Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ , ৪ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-২১-২০১৯

আমার আমি

সেলিম আল দীন


আমার আমি

বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব সেলিম আল দীন। নাটকের সীমাবদ্ধ পরিসরে তিনি একইসঙ্গে উপন্যাসের বিস্তৃতি, ছোটগল্পের অনিশ্চয়তা, কবিতার ছন্দ, ভাস্কর্যের দৃঢ়তা ও নাটকের দ্বন্দ্বময়তা যুক্ত করেছেন। ১৪ জানুয়ারি ছিল তাঁর ১১তম প্রয়াণ দিবস। সেলিম আল দীনের দিনলিপি 'আমার আমি' তাঁর অন্তর্গত ব্যক্তিত্বে বাঙময়। 'আমার আমি' থেকে কিছু অংশ পত্রস্থ হলো-

০৭-১১-২০০২

আজ সন্ধ্যায় কাজরী ও পলাশসহ হাঁটতে বেরিয়ে বাসার তিন মাথায় এপ্লাইড ফিজিক্সের এক তরুণ শিক্ষক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের- স্বপন, দেখা হলো।

কসমিক ওয়ার্ল্ড নিয়ে কথা হলো। আমাদের নবীকে নিয়ে কথা হলো। জগদীশচন্দ্র বসু, ম্যাথমেটিকস, কোয়ান্টাম ফিজিক্স- এসব ছিল আলোচনার মধ্যে।

ম্যাথমেটিকস একটা দার্শনিক জায়গায় একসময় মানুষকে পৌঁছে দিয়েছিল। এখন সেসব বিদ্যার অনুষঙ্গ। হয়তো পিওর ম্যাথমেটিকস আরও কিছুদিন থাকবে। একটা অনুমানকে সামনে রেখে অবিরল সামনে অসীম নিঃসীমের দিকে চলে যাওয়া। কিন্তু কোয়ান্টাম, কেমিস্ট্রি, দর্শন, অর্থনীতি সব বিষয় গণিতের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় পিওর ম্যাথমেটিকস ক্রমেই নির্জন চর্চায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। বিষয়টির অসহায়ত্ব ঘটেছে কলাবিদ্যা থেকে পৃথক হয়ে।

সে যাই হোক। হালকা কুয়াশার ভেতর আকাশ অগণন তারাভর্তি। সে ম্যাথমেটিকসের ধার ছুঁয়ে গিয়ে নিঃসীমে বিলীন। সমস্ত দৃশ্যমান আকাশজুড়ে অঙ্ক ফলিয়ে যার কূল পাওয়া যাবে না কোনোদিন।

তবে শূন্য এলো কোত্থেকে? এই বর্তুল পৃথিবীর আঙটি থেকে। শূন্য মানব কল্পনার এক বিস্ময়কর শক্তি। আদিকালে সে দেখেছে চন্দ্র-সূর্য, দিন-রাত্রির আকাশ। ভেবেছে, এর মধ্যে একটা শক্তি আছে। অর্থহীনতাও আছে। হয়তো শক্তি হিসেবে মানব সভ্যতায় শূন্য আসেনি। এসেছিল বিস্ময়, আকার ও জিজ্ঞাসা থেকে। আদি মানুষের গুহাচিত্রে হয়তো তার সাক্ষাৎ মিলতেও পারে।

মানুষের ভাবলোক যখন স্ম্ফীতকায় হলো, গোনাগুনতির পাশে সে এসে ঠাঁই করে নিল এক আকাশের অসীমতা নিয়ে। প্রাচীন বাংলায় তাই তো দেখি শূন্যতা এক দেবীর নাম, যে কি-না শক্তি- নিরাকার নারীরূপে কল্পিত। শূন্য অক্ষরে এসে শূন্যতার বিশেষণে তা ধর্মদর্শন হয়ে উঠল।

তারপর সেই আদিযুগে চন্দ্র-সূর্যের আবর্তন থেকে হাতচাকা এসেছিল- সেই চাকার আকারে গতির মূর্ছনা তাকে শূন্য রচনায় হয়তো অনুপ্রাণিতও করেছিল।

শূন্য একটা প্রতীক- এই বলে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার আগে যদি জানতাম মাটিতে, দেয়ালে, পাথরে কে প্রথম এই আশ্চর্য বৃত্ত এঁকেছিল। কেন। কোন অর্থে কে সে।

২৪-১১-২০০২

অনেক কাজে অসুখ তেড়ে উঠেছে। সতেরটি টেস্টের সময় অরুণদাকে ই-মেইল করেছি। ফলাফল পজিটিভ এবং তা অরুণদা বা বাচ্চুকে জানাতে কুণ্ঠাবোধ করছি। তাঁরা উদ্বিগ্ন হবেন। মাঝখান থেকে আমার অসুখের কিছু উপকার হবে না। আমি বেশ ঘাবড়ে গেছি। আবার ভেতরে প্রচণ্ড একটা শক্তিও টের পাচ্ছি। ভয় পেতে পেতে সাহসী হয়ে ওঠা যাকে বলি। প্রিয় নবী আমাকে সাহস জোগান; রবীন্দ্রনাথ, গ্যেটে, টলস্টয় তো আছেনই। দস্তয়ভস্কি রক্তবমি করে অন্তিমে চলে গেছেন। আমার মনে হয়, আমি স্বচক্ষে এসব মৃত্যু দেখেছি। তাঁদের শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে আছি।

আর একবার, এই তো তিন কি চার বছর আগে দেখি, জোড়াসাঁকোর বাড়ি কি শান্তিনিকেতনে, রবীন্দ্রনাথের মৃত্যুশয্যাপাশে এবং ভীষণ কাঁদছি।

আজ দুপুরে এমফিলের একটা পরীক্ষার ডিউটি ছিল। শরীরে কুলাচ্ছিল না। ফিরে এলাম আফসারের গাড়িতে। হেঁটে আসবার কথা। শরীরে কুলাচ্ছিল না।

এসে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবছিলাম, কোনো একটি ধ্রুব বিশ্বাস ছাড়া একজন লেখক বাঁচে না।

সব মহৎ লেখকের একটা করে নিজস্ব ধ্রুবতারা ছিল। সুধীন্দ্রনাথের মতো বলতে ইচ্ছে হলো, অগ্রজের অটল বিশ্বাস ফিরিয়ে দাও আমাকে।

পৃথিবী ও আকাশের এই বিস্তারিত দিন-রাত্রির ভেতর কোনো গ্রহের ফেরে আমি সেসব নক্ষত্র নিশ্চয়ই দেখতে পেলাম না। সেসব প্রাচীন কি গ্যয়েতীয় রবীন্দ্র বিশ্বাস। আমি তো শেষাবধি জীবনযাপনের ভেতর দিয়ে লেখার বিচিত্র তরঙ্গ সংকুুলতার মধ্য দিয়ে আলো আকাশ আনন্দের ধ্রুববিশ্বাসে পৌঁছতে পারলাম না।

ভাবি, ধ্রুব তবে কী! শকুন্তলায় লিখেছিলাম, 'ঘৃত চন্দনের আড়ালে হাড়ের অঙ্গার হাসে'। যে হয়তো ঈশ্বর থেকে ঈশ্বর-সন্ধিগ্ধতায় পৌঁছবার হাহাকার। তখন যৌবন ছিল। পীত পত্রালির মতো দিনগুলো বৃক্ষের সারিতে দাঁড়াত। ভাবতাম, একদিন সেই ধ্রুব পেয়ে যাব। পুষণের অধিক উজ্জ্বল কোনো এক বিশ্বকে, যেখানে মহামানবরা পৌঁছেছিলেন।

কিছুই হয়নি। আমার লেখায় কচিৎ সেই বিশ্বাসের আলো মেলে। হায়, এমনই অযোগ্য আমি!

৩-১২-২০০২

চাঁদপুর

ভোরের মুখ দেখা হলো না বটে, তবে টিটু আর 'ললনামায়' অভিনয় করে একজন, এই দুইজন এলো বেলা ১২টার দিকে।

বোরহানের বাসার ড্রইংরুমে অনেক আলাপ হলো। ধর্মতত্ত্ব নিয়ে। মহানবীর জীবনের ঐশ্বর্য, মহিমা এসব এবং তাঁর সুবিশাল উদারতা নিয়ে। তারপর ইয়াজিদের কনস্টান্টিনোপল বিজয়, ইমাম হাসান-হোসেন, চার খলিফা ইত্যাদি।

বেলা দেড়টার দিকে গাড়িতে উঠে বসি। আমার সঙ্গী কাজরী, সিফাত আর মেহেদী।

আসার পথের দৃশ্য বর্ণনা করা যায়।

সুপকস্ফ ধানের ক্ষেতগুলো ছুটতে ছুটতে দিগন্তে পৌঁছাচ্ছে। গাড়ি যখন চলে ট্রেন বাস কার- ত্রিস্তরে ছোটে- দূর মধ্য নিকট। অনেকটা ক্যামেরার ট্রলি হয়ে শেষমেশ হাওয়া। একটা আখড়ার মতো ঘর- বেড়াভাঙা জঙ্গলাকীর্ণ ভিটা শান্ত একান্ততায় ভাংচুরের ভেতর দাঁড়িয়ে। ইচ্ছা হলো একবেলা এই অপরিচিত স্থলে থেকে যাই।

শাহরাস্তি-হাজীগঞ্জ জায়গাগুলো অতিক্রমের সময় খুব অস্বস্তি বোধ করি। নগরের নির্জীব ধাঁচটা গাঁয়ের মধ্যে গঞ্জের প্রাক্তন আঙ্গিকে ঝাঁপ দিলে যে জগাখিচুড়ি হয় সে রকম। অবশ্য সে ক্ষেত্রে ফেনী-চাঁদপুরে ভেদ নেই। একটা লোককে দেখলাম অন্য একটা লোকের সঙ্গে রাস্তায় দাঁড়িয়ে। কাঁধে সোনা ছাঁকার জন্য বাঁশের তৈরি ত্রিকোণ জঁই বা ওচা। লোকটার মুখটি আড়াল ছিল বলে দেখা হলো না। কিন্তু চিনতে এতটুকু সময় লাগেনি। গাড়িটা যদিও তখন নব্বই কি একশ' কিলোমিটারে ছুটছিল। 

এরা গাঁয়ের বাড়ির পুকুরে গোসল করা মেয়েদের অলঙ্কার খসে গেলে তা কাদা ছেঁকে বের করে আনে। ওটাই জীবিকা। ভাবা যায়, কী রকম অবাক করা পেশা!

১৩-০৭-২০০৩

আজ ২৯ আষাঢ়, ১৪১০ এবং ১৩ জুলাই, ২০০৩। কাল রাতে খুব মজার একটা ঘটনা ঘটেছে। কিচেনে বাল্ক্বের নিচে অদ্ভুত একটা প্রজাপতি ধরলাম। টিকটিকির হাত থেকে বাঁচাবার মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে। যথাসম্ভব আলতো হাতে প্রজাপতিটি ধরে ফেললাম। আলোর নিচে ডানা দেখে চোখ গলে যায়। একেবারে হীরামতি প্রজাপতি। নীলচে কালোর মধ্যে স্বর্ণের দ্যুতি, আবার ছোটে ডানার ভেতর ময়ূর নীল। বোধ হয় মথ নয়। দিনের প্রজাপতি। ও হ্যাঁ, গায়ে বিচিত্র তিলফোঁটা।

পারুলকে দেখলাম, কাজের ছেলে এমরানকে তারপর কাজরীর ঘরে গিয়ে ওকে। জানালা দিয়ে সেটিকে ছেড়ে দিয়ে জানালা বন্ধ করে দেই, পাছে আলোর আকর্ষণে ও আবার ঘরে না ফিরে আসে। 

আজ ভোরে সেটি কি বেঁচে আছে তাই ভাবছি। কারণ ঘন বর্ষণ থামতেই খোলা আকাশের নিচে কাঁটা মেহেদীর ঝোপে একটি ওর চেয়ে ছোট মাপের প্রজাপতিকে মধু সঞ্চয়ে ডানার পতাকা উড়াতে দেখছি। 

পারুল চলে গেল টিচার্স ট্রেনিংয়ে। কাজরী ঘুম থেকে উঠল। রোদ উঠি উঠি করে। 

ঘোলাটে আকাশ আমার মন খারাপ করে দেয়। তবু ভাবি, প্রকৃতি যেমন, তেমন আকারেই আনন্দিত মনে তাকে গ্রহণের অভ্যাস রপ্ত করা উচিত, কিন্তু পুরোটা নয়। মনুষ্য প্রকৃতি যে। সে কোনো না কোনোভাবে তার ভালোলাগা-মন্দলাগার জায়গাটা তৈরি করে নেবেই। সেটা তার দুর্বলতা, সেটাই শক্তি। কিন্তু এই শক্তি প্রকৃতির বিনষ্টি ঘটালে পৃথিবীও হত্যাকারীর চোখে তাকায় মানুষের দিকে। হঠাৎ বন্যা, টাইফুনের সেই চোখ তো মানুষ আদিকাল থেকে দেখছে। কিন্তু এখন তার আচরণ যথার্থরূপে মানুষের অমিতশক্তির অপচয়ের বিরুদ্ধে হুঁশিয়ারি। 

না, এভাবে ঢাকায় যাওয়ার পথে এককালের গতিময় তুরাগের বিশাল হ্রদ মাটি ভরাট করে হাউজিং সোসাইটি বানাবার কোনো মানে হয় না। 

১৬-০৭-২০০৩

আষাঢ়ের পূর্ণিমা গেছে চার-পাঁচ দিন আগে। এখন যা লিখছি শুধু সেদিনের সন্ধ্যাবেলার স্মৃতি। স্মৃতির একটা অদ্ভুত ব্যাপার আছে, ভাঙাভুঙা আলো-অন্ধকার, ফিকে রঙ, তার আগ গলুই পাছ গলুই নেই। খুব স্পষ্ট নয়, তবু তা থেকে আনন্দ-হর্ষ-বেদনা-শোকের বিচ্ছুরণ। 


কিন্তু যেই লিখতে শুরু করলাম অমনি, চাঁদটা পুব-দক্ষিণে দিগন্ত রেখার ওপর লাফিয়ে উঠল, লেকের ওপারে মেয়েদের হল, কেমন একটা প্রাচীন দুর্গের আভাস, ফিকে আলোর ছায়া, কিছু শারদীয় মেঘের মুখে- এসব জমা হতে হতে একটা স্পষ্টতা তৈরি করে। ছবি কিন্তু ছবি নয়।

চিত্রের চেয়ে তা মহৎ এই জন্য যে, চিত্রে সবটা আসে না আমার মনের ভাব ফটোগ্রাফির সাধ্য নেই যে ধরে। 

এভাবে হোমারের পঙ্‌ক্তিমালা ইজিয়ান সাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে বয়ে চলেছে। শাহনামার রণক্ষেত্রে ঘোড়ার খুরে ছড়ানো ধূলি মেখে মেখে এভাবে রিলকীয় ভাবনার মৃদু ঝরনা বয়ে যায় প্রাচীন দুর্গের ধার বেয়ে। 

আহা, সেই পূর্ণিমা আজ আর নেই! সেই চকিত দেখা পথ চলতে চলতে সুকি কি বেঁচে আজও বনপাংশুল জ্যোৎস্নার নিচে। আর আমার সেই ময়ূরজানের কী খবর, যার সৌন্দর্যের খ্যাতিগুণে এক স্কুল মাস্টার, কি কিষাণ-যুবক বেরিয়ে পড়েছিল নৌকায়। সে লেখা কি এ জীবনে হবে না আর! হে আয়ুর অধিপতি, বর্ধিষ্ণু করো, বর্ধিষ্ণু করো আয়ু। শুধু সেসব লেখা লেখার জন্য, যা পৃথিবীর অগোচরে আমারই জন্য তুমি রেখে দিয়েছ। 

২১.০৭.২০০৩

গত রাতে আজানের খানিক আগে ঘুম ভেঙে যায় অফুরন্ত বৃষ্টিপাতের শব্দে। ঊষা থেকে শ্রাবণের মেঘচাপা আভা আর রাত্রির শেষাংশের অন্ধকার, এসব মিলিয়ে বুকের ভেতর ম্লান কদমগুলো রোমাঞ্চিত হয়ে ওঠে। সহস্র ফুলের গোলক সে কদম বুকে শুধু নয়, আমার বিছানার পাশেও ছিল। 

তবে সে কী রকম। বিকেল বেলা ছাত্রদের একটা ব্যবহারিক পরীক্ষা নিতে যাচ্ছি। কবি নামের এক ছাত্র আর আমি রিকশায়। ক'দিন থেকে বর্ষার কদম দেখিনি বলে খুব একটা ক্ষোভ জমা হচ্ছিল। আমি চাই ঠিক ওরা যেন গুচ্ছ গুচ্ছ আমার হাতে এসে পড়ে ঋতুর পতাকা হয়ে। কিছুতেই পাচ্ছিলাম না। এমনকি যখন কদম ফুল এ বছর কি আমাকে পরিত্যাগ করল- বলে হুতাশ করছি, তখন আমার কেনা জমির প্রান্তে লাগানো কদম গাছটিতে জমির পাহারাওয়ালাকে উঠিয়ে যে দুই-তিনটা ফুল তোলা হলো, তার আকার শীর্ণ। 

মন খারাপ হলো। গাছের দোষ নেই, সে বেশ অপরিণত। 

কিন্তু আজ রিকশায় যাওয়ার পথে, লাইব্রেরির দিক থেকে দৌড়ে এলো কিছু উদ্বাস্তু বালক। একজনার হাতে পনেরো-কুড়িটি কদম। সেগুলো কিনে নিয়ে চলে যাই পরীক্ষা নিতে। অডিটোরিয়ামে। 

একজন ভালো বাদক রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ছাত্র, তার হাতে দিয়ে পরীক্ষা নিতে বসে যাই। জীবনানন্দ দাশের বোধ কবিতাটির দৃশ্যরূপ। সোহাগ আর একটি মেয়ে মিলে করল- বেশ ভালো-ব্যালে এবং পোয়েটিক জেশ্চার মিলিয়ে কাজ। কিন্তু অসম্পূর্ণ। 

রাতে কদম ফুলের কয়েকটি বালিশের পাশে রেখে ঘুমাতে যাই। ক্ষণে ক্ষণে গন্ধ আসছিল। ভাবলাম, ওরই ভেতর দিয়ে স্বপ্নের পথটি ঘুমের দেশে চলে যাবে। কিন্তু সে যে মাতৃশাখাচ্যুত ফুল। ডালে যার বাসা তাকে মশারির ভেতর বিছানায় এনে যে গন্ধ পাই সে তো স্বতঃস্ম্ফূর্ত কদমের নয়। ঝরা বকুল হলে কথা ছিল।

ভোরে ঘুম ভেঙে দেখি, সহস্র ফুলের রোমে ঢাকা গোলকগুলো ম্লান। হায়, কী অদৃষ্ট! কবির হাতে ঈশ্বরের স্বাভাবিক সুগন্ধি ফুল লাঞ্ছিত হলো তারই আবেগদীপ্ত নাসারল্প্রেব্দর সুখদ আঘ্রাণের সাধে। 

তবু এই পথ দিয়ে এই বোধ নিয়ে ঘুমাক মানুষ। হত্যা নয়, ধর্মের অন্ধতা-মূঢ়তাকে নিয়ে কল্পস্বর্গের আশায় পৃথিবীতে তুচ্ছ জ্ঞান করা নয়- তারা যেন এ রকম শয্যায় ফুল রেখে ঘুমের মুদ্রায় নিঃসাড় ঘুমিয়ে ভোরের শ্রাবণে গভীর আবেগে জ্বলে ওঠে। 

বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেশ খানিকক্ষণ আধো ঘুম আধো তন্দ্রার চৌকাঠ দাঁড়িয়ে বৃষ্টির ছাঁট লাগিয়ে নিলাম শরীরে। তারপর আবার ঘুম। একেবারে সকাল আটটায় স্টেশনে পৌঁছবার ট্রেনে চেপে বসি। সে ট্রেন নিঃশব্দ, চাকাহীন ইঞ্জিনহীন-কিন্তু গন্তব্য অভ্রান্ত। সে যে প্রাত্যহিক কাজ। 

২৫-০৭-২০০৩

আজ ভোর ছ'টায় ঘুম ভাঙল। প্রচণ্ড গরমে এমনিতেই ঘুম আসছিল না। ওষুধের পর ওষুধ চাপিয়ে লাভ হয়নি। সাকল্যে চার ঘণ্টা কিংবা এক-আধ ঘণ্টা কম-বেশি। কাল দুপুর পর্যন্ত, বিকেল ও সন্ধ্যা- নির্মেঘ আকাশে ঊষর রৌদ্রে হয়তোবা দেবদূতদের হাতের সরোদ পর্যন্ত আধপোড়া হয়ে গিয়েছিল। তাই খোদা শেষ রাত্রে বৃষ্টি নামালেন। মুষলধারা সবুজ বিদ্যুতে। 

দু'জন খুব প্রিয়ভাজন ছাত্রের আচরণে শিক্ষক জীবনের প্রতি বেশ অসহিষ্ণু হয়ে উঠেছিলাম। এদের মধ্যে একজনকে হয়তো খুব বেশি দায়ী করব। কিন্তু সে যাক। অরুণদা অবশেষে ঢাকায় এলেন এবং চট্টগ্রাম চলে গেলেন। বছর ঘুরে দেখা হবে, হলো না। আটাশ তারিখ ফিরবেন। এখন বিকেল বেলা নিয়ে আসব। এদিকে আবার ২৯ জুলাই ঢাকা থিয়েটারের ত্রিশতম জন্মদিন। বাচ্চু বলেছে একটা শুভেচ্ছা কার্ডের জন্য কিছু লিখতে। আমি একটা আমার খুব পছন্দের পুরনো গান ভেঙে লিখেছি সম্ভাষণের ভাষা। কাল কাজের এত চাপ গেছে যে, সে বলে বোঝানো যাবে না। ঘুম না হবার কারণও ওই। তাতে রক্তে ঊর্ধ্বচাপ বেড়ে গিয়ে বিপত্তি ঘটায়। 

লিখতে লিখতে ঘন হয়ে নামল বৃষ্টি। সেগুনবন থেকে সর সর ধ্বনি উঠছে। সর সর- কিংবা ঝরো ঝরো। ফ্যানের বাতাসে তা শোঁ শোঁ ধ্বনির মতো শোনায়। ঊর্ধ্বাকাশে প্লেনে বসে থাকলে যে ধ্বনি শুনি, অনেকটা সেরকম। হয়তো বৃষ্টির পাখাওলা দেবদূতীরা উড়ছেন, সাজাচ্ছেন মেঘমালা, কোনো কোনো মোম, কেতকী কি কুড়চির পাপড়ি ছড়িয়ে, এসেন্স ঢেলে গোসল সেরে নিচ্ছেন। 

কাল রবীন্দ্রনাথের গান কয়েকটি অপটু গলায় টিভিতে দেখে সব কাজ বন্ধ করে স্তব্ধ হয়ে চোখ বন্ধ করে শুনলাম। অরুণ সেন যেমন বলেন- ও খারাপ গাইলেই বা কী। আমরা মূল সুরে সেগুলো বসিয়ে আমাদের মতো করেই শুনি। তাতে পুষিয়ে যায়। তাই হলো আর কি। 

রাতে ঘুম হয়নি ভালো। লেখার চাপ। তিনটার দিকে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়ে ফের লিখতে উঠব উঠব ভাবছি, অমনি পড়লাম ঘুমিয়ে। অদ্ভুত স্বপ্ন দেখলাম। একটি খাল। তীরে দরদালান। আকাশ থেকে কেউ যেন বলছে, দিন গেলে আর দিন ফেরে না। 

এই কষ্টটুকু নিয়ে উঠে দেখি আমার স্বপ্নের ভেতর দেখা মেঘগুলো বাস্তবেই দক্ষিণ আকাশ চেপে কালো হয়ে, পুব থেকে পশ্চিমে সবেগে আছড়ে পড়েছে। এমন ঘন বৃষ্টি, এমন শরীর মনজুড়ে কোমল অন্ধকার, সুগন্ধ। হঠাৎ মনে হলো, ঠিক এ সময়টাতে যদি বাড়ির দোতলায় বসে থাকতে পারতাম কিংবা চাঁদপুর, তালুকনগর অথবা সোমেশ্বরীর তীরে! কতক্ষণ চেঁচিয়ে 'একলা বসে ঘরের কোনে' ইত্যাদি গেয়ে এই স্থান-কালে বিচ্ছেদের কষ্ট বুকে নিয়ে বসে থাকি। 

কে ফেরাবে এই দুগ্ধবতী মেঘ, কোনো শ্রাবণে, এই যে সেগুনবনে। 

এমএ/ ০৭:০০/ ২১ জানুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে