Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-২২-২০১৯

একটি পারিবারিক নৈশভোজ

কাজুও ইশিগুরো


একটি পারিবারিক নৈশভোজ

ফুগু মাছ জাপানের প্রশান্ত মহাসাগরীয় উপকূলে ধরা পড়ে। এই মাছ খাওয়ার পর আমার মায়ের মৃত্যু হওয়ার পর থেকে আমার কাছে মাছটি বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। বিষটা থাকে মাছের যৌনগ্রন্থির দুটো নরম থলেতে। মাছ কাটার সময় খুব সতর্কভাবে থলেগুলো সরিয়ে নিতে হয়, যে-কোনো খামখেয়ালিতে বিষ চুইয়ে শিরায় ঢুকে যেতে পারে। থলে সরানোর কাজ সাফল্যের সঙ্গে করা হয়েছে কি না, পরিতাপের বিষয়, এটা বলা সহজ নয়। প্রমাণ মেলে খাবার সময়।

ফুগুর বিষক্রিয়া ভীষণ যন্ত্রণাদায়ক এবং প্রায় সবক্ষেত্রেই মৃত্যুর কারণ। যদি সন্ধ্যার দিকে মাছটা খাওয়া হয়, তাহলে ঘুমের মধ্যেই বিষক্রিয়া শুরু হয়ে যাবে এবং আর যন্ত্রণায় গড়াগড়ি খেতে খেতে সকালে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়বে। যুদ্ধের পর এই মাছ জাপানে খুব জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। কঠোর বিধি আরোপের আগেকার চল – নাড়িভুঁড়ি সাফ করার কাজটা রান্নাঘরে সারা। তারপর প্রতিবেশী ও বন্ধুদের ভোজে দাওয়াত করা।

আমার মা যখন মারা যান আমি তখন ক্যালিফোর্নিয়ায় থাকি। সে-সময়টায় বাবা-মায়ের সঙ্গে আমার সম্পর্কে একটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। সে-কারণেই দুবছর পর টোকিও না-ফেরা পর্যন্ত মা কোন পরিস্থিতিতে মারা গেছে, তা আমার জানা হয়নি। বাহ্যত আমার মা সবসময়ই ফুগু প্রত্যাখ্যান করতেন, কিন্তু সেই বিশেষ অনুষ্ঠানে স্কুলজীবনের বন্ধুর আমন্ত্রণে এসে তার মনে কষ্ট দেবে না এই ভেবে এই ব্যত্যয়টা ঘটালেন। এয়ারপোর্ট থেকে কামাকুরা জেলায় আমাদের বাড়ি আসার পথে বাবা আমাকে এসব বিস্তারিত জানিয়েছেন। আমরা যখন বাড়ি পৌঁছি শরতের রোদেলা দিন প্রায় শেষ হয়ে আসে।

আমরা বাবার চায়ের ঘরে খড়ের পাটিপাতা মেঝেতে বসেছি। বাবা জিজ্ঞেস করল, ‘পেস্ননে খেয়েছ?’

‘হালকা নাশতা দিয়েছিল।’

‘তা হলে তো অবশ্য ক্ষুধার্ত। কিকুকো এলেই আমাদের খাবার দেবে।’

চওড়া পাথুরে চোয়াল আর উগ্র কালো চোখের ভুরু – আমার বাবা ভয়ংকর-দর্শন একজন মানুষ। অতীতের দিকে ফিরে তাকালে আমি বেশ বুঝতে পারি, বাবা দেখতে অনেকটাই চৌ-এন-লাইর মতো। বাবা যেখানে পরিবারে বহমান বিশুদ্ধ সামুরাই রক্ত নিয়ে গর্বিত, সেখানে এই তুলনা তার পছন্দ না হওয়ারই কথা। কেবল তার উপস্থিতিই অন্য কাউকে স্বাভাবিক কথাবার্তায় উৎসাহিত করে না, অধিকন্তু প্রতিটি কথার পর নিজের মন্তব্য এমনভাবে বসিয়ে দেবেন যেন এটাই চূড়ান্ত কথা। আসলে সেই সন্ধ্যায় বাবার উলটোদিকে বসার পর শৈশবের একটা স্মৃতি ফিরে আসে – ‘বুড়া বেটির মতো বকর বকর’ করার অপরাধে বহুবার আমার মাথায় আঘাত করেছেন। অনিবার্যভাবেই এয়ারপোর্ট থেকে এখানে পৌঁছার পর বেশ লম্বা বিরতি দিয়ে বাবার সঙ্গে আমার কথা হচ্ছে।

আমরা দুজনই যখন কিছুক্ষণ চুপচাপ, বিরতি দিয়ে আমি বলি, ‘আমাদের ফার্মটার কথা শুনে আমি দুঃখিত।’ গম্ভীর হয়ে তিনি মাথা নাড়েন। তিনি বলেন, ‘আসলে কাহিনির শেষ তো সেখানেই নয়। ফার্মটা ধসে পড়ার পর ওয়াতানাবে নিজের জীবনটা নিয়ে নিলেন। বদনাম নিয়ে তিনি আর বাঁচতে চাননি।’

‘তাই।’

‘আমরা সতেরো বছরের পার্টনার। নীতি আর সম্মানের মানুষ ওয়াতানাবে। আমি তাকে খুব শ্রদ্ধা করতাম।’

আমি জিজ্ঞেস করি, ‘আপনি কি ব্যবসাটা আবার শুরু করবেন?’

‘আমি তো এখন রিটায়ারমেন্টে – নতুন কোনো উদ্যোগে নিজেকে জড়ানোর মতো বয়স আমার নেই। ব্যবসা এখন অন্যরকম হয়ে গেছে। বিদেশিদের নিয়ে কারবার। তাদের মতো করে কাজ করতে হয়। আমি বুঝি না, কেমন করে এ-অবস্থায় এসে ঠেকেছি। ওয়াতানাবেও না।’ একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বাবা আবার বললেন, ‘খুব চমৎকার মানুষ। নীতিমানা মানুষ।’

টি-রুম থেকে বাগান দেখা যায়। এখানে বসে আমি ধরতে পেরেছি সেই প্রাচীন কুয়োটা কোন জায়গায় ছিল। এটাকে আমি ভুতুড়ে মনে করতাম। ঘন ডালপালার মাঝখান দিয়ে এখন দেখা যাচ্ছে। সূর্য অনেকটা নিচে নেমে গেছে, বাগানের বেশ খানিকটায় ছায়া পড়েছে।

বাবা বললেন, ‘যেভাবেই হোক তুমি যে ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছ আমি তাতে সন্তুষ্ট; এটা নিশ্চয়ই সংক্ষিপ্ত সফরের চেয়ে বেশি কিছু – আমি তাই আশা করব।’

‘আমি কী পরিকল্পনা করব এখনো নিশ্চিত নই।’

‘বেশ আমি অতীতের কথা ভুলে যেতে তৈরি আছি। তোমার ব্যবহারে খুব মর্মাহত হলেও তোমাকে স্বাগত জানাতে তোমার মা সবসময়ই তৈরি ছিল।’

‘আমি আপনার সহানুভূতিকে গুরুত্ব দিচ্ছি। তবে আমি যা বলেছি – আমার পরিকল্পনা সম্পর্কে আমি এখনো নিশ্চিত নই।’

আমার বাবা বলতে থাকলেন, ‘আমি এখন বিশ্বাস করছি যে, তোমার মনে কোনো শয়তানির উদ্দেশ্য ছিল না – তুমি হয়তো কোনো প্রভাবের আছরে ছিলে। অনেকেরই এমন হয়।’

‘আপনি যেমন বলেছেন, এসব আমাদের ভুলে যাওয়াই ভালো।’

‘তুমি যেভাবে চাও। আরেকটু চা নেবে?’

ঠিক তখনই একটি নারীকণ্ঠ বাড়ির ভেতর প্রতিধ্বনিত হলো।

বাবা তার দুপায়ের পাতার ওপর ভর করে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘শেষ পর্যন্ত কিকুকো এসেছে।’

আমাদের মধ্যে বেশ ক-বছরের ব্যবধানের পরও আমার বোন ও আমি বেশ ঘনিষ্ঠ ছিলাম। আমাকে আবার দেখতে পাওয়া তাকে অতিরিক্ত রকম উত্তেজিত করে তুললেও কিছুটা সময় সে বিচলিত হয়ে খিলখিল করে হাসল। কিন্তু বাবা যখন তাকে ওসাকা এবং তার ইউনিভার্সিটি নিয়ে জিজ্ঞেস করতে শুরু করল, সে অনেকটা শান্ত হয়ে এলো। ছোট ও আনুষ্ঠানিক বাক্যে সে বাবার প্রশ্নের জবাব দিয়ে চলল। কিন্তু তার বদলে আমাকে কিছু প্রশ্ন করতে শুরু করল।  মনে হলো সে আশঙ্কিত অবস্থায় আছে তার কোনো প্রশ্ন না আবার অনভিপ্রেত বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যেই আমাদের কথোপকথন কমে এলো এমনকি কিকুকো আসার আগে যেমন চলছিল তার চেয়েও কম। আমার বাবা উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, ‘আমাকে তো অবশ্যই রাতের খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে। এসব ব্যাপারের বোঝা নিয়েছিলাম বলে কিছু মনে করো না। কিকুকো তোমার দেখভাল করবে।’

বাবা রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বোনের স্বসিত্ম ও আয়েশ ফিরে এলো। কয়েক মিনিটের মধ্যেই সে তার ওসাকা বন্ধুদের আর সেখানকার ইউনিভার্সিটির ক্লাস নিয়ে গল্প করতে শুরু করল।

তারপর সে হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল আমরা বাগানে গিয়ে গল্প করব, তারপর বারান্দার দিকে চলে গেল। বারান্দার রেলে রাখা শোলার স্যান্ডেল পরে আমরা বাইরে বাগানে পা রাখলাম। দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে। সিগারেট ধরাতে ধরাতে কিকুকো বলল, ‘এক শলা সিগারেটে টান দেওয়ার জন্য আমি আধঘণ্টা ধরে মরিয়া হয়ে উঠছিলাম।’

‘তাহলে সিগারেট খেলি না কেন?’

সে চোরাই চাহনিতে পেছনে বাড়ির দিকে তাকাল এবং শয়তানির দেঁতো হাসি দিলো।

‘ওহ্ আচ্ছা’, আমি বললাম।

‘অনুমান করো তো কী? এখন আমার একটা বয়ফ্রেন্ড আছে।’

‘ওহ্, তাই।’

‘কী করব তা-ই ভাবছি। এখনো মন স্থির করতে পারিনি।’

‘তা বেশ বোঝা যাচ্ছে।’

‘শোনো, সে আমেরিকা যাওয়ার পরিকল্পনা করছে। সে চাচ্ছে আমার পড়া শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার সঙ্গে বেরিয়ে পড়ি।’

‘ওহ্, তুই আমেরিকা যেতে চাচ্ছিস?’

‘যদি আমরা যাই, হিচ হাইক করতে যাব।’ কিকুকো তার বুড়ো আঙুল আমার মুখের সামনে দোলাল। ‘মানুষ অবশ্য বলে এটা বিপজ্জনক, তবে আমি ওসাকায় হিচ হাইক করেছি, কোনো সমস্যা হয়নি।’

‘তাই, তা হলে কোন বিষয়টা তোর কাছে অনিশ্চিত?’

লতাগুল্মের মাঝে সরুপথ আমরা অনুসরণ করছি। পথটি গিয়ে শেষ হয়েছে প্রাচীন কুয়োয়। আমরা যখন হাঁটছি কিকুকো অকারণে তার সিগারেটে নাটকীয় টান দিয়ে যাচ্ছে।

‘ওসাকায় এখন আমার অনেক বন্ধু, আমি ওখানেই পছন্দ করি। কিন্তু আমি সবাইকে ছেড়ে যেতে চাচ্ছি কি না, এখনো নিশ্চিত নই। আর আমি সুইচিকে পছন্দ করি। কিন্তু তার সঙ্গে এতটা সময় কাটাতে পারব কি না, তাও আমি নিশ্চিত নই। আমার কথা কি বুঝতে পেরেছ?’

‘সম্পূর্ণভাবে।’

আবার তার দেঁতো হাসি দিয়ে আমাকে পাশ কাটিয়ে পেছনে ফেলে আগে আগে হেঁটে কুয়োটার কাছে পৌঁছল। আমি সে-পর্যন্ত আসতেই জিজ্ঞেস করল, ‘তোমার কি মনে আছে আমরা কেমন বলতাম যে, কুয়োটা ভুতুড়ে?’

‘হ্যাঁ, মনে আছে।’

আমরা দুজনই কুয়োর ধারের ওপর দিয়ে দৃষ্টি ফেললাম। ‘মা সবসময়ই বলতেন সে-রাতে তুমি এখানে সবজির দোকানের বুড়িটাকে দেখেছিলে; তবে আমি কখনো মার কথা বিশ্বাস করিনি আর একা একা এখানে আসিওনি।’

‘মা সে-কথা আমাকেও বলতেন। মা আমাকে এমনও বলেছেন যে, বুড়ি নাকি নিজেই তার কাছে স্বীকার করেছে আসলে সে প্রেতাত্মা। আপাতদৃষ্টিতে কম হাঁটার জন্য আমাদের বাগানের ভেতর দিয়ে যেত। আমি ভাবতাম এতগুলো দেয়াল বেয়ে এগোতে তার কষ্ট হতো।’

কিকুকো খিলখিল করে হেসে ওঠে। তারপর কুয়োর পেছন দিয়ে সামনে বাগানের দিকে দৃষ্টি মেলে।

নতুন এক স্বরে কিকুকো বলল, ‘তুমি জানো, মা কখনো তোমাকে দোষ দেননি।’

আমি চুপ করে থাকি।

‘মা সবসময় বলতেন ভুলটা তা হলে কোথায় – ভুলটা তার ও বাবার, তারা তোমাকে ঠিকভাবে লালন করতে পারেননি। তিনি আমাকে বলেছেন, আমার বেলায় তারা কত সতর্ক ছিলেন। সে-কারণেই আমি এত ভালো।’

সে ওপরের দিকে তাকায়, দুষ্টুমির দেঁতো হাসিটা আবার তার মুখে ফিরে আসে।

‘বেচারি মা’ – সে বলে।

‘হ্যাঁ, বেচারি মা’ – আমিও বলি।

‘তুমি কি ক্যালিফোর্নিয়া ফিরে যাচ্ছ?’

‘জানি না, আমাকে দেখতে হবে।’

‘ওর কী হলো – মানে ভিকির?’

‘সব শেষ’ – আমি বললাম, ‘ক্যালিফোর্নিয়াতে আমার জন্য অবশিষ্ট কিছু নেই।’

‘তুমি কি মনে করো আমার সেখানে যাওয়া উচিত?’

‘কেন নয়? আমি ঠিক জানি না – তোর সম্ভবত ভালো লাগবে।’ আমি বাড়ির দিকে দৃষ্টি মেলি। আমাদের বোধহয় ভেতরে যাওয়া উচিত। রাতের খাবার তৈরিতে বাবার সাহায্যের দরকার হতে পারে।

আমার বোন আবার কুয়োর ভেতরের দিকে তাকায়। ‘আমি তো কোনো প্রেতাত্মা দেখতে পাচ্ছি না’ – তার স্বর কিছুটা প্রতিধ্বনিত হয়।

‘ফার্মটা ধসে যাওয়াতে বাবা কি খুব ভেঙে পড়েছে?’

‘জানি না। বাবার সঙ্গে তো কখনো কথা বলা যায় না।’ তারপর সে হঠাৎ সোজা হয়ে আমার দিকে তাকায়, জিজ্ঞেস করে, ‘বাবা কি তোমাকে বুড়ো ওয়াতানাবে সম্পর্কে কিছু বলেছেন? তিনি কী করেছেন?’

‘আমি শুনেছি তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’

‘তা বেশ, কিন্তু এটাই সব নয়। তিনি তার সঙ্গে গোটা পরিবারকে নিয়ে গেছেন। তার স্ত্রী এবং দুটো ছোট্ট মেয়ে।’

‘ওহ্ তাই?’

‘সেই সুন্দর দুটি ছোট্ট মেয়ে। সবাই যখন ঘুমিয়ে তিনি গ্যাস খুলে দেন আর মাংস কাটার ছুরি দিয়ে নিজের পেট চিরে ফেলেন।’

‘বাবা বলছিলেন ওয়াতানাবে ছিলেন নীতির মানুষ।’

‘ধ্যাৎ’, আমার বোন আবার কুয়োর দিকে ফিরল।

‘সাবধান। ঠিক ভেতরে পড়ে যাবি।’

সে বলল, ‘আমি তো কোনো প্রেতাত্মা দেখছি না। তুমি সবসময় আমাকে মিথ্যা বলেছ।’

‘আমি কখনো বলিনি যে, এটা কুয়োর ভেতর থাকে।’

‘তাহলে কোথায়?’

আমরা দুজন গাছ ও লতাপাতার দিকে তাকাই। বাগানের আলো নিবু নিবু হয়ে আসছে। শেষ পর্যন্ত দশ গজ দূরে একটা জায়গার দিকে অঙ্গুলি নির্দেশ করি।

‘ঠিক ওখানে আমি দেখেছি, ওখানেই।’

আমরা জায়গাটার দিকে তাকাই।

‘এটা দেখতে কেমন ছিল?’

‘আমি খুব ভালো করে দেখতে পাইনি, অন্ধকার ছিল।’

‘কিন্তু তুমি নিশ্চয়ই একটা কিছু দেখেছ।’

‘একটা বুড়ি। ঠিক ওখানে দাঁড়িয়ে আমাকে দেখছিল।’

যেন আমরা সম্মোহিত হয়ে পড়েছি, এভাবে আমরা ওই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে থাকি।

আমি বললাম, ‘তার পরনে ছিল সাদা কিমোনো। তার কিছু চুল অপরিপাটি ছিল, বাতাসে একটু করে উড়ছিল।’

কিকুকো কনুই দিয়ে আমার হাতে গুঁতো দেয়। ‘চুপ করে থাকো। তুমি আমাকে আবার ভয় দেখাতে চেষ্টা করছ।’

সিগারেটের অবশিষ্ট অংশটুকু পায়ে মাড়িয়ে ব্যাপারটা নিয়ে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর পা দিয়ে পাইনের সুচালো পাতা সিগারেটের ওপর ছুড়ে দিলো, আবারো দেঁতো হাসি দিয়ে বলল, ‘দেখি রাতের খাবার তৈরি হয়েছে কি না?’

আমরা বাবাকে রান্নাঘরে পেলাম। আমাদের দিকে একঝলক ক্ষক্ষপ্র দৃষ্টি দিয়ে বাবা যে-কাজ করছিলেন তাতেই মনোনিবেশ করলেন। মুখে হাসি নিয়ে কিকুকো বলল, ‘বাবা কিন্তু বেশ শেফ হয়ে উঠেছেন, নিজের খাবারটা তাকেই তৈরি করতে হয় কি না।’ বাবা ঘুরে দাঁড়িয়ে শীতল দৃষ্টিতে কিকুকোর দিকে তাকিয়ে রইলেন।

‘আমার গর্ব করার মতো দক্ষতা কিন্তু হয়নি।’ বাবা বলল, ‘কিকুকো এখানে এসে আমাকে সাহায্য করো।’

কয়েক মুহূর্ত আমার বোন নিথর দাঁড়িয়ে রইল, তারপর এগিয়ে গিয়ে ড্রয়ারে ঝোলানো একটি অ্যাপ্রোন বের করল।

বাবা তাকে বললেন, ‘এখন শুধু এই সবজিটাই রান্নার বাকি, অন্যগুলোর দিকে একটু চোখ রাখলেই হবে।’ তারপর বাবা ওপরের দিকে তাকিয়ে আবার আমার দিকে অদ্ভুতভাবে দৃষ্টিক্ষেপণ করে নিরীক্ষণ করলেন। বললেন, ‘আমি ভাবছি তুমি নিশ্চয়ই বাড়িটা ঘুরে দেখতে চাইবে।’ হাতে থাকা চপস্টিকগুলো রেখে বললেন, ‘তুমি এ-বাড়ি দেখার পর কতদিন পেরিয়ে গেছে।’

আমরা রান্নাঘর থেকে বেরোনোর সময় আমি কিকুকোর দিকে তাকাই, কিন্তু সে তো উলটোমুখী হয়ে আছে।

শান্তস্বরে বাবা বললেন, ‘ও খুব ভালো মেয়ে।’

আমি বাবাকে এক রুম থেকে অন্য রুমে অনুসরণ করছি, বাড়িটা কত বড় ছিল আমি ভুলে গেছি। একটা প্যানেল টানতেই দরজা খুলে যায় এবং অন্য একটা রুম দেখা দেয়। কিন্তু রুমগুলোতে চমকে দেওয়ার মতো শূন্যতা। একটি রুমে আলো জ্বলেনি। জানালা দিয়ে রুমে আসা মলিন আলোতে আমাদের চোখ পড়ে নগ্ন দেয়াল এবং খড় দিয়ে বোনা মাদুরের ওপর।

বাবা বললেন, ‘একজন মানুষের বসবাস করার জন্য বাড়িটা বড্ড বেশি বড়। অধিকাংশ রুমেরই তেমন কোনো ব্যবহার নেই।’

শেষ পর্যন্ত বাবা যে-রুমটির দরজা খুললেন, তা বই আর কাগজপত্রে ঠাসা। ফুলদানিতে ফুল ছিল এবং দেয়ালে ছবিও। এক কোনায় রাখা নিচু টেবিলের ওপর একটা কিছু আমার চোখে পড়ল। আমি কাছে এসে দেখলাম এটা যুদ্ধজাহাজের পস্নাস্টিক মডেল, বাচ্চাদের জন্য তৈরি করা। খবরের কাগজের ওপর এটা রাখা। এর চারদিকে ছড়ানো বিভিন্ন ধরনের পস্নাস্টিকের টুকরো।

বাবা হেসে উঠলেন। টেবিলের কাছে এসে মডেলটা হাতে তুলে নিলেন।

বাবা বললেন, ‘ফার্মটা ধসে পড়ার পর আমার হাতে একটু বেশিই সময়।’ অদ্ভুতভাবে আবার হাসলেন, কয়েক মুহূর্তের জন্য বাবাকে ভদ্র মনে হলো। ‘হাতে সময় একটু বেশিই।’

আমি বললাম, ‘এটাই তো কেমন ব্যাপার, তুমি সবসময় ব্যস্ত থাকতে।’

ছোট্ট হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সম্ভবত খুব বেশি ব্যস্ত থাকতাম। সম্ভবত আমার আর একটু মনোযোগী হওয়া উচিত ছিল বাবা।’

আমি হেসে উঠলাম। বাবা তার যুদ্ধজাহাজ নিয়ে ভাবতে শুরু করল। তিনি ওপরের দিকে তাকালেন, বললেন, ‘এটা তোমাকে বলব বলে ঠিক করে রেখেছি এমন নয়। তবে সম্ভবত এটা বলাই আমার জন্য সর্বোত্তম হবে। এটা আমার বিশ্বাস, তোমার মা কোনো দুর্ঘটনায় মারা যায়নি। অনেক বিষয়ে তার উদ্বেগ ছিল, কিছু হতাশাও ছিল।’

আমরা দুজনই পস্নাস্টিকের যুদ্ধজাহাজের দিকে তাকাই। আমিও শেষ পর্যন্ত বললাম, ‘অবশ্যই, আমি চিরদিনের জন্য এখান থেকে চলে যাব, এটা মা কখনো ভাবেননি।’

‘অবশ্যই, কিন্তু তুমি সেটা বুঝবে না। এটা যে কোনো কোনো মা-বাবার জন্য কেমন ব্যাপার, তুমি তা বুঝবে না। তারা কেবল সমত্মানই হারায় না – তাদের অবোধ্য কোনো কিছুর কাছে হারায়।’ বাবা আঙুল দিয়ে যুদ্ধজাহাজটাকে ঘোরায়। ‘এই গানবোটগুলোতে ভালো করে আঠা লাগানো উচিত, তুমি কি তাই মনে করো না?’

‘সম্ভবত। তবে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে।’

‘যুদ্ধের সময় আমি এরকম একটা জাহাজে কিছু সময় কাটিয়েছি। কিন্তু আমার ইচ্ছা ছিল বিমান বাহিনীতে যোগ দেওয়া। আমি ব্যাপারটাকে এভাবে হিসাব করেছি। যদি শত্রম্নরা জাহাজটাকে আক্রমণ করে তা হলে বড়জোর যা করতে পার – জীবন বাঁচানোর মতো কিছু একটা পাওয়ার আশায় পানিতে সংগ্রাম করা। কিন্তু উড়োজাহাজ? সেখানে সবসময়ই চূড়ান্ত অস্ত্র।’ মডেলটা টেবিলে আগের জায়গায় রেখে বাবা বললেন, ‘আমি মনে করি না যুদ্ধে তোমাদের আস্থা আছে।’

‘সেরকম বিশেষ কিছু নেই।’

তিনি রুমের চারদিকে চোখ ঘোরালেন। বললেন, ‘এতক্ষণে খাবার হয়ে যাওয়ার কথা, তুমি নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধার্ত।’

 

রান্নাঘরের পাশের রুমে ঝাপসা আলোয় আমাদের রাতের খাবার অপেক্ষমাণ। আলোর একমাত্র উৎস ছিল টেবিলের ওপর ঝুলিয়ে রাখা বড় লণ্ঠন, যা রুমটাকে তার ছায়ায় ডুবিয়ে রেখেছে। খাবার শুরু করার আগে আমরা একে অপরের সামনে মাথা আনত করলাম।

কথোপকথন সামান্যই। আমি যখন খাবার নিয়ে জনোচিত কয়েকটা মন্তব্য করি, কিকুকো একটু করে খিলখিল হেসে ওঠে। তার আগের বিচলিত অবস্থা আবার ফিরে এসেছে। বেশ ক-মিনিট বাবা কোনো কথা বলেননি। শেষে বললেন, ‘জাপানে ফিরে আসাটা তোমার জন্য কেমন অদ্ভুত ব্যাপার মনে হতে পারে।’

‘হ্যাঁ, কিছুটা অদ্ভুত তো বটেই।’

‘সম্ভবত আমেরিকা ছেড়ে আসার জন্য অনুতাপ করতে শুরু করেছ।’

‘সামান্য। তেমন বেশি নয়। আমি তেমন কিছু রেখে আসিনি, কেবল কয়েকটা শূন্য রুম।’

‘তাই?’

আমি টেবিলের ওপর দিয়ে তাকাই। বাবার মুখটা আধো আলোয় পাথুরে এবং ভীতিপ্রদ মনে হচ্ছে। আমরা নৈঃশব্দ্যের মধ্যে খেতে থাকি।

রুমের পেছন দিকে কিছু একটার ওপর আমার দৃষ্টি আটকা পড়ে যায়। প্রথমে আমি খাওয়া চালিয়ে যেতে থাকি, তারপর আমার হাত দুটি নিথর হয়ে আসতে থাকে। ব্যাপারটা অন্যদের চোখে পড়ে, তাদের দৃষ্টি আমার ওপর। আমি আমার বাবার কাঁধের ওপর দিয়ে পেছনের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকি। জিজ্ঞেস করি, ‘ওখানে কে? ওই ছবিতে কে?’

আমার দৃষ্টি অনুসরণ করতে চেষ্টা করে বাবাও খানিকটা ঘুরে জিজ্ঞেস করে, ‘কোন ছবি?’

‘সবচেয়ে নিচেরটা। সাদা কিমোনো পরা বুড়ি।’

বাবা টেবিলে তার হাতের চপস্টিক রেখে একবার ছবির দিকে তাকিয়ে আমার দিকে চোখ ফেরান।

‘তোমার মা’, তার স্বর কঠিন হয়ে আসে, ‘তুমি কি তোমার নিজের মাকে চিনতে পারছ না?’

‘আমার মা। অনেক অন্ধকার, আমি ভালো দেখতে পাচ্ছি না।’

কয়েক সেকেন্ড ধরে কারো মুখে কোনো কথা নেই, তারপর কিকুকো পায়ের ওপর ভর করে দেয়াল থেকে ছবিটা নামিয়ে আনে, টেবিলে ফিরে এসে ছবিটা আমার হাতে তুলে দেয়।

আমি বলি, ‘মাকে অনেক বুড়ো দেখাচ্ছে।’

বাবা বললেন, ‘মৃত্যুর অল্পদিন আগে ছবিটা তোলা।’

‘অন্ধকার ছিল তো, আমি ভালো করে দেখতে পাইনি।’

আমি চোখ তুলে দেখি বাবা হাত বাড়িয়ে আছেন, আমি তার হাতে ফটোগ্রাফটা তুলে দিই। কিছুক্ষণ ছবির দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে থেকে কিকুকোর দিকে এগিয়ে দিলেন। খুবই আনুগত্যের সঙ্গে আমার বোন উঠে গিয়ে ছবিটা দেয়ালে আবার টানিয়ে ফিরে এলো।

টেবিলের মাঝখানে একটি বড় পাত্রের ঢাকনি তখনো খোলা হয়নি। কিকুকো নিজের সিটে বসার পর বাবা এগিয়ে এসে পাত্রের ঢাকনা তুলে নিলেন। ভেতর থেকে বাষ্পের মেঘ উঠে এলো এবং পেঁচিয়ে পেঁচিয়ে লণ্ঠনের দিকে চলে গেল। বাবা পাত্রটা আমার দিকে কিছুটা ঠেলে দিলেন।

‘তুমি নিশ্চয়ই খুব ক্ষুধার্ত – ’ বাবা যখন বললেন তখন তার মুখম-লের একপাশে ছায়া পড়েছে।

‘ধন্যবাদ’ বলে আমি চপস্টিক হাতে সামনের দিকে ঝুঁকি। বাষ্প প্রায় স্ফুটনাঙ্কে পৌঁছেছে। আমি জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কী?’

‘মাছ।’

‘গন্ধটা দারুণ।’

গরম স্যুপের ভেতর মাছের ফালি বাঁকা হতে হতে বলের মতো হয়ে গেছে। আমি একটা তুলে আমার বাটিতে রাখি।

বাবা বললেন, ‘নিজেরা নিয়ে নাও। অনেক আছে।’

‘ধন্যবাদ।’ আমি আর একটু নিয়ে পাত্রটা বাবার দিকে ঠেলে দিই। আমি দেখলাম বাবা বেশ ক-টুকরো নিজের বাটিতে নিলেন। আমরা দুজন তারপর কিকুকোর খাবার তুলে নেওয়া দেখলাম।

বাবা খানিকটা আনত হয়ে আবার বললেন, ‘তুমি নিশ্চয়ই ক্ষুধার্ত।’

তিনি নিজের মুখে মাছ ঢুকিয়ে খেতে শুরু করলেন। আমি তখন এক টুকরো বেছে নিয়ে নিজের মুখে দিলাম। জিহবা দিয়ে অনুভব করলাম, বেশ কোমল এবং মাংসল।

‘খুব ভালো।’ আমি জিজ্ঞেস করি, ‘এটা কী?’

‘কেবল মাছ।’

‘খুব সুস্বাদু।’

আমরা তিনজন নীরবে খেয়ে চলেছি। কয়েক মিনিট চলে গেল।

‘আর একটু দিই?’

‘যথেষ্ট আছে তো?’

‘আমাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত রয়েছে।’ আমার বাবা আবার ঢাকনা তুললেন, আর একবার বাষ্প ওপরে উঠে এলো। আমরা পাত্রের দিকে এগিয়ে যাই এবং খাবার তুলে নিই।

বাবা বললেন, ‘এই নাও, তোমার জন্য শেষ টুকরোটা’।

‘ধন্যবাদ।’

যখন আমাদের খাবার শেষ হয়, বাবা সামনের দিকে দুহাত বাড়িয়ে দিয়ে তৃপ্তির হাই তুললেন। তিনি বললেন, ‘কিকুকো, একপাত্র চা তৈরি করো।’

আমার বোন বাবার দিকে তাকায়, কোনো কথা না বলে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। বাবাও উঠে দাঁড়ান।

‘চলো অন্য রুমে যাই, এখানে বেশ গরম।’

আমি উঠে দাঁড়াই এবং তাকে অনুসরণ করে টি-রুমে যাই। জানালা একপাশে ঠেলে দিলে বাগানের ঝিরঝির বাতাস ভেতরে ঢোকে। কিছু সময় আমরা নিস্তব্ধতার মধ্যে পার করে দিই।

নিস্তব্ধতা ভেঙে আমি বলি, ‘বাবা।’

‘হ্যাঁ?’

‘কিকুকো বলেছে, ওয়াতানাবে সাহেব পরিবারের সকলকে সঙ্গে নিয়ে গেছে?’

বাবা তার চোখ নুইয়ে মাথা নাড়ে। কয়েক মুহূর্তের জন্য মনে হয় তিনি গভীর চিমত্মামগ্ন। তিনি মুখ খুললেন, ‘ওয়াতানাবে তার কাজে অত্যন্ত নিবেদিত ছিল। ফার্মের ধসটা ছিল তার জন্য বড় আঘাত। আমার আশঙ্কা এটাই, তার বিচার-বিবেচনা শক্তিকে খুব দুর্বল করে ফেলেছিল।’

‘আপনি কি মনে করেন তিনি যা করেছেন তা ভুল হয়েছে?’

‘কেন নয়, অবশ্যই। তুমি কি অন্য কিছু মনে করছ?’

‘না, অবশ্যই না।’

‘কাজ ছাড়াও আরো অনেক কিছু আছে?’

‘হ্যাঁ।’

আমরা আবার নীরব হয়ে গেলাম। বাগান থেকে পঙ্গপালের ঝিঁঝি ধ্বনি আসছে। আমি বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকাই। কুয়োটা আর দেখা যাচ্ছে না।

বাবা বললেন, ‘এখন কী করবে বলে ঠিক করেছ? জাপানে কিছু সময় থাকবে তো?’

‘সত্যি বলতে এতটা সময়ের ব্যাপার এখনো ভাবিনি।’

‘তুমি যদি এখানে থাকতে চাও, মানে এ-বাড়িতে, তুমি অবশ্যই স্বাগতম। অবশ্যই যদি বুড়ো মানুষের সঙ্গে থাকতে তুমি যদি কিছু মনে না করো।’

‘ধন্যবাদ বাবা, এ-নিয়ে আমাকে ভাবতে হবে।’

আমি আরো একবার অন্ধকারের দিকে দৃষ্টি ফেলি।

বাবা বললেন, ‘এটা অবশ্যই সত্যি, এ-বাড়িটা এখন বড় বিষণ্ণ। তুমি নিশ্চয়ই অল্প সময়ের মধ্যে আমেরিকা ফিরে যাবে।’

‘সম্ভবত, আমি এখনো তা জানি না।’

‘নিঃসন্দেহে তুমি তাই করবে।’

মনে হলো বাবা কিছুটা সময় তার হাতের উলটোদিকটা পরীক্ষা করলেন, তারপর ওপরের দিকে তাকালেন এবং দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।  বললেন, ‘আসছে বসন্তে কিকুকোর পড়া শেষ হবে। সম্ভবত সে তখন এখানে ফিরে আসবে। কিকুকো খুব ভালো মেয়ে।’

আমিও বলি, ‘সম্ভবত সে ফিরে আসবে।’

‘তখন সবকিছু ভালোর দিকে যাবে।’

‘হ্যাঁ, আমি নিশ্চিত, তাই হবে।’

আমরা আরো একবার নিস্তব্ধতায় পতিত হই, কিকুকোর চা নিয়ে আসার জন্য অপেক্ষা করতে থাকি।

অনুবাদ : আন্দালিব রাশদী

আর/১০:১৪/২২ জানুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে