Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২১ মে, ২০১৯ , ৭ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০২-০৩-২০১৯

বইয়ের কাল আর আমার মহাকাল

মানস চৌধুরী


বইয়ের কাল আর আমার মহাকাল

এক।। ভনিতা নয়

ইংরেজিতে 'ডিসক্লেইমার' বলে যা বলা হয়ে থাকে, ঠিক সেটারই অনূদিত কিছু বাংলাতে ব্যবহার হয় কি-না আমার চোখে পড়েনি। বা আমার জানা নেই। তবে বাংলা রচনাদিতে 'কৈফিয়ত' বলে একটা বিষয় চর্চিত হয়ে আসছে। 'কৈফিয়ত' দিয়ে 'ডিসক্লেইমার'-এর জায়গা পূরণ হতে পারে কি-না সেটা স্বতন্ত্র তর্ক, এবং করবার মতো পণ্ডিত আমি হতে চাই না। কিন্তু কাজ চলে, তা বুঝতে পারি। আর যা আমি বলতে চাইছি গোড়াতেই, তা কিছুতেই কৈফিয়ত নয়। এটা বরং ঘোষণা। কৈফিয়ত শব্দটার মধ্যে কেমন একটা কাঁচুমাচু ব্যাপার আছে বলে আমার দৃশ্যকল্পনায় আসে। ওই কাঁচুমাচু ভাবটা আমার তেমন আসে না। কেবল লেখা জমা দেবার কোনো সময়সীমা তাড়া করে ফিরলেই আমার এ রকম একটা কাঁচুমাচু ভাব দেখা দেয়, তাও সেটা জনারণ্যে লোকজনকে বিশেষ টের পেতে দিই না। তবে বাংলায় 'ভণিতা', 'গৌরচন্দ্রিকা' কিংবা সনাতনী লোকসঙ্গীতে 'বন্দিশ' ইত্যাদিও বিশেষ ক্ষেত্রে অতীব কার্যকরী সব সূচনা। এসবের প্রয়োগযাথার্থ্য বুঝে নিলে নিশ্চয়ই দরকারমতো কাজে লাগাতে পারব। 

যা হোক, কথা হচ্ছিল আমার ঘোষণা নিয়ে। কোনো একটা প্রসঙ্গে রচনা ফাঁদতে গিয়ে জ্ঞানগর্ভ বিবরণী কিংবা স্মৃতিপরিব্রাজকীয় উদাহরণ হাজির করা সাধারণ চর্চা। কিন্তু কাজটা দিন দিন আমার বাধাপ্রাপ্ত হতে থাকছে। যা কিছু নিয়ে দু'চারটা কথা লিখে জমা দেবার জন্য কিতাবি জ্ঞানের অভাব আমার আড়াল-অযোগ্য। কিন্তু সমস্যা সেটাই সবচেয়ে বড় নয়। যত দিন যাচ্ছে ততই 'কী আমি মানি না' কিংবা 'শর্তাতীত/প্রশ্নাতীত কী অগ্রহণযোগ্য' ইত্যাদির তালিকাটা মাথায় কিলবিল করতে থাকে। নিমন্ত্রণকারী সম্পাদক যতই আমাকে একটি বিষয়বস্তু দিয়ে সহায়তা করে থাকুন না কেন, বাস্তবে ওই বিষয়বস্তুর পিছনকার অনুমান বা আন্দাজগুলোর মান্যতা-অমান্যতা নিয়েই আমার মাথা আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে। প্রত্যেক প্রস্তাবনারই প্রিমাইজ রয়েছে। আর প্রিমাইজগুলো নিয়ে আমার অশান্তিই পয়লা প্রসঙ্গ হয়ে ওঠে। এই পরিস্থিতি ক্রমাগত ঘনীভূত হচ্ছে। যদি তা আমার বয়সের সঙ্গে সম্পর্কিত হয়ে থাকে, তাহলে আশঙ্কা করি, দীর্ঘকাল জীবনধারণ আমার জন্য ভারী হয়ে উঠবে। সর্বোপরি, যে ক'জন দয়ালু সম্পাদক আমাকে রচনা লিখতে হুকুম করেন তাদের পক্ষে আমাকে নিমন্ত্রণ আরো গুরুভার হয়ে পড়বে। 

দুই।। আন্দাজবিরুদ্ধ 

অন্তত দুইটা আন্দাজ বা প্রিমাইজ আমাকে অস্বস্তি দিচ্ছে। প্রথমটি হলো, মানুষের জীবনে পুস্তকের প্রভাববিষয়ক অতিভাবনা। আমি নিশ্চিত যে, শিক্ষিত শ্রেণির মধ্যে জ্ঞানচক্ষু, অন্তর্দর্শন ইত্যাদির আকাঙ্ক্ষা বা লোভ অতীব প্রবল। আর তারা পুস্তককে এসবের সর্বোৎকৃষ্ট কারিগর হিসেবে দেখে থাকেন। ফলত, নানান কথক বা রচক নানাবিধ পুস্তকের অমিত প্রভাব বিষয়ে বলবার একটা মারাত্মক তাগিদের মধ্যে পড়ে থাকেন। তা ছাড়া, এইবিষয়ক আলাপ-আলোচনা পাড়তে-পাড়তে, করতে-করতে এমন একটা অলঙ্ঘনীয় পরিমণ্ডল তৈরি হয়ে গেছে যে তার মধ্যে বসবাস করতে-থাকা শিক্ষিত জ্ঞানপিপাসু মধ্যবিত্ত মানুষজন এই প্রভাবনবিষয়ক আন্দাজকে কেবল গ্রহণ করেই নিষ্পত্তি ঘটাতে পারেন। তাতে আরো আরো আলাপ দানা বাঁধতে থাকে। কেবল প্রভাবন-সমর্থ পুস্তকের উল্লেখ করলেই চলে না, সেসব পুস্তকের কৌলীন্যও খুব বিবেচ্য। নেহাত অনুরুদ্ধ হয়েই দু'চার জায়গায় প্রিয় বই হিসেবে 'আরব্যরজনী' (অনূদিত ও সংক্ষেপিত) কিংবা 'লোকনাথ পঞ্জিকা'র কথা উল্লেখ করাতে আমি বিশেষ প্রশংসিত হই নাই। নিন্দার মধ্যে একটা মাত্রা আবার প্রজন্ম/জেনারেশনবিষয়ক। প্রভাবক-পুস্তক উল্লেখের পর নবীন প্রজন্মের মানুষজন নাকি তা থেকে শিখবেন- এ রকম একটা আশা-আকাঙ্ক্ষা বা দাবিনামাও চালু আছে। পুস্তক বা কোনো কিছুরই শর্তাতীত কোনো প্রভাবন মনুষ্য চিন্তনে আছে বলে আমি মনে করি না। আর সেসব শর্ত এত জটিল বলে আমি মনে করি যে, তা নিয়ে আলাপ করা মাথা-আউলানো একটা বিষয় হয়ে দাঁড়াবে; অন্তত আমার জন্য। আর পরিশেষে সকলই গিয়ে জটিল দ্বান্দ্বিক সামাজিক অভিঘাতের দিকে নির্দেশ করবে। আপনারা জানেন যার যা বাতিক...। 

অন্য যে প্রিমাইজটি আমাকে কিছু বলার জন্য উস্কানি দেয় তা হচ্ছে স্মৃতিকথনের অকৃত্রিমতাবিষয়ক। এমনকি 'কৃত্রিম' শব্দটির বিরুদ্ধে যে ধরনের সামাজিক বিদ্বেষ চালু আছে, তাও আমি ধারণ করি না বিধায় শব্দটা ব্যবহারেও আরাম পাই না। আবার ভিন্ন কিছু জানি না, যা দিয়ে বলতে পারি, যা বলতে চাই। স্মৃতিকথন, হোক তা পুস্তকবিষয়ক বা প্রণয়, নিজগুণেই বাস্তবতা বা সত্যতার অতিক্রমকারী হবার যোগ্যতা রাখে। এসব যতটা সত্যীয় ততটাই গল্পীয়/কল্পীয়। অন্তত প্রতিবর্তী আর ব্যাখ্যামূলক। আবার গল্প-কল্পতাকে কোনো অভিযোগ হিসেবেও করছি না। গল্প-কল্প নানাবিধ বাস্তবের রূপকার ও বহনকারী। এর গুরুত্ব অপরিসীম আমার কাছে। কিন্তু স্মৃতিকথনকে 'খাঁটি' বা 'প্রকৃত' হিসেবে ধরে নিয়ে নিবিড় এক পাঠকত্ব বিরাজমান। স্মৃতির সার্বভৌমত্ব 'খাঁটিত্বে'র দর্শন দিয়ে মোড়ানো থাকে বলে পড়তে বা গ্রহণ করতে পদ্ধতিগত উৎপাত হয় আমার। যদি পাঠকত্ব/রিডারশিপের একটা গুণগত বদল ঘটে যেত তাহলে আমার এই ঝামেলাটা কমত- আমি হলফ করে বলতে পারি। 

তিন।। পরিবার-পাঠ-পরম্পরা 

কুলীন পাঠাভ্যাসের সঙ্গে কুলীন একটা পরিবার থাকা প্রায় আবশ্যিক শর্ত। যতই আমরা স্কুল-পালানো নজরুলের গল্প বলে উচ্ছ্বসিত হই, যতই আমরা ল্যাম্পপোস্টের আলোতে পাঠ গ্রহণকারী বিদ্যাসাগরকে ভেবে আনন্দাশ্রু মোচন করি, বাস্তবে এই জ্ঞান প্রত্যেকেরই থাকার কথা যে বৃহত্তর পরিবারের সংগ্রহে বা নাগালে যেসব পুস্তক রয়েছিল, সেসবের পরিমাণ, মান আর সেসবের সঙ্গে অগ্রজ প্রজন্মের সম্পর্কের ধরনের বিশাল কারিগরি ভূমিকা আছে যে কোনো মানুষের সঙ্গে বইয়ের সম্পর্ক তৈরি হবার। এই সাধারণ জ্ঞানটিরও তেমন কোনো উপলব্ধি লক্ষ্য করি না। অন্তত পাঠাভ্যাস দিয়ে পরস্পরকে ঘায়েল করার যে অনুশীলন তাতে শ্রেণিগত এই মাত্রাটি নিয়ে গভীর সংবেদন তেমন পাই না। সেটা চিত্রকলা, সঙ্গীত বা চলচ্চিত্রবিষয়ক আলাপের বেলাতেও প্রায় অভিন্ন। মূলত 'রুচি'র গৌরবের হিংস্র ঘোষণা দিয়ে পরস্পর 'রুচিবর্গ' নির্মাণের প্রক্রিয়া; এবং 'অন্যরুচি'র বর্গকে নস্যাৎ করবার প্রচেষ্টা। জগদ্দর্শন আর রুচির মধ্যকার সূক্ষ্ণ, এমনকি স্থূ্থল পার্থক্য, তাই একটি অতি জরুরি আলাপও বটে। পুস্তকপাঠ কিংবা কলাসেবন, আরো চেষ্টায় কলাচর্চা, জগদ্দর্শন-সৃষ্টি আর রুচিগঠনের মধ্যে কোনটা করে থাকে, যদি আদৌ করে, তাও বিচার করার দরকার আছে। জগদ্দর্শন থাকা আর তার ঘোষণা করতে থাকার মধ্যেও বোধহয় প্রভেদ আছে। আবার এসবের ঘোষণাই পরিশেষে রুচির গরিমা হয়ে পড়ে কি-না তাও আমি সন্দিহান না-হয়ে পারি না। বিস্তর সব ঝামেলার মধ্যে আমি নিরন্তর নিপতিত হতে থাকি। 

কিন্তু পরিবারের পুস্তক সংগ্রহ আসলেই এক গুরুতর প্রসঙ্গ। বাড়িতে থাকা তিনখানা বই আমি মনে করতে পারি, যাকে কম জবরদস্তি করেই 'কুলীন' বর্গে ফেলা যাবে- পথের পাঁচালী, শ্রীমদ্ভবগবৎ গীতা এবং শিক্ষা-মনস্তত্ত্বের একটা বই। কুলীনবর্গে থাকার জন্য গীতার পক্ষে হয়তো ভিন্ন গ্রহণযোগ্যতা নিতে হবে; কিন্তু থাকবে। তিনখানা বইয়েরই মালিক ছিলেন আমার বাবা আর তিনখানাই আমি পেট ভরে পড়েছিলাম বারকয়েক। এই তিনখানার বাইরে আরও খানকয়েক বই তার হয়তো থাকতে পারত, কিন্তু '৭১-পরবর্তীকালে না থাকার কারণে বাবাকে অত দোষ দেওয়া যায়নি। উপরন্তু, তিনি পুস্তকবিবর্জিত পরিবারে বড় হয়েছিলেন। ওই যে আগের আলাপ। তুলনায় মায়ের সংগ্রহ কিছুটা হূষ্টপুষ্ট ছিল। কিন্তু সবই উপন্যাস, আর লঞ্চঘাট থেকে কেনা সব জালিয়াতি সংস্করণ। শরৎচন্দ্র মহাধিপতি সেই সংগ্রহশালায়। আর ছিলেন ফাল্কগ্দুনী মুখোপাধ্যায়, নীহাররঞ্জন রায়, নিমাই ভট্টাচার্য, আশুতোষ মুখোপাধ্যায় থেকে শুরু করে সমরেশ বসু, বিমল মিত্র ইত্যাদি। উত্তরকালে যা বুঝলাম তাতে মর্যাদাকর বর্গে সমরেশ বসু ছাড়া প্রায় কারোরই থাকার বন্দোবস্ত নেই। সুলভ পাইরেটেড বইয়ের ওই নগণ্য সংগ্রহশালা শিক্ষিত মধ্যবিত্তীয় পাঠাভ্যাসে উল্লেখ করার মতো কোনো পরম্পরাও নয়। কিন্তু বাস্তবে বড় হতে হতে জেনে গেছি এমনকি এই সামান্য তিনখানা বই আর জালিয়াতিতে ছাপা উপন্যাসগুলোও জোগান হিসেবে কত গুরুত্বপূর্ণ। কারো কারো পারিবারিক সম্পদে গুটিকয় বইও অসম্ভব ব্যবস্থাপনা। বই আসলেই বনেদিপনার স্মারক, শ্রেণিগত স্টেটমেন্ট। 

চার।। শ্রীকান্ত, অপু আর সিন্দাবাদের জগৎ

তিনটি বই একটা ঘটনাচক্রীয় বাছাই মাত্র। অন্য কোনোদিন অন্য কোনো উছিলায় আরেক বাছাই তালিকা সাজাতে আমার বাধবে না। তবে শুরুতেই যাকে সত্যীয়-গল্পীয় বাস্তবতা বলছিলাম, সেই সূত্র মোতাবেক এই তিন বাছাইয়ে কোনো অর্থসংকট তৈরি হয় না। তাই বাছাইটা এই মুহূর্তে আরামদায়ক। এর মধ্যে 'পথের পাঁচালী' শিক্ষিতকুলে অনায়াস বাছাই, 'আরব্যোপন্যাস' কিছুতেই সহজে স্বস্তিকর নয়, আর 'শ্রীকান্ত' বাছাই হিসেবে মধ্যবিত্তীয় 'শিল্পরুচি'তে দ্বিধাদ্বন্দ্ব-জাগানিয়া; বস্তুত শরৎচন্দ্রই তাই। 'পথের পাঁচালী'র দারিদ্র্যের মোহনীয় চিত্রায়ন নিয়ে নানান কথা হয়েছে; অভিযোগটা চলচ্চিত্রকার সত্যজিতের প্রতিই বেশি, বিভূতিভূষণের উপর অতটা নয়। কিন্তু বিতর্কটাকে আমি দেখতে শিখেছি খোদ সাহিত্যধারা ও শৈলীর বিষয় হিসেবে। দারিদ্র্য ও অবধারিত বাস্তুচ্যুতির গল্পকে গৌণ বিবেচনা করার কোনো প্রচেষ্টা তাই জমতে দিই না। শরৎচন্দ্রের বিষয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্বের যুক্তিগ্রাহ্য কারণ কেবল হতে পারে দুটো। তিনি মহাজনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন, আর জনপ্রিয়কেই 'সস্তা' সাব্যস্ত করার একটা অটুট শিক্ষিত প্রক্রিয়া আছে। দ্বিতীয়ত, তার নারী পাঠকসংখ্যা ঈর্ষণীয় এবং তা ('পুরুষ') বোদ্ধাজগতে ঈর্ষার উদ্রেক করেছিল। হতে পারে। আরব্যোপন্যাস বিষয়ে অস্বস্তি তুলনামূলক সহজে বোধগম্য। অন্তত আমার স্মৃতিতেও বিষয়টা উজ্জ্বল। ছোট মামা তার জমানো টাকায় নিউজপ্রিন্টের অতি বিশ্রী দেখতে কিশোর সংস্করণ যখন দিলেন তখন তিনি নিজে প্রকৃতই ছোট। আমি আরও ছোট। বই পাবার পর গোগ্রাসে কদিন পড়ার পরই মায়ের নজরে এসেছিল। আমি তখনও পড়িনি বিবেচনা করে মা আমাকে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছিলেন বইটির উপর, কয়েক বছরের জন্য। বলাই বাহুল্য, সেই নিষেধাজ্ঞার কারণে আরো মনোযোগ দিয়ে বইটা আমি গোপনে পড়ে ফেলি। উত্তরকালে বুঝতে পেরেছিলাম যে, মায়ের নিষেধাজ্ঞা দৈত্য-দানোর ভয়ে আমি ভীত হয়ে পড়তে পারি, এই আশঙ্কাই ছিল না। বরং, এমনকি কিশোর সংস্করণেও যে রকম যৌনাভাস ছিল, মা নিজেই তাতে ভীত হয়ে পড়েছিলেন বলে মনে হয়। মধ্যবিত্ত বোদ্ধামহলের অস্বস্তি আর আমার মায়ের ভীতি উভয়ই যৌনকাতর হবার সম্ভাবনাই দেখি আমি।

তিনটা বই পড়বার কালও কাছাকাছি আমার। একটা তো বাবার সংগ্রহের তিনটি বইয়ের একটি। অন্যটা মায়ের সংগ্রহে ছিল। তার মানে, আমার পাঠাভ্যাসের প্রথমকালেই এগুলো ঢুকে পড়েছিল। তুলনায় ছোট মামার বইটা উপহূত ছিল বলে কিছুকাল পরে আমাদের বাসায় আসার কথা। কিন্তু মনে করতে গিয়ে এধার-ওধার হয়ে যায়। মনে হচ্ছে পড়ার ধারাবাহিকতাটা এ রকম হবে-পথের পাঁচালী, আরব্যোপন্যাস, শ্রীকান্ত। আবার এই স্মৃতির পক্ষে যুক্তিসঙ্গত কারণ সাজানো যাচ্ছে না। কিন্তু সেসব নিজেরই মাথার ঝামেলা, পাঠক নিশ্চয়ই পরোয়া করেন না। শ্রীকান্ত উপন্যাসের চারটি খণ্ডই যে বাসায় ছিল, তা নয়। যদ্দুর আবছা মনে পড়ে যে দুই বা বড়জোর তিন খণ্ড পাবার পর নেশাগ্রস্ত হয়ে অন্য খণ্ডটি বা দুটি জোগাড় করি। আমি যে সময়ের মাধ্যমিক আর উচ্চ মাধ্যমিকের ছাত্র, সে সময়ে সরকারি পুস্তক পরিষদ পাঠক্রমে শ্রীকান্ত থেকে খানিক অংশ রেখেছিলও বটে। আমার আর মনে নেই সেটা কোন গ্রেডে। আবার পরের দিকে পাঠক্রমে পথের পাঁচালীর অংশবিশেষও শিক্ষার্থীরা পেয়েছিলেন। 'ধ্রুপদী' থেকে অংশবিশেষ অল্পবয়সী বাচ্চাদের পড়তে দেয়া খুব নৈমিত্তিক ঘটনা। তারপরও শ্রীকান্তকে মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিকে পড়তে দেয়াতে যেসব পরিকল্পকের অবদান ছিল আমি তাদের আজ এই উছিলায় তারিফ করি। এই চরিত্রটিকে চিনতে দেওয়া বঙ্গাল মুল্লুকের রুচিকাতর মধ্যবিত্ত চিন্তকদের জন্য সহজ নয়, তাদের মর‌্যাল-পুলিশগিরি আচরণের মধ্যে গুরুতর বেমানান। 

ঠিক যে কারণে শ্রীকান্তের জগতের সঙ্গে শিশু-কিশোরদের পরিচয় ঘটিয়ে দেবার কারণে, সামান্য হলেও, আমি পরিকল্পকদের তারিফ করলাম, সেই কারণেই তিনি ও তার জগৎ আমার জন্য অনাবিল এক ভাবনা-সম্ভাবনাকে উন্মুক্ত করেছিল। সরল বিচারে, শ্রীকান্ত ছিলেন পরিব্রাজক। কিন্তু হালের ট্যুর লাভার মানুষজনের থেকে তার পরিব্রাজন গুণগতভাবে ভিন্নই কেবল নয়; তার পরিব্রাজনের মুখ্য বৈশিষ্ট্য এর অন্তর্ভেদী দর্শন, এর সম্পর্কান্বেষণ, এর সীমানাডিঙানিয়া সংশ্নেষণ, সংমিশ্রিত পাত্র ও পাত্রীর জীবনপ্রবাহের প্রতি গভীর সংবেদন আর অবধারিত অথচ মসৃণ বিদায়রাজি। যে মমতা নিয়ে, পাখির পালকের মতো বেদনাও, শ্রীকান্ত আর রাজলক্ষ্মী পরস্পরকে বিদায় দেন, সেই মমতা আর বিষাদের ছিটেফোঁটা বাংলা মুল্লুকের ঘরে ঘরে না পৌঁছালেও, ঘরে ঘরে ভাব সম্প্রসারণের প্রস্তুতি তো চলে 'বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না...'। শ্রীকান্তের দৃষ্টিসীমায় তখন আপনি আশ্রয় নেন। আর চলমান জলপ্রবাহের পথে রাজলক্ষ্মীর নৌকাখানি সুদূর থেকে সুদূরে যায়; আর আপনি দৃষ্টিসীমানার জলপ্রবাহে কাঁপাচোখে, ভাপাচোখে, এই দৃশ্যের কোনো অন্ত না চাইতে-চাইতে, চেয়ে থাকেন সেই বিন্দুটির দিকে, যেটি কেবল জ্ঞানের ভরসাতেই নৌকা, বিশ্বাসের ভরসাতেই রাজলক্ষ্মী; আর গাঢ় মন্ত্রের মতো আপনার চৈতন্যপ্রবাহে তখন অনুরণিত হয় 'ফি আমানিল্লাহ' কিংবা 'সুখে থাকো'। রাজলক্ষ্মী আর শ্রীকান্তের সম্পর্ক বেশি জায়গা নেবার একটা কারণ হতে পারে চলচ্চিত্রীয়। আরেকটা কারণ হতে পারে নারী-পুরুষের ফর্মুলাভিত্তিক প্রণয় নিয়ে সাহিত্যে অতি-আচার (অত্যাচার); কিন্তু বাস্তবে শ্রীকান্তের জীবনে সকল মনুষ্য সংযোগই গভীর ভাবনাদায়ী। শ্রীকান্ত আর এর স্রষ্টার আরেক বিরাট বৈশিষ্ট্য হচ্ছে সূক্ষ্ণ রসবোধ। লাগাতার শরৎচন্দ্রের সকল বিবরণীরই তা সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তবে আমার বিবেচনায় শ্রীকান্তের দীঘির মতো গম্ভীর শান্ততার মধ্যে রসবোধটা নির্লিপ্তি আর বিষাদের অনির্ণেয় দোলাচলে দারুণ উদ্ভাসিত।

শ্রীকান্তের মতো অপুও একাধিক গ্রন্থে বিকশিত। পুস্তকের বেলায় দুটো, চলচ্চিত্রে তিনটা। তেরো বছরের অপুর জীবনে একটা অনবধানবশত বিকেল আসে, বা গোধূলি। তার বোন সেই আগেই মৃত। ততদিনে বাবাও নেই। সংসার-চালানোর দুরূহ সংগ্রামটা তখন কেবল মায়ের কাঁধে ন্যস্ত। ব্রাহ্মণ পরিচয়টা, পরিহাসের মতো, তখন কাজে লাগল মা একটা বাড়ির রাঁধুনির কাজ পেয়েছেন বলে। সিঁড়ির নিচের ঘরে মা-ছেলের রাত্রিবাসই কেবল সংসারজীবন। বাকি সময় মায়ের শ্রমবিক্রিকাল। তার মধ্যেই অপু পাড়ায় ফুটবল খেলে, আর পাঁচজন সমবয়সী কিশোরের সাথে। ওই বিকেলটাতে তার রেফারিগিরি করার কথা। মাকে সে ঘুম থেকে ডেকে দিতে বলে দুপুরে ঘুমিয়ে পড়েছে। ছেলের ঘুমটা মা ভাঙাতে চাননি বলেই হয়তো, তিনি তার শতকাজের মধ্যে ছেলেকে ডেকে দেননি। অপুর যখন ঘুম ভাঙে তখন খেলার কাল ভেঙে গেছে। অপু হতাশ নাকি ক্ষুুব্ধ, আমরা কম জানতে পারি। কিন্তু ছোট্ট সেই ঘরের ততোধিক ছোট্ট জানালাতে সে গিয়ে দাঁড়ায়। সেই জানালাতে তখন পশ্চিমের আলো, পড়ন্ত সূর্যের ম্লান আলো। জানালা দিয়ে অপু যখন তাকায়, সেই চোখেও আপনি তখন ভর করেন। তারপর নিশ্চিন্দিপুর থেকে অমোঘ এক পরিক্রমা সারতে সারতে. কিশোরী চিরকালীন মৃত দুর্গার সঙ্গে দৌড়াতে-দৌড়াতে, দূরের ট্রেনের জাদুময় বাতাসভাসি শব্দ শুনতে-শুনতে অপুর জানালায় সোনালি রোদের সঙ্গে করে ঘরটিতে এসে লুটিয়ে পড়বেন আপনি। এই চরাচর শূন্যতাময় অনুভূতির উৎস আমি জানি না। কিন্তু আমৃত্যু এই কল্পদৃশ্য বহন করব আমি জানি। জিরাবোর পথে বাসে যেতে-যেতে, নিশ্চিন্তিপুর বলে একটা বাসস্টপ আছে, একটা গ্রামের নামেই। প্রতিবার আমি প্রত্যেকটা সাইনবোর্ডে নামটা বারবার পড়তে থাকি। কেমন একটা দুরূহ মস্তিস্কযাত্রা হয় তাতে। কিন্তু কখনোই বিস্মৃত হই না যে অপুর বিচ্ছেদগুলো আর ওর গরিবি আকস্মিক সহযোগ নয়। 

সিন্দাবাদ একটা উছিলা। অজস্র কিছুর উছিলা। তার কাঁধে সওয়ার এক নাছোড়বান্দা ভূত, কৌতূহলী আলাদীন, তার দৈত্য, হঠাৎ এক ভুতুড়ে কলস আবিস্কার করা জেলে, নিশিভ্রমণে নেশাতুর খলিফা, আলিবাবা আর তার পটীয়সী ভৃত্য মর্জিনা। আর আছে দৈত্য এবং এক প্রকাণ্ড রকপাখি, এত বিশাল যে তার পাখা দিয়ে তামাম মুল্লুক অন্ধকার করে দিতে পারত। ছোট ছোট রঙিন একদল মাছ, যেগুলো আশ্চর্য সেই জেলের কাছে ধরা পড়ে সুলতানের কাছে বিক্রীত হয়েছিল আর সুলতান যখন সেগুলোকে ভাজবেন বলে তেলে চড়িয়েছেন, সেগুলো আরেক মায়ারাজ্যের গল্প সুলতানকে বলবে বলে জ্যান্ত হয়ে যায়। আর এক অদম্য ভ্রমণলিপ্সা, যে লিপ্সা ভ্রমণের যতটা, অচেনার মায়াবী ডাকের কাছে সমর্পণ ততটা। 

এই বইটা একটা আস্ত অধিবেশনই দাবি করে। আমি সেই রকপাখির ডানায় চড়ে নামব আপনাদের দরবারে। আর যেই না আপনাদেরকে আমার আরব্যোপন্যাস বলতে শুরু করব, চারপাশ থেকে রঙিন সেই মাছগুলো ঝাঁকে ঝাঁকে সব শূন্যে লাফিয়ে-লাফিয়ে আমার হয়ে আপনাদেরকে নিজেরাই গল্পগুলো বলতে শুরু করে দেবে। সেইসব গল্প যা বলা হলেই কেবল আমাদের হয়!

এমএ/ ১১:২২/ ০৩ ফেবরুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে