Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-২৯-২০১৯

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়: দেশভাগের বেদনাবাহক  

স্বকৃত নোমান


অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়: দেশভাগের বেদনাবাহক  

চলে গেলেন প্রখ্যাত কথাশিল্পী অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর মৃত্যুতে ওপার বাংলার শিল্পী-সাহিত্যিকরা যেমন শোকাহত হন, তেমনি শোকাহত হই আমরা অর্থাৎ এপার বাংলার শিল্পী-সাহিত্যিকরাও। মানুষ মরে গেলে তার স্বজন-পরিজন ও শুভাকাঙ্ক্ষী-শুভানুধ্যায়ীরা শোকাহত হবে—এটাই স্বাভাবিক। অতীনের মৃত্যুশোকের কথা আলাদা করে লেখার কী দরকার? এই জন্য যে শোকেরও মাত্রা আছে। কোনোটা হালকা, কোনোটা গভীর। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের মৃত্যুশোকটা গভীর। কেন গভীর? এ জন্য যে কথাসাহিত্যই ছিল তাঁর সারা জীবনের সাধনা। সাধনা করতে করতে লাভ করেন সিদ্ধি। বাংলা ভাষার ধ্রুপদি ঔপন্যাসিক হিসেবে পোক্ত করে নেন নিজের আসনটি। তিনি সাহিত্যের একজন মৌলিক স্রষ্টা। দুই বাংলার সাহিত্যসেবীদের কাছে তিনি ছিলেন নমস্য।

অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন ভারতের নাগরিক; কিন্তু মননে ছিলেন বাংলাদেশের নাগরিক। সারাটা জীবন তিনি এই দেশকে মনের মণিকোঠায় লালন করেছেন। তিনি জন্মেছিলেন বাংলাদেশে, ১৯৩৪ সালে ঢাকা জেলার (বর্তমান নারায়ণগঞ্জের) রাইনাদি গ্রামে। এখানেই কেটেছে তাঁর জীবনের সাড়ে ১৭ বছর। এখানকার গাছপালা, নদী-নালা, ফুল-পাখি, আকাশ-বাতাস, ঝড়ঝঞ্ঝা ও অবারিত মাঠ দেখতে দেখতে তিনি বড় হয়েছেন। প্রাথমিক পর্যায়ের পড়ালেখা করেছেন এখানকার স্কুলে। দেশভাগের সময় পরিবারের সঙ্গে চলে যান ওপারে। কেন চলে গিয়েছিল তাঁর পরিবার? দাঙ্গার কারণে? এখানকার মুসলমানদের জোরজবরদস্তির কারণে? না, রাইনাদি গ্রামে তখন দাঙ্গা হয়নি। দূরের একটি গ্রামের হিন্দুদের বাড়িঘরে মুসলমানরা আগুন দিয়েছিল বটে; কিন্তু রাইনাদি ছিল শান্ত। হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ছিল সম্প্রীতি। তবু কেন চলে গেল অতীনের পরিবার? কারণটি ছিল আসলে অভিমান। বাংলাদেশে মুসলমানরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হলেও হিন্দুদের সঙ্গে মিলেমিশে থাকত। আপন মনে করত। অথচ হঠাৎ করেই মুসলমানরা প্রতিবেশী হিন্দুদের বাদ দিয়ে নিজেদের জন্য আলাদা একটি দেশ দাবি করে বসল। মুসলমানরা বলতে শুরু করল ‘মুসলিম লীগ জিন্দাবাদ’। বোঝাতে চাইল, তারাই এ দেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ, দেশ শাসনের অধিকার একমাত্র তাদেরই। এ থেকে হিন্দুদের মনে একটা বেদনা সৃষ্টি হয়। সেই বেদনা, সেই অভিমানের কারণে অনেক হিন্দু দেশ ত্যাগ করে ওপারে চলে যায়। একই অভিমানে চলে যায় অতীনের পরিবারও।

ওপারে গিয়ে প্রবেশিকা পরীক্ষা দেন অতীন। কাশিমবাজার মণীন্দ্র কলোনিতে বাবার ঘরবাড়িতে কিছুকাল থিতু হয়ে থাকলেন। তারপর শুরু হয় তাঁর জীবনসংগ্রাম। কলকাতায় যাযাবরের মতো কাটিয়েছেন গোটা যৌবন। যখন যে কাজ পেয়েছেন করেছেন। কখনো নাবিক, কখনো ট্রাক-ক্লিনার, কখনো স্কুল শিক্ষক, কখনো কারখানার ম্যানেজার এবং সব শেষে সাংবাদিকতা। এসব কাজের মধ্য দিয়ে জীবনকে তিনি দেখেছেন বহু কোণ থেকে। জীবনের বাস্তবতা যে কতটা রূঢ় হতে পারে, তা বেশ ভালো করেই উপলব্ধি করেছেন। জীবনের এই বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতাই কি তাঁকে লেখক করে তুলেছিল? হয়তো। লেখার জন্য তো অভিজ্ঞতার প্রয়োজন হয়। মানবজীবনকে জানতে হয়, বুঝতে হয়; মানবজীবন সম্পর্কে থাকতে হয় নানামাত্রিক অভিজ্ঞতা। সেই অভিজ্ঞতাটা অতীন বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছিল। তিনি অর্জন করেছিলেন। গল্পকার কুলদা রায়কে দেওয়া এক সাক্ষাত্কারে অতীন বলেছেন, ‘বেদনা না পেলে বেদনাকে বোঝা যাবে না। না বুঝলে বেদনা লিখবেন কী করে?’ এই বেদনা হচ্ছে জীবনের তিক্ততার বেদনা, জীবনের কষ্টকর সংগ্রামের বেদনা। জীবন তাঁকে যতটুকু আনন্দ দিয়েছে, তার চেয়ে বেদনা দিয়েছে বহুগুণ বেশি। কলকাতার তিক্ত জীবনযুদ্ধের বেদনা ছাড়াও অতীনের ছিল আরো একটি বড় বেদনা। সেই বেদনা দেশভাগের। দেশভাগটাকে তিনি আসলে মেনে নিতে পারেননি। এই বেদনা তাঁর মধ্যে তৈরি করে হাহাকার। কুলদা রায়কে দেওয়া ওই সাক্ষাত্কারে বলেছেন, ‘আমি যা কিছু লিখেছি, বেশির ভাগ লেখাই দেশভাগের ওপর। দেশভাগ না হলে আমি লেখকও হতাম না।’

সত্য বলেছিলেন অতীন। দেশভাগ ছিল তাঁর জন্য একটি বেদনাবহ ঘটনা। শুধু তাঁর জন্য নয়, অনেকের জন্যই এটা ছিল বেদনার। এটি ছিল মানবসৃষ্ট এক বিপর্যয়। এটি ঘটেছিল মূলত রাজনৈতিক অবিমৃশ্যকারিতায়, যার ব্যাপকতা ও গভীরতা ছিল ভয়াবহ। সাম্প্রদায়িক সত্তার ভিত্তিতে ভৌগোলিক বিভাজন কোটি কোটি মানুষকে শুধু ভিটেমাটি ত্যাগেই বাধ্য করেনি, প্রাণ কেড়েছে, নিঃস্ব করেছে। দেশভাগের এই বেদনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন অতীন লেখালেখির মাধ্যমে। মাতৃভূমি ছেড়ে ওপারে চলে গেলেও বাকি জীবনে কখনো ভুলতে পারেননি এই দেশকে। ফেলে যাওয়া সাড়ে ১৭ বছরের স্মৃতি বয়ে বেড়িয়েছেন সারা জীবন। তাঁর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসে ছিল সাড়ে ১৭ বছর। ফেলে যাওয়া দেশ, সময়, প্রকৃতি আর মানুষজনকে নিয়ে লিখলেন ‘নীলকণ্ঠ পাখির খোঁজে’ উপন্যাস। রয়েল সাইজের ৪০০ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসে তিনি তুলে ধরেছেন তাঁর ফেলে যাওয়া সাড়ে ১৭ বছরকে, সেই রাইনাদি গ্রামকে, সেই সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বাংলাদেশকে। উপন্যাসটি উত্সর্গ করেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে।

দেশভাগের বেদনা নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটির অসংখ্য চরিত্র। এই স্বল্পপরিসরে সব চরিত্র নিয়ে আলোচনা করার সুযোগ নেই। একটি চরিত্র হচ্ছে মুশকিল আসানের পীর। তিনি এক ধরনের অলৌকিকত্বের গল্প তৈরি করেন। হিন্দু-মুসলমান-নির্বিশেষে তাঁকে ভক্তি করে, বিশ্বাস করে। রাতের বেলায় তিনি প্রদীপ নিয়ে ঘুরে বেড়ান। এই চরিত্রটি প্রসঙ্গে অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন, তাঁর ছোটবেলায় এই মুশকিল আসান পীর তাঁদের বাড়িতে যেতেন গভীর রাতে। ‘মুশকিল আসান’ বলে ধ্বনি দিতেন। পরনে কালো জোব্বা, গলায় কাচের বল দেওয়া মালা, মুখে অনেক লম্বা দাড়ি, আর চোখের নিচে সুরমা টানা, মাথার চুল বড় বড়। কিশোর অতীন জানতেন না মুশকিল আসানের পীর কোন সম্প্রদায়ের মানুষ। সেই বয়সে এটা জানার কৌতূহলও ছিল না। বাড়ির বড়রা বলতেন, মুশকিল আসান সাহেব এলে গাঁয়ের মঙ্গল হয়। অতীনদের গ্রামটি ছিল হিন্দুপ্রধান। সেই গ্রামে এসেই ‘আল্লাহু আকবার’ বলে ধ্বনি দিতেন মুশকিল আসানের পীর। তাঁর হাতে মাটির তৈরি কুপির মতো একটা জিনিস থাকত। সেই কুপির চার-পাঁচটা মুখ। কোনোটায় কাজল, কোনোটায় আলো, কোনোটায় তেল। গভীর রাতে অতীনদের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ‘মুশকিল আসান’ বলে হাঁক দিতেন। ধ্বনি দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই ছোট-বড় সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসত। মুশকিল আসানের পীরকে ঘিরে দাঁড়াত। মুশকিল আসানের পীর তাঁর মাটির কুপি থেকে কাজল নিয়ে সবার কপালে একটা করে টিপ দিতেন। তার বিনিময়ে তাঁকে দেওয়া হতো এক পয়সা বা আধা পয়সা। তাঁকে দেখে ছোট্ট অতীন ভয় পেতেন।  তখন তাঁর চাচা-জ্যাঠারা বলতেন, ভয় নেই। তিনি সবার মঙ্গলের জন্য এসেছেন। কাকা-জ্যাঠারাও তাঁর দেওয়া ফোঁটা নিতেন। সেখানে কোনো হিন্দু-মুসলমানের ব্যাপার থাকত না। হিন্দুদের মধ্যে তো তখন ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারটা ব্যাপকভাবে ছিল। কিন্তু মুশকিল আসানের পীর মুসলমান বলে কেউ তাঁকে খাটো করে দেখত না। অতীন বন্দ্যোপাধ্যায় আসলে মুশকিল আসানের পীর চরিত্রটিকে অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের প্রতিনিধি হিসেবে উপস্থাপন করেছেন তাঁর উপন্যাসে। এ রকম চরিত্র বাংলা উপন্যাসে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যায় না।

ঈসম, জালালি চরিত্রের মতো উপন্যাসটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র বড় কর্তা ওরফে মণীন্দ্রনাথ। উত্তর চল্লিশের মানুষ তিনি। ঋজু শরীর তাঁর। এই মেধাবী মানুষটিকে একদিন দরগার হাসান পীর বলেছিলেন, ‘পীর-পয়গম্বর হইতে হইলে তর মতো চক্ষু লাগে। তর মতো চক্ষু না থাকলে পাগল হওন যায় না, পাগল করন যায় না।’ সেই মণীন্দ্রনাথ সত্যিই পাগল হয়ে যান। মানসিকভাবে অসুস্থ মণীন্দ্রনাথ প্রায়ই উচ্চারণ করেন, ‘গ্যােচারেত্শালা’। এই একটি শব্দের মাধ্যমে যেন মনের সব কথা বলে দেন মণীন্দ্রনাথ। ‘গ্যােচারেত্শালা’ ধ্বনিটি পাঠকের মনের মধ্যে গেঁথে যায়। যেন গোটা উপন্যাসটিই নিয়ন্ত্রণ করে এই ‘গ্যােচারেত্শালা’।

উপন্যাসটি সম্পর্কে বিশিষ্ট কথাশিল্পী সৈয়দ মুস্তাফা সিরাজ যথার্থই বলেছিলেন, ‘দুই বাংলার সাহিত্যিক ঐতিহ্যের ঐক্যে বিশ্বাসী বলে আমার জানাতে দ্বিধা নেই যে অতীনের এই রচনা এ যাবত্কালের নজিরের বাইরে। ভাবতে গর্ব অনুভব করছি যে আমার সমকালে এক তাজা তেজস্বী খাঁটি লেখকের আবির্ভাব ঘটেছে। আজ হয়তো তিনি নিঃসঙ্গ যাত্রী। কিন্তু বিশ্বাস করি, একদা আমাদের বংশধররা তাঁর নিঃসঙ্গ যন্ত্রণা অনুভব করে পিতৃপুরুষদের উদ্দেশে তিরস্কার বর্ষণ করবে। পথের পাঁচালীর পর এই হচ্ছে দ্বিতীয় উপন্যাস, যা বাংলা সাহিত্যের মূল সুরকে অনুসরণ করেছে।’

উপন্যাসটি প্রকাশের কিছুকাল পরেই ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট বারোটি মূল ভারতীয় ভাষায় বইটির অনুবাদ প্রকাশ করে। পরবর্তীকালে ভারতের স্বাধীনতার পঞ্চাশ বর্ষ পূর্তি উপলক্ষে উপন্যাসটির সচিত্র সংক্ষিপ্ত সংস্করণেরও আয়োজন করা হয়। সারা ভারতে গুটিকয় ক্লাসিকের সঙ্গে বাংলা ভাষায় এটিই একমাত্র সৃষ্টিশীল লেখা, যা সর্বভারতীয় সাহিত্যে অনুবাদের মাধ্যমে সুলভ সংস্করণের জন্য নির্বাচিত হয়।

এই উপন্যাসটি ছাড়াও তিনি লিখেছেন মানুষের ঘরবাড়ি, অলৌকিক জলযান, ঈশ্বরের বাগান। এই তিনটি আসলে নীল কণ্ঠ পাখির খোঁজেরই তিন খণ্ড। একই বেদনার আখ্যান তিনি লিখেছেন পরবর্তী তিন খণ্ডে। এ ছাড়া তার উল্লেখযোগ্য সৃষ্টির মধ্যে রয়েছে আবাদ, ঝিনুকের নৌকা, দুই ভারতবর্ষ, নগ্ন ঈশ্বর, একটি জলের রেখা, শেষ দৃশ্য, দেবী মহিমা, মানুষের হাহাকার, টুকুনের অসুখ, জীবন মহিমা, ঋতুসংহার, ফোটা পদ্মের গভীরে প্রভৃতি। বুকে বয়ে বেড়ানো দেশভাগের যন্ত্রণা ছত্রে ছত্রে ছড়িয়ে দিয়েছেন তিনি তাঁর সাহিত্যজীবনজুড়ে। সেই যন্ত্রণা স্বজন হারানো, দেশ হারানো লাখো মানুষের সর্বজনীন যন্ত্রণা হয়ে ধরা দিয়েছে তাঁর লেখায়। লেখনীর স্বীকৃতি হিসেবে তিনি ভূষিত হয়েছেন নানা পুরস্কারে। পেয়েছেন সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার, মানিক স্মৃতি পুরস্কার, বঙ্কিম পুরস্কার, বিভূতিভূষণ স্মৃতি পুরস্কারসহ নানা সম্মাননা। বাংলা সাহিত্য যত দিন থাকবে, তত দিন উচ্চারিত হবে তাঁর নাম।

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে