Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৭ নভেম্বর, ২০১৯ , ২ অগ্রহায়ণ ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-৩০-২০১৯

সব চরিত্র অকাল্পনিক

পিয়াস মজিদ


সব চরিত্র অকাল্পনিক

বলা হয়ে থাকে, কবি-লেখককে পাওয়া যাবে না জীবনচরিতে। আমরা মনে করি, তাঁদের বরং পাওয়া যেতে পারে নিজেদের লেখায়, সৃষ্ট চরিত্রে। না হয় বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় কেন ভক্ত-পাঠককে বই উপহার দেওয়ার সময় 'অপু' লিখে স্বাক্ষর দেন? 'পথের পাঁচালী' কি কিছুমাত্রায় বিভূতি-পাঁচালীও নয়? অপুও কি নয় বাল্যের বিভূতিভূষণ! বিভূতির মতোই আমার এক প্রিয় কথাকার রশীদ করীম (১৯২৫-২০১১)। যিনি আদর্শকে বাস্তবায়িত অথবা বাস্তবকে আদর্শায়িত করেননি কখনও তাঁর 'উত্তম পুরুষ', 'প্রসন্ন পাষাণ', 'আমার যত গ্লানি', 'প্রেম একটি লাল গোলাপ', 'সাধারণ লোকের কাহিনী', 'একালের রূপকথা', 'শ্যামা', 'বড়ই নিঃসঙ্গ', 'মায়ের কাছে যাচ্ছি', 'চিনি না', 'পদতলে রক্ত', 'লাঞ্চবক্স'-এর মতো অসামান্য আখ্যানের পরিসরে। প্রতিটি উপন্যাসই ব্যতিক্রমী বর্ণবিভায় উদ্ভাসিত হয় পাঠকের পটে। সমালোচকরা তাঁর প্রায় সব লেখাকেই গুরুত্বের কেন্দ্রে রাখেন' কেবল প্রথম উপন্যাস উত্তম পুরুষ (১৯৬১) সম্পর্কে অনেকেই দ্বিধাগ্রস্ত। আর আমি তাঁর সব উপন্যাসের পুনঃপুন পাঠ শেষেও ক্রমঅধঃপতিত সময়ে ফিরে ফিরে আসি উত্তম পুরুষ-এর মর্মমূলে। জীবদ্দশায় প্রকাশ পেয়েছে তাঁর সম্মোহক শিরোনামের একমাত্র গল্পগ্রন্থ 'প্রথম প্রেম' আর হ্রস্বকায় আত্মজীবনী 'জীবন মরণ'। তবে প্রেমভারাতুর গল্পগুচ্ছ কিংবা বিধিবদ্ধ আত্মজৈবনিক রচনার চেয়ে তিনি প্রকাশিত তাঁর উত্তম পুরুষে। জেনেছি কোনো বিশেষ মত প্রকাশের কারণ দেখিয়ে সাময়িকপত্রে এই উপন্যাসের ধারাবাহিক প্রকাশ ব্যাহত হয়েছে। লেখক নিজেও ভূমিকায় বলেছেন এটি 'পিরিয়ড-নভেল' কিন্তু মানুষের পাপী ও সৎ সত্তা, প্রেমী ও ভোগী অবয়ব সবকিছুই সাদাসিধেভাবে জাজ্বল্য করার সূত্রে আলোচ্য আখ্যান হয়ে উঠেছে চিরকালীন ব্যঞ্জনায় অভিষিক্ত। 

উত্তম পুরুষকে আমরা লেখকের নিজ জীবনের সঙ্গে মিলিয়ে পড়তে পারি। আত্মস্মৃতিকে যে লেখক সামষ্টিক করে তুলতে পারেন, তিনি ক্রমে তাঁর জনগোষ্ঠীর আপন লেখকে পরিণত হন। চল্লিশের দশকের কলকাতার যে চিত্র উত্তম পুরুষে অঙ্কিত হয়, তাতে একদিকে যেমন শাকের, সলিল, শেখর, সেলিনা, অনিমার মধ্য দিয়ে হিন্দু-মুসলিম আন্তঃসম্পর্কের চালচিত্র উদ্‌ঘাটিত হয়, তেমনি অন্যদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে বোমাতঙ্কের মধ্যে কাল কাটানো অর্থনৈতিক মন্দাগ্রস্ত মানুষের ক্ষয়িষ্ণু দশাও স্পষ্ট। একদিকে ধর্মের ভিত্তিতে দেশভাগের ডামাডোল, অন্যদিক বস্তুগত প্রতিশ্রুতির কাছে শুদ্ধতাবাদী ধর্মীয় রক্ষণশীলতার আত্মসমর্পণের চিত্রও পরিস্টম্ফুট।

আপাতদৃষ্টে মনে হবে, শাকের উত্তম পুরুষের নায়ক। তবে যে কোনো সচেতন পাঠকই বলবেন, উত্তম পুরুষের নায়ক হচ্ছে সময়। ইতিহাস রক্ষার দায় রশীদ করীম নেননি বটে, তবে তার উপন্যাসের পটে ইতিহাসের আলো-ছায়ার যে সম্পাত ঘটে, তা লেখক হিসেবে পাঠকের সঙ্গে তার সংযোগ আরও দৃঢ় করে। 

শাকের এ আখ্যানের কথক, উত্তম পুরুষ। নিজের সম্পর্কে তার বলার কথা এই রকম- 

আমি সবসময়েই উত্তম পুরুষ। কিন্তু কাহিনীকার স্বয়ং যখন 'আমি'- তখন তাঁকে অধমও হতে হয়। তা না হলে হয়তো তাঁর নিজের মর্যাদা থাকে, কিন্তু সত্যের থাকে না। 

একজন উত্তম পুরুষ প্রথম বচনে এর কাহিনী লিখছেন। উপন্যাসের আঙ্গিক হিসেবে এই কৌশলটি অভিনব বা মৌলিক নয়- এমনকি বাংলা সাহিত্যেও নয়। শুরুতেই বলে রাখা ভালো, সাধারণত গল্পের 'আমি' পাঠক-মনে যে আদর্শ পুরুষের ছবি তুলে ধরে, বর্তমান আমি সে সাধারণ অনুসারে খাটো। 

আমি আদর্শ পুরুষ নই। আদর্শ পুরুষের জীবন থেকে মৃত্যু পর্যন্ত সবটুকুই এক নিরবচ্ছিন্ন সূত্রে গাঁথা। সবটাই চিরপরিচিত রেলগাড়ির লাইন; কোন স্টেশনে গাড়ি কতক্ষণ দাঁড়াবে তাও আগে থেকেই জানা। কোথাও অপ্রত্যাশিত বিস্ময় বা অজ্ঞতার চমক নেই। সুতরাং আমি আদর্শ পুরুষ নই। চরিত্র যথেষ্ট বলীয়ান নয় বলেও বটে, মনের স্বাভাবিক প্রবণতাও কিছুটা অন্যদিকে প্রবহমান বলেও বটে। 

রশীদ করীমের প্রয়াণের অব্যবহিত পূর্বে কথাশিল্পী হামিদ কায়সারের সূত্রে তাঁর সঙ্গে আমার কিছুটা আলাপ-পরিচয় ঘটে। তখন তিনি জরাগ্রস্ত, লেখা তাঁর কুশলী করতল ছেড়ে গেছে অনেক দিন। তবে সামান্য আলাপের উত্তাপেই টের পেয়েছি ব্যক্তি রশীদ করীম এবং উত্তম পুরুষ-এর কথক শাকেরের চারিত্রিক গঠন ও প্রবণতার প্রবল মিল। 

শাকের এই আখ্যানের অঘোষিত নায়ক। দেশ বিভাগপূর্ব কলকাতার প্রধানত মুসলিম জীবনের যে চিত্র এখানে আঁকা হয়েছে, তার ভীষণ যোগ পেয়েছি রশীদ করীমের পারিবারিক সংস্কৃতিতেও। মনে আছে ধানমণ্ডি-৬ নম্বরে তাঁর বাসায় আমি আর হামিদ ভাই প্রবেশমুহূর্তেই অতিথি দেখে অসুস্থ শরীরেও হাত একটু ওঠাবার চেষ্টা করে অস্টম্ফুটস্বরে বললেন 'সেলামালাইকুম'। আমি প্রত্যুত্তরে বেলাল চৌধুরীর লেখার শিরোনাম ধার করে মনে মনে বললাম 'সেলাম রশীদ করীম'। মনে হচ্ছিল, আরে এই তো শাকের, যে বন্ধু মুশতাকের বাড়িতে গিয়ে তার মাকে ঠিক এভাবে শুভেচ্ছা জানিয়েছে। আর তখনই মনে পড়ল 'মুশতাক' নামটিও রশীদ করীমের প্রিয় নির্বাচন। আমরা যদি তার 'মনের গহনে তোমার মুরতিখানি' (১৯৯৭)-এর অন্তর্গত 'রাজনীতি ও ক্রিকেট' প্রবন্ধটি পড়ি তবে দেখব কিংবদন্তি ক্রিকেটার সৈয়দ মুশতাক আলী (যার সম্পর্কে লিখেছেন নেভিল বার্ডাস থেকে শঙ্করীপ্রসাদ বসু) রশীদ করীমের কতটা প্রিয় খেলোয়াড়। অনুমান করা যায়, খেলার মাঠের প্রিয় নাম অবলীলায় উঠে এসেছে তাঁর প্রথম উপন্যাসের অন্যতম চরিত্রে, যেন মূল চরিত্রের অনেকটা 'অল্টার ইগো' হয়েও। আবার তৃতীয় পরিচ্ছেদে বালিগঞ্জ ময়দানে পার্ক ইউনাইটেড ক্লাব বনাম রেইনবো ক্লাবের ফুটবল ম্যাচে জয় প্রসঙ্গে মুশতাক তার মাকে বলে, 'আম্মা তুমি যদি আজ শাকেরের খেলা দেখতে। কে বলবে সে হাফেজ রশীদ নয়!' মুহূর্তেই আমাদের মনে পড়ে ক্রীড়া বিষয়ক একাধিক লেখায় রশীদ করীম তুলে ধরেছেন প্রিয় ফুটবলার হাফেজ রশীদের কথা। 

রশীদ করীমের কণ্ঠে সব সময় ছিল ঐতিহ্যের গান। তাঁর এই ঐতিহ্যপ্রীতি পুরনো কলকাতার রাস্তাঘাট, গলিঘুপচি, সিনেমা হল, রেস্তোরাঁ থেকে কবরখানা পর্যন্ত বিস্তৃত। তালতলার লাড়ূয়া, মাখন-রুটি, নিউমার্কেটের চাকা চাকা পনির, কপির শিঙ্গাড়া, জিলিপি, বেনিয়া পুকুরপাড়া, ক্রিমেটোরিয়াম রোড, কোমেদান বাগান লেন, মৌলালির মোড়ের কাবাব, জোড়া গির্জা, মধুসূদনের সমাধি, পার্ক সার্কাস, সৈয়দ আমির আলী এভিনিউ, এলগিন রোড, সাঙু ভ্যালি রেস্টুরেন্ট, রূপালি কি চিত্রা সিনেমা হল- প্রমথেশ বড়ূয়া-উমা শশী-যমুনা-পঙ্কজ মল্লিক-সায়গল, ওয়াছেল মোল্লার দোকান, রেড রোড, গড়ের মাঠ, ল্যান্সডাউন রোড, ইউরোপীয় অ্যাসাইলাম লেন, ভীম নাগের সন্দেশ, মাটির ভাঁড়ের চা, কলুটোলার মাওয়ার লাড্ডু, আতর-লোবান আর গোলাপ পানি, নতুন বাজারের ফুল আর নেশেসতার হালুয়া, মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাব বনাম মোহনবাগান, চিনেপাড়া, খিদিরপুর, আউটরাম ঘাট, হ্যারিসন রোডের মর্নিং বেল রেস্টুরেন্টের মাটন কারি- কত কিছুর সমাবেশ যে এই উপন্যাসে! উপন্যাসকে রশীদ করীম শুস্ক বর্ণনার আখড়ায় পরিণত করেননি বরং তাঁর উপন্যাস কবিতা, সংগীত, চিত্রকলা, চলচ্চিত্র, ক্রীড়া, খাদ্য সংস্কৃতির সজীব সমাবেশস্থল। উল্লিখিত বিষয়ের প্রায় প্রত্যেকটিই তাঁর নিজের হারানো হিয়ার নিকুঞ্জ পথের বিষয় যেন। 

একটা নতুন সময়ের গতি এসে পুরনো ছবির মতো স্থির সৌন্দর্য চুরমার করে দিচ্ছে- এটা মন থেকে মেনে নিতে অপারগ তিনি। বলেছেন, 'সময় স্থির হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে থাকে না, তবু বইয়ের পাতায় থাকে।' আমরা দেখি উত্তম পুরুষ বইয়ের পাতায় থেকে যাচ্ছে শাকেরের বয়ানে গোলাম মুরশেদ ওরফে রশীদ করীমের জীবনখাতার পয়লাভাগ। উপন্যাসের পৃষ্ঠা ২৫-এ পড়ি- 

আব্বাস- তুমি! কি খবর?

স্যার, আমার ছোট ভাইটিকে ভর্তি করতে এসেছি। 

বেশ বেশ। তুমি এখন কি করছ? সেই ইংরেজি সাহিত্য নিশ্চয়ই। তোমাদের বংশটাই রাজ-ভক্ত হে! 

পণ্ডিত মশাই হেসে ফেললেন। বড় ভাইও হাসলেন। 

তোমার মেজ ভাই কি করছে? 

সে বিএ পড়ছে। 

সেই গুড ওল্ড ইংলিশ অনার্স? 

বড় ভাই আবার হাসলেন, কেমন যেন অপরাধীর মতো। বস্তুত পণ্ডিত মশায়ের অনুমানই ঠিক। তিনি আবার বললেন : 
ছেলেটা কিন্তু বাংলাও লিখতো ভালো। কিন্তু বাংলা শিখে কি হবে! কি বলো? 
না স্যার, ঠিক তা নয়। 

শাকেরের অগ্রজ আব্বাসের সঙ্গে পণ্ডিত মশাইয়ের কথোপকথনে যেমন উঠে আসে ঔপনিবেশিক সময়ের শিক্ষাচিত্র, তেমনি যদি রশীদ করীমের 'জীবন মরণ' আর তাঁর অগ্রজ আবু রুশদের আত্মজীবনী মিলিয়ে পড়ি তবে দেখব তাঁদের পরিবার ইংরেজি সাহিত্যের কৃতবিদ্য ছাত্রে ভরপুর। কিন্তু তাঁরা বাংলা সাহিত্যে রেখে গেছেন নিজস্ব মুদ্রার ছাপ, যেন পণ্ডিত মশাইয়ের কথাটির মতো 'বাংলাও লিখতো ভালো'। 

গোলাপ ও মৃত্যুর ঘ্রাণে ভরপুর তাঁর আখ্যানের আঙিনা। পরিচ্ছেদ আঠারো খান বাহাদুর সাহেবের মৃত্যু ও শেষকৃত্যের সজল বর্ণনা দেয় শাকের- 

জানাজা চলল 'গোরে-গরিবান'। পিছনে শত শত লোক। সবার মুখে এক কথা- পাড়ার রাজা চলে গেল। 

স্মরণ করতে পারি ব্যক্তি রশিদ করীমের সঙ্গে আমাদের শেষ সাক্ষাতে যখন তাঁর সমুখে উপবিষ্ট প্রয়াত ইতিহাসবিদ সালাহ্‌উদ্দীন আহমদ এবং বন্ধু জিল্লুর রহমান সিদ্দিকী; তিনি বলছিলেন তাঁর বহু স্বজনের সমাধি-রচিত কলকাতার 'গোরে-গরিবান' কবরখানায় আর তিনি পড়ে আছেন দূর ঢাকায়। তাঁর চোখের পানি আমাদের আর একবার সাক্ষাৎ করায় শাকেরের সঙ্গে। আমরা ফের শাকেরের সাথে রওনা দিই কলকাতায়। গিয়ে দেখি শাকের আপন মনে পড়ছে 'বনে-জঙ্গলে', পাঁচকড়ি দের 'মায়বী', বঙ্কিম-শরৎ-রবীন্দ্রনাথ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের 'চতুস্কোণ' কিংবা শেকসপিয়রের 'কিং লিয়ার'- 

Down from the waist they are Centaurs, 
Though women all above. 
But to the girdle do the Gods inherit, 
Beneath is all the friend’s. 
There’s hell, there’s darkness, 
there is the sulphurous pit, burning, 
scalding, stench, consumption.  

বিচিত্র বইয়ের পাঠক শাকেরের কাছ থেকে আমরা আবার ফিরে আসি রশীদ করীমের পড়ার টেবিলে। দেখি ইতিউতি এই বইগুলো ছড়ানো; 'কিং লিয়ার' তো জায়গায় জায়গায় দাগ দেওয়া, যেন জীবনসত্যের সূত্র খুঁজেছেন সেখানে; সেই বিচিত্র পাঠক রশীদ করীম যিনি আমাকে বলেন- পড়ো, সামস রাশীদের 'সিন্ধু বাঁরোয়া' থেকে আহমদ ছফার 'ওঙ্কার'; বইয়ের বৈচিত্র্যেই আছে জীবনবৈচিত্র্যের সূত্রসার। তাঁর কাছ থেকে পাঠের প্রেরণা নিয়ে ফিরে যাই আমার তখনকার আবাস জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে, আবার এক রোজার বিকেলে সাভার থেকে বাসে করে ঢাকায় আসতে গিয়ে হঠাৎ মনে হলো, যাই দেখে আসি উত্তম পুরুষের শাকের কিংবা রশীদ করীম আছেন কেমন। অসুস্থ বেশ, স্মৃতি তাঁর সঙ্গে লুকোচুরি খেলা খেলছিল তখন, আমাকে ভালো করে চিনলেন বলে মনে হলো না। তবু তিনি প্রায় অচেনা আমাকে স্বাগত করলেন, তাঁর স্ত্রী সালিমা মুরশেদ ফুল পরম স্নেহে রকমারি ইফতার সাজিয়ে দিলেন আমার সামনে, সামনেই ঈদ, রশীদ করীম জিজ্ঞেস করলেন- 'ঈদ কোথায় করবে? ঈদের চাঁদ দেখবে কোথায়!' তাঁর স্ত্রী হেসে বললেন, 'ওর তো চাঁদ দেখার বয়স নেই মনে হচ্ছে'। কিন্তু আমার বেশ মজাই লাগল। সমাগত ঈদ, ইফতারের সুঘ্রাণ, আর রশীদ করীমের জিজ্ঞাসা আমাকে নিয়ে গেল উত্তম পুরুষ উপন্যাসে, ঈদের আগে শাকেরদের বাড়িতে- 

ঈদের ছুটিতে আব্বা কলকাতা এসেছেন। চাঁদ-রাতে সারারাত জেগে দাদি রান্না করছেন :সেমাই, পোলাউ-কোর্মা কাবাব-পরোটা। বাড়ির কারো চোখে ঘুম নেই। ঈদের আগের রাতে কেই-বা ঘুমায়? ঘুম কি আসতে চায়? বছরের একটি দিন ঈদ, আবার আসবে সেই আসছে বছর। রান্নাঘরে কোর্মার খুসবু, চাটুর শব্দ, কাঠ-কয়লার ধোঁয়া, উনুনের দগদগে আগুন আর বাবুর্চির ময়দা পেষা, অন্যান্য ঘরে পাজামার ইজারবন, মাথার টুপি আর জুতার ফিতা সব ঠিকমতো আছে কি না তারই তদারক, বাড়ির বিভিন্ন লোকের এইসব বিভিন্ন কাজেই তো রাত কাবার হয়ে যায়। সময় কোথায়? বস্তুত উৎসবের দিনের চাইতে তার আগমন-প্রতীক্ষাতেই তো প্রধান আনন্দ। 

কোমেদান বাগান লেনে আমাদের বাড়ির চারপাশে উঁচু উঁচু দালান, ভালো করে আকাশ দেখা যায় না। 

আমরা পাড়ার সব ছেলেরা জড়ো হয়েছি তেত্রিশ নম্বরের ছাতে, সেখান থেকে আকাশের চারদিক দেখা যায়। 

একটি বিশেষ দিকেই চাঁদ উঠবে, এই বৈজ্ঞানিক সত্যটিকে আমাদের অধীর শিশুমন কিছুতেই সায় দেয় না। চাঁদ যদি ফাঁকি দিয়ে অন্য কোন দিক ওঠে। আমরা অস্থির হয়ে আকাশের চারদিকে চাঁদ হাতড়ে বেড়াই; কিন্তু কোথায় চাঁদ। 

অধীর উদ্বিগ্ন, অসহ্য প্রতীক্ষা। 

ঐ যে চাঁদ!

এভাবে শাকেরের সঙ্গে, রশীদ করীমের সঙ্গে আমার এবং আমাদের অনেকেরই স্মৃতির ঈদ পালন হয়ে যায় যেন। ঈদের আনন্দ থেকে পেছনে ফিরে যাই গত শতকের ভবানীপুরে। শাকের, মুশতাক, সলিল, শেখর, সেলিনা, অনিমার মধ্যে পারস্পরিক মতভিন্নতা বা বিরোধ যাই থাক তাদের চলাফেরা আর বন্ধুতা যেন অনেক পরে লেখা রশীদ করীমেরই প্রবন্ধ-শিরোনাম 'বাঙালির মিশ্র সংস্কৃতি'-এর সার্থকতা প্রতিপন্ন করে। 

উপন্যাসে শাকেরের কণ্ঠে হঠাৎ শুনি গোলাম মোস্তফার চরণ- 

আমরা নূতন, আমরা কুঁড়ি,

নিখিল মানব নন্দনে

এই শুনে মনে পড়ে যায় বাংলা একাডেমির হয়ে একটি তথ্যচিত্র নির্মাণের কাজে কথাশিল্পী সেলিনা হোসেন, মুর্শিদ আনোয়ার এবং আমি এক বিকেলে বসেছি তার বৈঠকখানায়। রশীদ করীম আলাপ করছিলেন তাঁর বিশেষ সুহৃদ, 'ফিরে ফিরে চাই' এবং 'আমার দিনগুলি' বইয়ের অনন্য লেখক সুস্মিতা ইসলামের সঙ্গে। কানে এখনও ভেসে আসছে তার জড়ানো স্মৃতিস্পৃষ্ট উচ্চারণ 'দিদি, মনে পড়ে কলকাতা। সৈয়দ মুজতবা আলী, হুমায়ুন কবীর, আবু সয়ীদ আইয়ুব আর গোলাম মোস্তফার কথা। অতীত হয় নূতন পুনরায়।' পুরনো দিনের অভিন্ন অংশী সুস্মিতা ইসলামকে পেয়ে রশীদ করীমই বলছিলেন নাকি শাকেরই বলছিল এই স্মৃতিমেদুর কথাবার্তা! ধন্দ কাটে না আমার। না কাটুক। 

আমি বরং ঘুরে আসি প্রেম নামে রশীদ করীমের লাল গোলাপমহলে। প্রথমদিকে গল্পই লিখতেন তিনি। বলেছেন তিনি, ১৯৪২ সালে 'সওগাত' পত্রিকায় তার 'আয়েশা' গল্পটি প্রকাশিত হয়। এক সুন্দরী বাল্যসখীর প্রেমাভিঘাতের গল্প সেটি। এই অনাল্ফম্নী বাল্যসখীর কথা ঘুরেফিরে এসেছে তার আরও অনেক গল্প-উপন্যাস এমনকি আত্মকথায়। উত্তম পুরুষ উপন্যাসে শাকেরের বন্ধু মুশতাকের বোন সেলিনা তার কাছে যেন এক রহস্যমঞ্জিলের নাম। যে প্রথমে তাকে উপেক্ষা করে, পরে কিছুটা কাছে টানে এবং শেষে সমাজের কাছে তাকে হেয় প্রতিপন্নও করে। এর মাঝে শাকের কলকাতা থেকে সেলিনার কাছ থেকে দূরে চলে যায়, মাদারীপুরে। যেমন কলকাতায় জন্ম নেওয়া ও বেড়ে ওঠা রশীদ করীমের দেশভাগের পর ১৯৫০ সালে কলকাতা ত্যাগ করে ঢাকায় চলে আসা। বাস্তবে উদ্বাস্তু হলেও স্মৃতিজমিতে কেউ কখনও উদ্বাস্তু থাকে না। ফিরে ফিরে সে আসে ধীরে, স্মৃতি-পারাবারে। শাকের যেভাবে ফিরে যায় কলকাতায়, হঠাৎ দেখাও হয়ে যায় সেলিনার সঙ্গে। রশীদ করীমের যেমন হঠাৎ দেখা হয় তাঁর ফেলে আসা বাল্যসখীর সঙ্গে। 

রশীদ করীমের সঙ্গে আমার দেখা নেই অনেক দিন। অর্ধযুগের বেশি হয়ে এলো তাঁর প্রয়াণের। তবে নতুন করে উত্তম পুরুষ পড়তে পড়তে এই তো আমার সঙ্গে আবার দেখা হলো শাকেরের; দেখা হলো হয়তো রশীদ করীমেরই সঙ্গে। 

এমএ/ ০০:২২/ ৩০ জানুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে