Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ২৬ মে, ২০১৯ , ১২ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (9 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-০৬-২০১৯

হোটেল-রেস্তোরাঁর মান নির্ধারণ ও কিছু প্রশ্ন

রুহিনা ফেরদৌস


হোটেল-রেস্তোরাঁর মান নির্ধারণ ও কিছু প্রশ্ন

ঢাকায় মোট কতগুলো রেস্তোরাঁ বা খাবারের দোকান রয়েছে? সেখানে প্রতিদিন গড়ে কতজন লোক খাবার খেয়ে থাকেন? রেস্তোরাঁ, ক্যাফেগুলো দৈনিক কত টাকা আয় করে? ঢাকার রেস্তোরাঁ অর্থনীতির পরিধি কত?

প্রশ্নগুলোর কোনো সমন্বিত তথ্য বা পরিসংখ্যান নেই। ঢাকা সিটি করপোরেশন, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, রেস্তোরাঁ মালিক সমিতি—এ অভিভাবক প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ঢাকায় মোট কতগুলো হোটেল-রেস্তোরাঁ আছে, তার কোনো সুনির্দিষ্ট তালিকা পাওয়া যায়নি।

তালিকা রয়েছে, তবে বিচ্ছিন্ন। যেমন উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ভিন্ন ভিন্ন জোনে রয়েছে জোনভিত্তিক কিছু তালিকা, বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির অধীনে রয়েছে তাদের নিবন্ধিত মাত্র ৬৫০ হোটেলের তালিকা (ঢাকার মোট হোটেল-রেস্তোরাঁ অনুপাতে সংখ্যাটি নেহাতই সামান্য)। এছাড়া নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ চলমান গ্রেডিং প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করছে তাদের মতো করে এলাকা ভাগ করে। যেমন মতিঝিল, দিলকুশা, পল্টন ও সচিবালয়ের কয়েকটি এলাকায় পাইলট প্রকল্পের অধীনে গত জানুয়ারিতে কার্যক্রম শুরু হয়। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (অতিরিক্ত সচিব) মাহবুব কবির মিলনের ভাষ্যমতে, ‘শুধু ঢাকাতেই কার্যক্রমটি সীমাবদ্ধ রাখা হবে না। ঢাকার পর চট্টগ্রামে কাজ শুরু করবেন। পরবর্তীতে ধাপে ধাপে দেশের সব হোটেল-রেস্তোরাঁয় এ কার্যক্রম পরিচালনা করা হবে।’ উদ্যোগটি নেহাত আশাজাগানিয়া।

এ পর্যায়ে ছোট একটি ভূমিকা অনিবার্য। বিগত কয়েক বছরে একটু একটু করে ঢাকার জীবনযাত্রার অনেকখানি পরিবর্তন হয়েছে। এক জায়গা থেকে অন্যত্র যাওয়া, ঘরে বসে প্রয়োজনীয় জিনিস কেনা, অনলাইন মারফত নানা রকম সেবা পাওয়া—সব মিলিয়ে মানুষের রোজকার রুটিন, সবকিছুতে বদলের ছোঁয়া। পরিবর্তনের ধারাবাহিকতায় বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রাধান্য পাচ্ছে রেস্তোরাঁ কালচার। ঢাকাবাসীর হোটেল-রেস্তোরাঁয় খাওয়া, সময় কাটানোর বিষয়গুলোও বৃদ্ধি পেয়েছে। প্রতিদিন কতজন মানুষ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় খেতে যায়, এর হিসাব করলে রেস্তোরাঁ সংস্কৃতির নেপথ্যের অর্থনীতি সম্পর্কেও একটি ধারণা পাওয়া যায়। তাই রেস্তোরাঁ অর্থনীতির সুনির্দিষ্ট পরিমাপের পরিসংখ্যান জরুরি।

তাছাড়া ঢাকাসহ গোটা দেশের খাবারের দোকানগুলোকে গ্রেডিং পদ্ধতির আওতায় আনার জন্য যে সংগঠিত ও দক্ষ জনবল, প্রযুক্তিগত সমর্থন এবং অভিভাবক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সার্বিক সমন্বয়ের প্রয়োজন পড়বে, সে বিষয়গুলোও নিশ্চিত করা প্রয়োজন। নামমাত্র জনবল কিংবা অদক্ষ কর্মী দল নিয়ে ব্যাপক এ উদ্যোগকে ফলপ্রসূ করা মোটেও সহজ হবে না। তাছাড়া গ্রেডিং কার্যক্রমের ভাবনা ও সূচনা গত বছরের প্রথম দিকে হলেও এ জানুয়ারি থেকে পুনরায় শুরু হয়েছে। প্রথম পর্যায়ে রাজধানীর মতিঝিল, পল্টনসহ এর পার্শ্ববর্তী এলাকার ২০০টি হোটেল-রেস্তোরাঁর তালিকা করে ৫৭টি হোটেল-রেস্তোরাঁকে গ্রেডিং পদ্ধতির আওতায় আনা হয়েছে। প্রাথমিক পর্যায়ে ‘এ প্লাস’ ১৮টি এবং ‘এ’ পেয়েছে ৩৯টি রেস্তোরাঁ। রয়েছে ‘বি’ ও ‘সি’ ক্যাটাগরিও। তবে ‘এ’ প্লাস পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো উত্তমমানের এবং ‘এ’ পাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলো ভালো মানের হোটেল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এসব হোটেলের সামনে ‘এ প্লাস’ সবুজ, ‘এ’ নীল, ‘বি’ হলুদ ও ‘সি’র ক্ষেত্রে কমলা রঙের স্টিকার লাগানো হয়েছে। কমলা স্টিকারের কোনো হোটেল যদি এক মাসের মধ্যে মান ভালো করতে না পারে, তাহলে হোটেলের লাইসেন্স বাতিল করা হবে। অন্যদিকে হলুদ স্টিকারধারী রেস্তোরাঁকে তিন মাসের সময়সীমা বেঁধে দেয়া হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে তাদের মান ও গ্রেড উন্নত করতে হবে। অন্যথায় তাদের লাইসেন্সও বাতিল করা হবে।

এদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ওয়েবসাইটে গিয়ে দেখা মিলল ফুড সেফটি জোনের। সেখানে সবুজ, হলুদ, লাল— তিনটি জোনে নিরাপদ খাবারের দোকানের খোঁজ জানাচ্ছে। সবুজ ক্যাটাগরিতে (গতকাল পর্যন্ত) রয়েছে ৩৭টি রেস্তোরাঁর নাম। কিন্তু হলুদ ও লাল জোনে কোনো হোটেল বা রেস্তোরাঁর নাম নেই। কর্তৃপক্ষ বোধকরি এক ও তিন মাস পর্যন্ত যে সময় বেঁধে দিয়েছে, তার পরিপ্রেক্ষিতে এ তালিকায় স্থান পাওয়া দোকানগুলোর নাম ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেনি। এক্ষেত্রে গ্রেডিং কার্যক্রমের গতি যোগ করতে হলুদ কিংবা কমলা ক্যাটাগরিতে জায়গা পাওয়া হোটেল-রেস্তোরাঁর নাম উল্লেখ করা যেতে পারত। এতে ওই হোটেল ও রেস্তোরাঁগুলো আরো বেশি সচেতন ও সক্রিয় হতো। তাছাড়া ঘরে বসে অনলাইনেও অনেকে খাবার অর্ডার করে, তাই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বিবেচনা করতে পারেন।

চলমান গ্রেডিং পদ্ধতি ও ঢাকার খাবারের দোকানের তালিকার খোঁজে যোগাযোগ করা হয় বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সঙ্গে। আগেই উল্লেখ করেছি, তাদের কাছে সার্বিক কোনো তালিকা নেই। কেবল সমিতির নিবন্ধিত হোটেল-রেস্তোরাঁর তালিকা রয়েছে। তবে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব এম রেজাউল করিম সরকার রবিন জানান, ‘ঢাকায় মোট হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যাটা আনুমানিক সাড়ে ৫ থেকে ৭ হাজার।’ (যদিও প্রকাশিত কোনো কোনো প্রতিবেদনে ১০ হাজারের বেশিও বলা হচ্ছে)। পাশাপাশি তিনি দারুণ একটি তথ্যও জানালেন। তা হলো ২০১৪ সাল-পরবর্তী রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার কারণে রেস্তোরাঁ ব্যবসা খানিকটা ঝিমিয়ে পড়লে বিভিন্ন মিডিয়া, দৈনিক পত্রিকাগুলো তাদের কাছে রেস্তোরাঁ-বিষয়ক বিভিন্ন তথ্য জানতে চায়। সে সময় তাদের কাছে খাবার দোকানের তালিকা, কর্মীদের তথ্য, রেস্তোরাঁ অর্থনীতির পরিধি-বিষয়ক কোনো পরিসংখ্যান না থাকায় তারা কোনো তথ্য সরবরাহ করতে পারেনি। পরবর্তীতে তথ্য সংরক্ষণের বিষয়টি উপলব্ধি করে তারা জরিপ চালায় ও তালিকা করে। সে তথ্য অনুসারে, সারা দেশে ছোট-বড় হোটেল-রেস্তোরাঁর সংখ্যা ৫৫-৬০ হাজার (তালিকাটি কোনো ধরনের জরিপের ভিত্তিতে নয়, অনুমানের ভিত্তিতে তৈরি করা হয়। তারকা হোটেল ও স্ট্রিট ফুড বা ভ্রাম্যমাণ খাবারের দোকান বাদে)। তবে সমিতির পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে হোটেল-রেস্তোরাঁর অবদান ৮ শতাংশ। প্রায় ৩০ লাখ দক্ষ ও অদক্ষ শ্রমিক-কর্মচারী এতে জড়িত। রেস্তোরাঁ খাতের ওপর নির্ভরশীল শ্রমিক পরিবারের সংখ্যা ৩০ লাখ। নির্ভরশীল মালিক পরিবারের সংখ্যা তিন লাখ। রেস্তোরাঁ খাতের ওপর নির্ভরশীল মোট জনসংখ্যা ১ কোটি ৯৫ লাখ।

পরিস্থিতির সার্বিক চিত্র যখন এমন, তখন নিরাপদ খাবারের মান নিশ্চিতে সরকারের দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোকে অনেক বেশি সংগঠিতভাবে ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ করতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে কাজ করে প্রত্যাশিত ফলাফল আসবে না। যেমন নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে গ্রেডিং পাওয়ার পরদিনই ‘এ’ ক্যাটাগরির কয়েকটি রেস্তোরাঁকে জরিমানা করে ভোক্তা সংরক্ষণ অধিদপ্তর। এদিকে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ জানায়, যে ধারায় জরিমানা করা হয়েছে, তা ঠিক হয়নি। এ নিয়ে নিজের ফেসবুক পেজে ক্ষোভ প্রকাশ করেন খোদ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা। সেখানে তিনি জানান, ‘ভালো উদ্যোগকে প্রশ্নবিদ্ধ করতেই এমনটি করা’। পরবর্তীতে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হয়, তারা নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের গ্রেডিং পদ্ধতির কথা জানতেন না। নিজেদের মতো করে তারা হোটেলগুলোয় যান এবং সেখানে বাসি ও পুরনো তেহারি, বিরিয়ানি, বোরহানি খুঁজে পেয়ে জরিমানা করা হয়। হোটেল কর্তৃপক্ষের তরফ থেকে বলা হয়, সেখানে কর্মরত শ্রমিকদের জন্য এগুলো রাখা হয়েছিল)। ঘটনাটি স্বাভাবিকভাবেই সরকারের দুটি সংস্থার সমন্বয়হীনতার বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।

এক্ষেত্রে শ্রীলংকার উদাহরণটি আমাদের গ্রেডিং কার্যক্রমকে উৎসাহিত করতে পারে। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দেশটির স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ যখন ফলপ্রসূ হচ্ছিল না, তখন তারা হোটেল-রেস্তোরাঁর মান নির্ধারণে ‘এ’, ‘বি’, ‘সি’, ‘ডি’ চারটি গ্রেডের প্রবর্তন করে। তারা শুধু খাবারের দোকানগুলোয় নয়, বেকারি, মুদিখানা, সুপার মার্কেট, স্ন্যাক শপসহ অন্যান্য খাবারের দোকানের ওপর এ পদ্ধতির প্রয়োগ ঘটায়। তাতে করে রেস্তোরাঁ মালিক থেকে কাঁচামাল সরবরাহকারী খাদ্যের মান বজায় রাখার পাশাপাশি সংরক্ষণের বিষয়গুলোয়ও সজাগ থাকেন। তাছাড়া সক্রিয় মনিটরিংয়ের মাধ্যমে তারা নিশ্চিত করে যে, এ পর্যায়ে নিরাপদ খাবার, মানসম্মত সেবা ও খাবারের মূল্য নিয়ে মালিকপক্ষের আর উদাসীন থাকার কোনো সুযোগ নেই। তাই হোটেল-রেস্তোরাঁ গ্রেডিংয়ের পাশাপাশি খাবারের দামের বিষয়টিও বিবেচনায় আনা জরুরি। ফাস্টফুডের দোকানসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় ক্রেতার কাছ থেকে এক ধরনের হিডেন চার্জ রাখা হয়। খাবার বিলের সঙ্গে ভোক্তার হাতে ধরিয়ে দেয়া হয় বাধ্যতামূলক সার্ভিস চার্জ।

পরিশেষে ঢাকায় দুদণ্ড নিজের মতো করে নিঃশ্বাস নেয়ার জায়গা খুঁজে পাওয়া মুশকিল। যাদের খানিকটা সামর্থ্য রয়েছে, তারা চিলেকোঠা কিংবা চার দেয়ালে ঘেরা কোনো রেস্তোরাঁয় বসে দিনের ক্লান্তি কমায়। বেশির ভাগ লোকই যায় কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই বলে। এসব মিলিয়ে রেস্তোরাঁয় সময় কাটানোর চাহিদা বেড়েছে। তাই নাগরিক এ চাহিদাকে ন্যায্যভাবে পূরণ করতে হবে। আমরা জানি, উন্নত বিশ্বের অনেক বড় শহরের তুলনায় ঢাকার জীবনযাপনের খরচ বেশি। খাবারের হোটেলগুলোও যার বাইরে নয়। গ্রেডিং কার্যক্রমের মাধ্যমে তাই শুধু রান্নাঘরের পরিবেশ-পরিচ্ছন্নতা, খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশনকারীদের স্বাস্থ্য নয়, খাবারের নির্দিষ্ট মানদণ্ডের পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণও জরুরি। এক্ষেত্রে গ্রেডিং করেই অভিভাবক প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব শেষ হয় না। হোটেল রেস্তোরাঁগুলোকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের মধ্যে রাখা চাই।

লেখক: সাংবাদিক

এমএ/ ০১:৪৪/ ০৬ ফেব্রুয়ারি

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে