের প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে বলেছিলেন, ‘সুইডেন ছোড় দো, পাঁচ বরছ মে ভি নেহি, দছ বরছ মে হামকো বাংলাদেশ বানা দো।’ এর অর্থ হল, সুইডেন বাদ দিন, পাঁচ বছরও বাদ দিন, দশ বছরে আমাদের (অর্থাৎ পাকিস্তানকে) বাংলাদেশ বানিয়ে দিন।

একাত্তর সালে স্বাধীন হওয়ার আগ পর্যন্ত পশ্চিম পাকিস্তান ছিল অর্থনৈতিকভাবে উন্নত। বাংলাদেশ ছিল দারিদ্র্যপীড়িত। কিসিঞ্জারের ভাষায় ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’। পঞ্চাশ বছরও পার হয়নি। এরই মধ্যে অর্থনীতির প্রায় সব সূচকেই পাকিস্তানকে অতিক্রম করে ঊর্ধ্বে অবস্থান করছে বাংলাদেশ। কোনো কোনো সূচকে শক্তিশালী ভারতকেও ছাড়িয়েছে বাংলাদেশ। প্রধান রফতানি খাতের কথাই ধরা যাক।

বাংলাদেশে পোশাকশিল্প শুরুই হল আশির দশকের প্রারম্ভে বা কিছু আগে। পাকিস্তানকে হারিয়ে, ভারতকে অতিক্রম করে, তুরস্ককে পরাভূত করে এখন পোশাক রফতানিতে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয়। একমাত্র চীনের পরে। তথ্যটি অর্থবহ কারণ তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানে একমাত্র শিল্পপতি ছিলেন চট্টগ্রামের একে খান। তা-ও ছোটখাটো শিল্পপতি।

পাকিস্তানিরা বলত যে, বাঙালিরা ব্যবসা বোঝে না, করতেও পারে না। আজকে শিল্প-ব্যবসার কোনো অঙ্গনেই বাঙালিদের সঙ্গে পেরে উঠছে না পাকিস্তানিরা। শুধু ব্যবসা কেন! সব অঙ্গনেই। পাকিস্তান ক্রিকেট টিমে দ্বাদশ ব্যক্তি ছাড়া কোনো বাঙালি ক্রিকেটার ছিল না। এখন বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কাছে হরহামেশা পাকিস্তান দল পরাজিত হচ্ছে।

চুয়াত্তর সালে বিরাট দুর্ভিক্ষ হয়েছিল। দু-এক বছর পরপরই দুর্ভিক্ষ হতো। তখন সাড়ে সাত কোটি লোকের ষাট শতাংশ খাদ্য উৎপাদন হতো। খাদ্য আমদানির মতো অর্থও ছিল না। তাই দুর্ভিক্ষ হতো। আঞ্চলিক দুর্ভিক্ষ বা মঙ্গা তো নিত্যঘটনা ছিল। আজ ১৬ কোটি মানুষের দেশ খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণ। স্বাধীন দেশের কৃষকই এ অসম্ভব কাজটি করেছেন।

বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় লেগেই ছিল। উপকূল অঞ্চলে কত লোক মৃত্যুবরণ করেছে, কত ক্ষতি হয়েছে- তার বুঝি হিসাবও নেই। এ প্রাকৃতিক দুর্যোগগুলো এখন অতীত কাহিনী। উপকূলের ধ্বংসযজ্ঞ এখন সীমিত।

এখন শতবর্ষের জন্য বদ্বীপ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে সরকার। তাহলে রুদ্রপ্রকৃতিও কি মুক্তিযুদ্ধকে ভয় পেয়েছে? আগে প্রকৃতি মানুষকে অত্যাচার করত। এখন মানুষ প্রকৃতিকে শৃঙ্খলবদ্ধ করে ফেলেছে।

একটি মুক্তিযুদ্ধ, একটি স্বাধীনতা বাঙালিদের কেন এবং কীভাবে অর্থনৈতিক, সামাজিক সব দিক দিয়ে উন্নতির শিখরে নিয়ে এল। বিষয়টি পর্যালোচনার দাবি রাখে। প্রথমে ইংরেজ, পরে পাকিস্তানিরা বাঙালিদের অনেকটা কারারুদ্ধ করে রেখেছিল। হাতে-পায়ে শেকল পরিয়ে রেখেছিল।

হীনমন্যতার বীজ ঢুকিয়ে দিয়েছিল মগজে। অল্পসংখ্যক বাঙালি মীরজাফরকে ইংরেজ-পাকিস্তানিরা উচ্ছিষ্টের বিনিময়ে ব্যবহার করত বাঙালিদের বিরুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধ এমন বন্দিদশা থেকে বাঙালিকে মুক্ত করেছিল।

ইতিহাসের কিছু খণ্ডচিত্রের দিকে তাকান যাক। ইংরেজরা সারা ভারতবর্ষ দখল করেছিল। শুরু হয়েছিল কিন্তু বাংলাদেশ থেকে। পলাশীতে বাঙালিদের সঙ্গে যুদ্ধ করতে হয়েছিল ইংরেজদের। মীরজাফর গাদ্দারি না করলে যুদ্ধের ফল অন্য রকম হতে পারত। সে যাই হোক, ইংরেজদের যুদ্ধ বাঙালির সঙ্গেই হয়েছিল। অবশিষ্ট ভারত জয়ে ইংরেজকে তেমন যুদ্ধ করতে হয়নি।

এ কারণে ইংরেজ শাসনামলে বাঙালি বিশেষ করে বাঙালি মুসলিমদের (সিরাজুদ্দৌলা মুসলিম শাসক ছিলেন) দাবিয়ে রাখাই ইংরেজদের অন্যতম নীতি ছিল। বাঙালির ধীশক্তিকে তারা ভয় পেত।

অবাঙালি ভারতীয় নেতা গোখেল বলেছিলেন, ‘বাঙালিরা আজ যা ভাবছে, অন্যান্য ভারতীয়রা তা ভাববে আগামীকাল’। ইংরেজরা একথা বুঝেছিল। তাই বাঙালির এক্সেলেন্সকে তারা সমীহ করত। ইংরেজরা যখন মোটা কাপড় বানাত, বাঙালিরা তখন মসলিন কাপড় তৈরি করত। ব্যবসায়িক দৃষ্টিভঙ্গিতে দেখলে ইংরেজরা বাংলার মসলিন কাপড় বিশ্বব্যাপী বিক্রি করে প্রচুর অর্থ উপার্জন করতে পারত। ইংরেজরা তা করেনি।

তারা বাঙালির অহংবোধ ভেঙে দেয়ার জন্য সুদক্ষ কারিগরদের হাতের আঙুল কেটে দিয়েছিল বলে কথিত আছে। অন্য ভারতীয়দের ক্ষমতায়িত করলেও বাঙালিদের ক্ষমতা বলয়ের বাইরে রেখেছে। হীনমন্যতা ঢুকিয়েছে তাদের মধ্যে।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সিপাহি বিদ্রোহসহ ইংরেজবিরোধী আন্দোলন (যথা স্বদেশি আন্দোলন) অধিক সংগঠিত হয়েছে বৃহত্তর বাংলায়। তাই বাঙালিরা নিষ্পেষিত হয়েছে।

এরপর হল পাকিস্তান। বৃহত্তর বাংলায় পাকিস্তানের দাবি নিয়ে নির্বাচনে জিতেছিল মুসলিম লীগ। অথচ স্বাধীনতার পর পাকিস্তানের রাষ্ট্রযন্ত্র ছিনিয়ে নিল অবাঙালি পাকিস্তানিরা। বাঙালি হয়ে গেল ‘সেকেন্ড ক্লাস সিটিজেন’। ভাগ্যের পরিহাস! নিষ্পেষিত হয়ে, হীনমন্যতায় ভুগে অবসন্ন হয়ে ঝিমিয়ে পড়েছিল বাঙালি জাতি। চেতনার জাদু নিয়ে আবির্ভূত হলেন বঙ্গবন্ধু। তন্দ্রা কেটে গেল।

বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাঙালির হীনমন্যতা দূর হল। মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি আত্মপ্রত্যয়ী হয়ে উঠল। ধীশক্তি তো আগেই ছিল। তার সঙ্গে যোগ হল আত্মপ্রত্যয়। ‘কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবা না’ বজ কণ্ঠের এই প্রত্যয় সারা জাতিকে প্রত্যয়ী করে তুলেছিল।

এ কারণেই স্বাধীনতার পর বাঙালি জাতি আত্ম আবিষ্কার করেছিল। আত্মশক্তিতে বলিয়ান হয়েছিল। বাঙালি হয়ে উঠল অদম্য। যেখানে হাত দেয় সেখানেই সফল হয়। সফলতাই তার আত্মশক্তিকে ক্রম বিকশিত করতে লাগল। মুক্তিযুদ্ধের বিজয়ী হয়ে উঠল সর্বক্ষেত্রে বিজয়ী জাতি।

কৃষিতে বিপ্লব হয়েছে। পোশাক তথা বস্ত্র শিল্পে সফলতা এসেছে। ঘরকুনো বাঙালি স্বাধীনতার পর বিশ্বের সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। আজ বোধ করি এমন কোনো রাষ্ট্র খুঁজে পাওয়া যাবে না, যেখানে বাঙালি বসতি নেই। সেবা খাতের কাক্সিক্ষত বিকাশ ঘটেছে।

বিশ্ব বাণিজ্যে অনেক বাঙালি স্থান করে নিয়েছেন। বিদেশে শান্তিরক্ষী বাহিনীতেও প্রাধান্য রয়েছে বাঙালি সেনাদের। ক্রীড়া জগতেও স্থান করে নিয়েছে বাংলাদেশ। ক্রিকেট খেলায় এককালে অনুপস্থিত বাংলাদেশ এখন বিশ্বের প্রথম কাতারে।

বাংলাদেশের বালিকা ফুটবল দল রীতিমতো চমক সৃষ্টি করেছে বিদেশে খেলে। দারিদ্র্য নিরসনের সংগ্রামে অগ্রগতি উল্লেখযোগ্য, যদিও আরও অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় অভাবিত সম্প্রসারণ ঘটেছে, যদিও মান অর্জন নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

জাতীয় আয়ের বার্ষিক শতকরা প্রবৃদ্ধি, সাত শতাংশ অতিক্রম করে দ্রুত আট শতাংশের দিকে ধাবিত হচ্ছে, যা গর্ব করার মতো। এ গর্ব-খর্ব হয়ে যায় যখন দেখি এখনও দারিদ্র্য মানুষের সংখ্যা ২২ শতাংশ, অতি দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ১২ শতাংশ। অথচ অতি ধনীদের সংখ্যা বৃদ্ধির শতাংশ হারের বিচারে বাংলাদেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চীনকে টপকিয়ে প্রথম স্থান অধিকার করেছে।

ধনীদের শতাংশ হার বৃদ্ধির বিচারে বাংলাদেশ বিশ্বের তৃতীয় স্থানে। এসবের সাদামাটা অর্থ দাঁড়ায়, জাতীয় আয় বৃদ্ধির অর্জিত অর্থ দেশের ৫ শতাংশ মানুষের কাছে পুঞ্জীভূত আছে। এমন চলতে থাকলে বাংলাদেশের মালিকানা চলে যাবে গুটি কয়েক অর্থশালীর কাছে।

রাজনীতি-অর্থনীতি সবই অর্থশালীদের হাতের মুঠোয় চলে যাবে। সাধারণ নাগরিকের কাছে রাষ্ট্রের মালিকানা ফিরিয়ে দিতে হলে যেতে হবে সংবিধানের কাছে। সংবিধানে বর্ণিত গণতন্ত্র ও সমাজতন্ত্রের কাছে।

গণতন্ত্র আমরা সবাই স্বীকার করি, চর্চার চেষ্টাও করি। কিন্তু সমাজতন্ত্র তো সরকারের কার্যকর স্বীকৃতিই পাচ্ছে না। দেশের অর্থনীতি চলছে পুঁজিবাদ বা ধনতন্ত্রের ধারায়, যা সমাজতন্ত্রের বিপরীত। সমাজতন্ত্রের আধুনিক নাম ‘কল্যাণ অর্থনীতি’ যা প্রথম গৃহীত হয়েছিল ব্রিটেনে। এখন কল্যাণ রাষ্ট্রের পরিচয় বহন করছে ইউরোপের নরওয়ে, সুইডেন, ডেনমার্ক, জার্মানি, ইংল্যান্ড ইত্যাদি রাষ্ট্র।

এসব উন্মুক্ত রাষ্ট্র ধনতন্ত্র পরিহার করে কল্যাণ অর্থনীতি চর্চা করতে পারলে বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ কেন পারবে না? জাতীয় আয়ের সঙ্গে বণ্টন ব্যবস্থার সমন্বয়ের নামই কল্যাণ অর্থনীতি বা সমাজতন্ত্র।

এজন্যই মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। পশ্চাৎসরণ নয়। সাহস করে উন্নয়নের সঙ্গে বণ্টন ব্যবস্থার সমন্বয় সাধন করে সব মানুষের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিশ্চিত করতে পারলে কল্যাণ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠিত হবে। তা না হলে কিন্তু সংবিধান লঙ্ঘিত হবে। চার মূলনীতির যে কোনোটির বিপরীত কর্ম সংবিধান লঙ্ঘনের শামিল।

এমএ/ ০৩:০০/ ০৬ ফেব্রুয়ারি

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে