Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ৩ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-২১-২০১৯

নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন দরকার

আবদুল গাফফার চৌধুরী


নির্বাচনোত্তর রাজনীতিতে গুণগত পরিবর্তন দরকার

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে শোচনীয় পরাজয়ের পর বিএনপি-নেতৃত্বের এক অংশের চোখ খুলেছে। তারা বুঝতে পারছেন এই পরাজয়ের দায় কেবল আওয়ামী সরকারের ওপর চাপালে চলবে না, নিজেদের ভুলত্রুটি এবং দলে সবল নেতৃত্বের অভাবের কথাও ভাবতে হবে।

বেগম খালেদা জিয়া জেলে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান আদালতের বিচারে দণ্ডপ্রাপ্ত অপরাধী। তার নেতৃত্বের কোনো ক্রেডিবিলিটি নেই। দেশে-বিদেশে তার নেতৃত্বের নেই গ্রহণযোগ্যতাও।

নির্বাচনে পরাজয়ের পর এখন ব্যারিস্টার মওদুদ, জাফরুউল্লাহর মতো বিএনপির শীর্ষনেতা ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা মুখ খুলেছেন এবং দলের পুনর্গঠন ও নেতৃত্বের পরিবর্তন আনার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিচ্ছেন। কেউ কেউ বলছেন, তারেক রহমানের নেতৃত্ব দলের জন্য এখন লায়াবিলিটি। নির্বাচনের সময় তিনি সামনে না এসে নেপথ্যে থাকলে ভালো করতেন।

বিএনপিকে আবার ঘুরে দাঁড়াতে হলে তারেক রহমানকে কয়েক বছরের জন্য নেতৃত্ব থেকে ছুটি নিতে হবে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির তিন সদস্য ঢাকার একটি দৈনিককে বলেছেন, ‘খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে যৌথ নেতৃত্বে দল একরকম ভালোই চলছিল। যেদিন তারেক রহমান স্কাইপে এসে নির্বাচনে মনোনয়ন প্রার্থীদের ইন্টারভিউ নেয়া শুরু করলেন, সেদিনই সব ভেস্তে গেল।’

প্রকাশ্যে অনেকে মুখ না খুললেও বিএনপির তৃণমূলেও এখন এই উপলব্ধি এসেছে যে, নির্বাচনে তাদের ভরাডুবির একটা প্রধান ফ্যাক্টর তারেক রহমানের নেতৃত্ব। বিএনপি-জামায়াত জোট নতুন ঐক্যফ্রন্ট গঠনের সময় কৌশল করে ডা. বদরুদ্দোজাকে ফ্রন্ট থেকে বাদ দেয় এবং ড. কামাল হোসেনকে নেতৃত্বে বরণ করে।

কিন্তু ড. কামাল হোসেনের সঙ্গেও বিএনপি কথা রক্ষা করেনি। এই গণফোরাম নেতার নিজের ভাষ্যমতে, জামায়াতের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা বর্জনের ব্যাপারে বিএনপি তাকে দেয়া প্রতিশ্র“তি রাখেনি। এটা আগে জানলে তিনি ঐক্যফ্রন্টে যোগ দিতেন না।

এই ব্যাপারেও তারেক রহমনের কূটকৌশলই দায়ী। তারেক জামায়াতের ঘনিষ্ঠ মিত্র। জানা যায়, তারই নির্দেশে জামায়াতকে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে নামতে দেয়া হয়েছিল। ঐক্যফ্রন্ট নির্বাচনে জয়ী হলে প্রধানমন্ত্রী কে হবেন এই প্রশ্নেও দেশবাসীকে অন্ধকারে রাখা হয়।

বিদেশিদের প্রশ্নের জবাবেও ড. কামাল হোসেনও এই ব্যাপারে কোনো কথা বলতে পারেননি। তিনি নিজেও নির্বাচনে দাঁড়াননি। এরপর কাণ্ডারিবিহীন এই জোটকে ভোটদানে দেশের মানুষ উৎসাহিত হবে কেন? ফ্রন্ট জয়ী হলে তারেক রহমান তলে তলে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার কৌশল আঁটছেন, এই ভয়ও ভোটদাতাদের মনে কাজ করেছে এবং বিদেশিদেরও বিএনপির প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিতে বাধ্য করেছে।

ভারতে যেমন ইন্দিরা গান্ধীর পুত্র সঞ্জয় গান্ধীর দৌরাত্ম্যে একবার সাধারণ নির্বাচনে অবিশ্বাস্যভাবে ইন্দিরা সরকারের পরাজয় ঘটেছিল। তারেকের দৌরাত্ম্য নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির অন্যতম মূল কারণ। তারেকের নির্দেশে জামায়াতের সঙ্গে গলাগলিও এই জোটের পরাজয় নিশ্চিত করেছে। বিএনপির বুদ্ধির দোষেই আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনেও কার্যত ওয়াকওভার পেয়েছে।

এখন এই পরাজয়ের জন্য উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে চাপানো হচ্ছে। লন্ডনের ইকোনমিস্ট পত্রিকা আওয়ামী লীগ সরকারের ঘোর সমালোচক। তারা পর্যন্ত লিখেছেন, ‘এবারের নির্বাচনে কোনো কারচুপি না হলেও শেখ হাসিনা জয়ী হতেন।’

অনেকের মতো আমারও ধারণা, পরাজয়ের জন্য ‘স্কেপগোট’ না খুঁজে নির্বাচিত ছয়জন সদস্য নিয়েই এখন বিএনপিকে সংসদে বিরোধী দল হিসেবে বসতে হবে। দলকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে সংসদের ভেতরে-বাইরে তাদের অবস্থান দরকার। নীতি ও নেতৃত্বের পরিবর্তন দ্বারা তারা আবার শক্তি সঞ্চয় করতে পারবেন। আগামী সাধারণ নির্বাচনে তারা সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবেন না, তা কে বলতে পারে?

আমি ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা নই, একজন সামান্য সাংবাদিক। কিন্তু আমার চোখেও এই সত্যটা প্রতিভাত যে, বিএনপি তার অস্তিত্ব সংকটের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। নেতৃত্ব ধার করে কোনো দল রাজনীতিতে টিকে থাকতে পারে না, যদি নিজেদের নীতি ও নেতৃত্ব সঠিক ও সবল না হয়।

রাজনীতিতে ড. কামাল হোসেনের নিজেরও কোনো তেমন ক্রেডিবিলিটি নেই। ঐক্যফ্রন্ট গঠনের পর তাকে করা হয়েছিল শিখণ্ডি নেতা। দেশে অনুপস্থিত তারেক রহমানকেই তার ঘাড়ে সিন্দাবাদের দৈত্যের মতো বসিয়ে রাখা হয়েছিল।

এবারের নির্বাচনে বিএনপির মাত্র ছয় আসন পাওয়া, যা বিএনপির জন্মকাল থেকে আজ পর্যন্ত ঘটেনি। দেশি-বিদেশি ধর্মান্ধ সন্ত্রাসবাদের ক্রমাগত পরাজয়ের মুখে বাংলাদেশে জামায়াতের আজ শক্তিশালী রাজনৈতিক অবস্থান নেই। তরুণ প্রজন্ম ভয়ানক জামায়াতবিরোধী। বিএনপি কেন এই অর্ধমৃত লাশ এখনও কাঁধে বহন করে নিজেদের সর্বনাশ করছে তা আমার জানা নেই।

বিএনপির নীতি ও নেতৃত্বের আমূল পরিবর্তন দরকার। তার বিলুপ্তি কামনা করি না। বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জেনারেল জিয়াউর রহমান নিজে মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। তার দলের তো মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধিতা করার এবং জামায়াতের মতো গণশত্রু দলের সঙ্গে হাত মেলানোর দরকার পড়ে না। তারা আওয়ামী লীগ সরকারের বিরোধিতায় নামুন।

কিন্তু মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধিতা নয়। তারা যদি আওয়ামী লীগের চাইতেও ভালোভাবে এই আদর্শের পতাকা তুলে ধরতে পারেন, জনকল্যাণের আরও ভালো কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারেন, তাহলে দেশটিতে দ্বিদলীয় গণতান্ত্রিক রাজনীতির সুস্থ বিকাশ ঘটতে খুব দেরি হবে না।

সাম্প্রতিক নির্বাচনের পর বিএনপি তার ফল প্রত্যাখ্যান করে নতুন নির্বাচন দাবি করে সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসতে চায়। সরকারবিরোধী আন্দোলন করার শক্তি তাদের নেই। সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির ক্ষমতাও তাদের নেই। তাহলে ইসির কাছে নালিশ জানিয়ে বা সরকারের সঙ্গে সংলাপে বসে লাভ হবে কি? নতুন নির্বাচন না দেয়ার ব্যাপারে ইসি এবং সরকার দু’পক্ষই দৃঢ় সংকল্পবদ্ধ। এই দাবি জনগণের কাছেও সাড়া পায়নি। সরকার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিও পেয়ে গেছে।

এখন সংবাদ সম্মেলনে জনগণের ভোটের অধিকার হরণ করা হয়েছে বলে কান্নাকাটি করে লাভ নেই। বিএনপিতে ‘ঘোস্ট লিডারশিপের’ অবসান ঘটুক। বেগম জিয়া জেল থেকে মুক্ত না হওয়া পর্যন্ত বাইরে থেকে নেতা হায়ার না করে নিজেদের মধ্য থেকে যৌথ নেতৃত্ব গড়ে তুলুন।

জামায়াতের ভূতকে ঘাড় থেকে নামিয়ে বিএনপি অসাম্প্রদায়িক রাজনীতির পথ ধরুক। দেশের রাজনীতিতে এবং বর্তমান সংসদেও একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল প্রয়োজন। বিএনপির নীতি ও নেতৃত্ব পরিবর্তিত ও সংশোধিত হলে দেশের এই প্রয়োজনীয়তা তারা পূরণ করতে পারবে, চাই কী আবার ক্ষমতায় যেতে পারবে।

দেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটানোর জন্য আওয়ামী লীগের উচিত বড় ধরনের পদক্ষেপ নেয়া। এ ব্যাপারে ক্ষমতাসীন দল হিসেবে তাদের দায়িত্বই বেশি। সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধ ব্যক্তি ও দলগুলোকে বাদ দিয়ে, নির্বাচনে বিজয়ী ও বিজিত দল নিয়ে আওয়ামী লীগের উচিত একটি গোলটেবিল বৈঠকের অনুষ্ঠান এবং বাংলাদেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক নীতি আরও সবল ও কার্যকর করার লক্ষ্যে ডান-বাম সব গণতান্ত্রিক দলের মধ্যে ঐকমত্য সৃষ্টি করা। সেই কাজই নেলসন ম্যান্ডেলা করেছিলেন তার দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা স্বাধীন হওয়ার পরপরই।

বাংলাদেশে শেখ হাসিনা এখন দলীয় নেতা নন, জাতীয় নেতৃত্বে তার উত্তরণ ঘটেছে। তার উচিত দলীয় রাজনীতির ঊর্ধ্বে উঠে দেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটানোর লক্ষ্যে সবার কাছে গ্রহণযোগ্য জাতীয় নীতি নির্ধারণ করা।

এমএ/ ০৮:২২/ ২১ জানুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে