Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০২-০১-২০১৯

‘এত বড় আন্দোলন না হলে তারা আমাদের কখনোই অনুগ্রহ করতো না’

তারিকুল ইসলাম মাসুম


‘এত বড় আন্দোলন না হলে তারা আমাদের কখনোই অনুগ্রহ করতো না’

ভাষা সংগ্রামী আব্দুল মতিন। যিনি ‘ভাষা মতিন’ নামেই বেশী পরিচিত।

নাম: আব্দুল মতিন।
পিতা: আব্দুল জলিল।
জন্ম: ৩ ডিসেম্বর ১৯২৮।
মৃত্যু: ৮ অক্টোবর ২০১৪।
গ্রাম: শৈলজনা।
ইউনিয়ন: ওমরপুর।
থানা: চৌহালী।
জেলা: সিরাজগঞ্জ।

পরিচিতি
আব্দুল মতিন, ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারণে সেই থেকেই সবাই তাকে ভাষা মতিন নামে চেনেন। তিনি ১৯৪৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএ তে ভর্তি হন। ১৯৪৯ সালে ৩ বছরের জন্য বহিস্কার হন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন তিনি। বিএ পাশের পর ভর্তি হন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগে। ভাষা আন্দোলনের অপরাধে ১৯৫২ সালের ৭ মার্চ জেলে যান।

রাজনীতি
ভাষা আন্দোলনের পর ছাত্র ইউনিয়ন গঠনে ভূমিকা রাখেন, সভপতি হন পরে। কৃষকদের জন্য সংগঠন ‘কৃষক ফ্রন্ট’ এর সভাপতি ছিলেন। ১৯৫৪ সালে পাবনা জেলা কমিউনিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক হন। ১৯৫৭ সালে মাওলানা ভাসানীর ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি ‘ন্যাপ’ এ যোগ দেন তিনি।

১৯৬৮ সালে পাবনা জেলা ভিত্তিক পূর্ব বাংলার কমিউনিস্ট পার্টি গঠন করেন। ১৯৯২ সালে বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি গঠনে ভূমিকা রাখেন এবং মতের অমিলের কারণে ২০০৬ সালে ওয়ার্কার্স পার্টি থেকে পদত্যাগ করেন। ২০০৯ সালে আবার ওয়ার্কার্স পার্টির একাংশের সাথে যোগ দেন তিনি। ২০১৩ সালে বাংলাদেশের ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগ গঠিত হলে তার উপদেষ্টা মণ্ডলীর সদস্য হন এবং আমৃত্যু সে পদে ছিলেন।

পদক সম্মাননা
২০০১ সালে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক পুরস্কার একুশে পদক পান ভাষা আন্দোলনের জন্য। এছাড়াও অনেক সম্মাননা ও পদক পান তিনি।

৯ ভাই ৪ বোনের মধ্যে সবার বড় আব্দুল মতিন। মহান মুক্তিযুদ্ধে বাবা আব্দুল জলিলসহ দুই ভাই শহীদ হন। শহীদ হন আরো ৪ চাচাতো ভাই। আব্দুল মতিনের স্ত্রী গুলবদন নেসা মনিকা। তাদের দুই মেয়ে মতিয়া বানু শুকু, মালিহা শোভন সুবর্না। থাকতেন ছোট মেয়ে ও জামাইয়ের বাসায়।

সাক্ষাতকার গ্রহণ মোহাম্মদপুরে আব্দুল মতিনের মেয়ের বাসায়।

তা ই মাসুম: শরীর কেমন? আপনার ছোট বেলার বিষয়ে জানতে চাই?

আব্দুল মতিন: আমার জন্মস্থান হল বর্তমান সিরাজগঞ্জ জেলা, আগের পাবনা। আমার বাপ দাদা চৌদ্দপুরুষ কৃষক পরিবার। নিম্ন নিম্ন-মধ্যবিত্ত অবস্থায় চলে গেছে ঐ সময়, যখন আমার জন্ম হয়। তখন আমার বাবা ম্যাট্রিক পাশ করে চাকরির খোঁজে কলকাতা গেলেন। কলকাতায় শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের সঙ্গে দেখা করেন। ফজলুল হক পুলিশের দারোগার একটা চাকরির ব্যবস্থা করে দিলেন। তখন তিনি ভাবলেন, এটা তো একটা অন্যায় কাজ করে ফেললাম। আমাকে তো ঘুষ খেতে হবে। অত্যাচারী হব! এই কাজ তো আমি করতে পারি না। আর ওই চাকরিতে গেলেন না।

পরে একটা গার্ডেনিং এর সুপারিনটেন্টেন্ড এর চাকরি নিলেন ৫০ টাকায়।

সেই সময় আমার জীবনের উল্লেখযোগ্য ঘটনা হল যে, আমি পড়তে বসলে এই যে দেখ, অ আ ই ঈ আমি পড়তে পড়তে বললাম পড়া হয়ে গেছে। একটা অ হল আরেকটা আ হল। কেমন করে আ হল! একটা দাগ দিয়ে অ’র সাথে। ই একটা ঈ একটা। এরকম করে এ ঐ এ’র ওপরে একটা দাগ দিয়ে ঐ হয়ে গেল! ও একটা ঔ হয়ে গেল! খুব সহজ ব্যাপার। চমৎকার আমাদের ভাষা। এইভাবে পড়ে ফেললাম।

ক খ গ ঘ চ ছ জ ঝ ঞ ট ঠ ড ঢ ণ ত থ দ ধ প ফ ব ভ য় র ল শ ষ স হ ক্ষ…।

পড়তে পড়তে আমি ব র ক ধ ঝ যখন আয়ত্তে নিয় আসলাম, তখন দেখলাম একই ব এর নীচে ফোটা দিলেই র হয়ে যাচ্ছে। আবার ব তার সামনে থেকে একটা টান দিলেই ক হয়ে যাচ্ছে। ওই রকমভাবে ধ হয়ে যাচ্ছে উপরের দিকে দিলে। ড ডান দিকে একটা টান দিলেই জ হয়ে যাচ্ছে, দেখলাম আনেক কিছুই কমন। খালি ফোটা দিয়ে, সামনে, ওপরে টান দিয়ে ভিন্ন হয়ে যায়। ছোট হলেও মৌলিক বিষয়গুলো বুঝতে পেরেছিলাম। এবং আই ওয়াজ দ্যাট টাইম লাভ উইথ দিস ল্যাংগুয়েজ।

তা ই মাসুম: ২১ শে ফেব্রুয়ারি ও ভাষা আন্দোলন সম্পর্কে আমার যে ক্ষুদ্র জ্ঞান তা তাকে বলার চেষ্টা করলাম।

আব্দুল মতিন: এগুলো আপনি কোথায় পাইছেন?

তা ই মাসুম: ভাষা আন্দোলন বিষয়ে নানা বই ও বাংলা পিডিয়া পড়ে জেনেছি।

আব্দুল মতিন: কী?

তা ই মাসুম: বাংলা পিডিয়া আছে না? প্রফেসর সিরজুল ইসলাম স্যারের সম্পাদনায়।

(আমার নেয়া নোটের কাগজ বের করে তাকে দেখিয়ে পড়লাম… ২১ শে ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলায় ছাত্রদের সভা বসে…আপনার বিষয়টা যেখানে আছে…তবে ছাত্র নেতৃত্ব বিশেষ করে আব্দুল মতিন এবং গাজীউল হক নিজেদের অবস্থানে অনড় থাকেন, ১৪৪ ধারা ভঙ্গ করার সিদ্ধান্তে)।

আব্দুল মতিন: তারা এ কথা বলেছেন! এটা শুধু আমরা তো না, অন্য ছাত্ররাও তো এর সঙ্গে আছে। সবকিছু জেনে আসবেন না?

তা ই মাসুম: সবকিছু তো জানি না, এজন্যই তো আপনার কাছে আসা স্যার। আপনি কিভাবে যুক্ত হলেন ভাষা আন্দোলনে তাও বলবেন। ১৯৫২’র ৩১ জানুয়ারি যে আপনারা সিদ্ধান্ত নিলেন ২১ শে ফেব্রুয়ারি পূর্ব পাকিস্তান গণ পরিষদে বাংলা ভাষার রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবিতে যাবেন। ৩১ জানুয়ারি থেকে ২১ শে ফেব্রুয়ারির দিনগুলো কেমন ছিল?

আব্দুল মতিন: এটা তো সিদ্ধান্ত হয়েছে আরো আগে! এই জিনিসগুলো যদি আপনি ঠিকমতো বোঝেন! ক্লিয়ারলি যদি না বোঝেন, তাহলে ইতিহাস বিকৃত হবে। এবং এই বিকৃত ইতিহাস দিয়ে কোনদিন আপনি সত্যকে উদঘাটন করতে পারবেন না। এটা কিভাবে সৃষ্টি হইছে? কোন আবেগে ছাত্ররা এটা গ্রহণ করলো? কোন কারণে, কোন চিন্তার কারণে তারা এটা গ্রহণ করলো?

তা ই মাসুম: স্যার, প্রথম লাহোর প্রস্তাব অনুযায়ী দেশ ভাগ হলে তো এই দুঃখজনক ঘটনা ঘটত না।
আব্দুল মতিন: কী ছিল তাতে?

তা ই মাসুম: মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলে এক বা একাধিক রাষ্ট্র হবে। স্টেটস। স্টেটস এর শেষের এস টা মুছে দিয়ে স্টেট করে দিল।

আব্দুল মতিন: এটা পরে চেঞ্জ করা হল। ৪৬ এ, হ্যাঁ ফোর্টি সিক্সে। ফোর্টি সিক্সের মার্চ। মার্চ মাসে, সেখানে এটা যে, এটার জন্য ভোটাভুটি হল। এবং সমস্ত উপ-মহাদেশব্যাপী ভোটাভুটি হইল। খালি আমরা দেই নাই, আমরা যে বাঙালিরা আমাদেরকে রাষ্ট্র দিতে হবে একথা বলি নাই। যে ৪৬ সালে যে ভোটাভুটি হইল? সেই ভোটাভুটি কি হইছিল রায়?

প্রত্যেকটা প্রভিন্সে কি, কত ভোটভুটি হয়েছে। এখানে কত হয়েছে? পাঞ্জাবে কত হয়েছে? সিন্ধে কত হয়েছে? 

বেলুচিস্তানে কত হয়েছে? আসামে কত হয়েছে? টোটাল ভোট কত হয়েছে? সমস্ত ইন্ডিয়াতে যে ভোটভুটি হইছে তার কি রেজাল্ট হয়েছে এবং তারা কি বলে?হ্যাঁ, মুসলমানদের রাষ্ট্র হবে ২টা। ২টা রাষ্ট্র হবে। তো কথা হইল ভোটাভুটি হইল সেই ভোটাভুটির রায় কি হইল? কোথায় গেল?

তা ই মাসুম: সেই রায় তো তোয়াক্কা করল না।

আব্দুল মতিন: সেই রায় তো তারা মানল না। সেই রায় পরবর্তীতে চেঞ্জ করা হইল, কোথায়? ঐ যে দিল্লি কনভেনশন। দিল্লি কনভেনশন, কারা ছিল ভোটার? কারা? হু গেভ দ্যা ভোট? সেখানে হইল ৫শ’র ওপরে সেন্ট্রাল কমিটি, যারা সেন্ট্রালি ইলেক্টেড সেই সমস্ত পারসনস অ্যান্ড প্রভিন্সিয়াললি ইলেক্টেড। এই দিল্লি কনভেনশনে ৭ দিনের মধ্যে এই কাজগুলো সব করা হইল। তার মেইন চ্যাম্পিয়ন ছিল জিন্নাহ (মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ) আর তার এসিস্ট্যান্ট ছিল 

সোহরাওয়ার্দী (হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী)। হি ওয়াজ দ্যা মিনিস্টার অব বেঙ্গল এ্যাট দ্যাট টাইম।

ফজলুল হক (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক) থাকলে পরে এরকম হইত না। আবুল হাশিম থাকলেও এইটা হইত না। আবুল হাশিম বলল, না। সে চ্যালেঞ্জ করল। বলল যে, লাহোর প্রস্তাব আমি দেখতে চাই, অরিজিন্যাল কপি। ঐ দিল্লি আর্কাইভসে তখন ছিল, সেই আর্কাইভস লিয়াকত আলী (লিয়াকত আলী খান) নিয়া আসল। আর্কাইভস থেকে বাইর কইরা নিয়া আইসা দেখল।

জিন্নাহ দেখাইলো, এই যে দেখেন! লেখা রাইছে! ২টা স্টেট হবে, স্টেটস হবে।

আপনি কেন বলছেন? এবং হু আর নাউ চেঞ্জিং ইট? বলছে যে, (জিন্নাহ) দে আর পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভস। বলছে, (আবুল হাশিম) পিপলস রিপ্রেজেন্টেটিভস? সো ভোটের তো রিপ্রেজেন্টেটিভস না? দোজ হু উইল নট গিভ ভোট! যারা অথরাইজট টু গিভ ভোট তাদের তো মতের প্রতিফলন ঘটছে না? সেইটা করেন? এখানে কি লেখা আছে, সেটা করেন।

বলছে যে, (জিন্নাহ) ইট ওয়াজ প্রিন্টিং মিসটেক। (আবুল হাশিম) প্রিন্টিং মিসটেক! বলল। এবং সেই টু স্টেটস এর জায়গায় ওয়ান স্টেট করে ফেলল! এই হয়ে গেল! এই হয়ে গেল ১ স্টেট পাকিস্তান। এই যে এক কলমের খোঁচায় মানুষের মতামাতের….সমস্ত মানুষ যে ভোট দিয়েছে, দেয় নাই। এই যে মোনাফেকী হইল!

সেখনেই তো মোনাফেকী করা হইছে। ওটা বুদ্ধি করে বলেছিল ফজলুল হক (শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক ১৯৪০ এর লাহোর প্রস্তাবে) যে, টু স্টেটস হবে। তারপর তো তার মুখ বন্ধ! আর কিছু করতে পারল না। তারপরে সোহরাওয়ার্দী আসল। এবং সোহরাওয়ার্দী হইলেন চ্যাম্পিয়ন। এই তো এইভাবে করতে করতে করতে তার পরে মুক্তিযুদ্ধ। ক্রেডিট গোজ টু শেখ মুজিব যে, হি কুট আটার দিস থিংস। ঐ যে কতই মার্চ?

তা ই মাসুম: ৭ই মার্চ।

আব্দুল মতিন: হ্যাঁ, ৭ই মার্চ। ৭ই মার্চে সে কি বলল? সেই বক্তৃতাগুলো তো আপনার স্মরণ আছে?

তা ই মাসুম: জ্বি।

আব্দুল মতিন: এখনো, সেটা, কি অসাধারণ সে বক্তৃতা! ঐ রকম বক্তৃতা শোনা যায়? পৃথিবীতে কোন জায়গায় পাওয়া যায় না। সে তো কল্পনা করে নাই মানুষ এইভাবে দাঁড়াবে! যখন এই যুদ্ধটা ঘটে গেল! কি অসাধারণ একটা যুদ্ধ! ৯ মাসের! একটা স্ট্যান্ডিং আর্মি উইথ দ্যা ব্যাকিং অব ইমপ্যারালিজম, তারা দাঁড়াইতে পারল না!

তা ই মাসুম: স্যার, আমরা ভাষা আন্দোলন নিয়ে কথা বলি?

আব্দুল মতিন: হ্যাঁ, প্রথম যে সংগ্রাম কমিটি গঠিত হয়েছিল, ফোর্টি এইটের সংগ্রাম কমিটির মধ্যে আমিও একজন মেম্বার ছিলাম। বহু লোক ছিল না। তো দাবি করে যে, তারা ছিল। আমি তখন ছাত্রলীগের পক্ষে ছিলাম। শেখ মুজিবুর তখন আসল। তখন সে বলল যে, আমাদের যে ছাত্র সংগঠনের মাধ্যমে আমরা পাকিস্তান অর্জন করেছি সেই পাকিস্তান আর হল না। সুতরাং আমরা নতুন একটা ছাত্র সংগঠন করতে চাই। সেটা হল পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ। ফজলুল হক হলে অ্যাসেমব্লিতে মিটিং হয়েছিল। ওই খানে আমিও ছিলাম।

তখন আমরা বললাম যে, এইটা আমরা করব। তখন সেইখানে তোয়াহা সাহেব (মোহাম্মদ তোয়াহা) এবং অলী আহাদ সাহেব দুই নেতা। তারা বললেন যে, মুসলিম থাকলে পরে আমরা এইটা করতে পারবো না। বলল যে, তাহলে কি? শেখ মুজিবুর বলল, কী করবো? আমি বললাম, কী করবেন? যা করেন আমি আপনাকে সাপোর্ট করবো। উনি বললেন, এটা কী করে করবা? আমি বললাম যে, কী করে করবো মানে? আমি বললাম আমাদের এখনো মুসলমানের জের আছে। এখনো আমরা এটা কাটাইয়া উঠি নাই। সুতরাং এই ছাত্রলীগ, মুসলিম ছাত্রলীগ নাম না দিলে এটা ফাংশন করতে পারবে না। সুতরাং আমরা ফার্স্ট একটা বছর কাজ করে নেই। ইতোমধ্যে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনটা আমরা মোটামুটি করে নেই।

কিন্তু, এটা কিন্তু থাকে নাই। মুসলিম শব্দ থাকে নাই, আওয়ামী লীগের মুসলিম শব্দ থাকে নাই। সব চেঞ্জ হচ্ছে, দেখেন সব টেম্পরারি, সব টেম্পরারি। এই যে রাষ্ট্র এই রাষ্ট্রের ভাষার মধ্যে বাঙালি থাকবে। বাংলা এবং উর্দু এই দুইটা থাকবে রাষ্ট্রভাষা। তো আমরা এই সংগ্রাম শুরু করলাম।

তারপরে জিন্নাহ সাহেব আসলেন, জিন্নাহ সাহেব এসে ছাত্রদের তো মিটমাট করতে পারলেন না। না এয়ারপোর্টে, না কনভোকেশনে কোন জায়গায়ই করতে পারলেন না। এবং কনভোকেশনে যেখানে সে সেকেন্ড টাইম বলতে আরম্ভ করলেন ‘ওয়ানলি স্টেট ল্যাংগুয়েজ শ্যাল বি উর্দু অ্যান্ড নো আদার ল্যাংগুয়েজ’। এ কথাটা কে বলেছিল?

তা তা ই মাসুম: জিন্নাহ।

আব্দুল মতিন: জিন্নাহ, এটার প্রতিবাদ কে করেছিল?

তা ই মাসুম: কোন জবাব দিলাম না। (আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন)

আব্দুল মতিন: জানেন না আপনি!, এই দেশের একটা প্রেসিডেন্ট সে বলছে, উর্দু শ্যাল বি দ্যা স্টেট ল্যাংগুয়েজ অব পাকিস্তান, আর সেইটার কে প্রতিবাদ করল সেইটা আমাদের জানার প্রয়োজন নাই? (কার্জন হলে আব্দুল মতিনসহ অনেকে এর প্রতিবাদ করেছিলেন, সেটা জানার জন্য আমাকে সেই সময়কার চিফ ইঞ্জিনিয়ার হাতেম আলী খান এর স্ত্রীর কাছে সত্যতা যচাইয়ের জন্য বললেন যিনি হায়দার আকবর খান রনো’র মা।)

ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে, ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে এই মাথায় হল হাতেম আলী খানের বাড়ী আর মাঝখানে একটু হইল শেখ মুজিবরের বাড়ী একই রোড।

তা ই মাসুম: জ্বি।

আব্দুল মতিন: জিন্নাহ সাহেবকে তাদের এখান থেকে বের করে নিয়ে যেতে হবে। তখন ওখান থেকে তাকে নিয়ে পেছনের দিকে নিয়া বলল যে, ব্যাক ডোরে গাড়ী আছে আপনি আসেন। ওখান থেকে ওনাকে নিয়া চলে গেল। এই যে ঘটনাটা ঘটল। তো জিন্নাহ তো এর পরে ছাত্রদের সাথে দেখা করেছিল, কতকিছু হইল। ওলি আহাদ তো তাকে বলল, আপনি তো কমনওয়েলথ এর একজন রিপ্রেজেন্টেটিভ, একটা দেশের! আপনি কে? আপনাকে তো আমরা সরিয়ে দিতে পারি। আমরা কমনওয়েলথ, ইংল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখব! হি ইজ ওয়ার্থলেস ম্যান! তাকে পরিবর্তন করে দিতে হবে। আপনি তো তাদের মাধ্যমে গভর্নর জেনারেল হইছেন!

এই রকম তর্ক-বিতর্ক হইয়া সে ছাত্রদের কনভিন্স করতে পারল না। সো এইটাই হইল কনভোকেশন। তার পরে আর কোথায় কনফরমেশন পাইল? হি গট নো কনফরমেশন ফ্রম এনি হয়ার। কিছু দালালরা ছাড়া, মুসলিম লীগরা ছাড়া আর তো কেউ তাদের সাপোর্ট দেয় নাই। দুইটা চাচ্ছি আমরা রিজনাবলি তোমরা দুইটা দাও? কেন তুমি বলছ একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা উর্দুই হবে?

তা ই মাসুম: স্যার, সাধারণ মানুষ, ছাত্ররা কিভাবে ভাষা আন্দোলনে যুক্ত হল?

আব্দুল মতিন: অনেকে মনে করে ফোর্টি এইটে বোধ হয় শুরু হইছে, নট ফোর্টি এইট, ফোর্টি সেভেনে নভেম্বর মাসে, একজ্যাক্ট ডেটটা আমার মনে নাই।

আমি এক্সিডেন্টলি ঐ পথ দিয়ে যাচ্ছিলাম, আমি তখন ঢাকা ইউনিভার্সিটির ছাত্র। ওখানে তখন ব্যারাক ছিল, সেক্রেটারিয়েট তো তখন হয় নাই। বিল্ডিংটা তখন ঐ ইডেন কলেজটা নিয়ে নিল। ঐ যে মেডিকেল কলেজটা নিয়ে ইউনিভার্সিটি হইল এক পর্সন দিয়া। এভরি থিং নিউ তখন। পাকিস্তান নতুন রাষ্ট্র। সেই সময় ফোর্টি সেভেনে নভেম্বর, আমি সলিমুল্লাহ হলের ওখান দিয়ে আসছি ইউিনিভার্সিটি যাব, ওখানে দেখি যে মিটিং হচ্ছে। আমি একজনকে বললাম যে, ভাই এখানে কিসের মিটিং হচ্ছে?

তো বলল যে, পোস্ট কার্ড ইনভেলাপ হইছে এগুলো দেখেন নাই? আমি বললাম, কী হইছে, আমি দেখিও নাই তখন। বলল, সেখানে কোনো জায়গায় পোস্ট কার্ড, ইনভেলাপ, মানি অর্ডার ফরম, টিকিট, রেল টিকিট কোন কিছুতে বাংলার স্থান নাই। ইংরেজ আমলে যা ছিল সেটাও নাই। এখানে সব উর্দু করে দিয়েছে। আমি বললাম, বলেন কী? বলল, হ্যাঁ। ৩ দিন আগে পোস্ট অফিস থেকে আমরা এগুলো পাইছি। ছাপানো হইছে, এখন আমরা সেটার প্রতিবাদে মিটিং করছি। আমি বললাম, এটার প্রতিবাদে মিটিং করছেন, মিটিং কে অর্গানাইজ করছে? বলল, আমরাই একটা মিটিং ডেকেছি।

বললাম, এটা তো সাংঘাতিক ব্যাপার! আমরা কি মিটিংয়ে থাকতে পারি? বলল, হ্যাঁ, থাকতে পারেন, সামনে ওখানে যান। তখন ইন দি মিন টাইম তাদের বক্তৃতা যেটুকু শুনলাম, একজন বলছে, যে ভাই! পোস্ট কার্ড, ইনভেলাপ, মানি অর্ডার ফরম এভরিথিং ডাক টিকিট, রেল টিকিট, সমস্ত টিকিটগুলোর মধ্যে খালি উর্দু। আমরা কী? ফালতু না-কি আসছি? আমাদের রাষ্ট্র তো পাই নাই? এখন আমরা সেটা চাই। বাংলা এবং উর্দু দুইটা রাষ্ট্র ভাষা হবে, আমরা সেটা চাই। এবং এই সমস্ত সবকিছু উইথড্র করতে হবে, এইটুকুই আমাদের দাবি।

সেকেন্ড ম্যান উঠে দাঁড়াল, হি মাইট বি লিডার, তিনি বললেন, ভাই, শুনলেন আমাদের তো এভাবে থাকলে চলবে না। আমাদেরকে মিছিল করতে হবে, আমরা এই সমস্ত জায়গায় মিছিল করবে যেখানে ব্যারাক আছে, সমস্ত ব্যারাকব্যাপী।

তারা বলছে মর্যাদা দেন, নাহলে কিন্তু কোনকিছু চলতে দিব না। বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে ঘোষণা করেন। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে। তো এই রকম দাবি এই দাবি আমরা চাই এবং আমরা আর সময় নষ্ট করব না। আমি বক্তৃতা দীর্ঘ করব না আপনারা এটা মানেন কিনা? বলল যে, হ্যাঁ, মানি। দুই তিনশ লোক তারা বলল আমরা মানি। এবং এটা গৃহীত হল। অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে। এবং সেইটাই প্রতিফলিত দেখলাম ৪৮ সালের মুভমেন্টে। কিন্তু ৪৮ সালের মুভমেন্টটা ব্যর্থ হইল কোথায়? এটা কন্টিনিউ করতে পারল না।

কারণ, ইন দ্যা মিন টাইম, জিন্নাহ সাহেব এসে বললেন, দেখ পাকিস্তান আমরা অর্জন করেছি, এইটাকে রক্ষা করা পবিত্র দায়িত্ব আমাদের ওপরে। আমাদের এক নেতা, এক খোদা, এক কনস্টিটিউশন, এক আইন এবং আমাদের এক ল্যাংগুয়েজ। এটাই করতে হবে, তাহলে পরে আমাদের এক ল্যাংগুয়েজ। আমরা ভাষা সেখানে ২টা করব না। এটা হলে ডিভিশন হয়ে যাবে। এই যে, এই কথা শুনে আপনিও তো কনভিন্সড হয়ে যাওয়ার মত হবেন! এবং সে একটা মামুলি নেতা ছিল না কিন্তু জিন্নাহ! জাস্ট পথে ঘাটে তৈরি হওয়া না। সে ব্যারিস্টার এবং তাকে গান্ধীও সমীহ করতো। এবং সে যথেষ্ট জ্ঞান বুদ্ধি রাখতো। ৪৮ সালে কমিটি করা হইল, কমিটি করে আমরা ৪৮ এর ডাক দিলাম। ৪৮ তো থ্রো আউট দ্যা কান্ট্রি এটা একসেপটেড হইছিল। কিন্তু পরবর্তী কন্টিনিউ করতে পারলাম না, এই যে আমাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির শুরু হইয়া গেল, জিন্নাহর বক্তৃতা থেকেই প্রথমত।

আপনি জানেন তখন প্রধামমন্ত্রী কে ছিল? নুরুল আমিন না।

তা ই মাসুম: খাজা নাজিম উদ্দিন।

আব্দুল মতিন: নাজিম উদ্দিন, হ্যাঁ, নাজিম উদ্দিন কম্প্রোমাইজ করল, সেই কম্প্রোমাইজটা কিন্তু সে মোটামুটি করতে পেরেছিল আর কেউ পারে নাই।

জিন্নাহ সাহেব বললেন, দেশের মুখ্যমন্ত্রীর সাথে তোমরা আন্ডারস্ট্যান্ডিং করেছ।

হু ইজ প্রাইম মিনিস্টার? হি ইজ চীফ মিনিস্টার! সে তো একটা প্রদেশের মুখ্যমন্ত্রী আর পাকিস্তান ইজ কম্প্রোমাইজ ফাইভ প্রভিন্সেস। সেই ফাইভ প্রভিন্সের সেন্ট্রাল সরকার আছে। তোমরা সেন্ট্রাল সরকারের সাথে কোন কথা বলতে পেরেছ?

এই সরকার সেট করবে, সেন্ট্রাল গভর্নমেন্ট, নট প্রভিন্সিয়াল গভর্নমেন্ট।

আমরা সেখানে জবাব দেই, সেখানে তো দুইটা রিজিওন, পাকিস্তানের দুইটা স্টেট হবে এটা তো লাহোর প্রস্তাবে ছিল? সেইটা হল না কেন?

বলছে যে (জিন্নাহ), ডোন্ট ডু ইট, বয়েজ! ডোন্ট ডু ইট! ইট ইজ মাই এ্যাপ্লাই। জিন্নাহ’র এই কথার পরে তারা কি আর মুভমেন্ট করতে পারে? এখন কথা হচ্ছে আমরা একটা জাতি, জাতির একটা ভাষার চাই স্বীকৃতি। এই দাবি নিয়া যারা থাকে একটা লোক ও যদি থাকো, তাহলে পরে সেই সিঙ্গেল ম্যান উইল লিড দ্যা কান্ট্রি।

ফোর্টি এইটে। এই ফোর্টি এইট থেকে ফোর্টি নাইন, ফিফটিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম কমিটির আহ্বায়ক হইলাম। ফিফটিতে এইখানে যে স্ট্রাগলটা করেছি, ফিফটি টু ফিফটিটু (১৯৫০ থেকে ১৯৫২)। ফিফটি টু ফিফটিটু একটা পিরিয়ড। ফিফটিটু তে একটা এ্যাচিভমেন্ট। বিরাট বিরাট এ্যাচিভমেন্ট, তাহলে এই ঘটনাগুলো ডাইরেক্টলি আপনি শুনেছেন কি-না?

এই যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কমিটি হইল, দুইটা কমিটি পার্স্যু করছে। মাইন্ড ইট!

আপনি যদি এটা না বোঝেন? তাহলে পরে আপনি জার্নালিজম কী করবেন- কী করছেন জানি না। আই ডু নট নো! কিন্তু কথা হইল যে, আমার প্রশ্ন যে, কমিটি হইল দুইটা ঐ যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সংগ্রাম পরিষদ এইটা কোথায় স্থান আছে? এটার কি নাম জানে কেউ?

তা ই মাসুম: স্যার, এইটার কথা আছে ।

আব্দুল মতিন: কোথায় আছে?

তা ই মাসুম: ওই বাংলা পিডিয়ায় আছে।

আব্দুল মতিন: কী আছে?

তা ই মাসুম: ১৯৫০ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন হয়েছে, আপনি (আব্দুল মতিন) ছিলেন তার আহ্বায়ক।

আব্দুল মতিন: আছে? তাহলে আরেকটা কমিটি হইল কবে?

তা ই মাসুম: মোট ৪টা কমিটি হয়েছে

আব্দুল মতিন: কী চারটা কমিটি?

তা ই মাসুম: এখানে যেটা বলা আছে

আব্দুল মতিন: কী চারটা কমিটি? যাহোক এই যে কমিটি গঠন হইল ইউনিভার্সিটিতে, এরপরে তারা রাজি হইল। এবং সমস্ত দলগুলো এর সঙ্গে থাকল। এটা অন্যরা করেছে, নট আমি করি নাই। আমি সেখানে খালি মিটিং যখন হইল সেখানে বললাম যে, আপনারা দেখছেন যে আমরা মেজরিটি, তার ভাষাকে দিতে হবে। মেজরিটি হলে কেন হবে? আপনি জাতির একটা ভাষা দিতে হবে। একচুয়ালি পাকিস্তান হইলে পরে হওয়া দরকার ছিল সিন্ধি ভাষা, পাঞ্জাবী ভাষা, তার পরে বেলুচি ভাষা, পাঠান ভাষা, আর হইল বাংলা ভাষা। বাংলা ভাষা তারমধ্যে মেজরিটি হইছে তারা আলাদা হবে। আলাদা থাকবে, আপনাদের সঙ্গে কেন থাকবে? আমার প্রভিন্সিয়াল অটোনমি পুরোপুরি দিতে হবে। সুতরাং এই হবে ইহিতাস। আপনার সেইটা করবেন?

তখন সবাই বলল যে, আবদুল মতিনকে আমরা কনভেনার করব। আই ওয়াজ ইলেক্টেড বাই দ্যা জেনারেল স্টুডেন্টস। আই বিকাম কনভেনার। তার পরে ৬টা মিটিং দিয়েছি, ৬টা মিটিং এ আসে নাই। আমি একা চালিয়েছি। কারণ, আই ওয়াজ ইলেক্টেড বাই দ্যা জেনারেল স্টুডেন্টস। নট ইলেক্টেড বাই ছাত্রলীগ অর তমদ্দুন মজলিশ অর এনি আদার অর্গানাইজেশন। তখন এই ৬টা মিটিং এ যখন আসল না তখন আমি পতাকা দিবস ঘোষণা করলাম।

পতাকা দিবস, ফ্ল্যাগ ডে। ফ্ল্যাগ একটা সিম্বল করে আমরা টাকা তুললাম। আমরা টাকা পাব কোথায়? সেক্রেটারিয়েট দুই গেট থেকে তুলে প্রায় ১ হাজার টাকা সংগ্রহ করলাম। তারপরে তো আমরা ২১ শে করে ৫২ সালে করেই ফেললাম। কিন্তু ৫২ সালে করেও তো হইল না। যখন গণ পরিষদে বাধ্য হইয়া গ্রহণ করল, তখন আমরা ৫৬ সালে। কত সালে?

তা ই মাসুম: ১৯৫৬ সালে

আব্দুল মতিন: এই যে গণপরিষদ, যে গ্রহণ করল, তখন তো এটা একসেপ্টেড হইল, লিগ্যাল স্ট্যাটাসটা আমরা পেয়ে গেলাম। যদি এইটা একসেপ্টেড না থাকত তাহলে কি আমাদের এই ইন্টারন্যাশনাল স্বীকৃতিটা দিতে পারতো? ওই যে, যেটা বললেন আমাদের স্ট্যাটাস? পৃথিবীব্যাপী এটা পালনীয় দিন ২১ ফেব্রুয়ারি।

তো এই যে একটা মর্যাদা আমরা পেলাম আমার দেশে যদি মর্যাদা না পেতো, আমার দেশ যদি স্বাধীন না করতাম, আমাদের রাষ্ট্রভাষা যদি আমরা অর্জন না করতাম, আমরা যদি ৫২ সালে সফল অভ্যুত্থান, এত বড় আন্দোলন না করতাম, তাহলে কি আমাদের তারা এই অনুগ্রহ করতে পারতো? কোনো দিনও হইতো না।

এমএ/ ০০:৪৩/ ০১ ফেবরুয়ারি

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে