Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-০৪-২০১৯

গণতন্ত্রের মরচে ধরা হাতিয়ার শক্তিশালী করবে কারা

আবদুল গাফফার চৌধুরী


গণতন্ত্রের মরচে ধরা হাতিয়ার শক্তিশালী করবে কারা

ভারতের বাম মোর্চা সম্প্রতি বন্‌ধ ডেকেছিল। বাম নেতারা বলেছিলেন, তারা সারাদেশ দাবি আদায়ের লক্ষ্যে অচল করে দেবেন। আগে বন্‌ধ, হরতাল, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, কালো পতাকা মিছিল ইত্যাদির নামে শাসক শক্তির বুক কাঁপত। এখন তাদের বুক-চোখ কোনোটাই কাঁপে না। ভারতে সাম্প্রতিক বন্‌ধেও কারও বুক কাঁপেনি। দোকানপাট বন্ধ হয়নি। রাস্তাঘাট গাড়িশূন্য হয়নি। মানববন্ধনে তেমন মানব দেখা যায়নি। 

বাংলাদেশেও গত কয়েক বছর যাবৎ দেখা যাচ্ছে একই অবস্থা। এই অবস্থার জন্য অবশ্য বিএনপি-জামায়াতই বেশি দায়ী। রোগীকে অ্যান্টিবায়োটিক ঘন ঘন বা বেশি ডোজে খাওয়ালে যেমন তা আর কাজ দেয় না, তেমনি গণতন্ত্রের যেসব অব্যর্থ হাতিয়ার, যেমন- হরতাল, বন্‌ধ ইত্যাদি আগে চমৎকার কাজ দিত। পরে দেখা গেল বিএনপি ও জামায়াত এই অস্ত্র অকারণে ও বারবার ব্যবহারের ফলে তা একেবারেই ভোঁতা হয়ে গেছে। 

খালেদা জিয়া তো 'আপসহীন নেত্রী' হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। জামায়াতকে কাঁধে নিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতা থেকে উচ্ছেদের জন্য ১২ ঘণ্টা বা ২৪ ঘণ্টা নয়; একেবারে কয়েকদিনের লাগাতার হরতাল তিনি ডাকতেন। তাতে জনগণকে যুক্ত করতে না পেরে হরতালে সন্ত্রাস যুক্ত করে জনগণকে ভয় দেখিয়ে হরতাল সফল করতে চেয়েছেন। তাতে শহরে-বন্দরে কিছু মানুষকে ভীতিগ্রস্ত করা গেছে বটে, কিন্তু হরতাল বা সন্ত্রাস কোনোটাই সফল হয়নি। 

গণতন্ত্রে সহিংস প্রতিবাদের বিধান নেই। শান্তিপূর্ণ, অহিংস প্রতিবাদের জোরালো ব্যবস্থা আছে। যেমন হরতাল, বন্‌ধ, ধর্মঘট, মানববন্ধন, বিক্ষোভ মিছিল, কালো পতাকা প্রদর্শন ইত্যাদি। কিন্তু তা হতে হবে জনগণের ইচ্ছাভিত্তিক ও দাবিভিত্তিক। কোনো রাজনৈতিক দল জনগণের ইচ্ছা ও সম্মতির বাইরে নিজেদের খেয়ালখুশিমতো দলীয় স্বার্থে হরতাল ডাকলে তা ব্যর্থ হয়। প্রমাণ, ১৯৭০-৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধিকার দাবিতে বঙ্গবন্ধুর ডাকা হরতাল ও অহিংস আন্দোলনে সারা বাংলা অচল হয়েছে, সামরিক শাসকরা পর্যন্ত পিছু হটেছে। কিন্তু গত দশ বছর ধরে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা হরতাল, এমনকি সহিংস আন্দোলনও সফল হয়নি। 

বিএনপি-জামায়াতের হরতালে গাড়ি ও দোকানপাটে আগুন দিয়ে, নিরীহ পথিকের গায়ে পেট্রোল বোমা ছুড়ে সাধারণ মানুষকে ভীতিগ্রস্ত করা গেছে। কিন্তু তাদের সমর্থন আদায় করা যায়নি। হরতাল বা আন্দোলন সফল করা যায়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির, বিশেষ করে জামায়াতের শেষের দিকে ডাকা হরতালগুলো তো প্রহসনে পরিণত হয়েছিল। 

দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের গোড়ায় যখন জার্মানদের হাতে ব্রিটিশ সৈন্যরা বেদম মার খাচ্ছিল এবং রণাঙ্গন থেকে পিছু হটছিল, তখন ব্রিটিশ পত্রপত্রিকায় সেই খবরের হেডিং দেওয়া হতো ‘Successful retreat of British soldiers’-'ব্রিটিশ সৈন্যদের সাফল্যজনক পশ্চাদপসরণ।' বাংলাদেশেও বিএনপি ও জামায়াতের ডাকা হরতাল যখন বারবার ব্যর্থ হতে থাকে, তখন ঢাকার কোনো কোনো দৈনিকে সেই খবরের হেডিং দেওয়া হতো- 'ঢাকায় শিথিল হরতাল।' ব্যর্থ হরতাল কথাটা লেখা হতো না। 

বাংলাদেশ, এমনকি উপমহাদেশের ইতিহাসও প্রমাণ করে, গণতন্ত্রের হাতিয়ারগুলো তখনই সফল হয়, যখন তা গণতান্ত্রিক দাবি আদায়ে জনগণের ইচ্ছা ও সম্মতি নিয়ে ব্যবহূত হয়। কিন্তু অগণতান্ত্রিক শক্তি দ্বারা জনগণের সমর্থনহীন অসাধু ইচ্ছা পূরণের জন্য তা ব্যবহার করা হলে তা সফল হয় না। বাংলাদেশে তো বিএনপি ও জামায়াত জনগণের কোনো প্রকৃত দাবি আদায়ের জন্য নয়; নিজেদের দলীয় স্বার্থ ও উদ্দেশ্য পূরণের লক্ষ্যে যখন গণতন্ত্রের হাতিয়ারগুলোকে ব্যবহার করতে চেয়েছে এবং তার সঙ্গে সন্ত্রাস যুক্ত করতে চেয়েছে, তা শোচনীয়ভাবে ব্যর্থ হয়েছে। 

কত নন ইস্যুতে বিএনপি অতীতে হরতাল ডেকেছে এবং রাজপথে নিরীহ মানুষ হত্যা করেছে, তার ইয়ত্তা নেই। প্রথমদিকে মানুষ ভীতিগ্রস্ত হয়ে দোকানপাট বন্ধ রাখত। প্রচার করা হতো- হরতাল বিপুলভাবে সফল। জনগণের ভয় কেটে যেতেই বিএনপি-জামায়াতের হরতাল সম্পূর্ণ ব্যর্থ হতে থাকে। বিএনপির মতো অগণতান্ত্রিক দলের হাতে পড়ে গণতন্ত্রের এই চমৎকার হাতিয়ারটি এমনভাবে কার্যকারিতা হারিয়েছে যে, কোনো প্রকৃত গণদাবিতে এখন হরতাল ডাকলে, মানববন্ধন হলে তা সম্পূর্ণ সফল হবে কি-না সন্দেহ। কিছুদিন আগে ঢাকায় নিরাপদ সড়কের দাবিতে ঐতিহাসিক ছাত্র আন্দোলনের সময়েও সড়ক অবরোধ সফল হয়েছে, হরতাল তেমন সফল হয়নি। 

সত্যি কথা বলতে কি, বাংলাদেশে হরতাল এখন অর্থহীন, মানববন্ধন গুরুত্বহীন; সড়ক অবরোধও তেমন সফল হয় না। এক কথায়, গণতন্ত্রের যে হাতিয়ারগুলো সাম্প্রতিক অতীতেও অত্যন্ত শক্তিশালী ও কার্যকর ছিল বাংলাদেশে, সেই হাতিয়ারগুলোতে যেন মরচে পড়ে গেছে। ইউরোপ-আমেরিকাতেও বিক্ষোভ-মিছিল এবং সড়ক অবরোধ এখনও আছে; হরতালের নাম-গন্ধও শোনা যায় না। ব্রিটেনে ২০ বছর আগেও কয়লা শ্রমিক ধর্মঘট ছিল শ্রমিক আন্দোলনের অত্যন্ত সফল অস্ত্র। থ্যাচারের সরকারের আগে বহু সরকার এই ধর্মঘটের ফলে ক্ষমতা ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। কিন্তু আর্থার স্কারগিলের নেতৃত্বে ব্রিটেনের কয়লা শ্রমিকরা বছরের পর বছর ধর্মঘট করেও মার্গারেট থ্যাচারের সরকারের পতন ঘটাতে পারেনি। বরং ব্রিটিশ ট্রেড ইউনিয়ন মুভমেন্টের এই শক্তিশালী বাহুটি সম্পূর্ণ অকেজো হয়ে গেছে। 

গণতন্ত্রের হাতিয়ারগুলো অকেজো হয়ে যাওয়ার অর্থ গণতন্ত্রেরও অকেজো হয়ে যাওয়া। বিএনপি ও জামায়াত তাদের অগণতান্ত্রিক উদ্দেশ্য পূর্ণ করার লক্ষ্যে বাংলাদেশে গণতন্ত্রের এই হাতিয়ারগুলোর বারবার অপব্যবহার দ্বারা জনগণের কাছে এগুলোকে গুরুত্বহীন করে ফেলেছে। দেশের কোনো সরকার- এমনকি আওয়ামী লীগ সরকারও যদি তাতে আনন্দিত হয় তাহলে ভুল করবে। দেশে গণতন্ত্র রক্ষা ও চালু রাখার জন্যই গণতন্ত্রের এই মরচে ধরা হাতিয়ারগুলোকে আবার শানিত ও কার্যকর করে তুলতে হবে। 

গণতন্ত্রের আদি প্রবক্তারা বলে গেছেন, কোনো দেশে শান্তিপূর্ণ ক্ষমতার বদল চাইলে তার শর্ত হচ্ছে, পার্লামেন্টে শক্তিশালী বিরোধী দল থাকা এবং পার্লামেন্টের বাইরে হরতাল, ধর্মঘট, আন্দোলনের মাধ্যমে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতাসীনদের কোনো কাজের প্রতিবাদ করা বা ক্ষমতায় পরিবর্তন আনার অধিকার ও সুযোগ জনগণের হাতে থাকা। নইলে এর বিকল্প হবে ষড়যন্ত্র, রক্তপাত, অভ্যুত্থান ও বিপ্লব। 

এর প্রমাণ উন্নয়নশীল বহু দেশে এবং বাংলাদেশেও রয়েছে। শান্তিপূর্ণ পন্থায় বিএনপি সরকারকে ক্ষমতা থেকে অপসারণের কোনো সুযোগ না থাকায় এই দলের সরকারগুলোকে রক্তপাত ও অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতা থেকে সরাতে হয়েছে। জিয়াউর রহমানের সরকারের পতন ঘটেছে রক্তপাতের মাধ্যমে। পরবর্তী জাস্টিস সাত্তারের সরকারের পতন ঘটেছে জেনারেল এরশাদের সামরিক অভ্যুত্থানের দ্বারা। ১৯৯৬ সালে খালেদা সরকারের পতন ঘটেছে গণঅভ্যুত্থানের ফলে। বিএনপি-সমর্থিত ইয়াজউদ্দিনের তত্ত্বাবধায়ক সরকারেরও পতন ঘটে সামরিক হস্তক্ষেপে।

এর পাশাপাশি আওয়ামী লীগের হাসিনা সরকার বারবারই ক্ষমতায় এসেছে শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচনে জয়ী হয়ে। নির্বাচনে পরাজিত হলে বিনা প্রতিবাদে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তর করেছেন। খালেদা জিয়ার মতো 'আমাদের বিজয় ছিনতাই করা হয়েছে' বলে চিৎকার জোড়েননি। বাংলাদেশে শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই গণতন্ত্রের ধারাবাহিকতা অব্যাহত আছে। 

গণতন্ত্রের হাতিয়ার নিয়ে যে এত কথা লিখলাম, তার কারণ, বাংলাদেশের বর্তমান পার্লামেন্টেও বিরোধী দল নেই। পার্লামেন্টের বাইরেও শক্তিশালী বিরোধী রাজনৈতিক দল নেই। বিএনপির অবস্থা পার্লামেন্টের ভেতরে-বাইরে সঙ্গিন। জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টি গৃহপালিত বিরোধী দল। গণফোরামের দুই পার্লামেন্ট সদস্য হারাধনের দুই ছেলে। এই অবস্থায় শেখ হাসিনার শাসনে গণতন্ত্র নিরাপদ। কিন্তু দেশের রাজনীতিতে গণতন্ত্র নিরাপদ কি-না, আমার সন্দেহ আছে। দেশে এবং পার্লামেন্টে নব্য ধনীদের পরাক্রম বেড়েছে। আমলাতন্ত্র শক্তিশালী হয়েছে। জনপ্রতিনিধিত্ব চলে গেছে রাজনীতিকদের বদলে নব্য ব্যবসায়ীদের হাতে। গণতন্ত্রের সবচেয়ে শক্তিশালী বাহু পার্লামেন্ট এবং মিডিয়া দুই-ই ট্রেড ব্যারনদের কবলে। এই অবস্থায় গণতন্ত্রের যে হাতিয়ারগুলো বাংলাদেশে অকার্যকর হয়ে গেছে, সেগুলো আবার সক্রিয় ও শক্তিশালী করা জরুরি দরকার। কিন্তু প্রশ্ন- করবে কারা? 

এমএ/ ০৪ ফেব্রুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে