Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-২১-২০১৯

কথাকলি এবং মরা জলের দেশে

রিজওয়ানুল ইসলাম


কথাকলি এবং মরা জলের দেশে

সামাজিক অঙ্গীকারের দেশ কেরালায় 

কেরালা কি একটি দেশ? কর্মজীবনে আমার সহকর্মী এবং বন্ধু জোস কেরালার লোক। সে কোন দেশের- প্রশ্ন করা হলে সে বেশ গর্বের সাথে বলত, আমি কেরালার লোক। তার এই জবাবের পেছনে যে কোনো কারণ নেই, তা নয়। ভারতের একটি রাজ্য হলেও অনেক দিক থেকে, বিশেষ করে সামাজিক অগ্রগতির দিক থেকে কেরালা বরাবরই অন্যান্য অঞ্চল থেকে এগিয়ে। 

অর্থনীতির ছাত্র হিসেবে গোড়া থেকেই আমার নজর ছিল উন্নয়নের অর্থনীতিতে এবং তার মধ্যে সামাজিক অগ্রগতিতে। আর সে প্রসঙ্গে ভারতের কেরালা রাজ্যের কথা পড়েছিলাম নোবেল বিজয়ী অর্থনীতিবিদ অমর্তৗ সেনের লেখায়। বিংশ শতকের আশির দশক থেকেই বিষয়টি নিয়ে লেখালেখি হয়েছে। রাজনৈতিকভাবে রাজ্যের সরকার পরিচালনা করছে কমিউনিস্টদের নেতৃত্বে বাম দলগুলো অথবা কংগ্রেস। কিন্তু রাজ্যের এই বিশেষ অর্জন ম্লান হয়নি। ২০১৭ সালের ডিসেম্বরে যখন আমি দ্বিতীয়বারের মতো কেরালা যাই তখন বামফ্রন্ট ক্ষমতায়। আর রাজ্যের অর্থমন্ত্রী টমাস আইজেক আমার বন্ধু জোসের ঘনিষ্ঠ বন্ধু। আমি যে সেমিনারে যোগ দিতে গিয়েছি, তার উদ্বোধনী ভাষণ দিতে এসেছিলেন তিনি। তার বক্তৃতা শুনে খুব ভালো লেগেছিল। কারণ তিনি বলছিলেন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সাথে সামাজিক ন্যায়ের কথা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতার কথা এবং ভিন্নমতের প্রতি সহনশীলতার কথা।

কেরালার সামাজিক ন্যায়ের নীতি শুধু বক্তৃতাতে সীমাবদ্ধ নয়; বাস্তবেও পাওয়া যায় তার কিছু উদাহরণ। বিভিন্ন স্থানে সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলেই জানতে পারলাম এমন কিছু কর্মসূচির কথা। জানা গেল তাদের রেশন ব্যবস্থার কথা, যাতে দারিদ্র্যসীমার নিচের পরিবারগুলোকে মাসে ৩০ কেজি চাল দেওয়া হয় বিনামূল্যে। এমনকি যারা দরিদ্র নয়, তারাও মাত্র দু'টাকা কেজি দরে মাসে ৮ কেজি চাল কিনতে পারে। 

কেরালায় ধর্মীয় ও সামাজিক সম্প্রীতির কথা আগেই শুনেছিলাম। এবারও তার দৃষ্টান্ত পেলাম ভ্রমণের শুরুতেই। জোসের স্ত্রী রানী এয়ারপোর্টে এসেছিল আমাদেরকে রিসিভ করে হোটেলে নিয়ে যাবার জন্য। হোটেলের কাছাকাছি যেতেই রাস্তার এক পাশে দেখলাম একটি সুন্দর গির্জা; সাদা দেয়াল বলে রাত হলেও বেশ ভালোই দেখা যাচ্ছিল। তার কাছেই দেখলাম একটি সুন্দর মসজিদ। রানী গর্বের সাথে জানালো, কেরালায় বিভিন্ন ধর্মের লোকেরা শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করে এবং অনেক জায়গায়ই ধর্মীয় উপাসনালয় গড়ে উঠেছে একে অন্যের কাছাকাছি। কেরালায় ঘুরতে গিয়ে দেখলাম যে কথাটায় সত্যতা আছে। অনেক জায়গায়ই মসজিদ, মন্দির ও গির্জা বেশ কাছাকাছি। 

ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, সামাজিক ন্যায় এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি কেরালার ঐতিহ্য। স্বাধীন ভারতের একটি রাজ্য হিসেবে স্বীকৃতির আগে পাঁচশ' বছরেরও বেশি সময় সে অঞ্চলটি ছিল ত্রাভাংকোর নামে এক রাজা শাসিত স্টেট। দুটি ব্যাপারে এই রাজ্যটি ভারতের অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় আলাদা ছিল। প্রথমত, বংশপরম্পরায় এ রাজ্যের রাজারা শিক্ষা ও সামাজিক সংস্কারের ওপর অনেক জোর দিতেন এবং প্রজাদের শিক্ষার দিকে বিশেষ নজর রাখতেন। অন্যান্য রাজ্যের রাজাদের মতো তারা তাদের ধন-সম্পদ শুধু নিজেদের আরাম-আয়েশের জন্য ব্যয় করতেন না। প্রজাদের সামাজিক উন্নয়ন বিশেষ করে তাদের শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের জন্য তারা তাদের সম্পদের অনেকটাই ব্যয় করতেন। দ্বিতীয়ত, ত্রাভাংকোরের রাজারা হিন্দু ধর্মাবলম্ব্বী ছিলেন; কিন্তু তারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিকে গুরুত্ব দিতেন এবং খ্রিষ্টান ও মুসলমানদের নিজ নিজ ধর্ম পালনে সহায়তা করতেন। তার ফলেই দেখা যায় সুন্দর সুন্দর গির্জা ও মসজিদ। 

আমি অনেক সেমিনার-মিটিংয়ে গিয়েছি, এবং বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এয়ারপোর্ট, হোটেল ও সেমিনারের জায়গা ছাড়া আর কোনো কিছু না দেখেই ফিরেছি। কিন্তু থিরুভানান্থাপুরমের এই সেমিনারের প্রথম দিনের সন্ধ্যায়ই আয়োজন ছিল একটি সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের, যার প্রধান আকর্ষণ ছিল কথাকলি নাচ। এই নাচটি ভারতের ধ্রুপদী নাচগুলোর অন্যতম; কেরালা রাজ্যেই যার উদ্ভব। 

মুদ্রা আর ভঙ্গিমার মাধ্যমে গল্প বলা এর বৈশিষ্ট্য। গল্পগুলো নেওয়া হয় লোকগাথা বা ধর্মীয় পৌরাণিক কাহিনী থেকে। তাদের আয়তন মহাকাব্যের মতো বলে এই নাচের একেকটি পর্ব সম্পূর্ণ করতে সময় লাগে অনেক। আর তাই রাতজুড়ে অনুষ্ঠিত হয় এই নাচ। কথাকলির আর একটি বৈশিষ্ট্য হচ্ছে মুখে বিশালাকৃতির রঙিন মুখোশের ব্যবহার। তবে চোখ আর ভ্রুর জায়গা খোলা রাখা হয়। কারণ গল্পের চরিত্রগুলোর বিভিন্ন ভাব প্রকাশের জন্য এ দুটি অঙ্গ বেশ ব্যবহার করা হয়। 

আমরা যারা সেমিনারের জন্য গিয়েছি তারা সারা রাত ধরে নাচ দেখলে পরদিন সেমিনারে গিয়ে ঝিমাবে- এই চিন্তা থেকেই বোধ হয় আমাদের জন্য বিশেষভাবে আয়োজিত হয়েছিল একটি সংক্ষিপ্ত সংস্করণ। রামায়ণ থেকে রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের কয়েকটি ছোট ছোট কাহিনী নিয়ে সাজানো হয়েছিল সে সন্ধ্যার উপস্থাপনা। তাতে ছিল রাসলীলার দৃশ্যও। পুরো অনুষ্ঠানটি ছিল এক ঘণ্টার, যাতে সেটা শেষ হবার পর মোটামুটি সময়মতো ডিনার খেয়ে ঘরে ফেরা যায়।

মরা জলে নৌকা ভ্রমণ

কেরালার পর্যটন ম্যাপের অন্যতম আকর্ষণীয় বিষয় হাউসবোটে চড়ে ব্যাকওয়াটারে বেড়ানো। কেমন করে সৃষ্টি হলো এই ব্যাকওয়াটার বা মরা জল? অনেক নদী ও খাল সমুদ্রের দিকে যেতে যেতে কেরালার উপকূলীয় এলাকায় এসে গতি হারিয়ে ফেলে। কারণ জায়গাটি সমুদ্রের চেয়ে নিচে। গতি হারানো সেসব নদী ও খালের জল প্রায় স্থবির বলেই তার নাম মরা জল। কিন্তু এলাকাটি বেশ বিস্তীর্ণ এবং কোনো কোনো জায়গায় কয়েকটি নদী মিলে প্রায় সাগরের মতো। নদীগুলোর দু'পাড়ে রয়েছে ফসলের জমি, যদিও পাড়ে বাঁধ দিয়ে নোনাপানির প্রবেশ ঠেকাতে হয়। কোথাও কোথাও নদীর পাড়ে একটু উঁচু জমিতে গড়ে উঠেছে জনবসতি। কোনো কোনো জায়গায় সে জমি এতই সংকীর্ণ যে, শুধু একটি করে বাড়ি করা সম্ভব হয়েছে। সেসব জায়গায় পাশাপাশি একসারি বাড়ি নিয়ে হয়তো একটি গ্রাম। 

যদিও কেরালার মরা জলে হাউসবোটের কথা আমরা আগেই শুনেছিলাম, প্রথমবার যখন কেরালা যাই তখন এই ট্রিপ করা হয়নি। সুতরাং এবার যখন থিরুভানান্থাপুরমে সেমিনারে যাবার নেমন্তন্ন পেলাম তখন সেটা গ্রহণ করার সাথে সাথে এটাও ঠিক করে ফেললাম, সেমিনার শেষ করে দুটো দিন হাউসবোটে কাটাব। আমাদের বন্ধু জোস এবং রানীও অনেক দিন থেকেই বলছিল কেরালার এই আকর্ষণের কথা। ওরা যখন শুনল, আমরা যাচ্ছি, তখন বলল, এই ট্রিপের ব্যবস্থা ওরাই করবে। পরে দেখলাম, রানীর এক ভাই রয়েছে এই ব্যবসাতে; আর তার কোম্প থেকে দুটো নৌকা আমাদের কয়েকজনের জন্য নেওয়া হয়েছে। আসলে পুরো ট্রিপই জোস ও রানী আমাদেরকে উপহার হিসেবে দিয়েছিল। 

আমাদের হাউসবোটের যাত্রা শুরুর জায়গা ছিল কুতানন্দ অঞ্চলের আলাপুজা গ্রাম, থিরুভানান্থাপুরম শহর থেকে ১৬০ কি.মি. দূরে। দলে ছিলাম আমরা ১২ জন। 

থিরুভানান্থাপুরম থেকে আলাপুজা যাওয়ার পথে আবারও দেখলাম পথের পাশে অনেক জায়গায়ই মন্দির, মসজিদ আর গির্জার কাছাকাছি অবস্থান, আর সবই দেখতে বেশ ছিমছাম (অন্তত বাইরে থেকে)। হয়তোবা লোকেরা অবস্থাপন্ন বলে ধর্মীয় উপাসনার জায়গাগুলোকেও ভালো অবস্থায় রাখতে পারে। 

বোটের টার্মিনালে পৌঁছতেই কোম্পানির লোকেরা সাদর অভ্যর্থনা করে তাদের অফিস-কাম লাউঞ্জে নিয়ে বসালো। এসে গেল ঠাণ্ডা পানীয়। ডিসেম্বর মাস হলে কী হবে, দক্ষিণ ভারতে শীতকাল বলতে তেমন কিছু নেই। সুতরাং চার ঘণ্টা বাসযাত্রার পরে একটু আদর-যত্ন ভালোই লাগল। চেক-ইনের আনুষ্ঠানিকতা দ্রুত সারা হলো। তারপর একটি ছোট লঞ্চে আমাদেরকে নিয়ে যাওয়া হলো হাউসবোটে। 

অনেক দিন আগে কাশ্মীর বেড়াতে গিয়ে ডাল লেকে হাউসবোটে থেকেছিলাম। তাছাড়া কেরালা ব্যাকওয়াটারের ট্যুর কোম্পানিগুলোর ওয়েবসাইটে নৌকাসহ নদীর দৃশ্য দেখেছিলাম আগেই। সুতরাং এ ধরনের নৌকা কেমন হতে পারে, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা ছিল। তা ছাড়া এটাও জেনেছিলাম, আমাদের জন্য পাঁচ তারা ধরনের নৌকারই ব্যবস্থা হবে। নৌকায় উঠে সে রকমই দেখলাম। প্রথমেই ঔপনিবেশিক কায়দায় উর্দি পরা একজন আমাদের অভ্যর্থনা জানাল। তার হাতের ট্রেতে ছিল সুন্দর করে সাজানো কচি ডাব; ওপরে ছিদ্র করে স্ট্র ঢোকানো, সাথে ন্যাপকিন; খাবার জন্য একেবারে তৈরি। এর চেয়ে সুন্দর অভ্যর্থনা আর কী হতে পারত! 

হাউসবোটে ঢুকেই একটি লাউঞ্জ, যার সামনের দিকটা খোলা। সুন্দর সোফা দিয়ে সাজানো; একেবারে কোনো বাড়ির ড্রইং রুমের মতো। নৌকা চলার সময় সেখানে বসলে (বা দাঁড়ালে) সামনের নদী ও দু'পাড়ের দৃশ্য দেখা যায় ভালো। তার পরই খাবার ঘর। আর সেটা পেরিয়ে সরু ব্যালকনির দু'পাশে একের পর এক তিনটি শোবার ঘর। এয়ারকন্ডিশন করা ঘর আর লাগোয়া স্নানঘর। সব মিলিয়ে একটি পাঁচ তারা হোটেলের মতোই। এক পাশে জানালা; সুতরাং ঘরে বসে বা বিছানায় শুয়েও দেখা যায় নদী ও তার পাড়ের দৃশ্য। তবে আরও ভালো দেখা যায় লাউঞ্জের খোলা জায়গাটা থেকে। সুতরাং রাতে ঘুমোনোর সময় ছাড়া বাকি সময়টা আমি সেখানেই কাটিয়েছি। 

নদীর দু'পাশে নারকেল গাছের সারি আর তার পর বাঁধের ওপারে সবুজ ধানের ক্ষেত। কিন্তু খানিক দূর যাবার পর একটি জায়গায় দেখা গেল ফসলবিহীন পতিত জমি, যেখানে জমে আছে পানি। রানী জানাল, সেখানে তার পরিবারের কিছু জমি আছে। এক জায়গায় বাঁধ ভেঙে যাওয়াতে নদী থেকে সমুদ্রের নোনাপানি ঢুকে গিয়ে নষ্ট করেছে ফসলের সুযোগ। স্থানীয় সরকারের কাছে বাঁধ মেরামত এবং পুনঃস্থাপনের দরবার করেও ফল হয়নি। পুরোপুরি বুঝতে না পারলেও বিষয়টাতে যে কিছু রাজনৈতিক গোলমাল আছে, তা অনুমান করলাম। তার ফলেই এই অচলাবস্থা। 

আমাদের খাবার নৌকাতেই রান্নার ব্যবস্থা। লাঞ্চের টেবিলে গিয়ে দেখলাম বিশাল ব্যাপার। শুরু হলো পশ্চিমি কায়দায়, স্যুপ দিয়ে। তারপরই পালা বদল; এসে গেল বিভিন্ন ধরনের মালয়ালি খাবার। আপাম, উতাপাম, রসম, সাম্ভার- কী নেই! সবজি, মাছ, মাংস সবই রয়েছে। গুনে দেখলাম এক ডজন আইটেম। দক্ষিণ ভারতীয় অনেক খাবারেই নারকেলের উপস্থিতি বেশ বোঝা যায়। তবে আমার সবচেয়ে ভালো লেগেছিল ভাজা রূপচাঁদা মাছ। শেফের সাথে কথা বলে জানলাম, মাছ তো বটেই, অন্যান্য খাবার ওই এলাকা থেকেই সংগৃহীত। পর্যটনের সাথে স্থানীয় অর্থনীতির ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ভালো উদাহরণ বলতে হবে। 

লাঞ্চের পর আমরা ছয়জন অন্য নৌকায় গিয়ে যোগ দিলাম বাকি ছয়জনের সাথে। নদ এবং নদীকে ভিত্তি করে জীবনের দৃশ্য দেখা, ছবি তোলা, আর সবাই মিলে আড্ডা। বোঝা যাচ্ছিল যে এলাকাটি খ্রিষ্টান অধ্যুষিত। কারণ দু'পাশের গ্রামগুলোতে মাঝে মাঝেই দেখা যাচ্ছিল ছোট ছোট কিন্তু সুন্দর গির্জার সামনের অংশ এবং চুড়ো। তবে চম্পাকুলাম গ্রামে যেটি দেখলাম সেটি ছিল আয়তনে বিরাট আর সম্ভবত এলাকার সবচেয়ে পুরনো। সেখানে নৌকা পাড়ে ভিড়িয়ে আমাদেরকে নামা এবং খানিকটা হাঁটাহাঁটির সময় দেওয়া হলো। আমরা গেলাম সেন্ট মেরির ব্যাসিলিকা নামে একটি গির্জা দেখতে। ভিত্তিপ্রস্তরের লেখা থেকে জানলাম, বিশাল সেই গির্জা স্থাপিত হয়েছিল ৪২৭ খ্রিষ্টাব্দে। বুঝতে পারলাম, পঞ্চম শতকেই (অর্থাৎ প্রায় ১৬শ' বছর আগে) খ্রিষ্টধর্মের যাজকগণ ভারতের ওই অঞ্চলে পদার্পণ করেছিলেন। স্থাপত্যের দিক থেকে গির্জাটি বেশ দেখার মতো। সেখানকার গ্রামটি অন্যান্য গ্রামের চেয়ে চওড়ায় অনেক বড় ছিল। যার ফলে অনেকখানি জায়গা পেয়েছে গির্জাটি। পশ্চিম দিক থেকে বিকেলের সোনালি রোদ পড়ায় তার সামনের দিকটা পেয়েছিল এক অনন্য আভা। তার ভেতরে ঢুকে দেখলাম অনেকেই নিজেদের মতো প্রার্থনায় নিয়োজিত। 

গির্জাটির প্রাঙ্গণে ছিল সুন্দর কেয়ারি করা ফুলের বাগান। দেখতে ও হাঁটতে বেশ ভালোই লাগছিল। কিন্তু আমরা সেখানে বেশি সময় কাটাতে পারলাম না। কারণ আমাদের পরবর্তী আইটেম ছিল নৌকা বাওয়া। তার জন্য বাইচের নৌকার মতো ছোট একটি নৌকার ব্যবস্থা ছিল। দু'পাশে সার বেঁধে বসে বৈঠা দিয়ে বাইতে হবে নৌকা। আমি যদিও সাঁতার জানি, নৌকা বাওয়ার কোনো অভিজ্ঞতা আমার নেই। তাই এই খেলা থেকে বিরত থাকলাম। আমার বেশ কয়েকজন সহযাত্রী অবশ্য উৎসাহের সাথেই নৌকা বাইতে গেল। 

চম্পাকুলাম গ্রামটির এক জায়গায় একটি ছোট্ট রিসোর্ট, যার সামনে আমাদের নৌকা নোঙ্গর করল রাতের জন্য। আর আমরা নেমে সামান্য হেঁটে একটা জায়গায় গেলাম সূর্যাস্ত দেখতে। তবে আমাদের জন্য একটি মধুর চমক অপেক্ষা করছিল। সন্ধ্যায় আমাদেরকে বলা হলো রিসোর্টটির লনে জড়ো হবার জন্য। সেখানে একটি বেদির মতো জায়গায় উপস্থিত কয়েকজন শিল্পী, যাদের মধ্যে প্রধান ছিলেন একজন বাঁশিবাদক। সঙ্গে ছিল দক্ষিণ ভারতীয় তালবাদ্যের যন্ত্র মৃদঙ্গম। শুনলাম, রানীর ভাই (যিনি আমাদের নৌকার কোম্পানির মালিক) আমাদের জন্য বিশেষভাবে আয়োজন করেছেন এ অনুষ্ঠান। সন্ধ্যার আলো ততক্ষণে নিভে গেছে এবং রাতের আকাশের তারা দেখা যাচ্ছে। রিসোর্টের মূল দালানের কয়েকটি বাতি বাদে পুরো জায়গাটি ছিল প্রায় অন্ধকার। কয়েকটি প্রদীপ জ্বেলে আলোর ব্যবস্থা। সেই পরিবেশে বাঁশি আর মৃদঙ্গমের কনসার্ট। কর্নাটিক সঙ্গীতের সাথে আমার পরিচয় কম হলেও হিন্দোল, হংসধ্বনি ইত্যাদি রাগে বাঁশির সুর ও মৃদঙ্গমের তাল মিলে যে মূর্ছনার সৃষ্টি করেছিল, তার জন্য চম্পাকুলামের সেই সন্ধ্যা ভোলা যাবে না। 

যদিও আমার ভোরে বিছানা ছাড়ার অভ্যেস নেই, একদিনের জন্য আমি তার ব্যতিক্রম ঘটাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। কারণ নদীতে নৌকা থেকে সূর্যোদয় এবং ভোরের দৃশ্য দেখার সুযোগ ছাড়তে চাইনি। কিন্তু বিধি বাম! সেদিন সকালে আকাশ তেমন পরিস্কার ছিল না। তবে হালকা মেঘের ফাঁক থেকে সূর্য তার আভা ছড়িয়ে সকালের দ্যোতনা ঠিকই সৃষ্টি করল। এবং একটু পরেই আকাশে দেখা গেল রূপালি রঙের এক আশ্চর্য আভা আর নদীর জলে তার প্রতিফলন পড়ে সৃষ্টি হয়েছে অপূর্ব দৃশ্য। আমি ঘর ছেড়ে নৌকার লাউঞ্জে গিয়ে দাঁড়াতেই দেখলাম নদিভিত্তিক জনজীবনের বিভিন্ন চিত্র। নদীর পাড়ে কেউ মুখ ধুচ্ছে, কেউ কাপড় কাচছে, আর কেউবা হাঁটুজলে নেমে সূর্যপ্রণাম করছে। ছোট ছোট নৌকা নিজেরাই বেয়ে ছেলেমেয়েরা চলেছে স্কুলে, আর বড়রা যাচ্ছে যার যার কাজে। কেউ কেউ পসরা সাজিয়ে চলেছে; হয়তো বাজারের দিকে। এক জায়গায় নদীপাড়ের জমিতে কয়েকজন শ্রমিক এরই মধ্যে হাজির। 

আমাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে যাচ্ছিল নানা রকম পাখি। তখনই প্রথম জানলাম, আমার সাবেক সহকর্মী জেরি রজার্স একজন উৎসাহী পাখি দর্শক। হাতের বাইনোকুলার মাঝে মাঝে চোখে লাগিয়ে দেখছিল পাখি। তবে অনেক পাখির নাম সে খালি চোখে দেখেই বলে দিচ্ছিল। নিনা এসে তার সেলফোন দিয়েই তুলে ফেলল পাখিদের কিচিরমিচিরসহ একটি সুন্দর ভিডিও। আমাদের নৌকার সারেং শুনছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী ইয়েসুদাসের গান। তিনি যদিও ভল্যুম খুব কমিয়ে রেখেছিলেন, সকালের সেই স্তব্ধতায় গানগুলো যোগ করেছিল এক অনন্য মাত্রা। 

'ডাচ'বিহীন 'ডাচ প্যালেস'

আমাদের পরের গন্তব্য কোচি। ছোটবেলায় ভূগোল বইয়ে পড়েছিলাম, কোচিন- দক্ষিণ ভারতের সমুদ্রবন্দর। আলাপুজার নৌকাঘাট থেকে মিনিবাসে দু'ঘণ্টার যাত্রা। বাসের ড্রাইভারকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল আমাদেরকে যেন প্রথমেই নিয়ে যাওয়া হয় ফোর্ট কোচিতে। পরে বুঝলাম যে ফোর্ট কোচি আসলে কোনো দুর্গ নয়। পুরনো কোচিন শহরের কেন্দ্র এটি; যখানে ঔপনিবেশিক আমলে নানা ধরনের অফিস-আদালত ছিল। দালানগুলো দেখেই বোঝা যাচ্ছিল, এগুলোর পেছনে রয়েছে শত শত বছরের ঐতিহ্য। এখন এলাকাটি ট্যুরিস্টদের আকর্ষণ বলে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু রেস্তোরাঁ। বলতে গেলে ঔপনিবেশিক ভারতের ইতিহাস শুরু হয়েছিল কোচিতে। কারণ এখানে পর্তুগিজরা এসে গিয়েছিল ষোড়শ শতাব্দীতেই। পরে অবশ্য এলাকাটি হাত বদল হয়ে প্রথমে গেছে ডাচদের; পরে ব্রিটিশদের হাতে। 

আমরা যখন ফোর্ট কোচিতে পৌঁছলাম তখন প্রায় লাঞ্চের সময়। আগেই শুনেছিলাম, ওখানকার অন্যতম আকর্ষণ নদীপাড়ে কয়েকটি স্থানীয় রেস্তোরাঁ, যেখানে নদী থেকে ধরা মাছ পাওয়া যায়। চায়নিজ জাল দিয়ে ধরা হয় সেসব মাছ।

এমএ/ ০৭:০০/ ২১ জানুয়ারি

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে