Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (5 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-২১-২০১৯

বাংলাদেশে অর্থনীতিচর্চার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ

ড. হোসেন জিল্লুর রহমান


বাংলাদেশে অর্থনীতিচর্চার অতীত বর্তমান ভবিষ্যৎ

সিলভিয়া নেসার লিখিত অর্থশাস্ত্রের প্রবর্তকদের জীবনী-বিষয়ক বই গ্র্যান্ড পারস্যুট: দা স্টোরি অব ইকোনমিক জিনিয়াস-এ অ্যাডাম স্মিথ থেকে শুরু করে আলফ্রেড মার্শাল, জোসেফ সুমপিটারসহ অন্যান্য অর্থনীতিবিদের চিন্তা ও অর্থশাস্ত্রের বিকাশের বর্ণনা রয়েছে। এ বর্ণনা থেকে স্পষ্ট হয়, শুরুতে অর্থশাস্ত্রের জন্ম হয় নৈতিক দর্শনের অংশ হিসেবে। একথা স্মরণে রেখে বাংলাদেশে অর্থনীতি চর্চার ইতিহাস জানার জন্য অর্থশাস্ত্রের তিনটি বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে স্পষ্ট হওয়া জরুরি।

প্রথমত, অর্থনীতি মৌলিক (পিউর) বিজ্ঞান নয়, সামাজিক বিজ্ঞান। এর উদ্দেশ্য সমাজের পাঠ। যখন অর্থশাস্ত্র সমাজের বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়, তখন অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও অর্থশাস্ত্রের একটি সংকট তৈরি হয়। অর্থনীতি চর্চার এ সংকট নিরসনে বর্তমানে পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোয় আন্দোলন চলছে। বর্তমানে অর্থশাস্ত্র সমাজ থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ফলে সাম্প্রতিক সময়ে অর্থনীতি যে সামাজিক বিজ্ঞানের ভিত্তি, এ বিষয় যেসব ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করছেন, তাদের নোবেল পুরস্কার দেয়া হচ্ছে। সুতরাং অর্থনীতি হচ্ছে সামাজিক বিজ্ঞানের একটি অংশ, বিষয়টি উপলব্ধি করা বাংলাদেশের মতো দেশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি সামাজিক বিজ্ঞান হলেও শাস্ত্রটি কেবল বর্ণনামূলক নয়। অর্থনীতি একটি বিশ্লেষণমূলক বিজ্ঞান (অ্যানালিটিক্যাল সায়েন্স)। অর্থাৎ এর মাধ্যমে আমরা বিভিন্ন সূত্রের সাহায্যে কোনো কিছু ব্যাখ্যা করি। একসময় বাংলাদেশ ও চীন অর্থনীতিতে সমপর্যায়ে ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে এ দুটি অঞ্চলের মধ্যে অর্থনৈতিক উন্নয়নে বিরাট পার্থক্য তৈরি হয়েছে। বিষয়টি শুধু চীনের রফতানি খাতের তথ্য দ্বারা ব্যাখ্যা করা যাবে না, বরং তা ব্যাখ্যার জন্য বিশ্লেষণমূলক পদ্ধতি জরুরি।

তৃতীয়ত, অর্থনীতি হচ্ছে একটি ডায়নামিক বা গতিশীল বিষয়। কারণ সমাজই গতিশীল। ১৯৭০-এর দশকে বাংলাদেশে গ্রামীণ উন্নয়ন ছিল মুখ্য বিষয়। বিআইডিএসের (বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ) পূর্বসূরি পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব ডেভেলপমেন্ট ইকোনমিকসের (পাইড) অর্থনীতি গবেষকরা মূলত ডেস্ক রিসার্চ বা সেকেন্ডারি ডাটাভিত্তিক গবেষণা করতেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে প্রাইমারি রিসার্চের বিষয় প্রধান হয়ে ওঠে। গ্রামের উন্নয়নের জন্য আমরা গ্রাম থেকে তথ্য নিয়ে বিশ্লেষণের উদ্যোগ শুরু করি। কারণ স্বাধীন বাংলাদেশের বেশির ভাগ মানুষ গ্রামে বসবাস করে, তাদের জীবনমানের উন্নতি করতে হবে। তবে এটাও সত্য, সত্তরের দশকের চিত্রকল্প দ্বারা বর্তমান বিশ্লেষণ করা যৌক্তিক হবে না। কারণ গত চার-পাঁচ দশকে বাংলাদেশে বিশাল পরিবর্তন হয়েছে।

আরেকটি বিষয় হলো, সত্তরের দশকের শিল্প-কারখানার জাতীয়করণ ছিল একটি রক্ষণাত্মক নীতি প্রতিক্রিয়া (ডিফেনসিভ পলিসি রেসপন্স), স্বপ্রণোদিত নীতি প্রক্রিয়া (অ্যাক্টিভ পলিসি রেসপন্স) নয়। যেসব মিল-কারখানার মালিক পূর্ব পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে চলে গিয়েছিল, তাদের জন্য বাংলাদেশে বসবাসরত মালিকদের মিলগুলোও সরকার হস্তগত করে। ফলে বাংলাদেশে সত্তরের দশকের জাতীয়করণ অন্যান্য দেশের জাতীয়করণের চেয়ে ভিন্ন ছিল। তত্কালীন বাংলাদেশে আমরা ব্যবস্থাপনা সংস্কৃতি (ম্যানেজারিয়াল কালচার) তৈরি করতে পারিনি বলে এ উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।

অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে রাষ্ট্র ও বাজার— এ দুটি বিষয়ের আপেক্ষিক ভারসাম্য নিয়েই অর্থনীতিবিদদের মাঝে টানাপড়েন চলছে। সত্তর ও আশির দশকে বাংলাদেশের অর্থনীতি পরিচালনায় রাষ্ট্রই ছিল প্রধান। পরবর্তীতে তা বাজারকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। বাজারকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও বাস্তবে রাষ্ট্রের ভূমিকা কোনোদিন অদৃশ্য হয়ে যায়নি। রাষ্ট্রে যখন বাজার ব্যবস্থা বিদ্যমান, তখন একটা সার্টিফিকেটের জন্য প্রশাসনের পেছনে ঘুরতে ঘুরতে অনেক উদ্যোক্তা হাল ছেড়ে দেন। ফলে বাস্তবে অর্থনীতি বাজারকেন্দ্রিক হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্র বিলুপ্ত হয়নি। নীতি প্রণয়নে রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক সুনির্দিষ্ট হলে দেশের উন্নয়ন ত্বরান্বিত হয়। যেমন চীনে রাষ্ট্র শক্তিশালী অবস্থানে থাকা সত্ত্বেও বাজারকে একটি শক্ত অবস্থান দিয়েছে। তারা দক্ষতার সঙ্গে রাষ্ট্র ও বাজারের মধ্যকার আন্তঃসম্পর্কের ভারসাম্য তৈরি করতে পেরেছে। বাংলাদেশ তা দক্ষতার সঙ্গে করতে না পারায় চীন থেকে অনেক পিছিয়ে পড়েছে। রাষ্ট্র ও বাজার দুটিই বাস্তবতার অংশ। এ দুটির সম্পর্ক নির্ণয় ও সম্পর্ক কীভাবে সুস্থিত করা যাবে, সেখানেই অর্থনীতির মূল বিষয় নিহিত।

বাংলাদেশের অর্থনীতি চর্চার ইতিহাসে আরো কিছু মাত্রা রয়েছে। এগুলোর মৌলিক অভিজ্ঞতা দীর্ঘকাল ধরে নীতি প্রণয়নে প্রভাব ফেলছে। যেমন ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ও ১৯৭৪ সালের দুর্ভিক্ষ। এ দুটি ঘটনা নীতিজগতের মনস্তত্ত্বে প্রচণ্ড ধাক্কা দিয়েছে। এর সূত্র ধরে এখনো তার ধারাবাহিকতা চলছে। ১৯৬০-এর দশকের সাহিত্যে ফ্যাটালিজম (তকদিরের লিখন) বিষয়ে অনেক বিশ্লেষণ থাকত। অর্থাৎ ভাগ্যে লেখা আছে, তা খণ্ডন করা যাবে না। দরিদ্র মানুষ আকাঙ্ক্ষার জগতে নিজের দারিদ্র্যকে মেনে নিত। আমি দরিদ্র, আমার ছেলেমেয়েরাও দরিদ্র থাকবে— ভবিষ্যতে এ ধারা বজায় থাকবে।

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে প্রচুর বিশ্লেষণ হয়েছে, কিন্তু মানুষের মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে বিশ্লেষণ অনুপস্থিত। ’৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ ও ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষ সমাজে ভয়ংকর একটি মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব সংঘটিত করে। স্বাধীন বাংলাদেশে আশাবাদী আকাঙ্ক্ষা ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষে নষ্ট হয়ে যায়। কারণ হাজার হাজার মানুষ খাদ্যের অভাবে মারা গেছে। রাষ্ট্র খাদ্যের অভাব দূর করতে পারেনি। তখন জনগণের মাঝে একটা মনস্তাত্ত্বিক বিপ্লব ঘটে। স্বাধীনতার পর আকাঙ্ক্ষাজাত (অ্যাসপিরিশনাল) সমাজ গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ’৭৪-এর দুর্ভিক্ষের পর তা হয়ে ওঠে ‘দ্য নেসেসিটি রিলাই অন ইওরসেলফ’; সার্বিকভাবে রাষ্ট্রের ওপর নির্ভর করা সম্ভব ছিল না। এ প্রেক্ষাপটেই দেশে এনজিওসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন গড়ে ওঠে।

১৯৭৪-৭৫ সালের আগে বাংলাদেশের সাহিত্যে ‘পভার্টি’ শব্দটা বেশি উচ্চারিত হয়নি। ‘রুরাল পভার্টি’, ‘রুরাল ডেভেলপমেন্ট’ শব্দগুলো ছিল। দুর্ভিক্ষের পর পভার্টি শব্দটি রাষ্ট্রের নীতি প্রণয়নের অন্যতম লক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়। বাংলাদেশ রাষ্ট্রের প্রচুর ঘাটতি ছিল। যখন খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার সম্ভাবনা তৈরি হয় তখন অকার্যকর রাষ্ট্র হঠাৎ কার্যকর হয়ে ওঠে। কারণ নীতিনির্ধারকরা অত্যন্ত সচেতন হয়ে ওঠেন যে এ বিষয়ে ব্যর্থ হওয়া যাবে না।

এ কারণে বর্তমানে আমরা একটি নিম্নগামী প্রবণতা (ডাউনসাইড) দেখতে পাচ্ছি। বাংলাদেশে একই সঙ্গে প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যান বৃদ্ধি পাচ্ছে, আবার বেকারত্বও বৃদ্ধি পাচ্ছে; মানসম্মত কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। এ সমস্যা সমাধানের জন্য মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ে মনোযোগ দিতে হবে। কারণ মনস্তাত্ত্বিক বিষয় জনগণকে পরিচালিত করছে।

দেশের কৃষি ব্যবস্থাকে একটি সুনির্দিষ্ট নীতি ও দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করা হয়, তা হলো কৃষি আমাদের খাদ্যনিরাপত্তা দেবে। চাল উৎপাদনে কোনোভাবেই ঘাটতি হতে দেয়া যাবে না। কিন্তু গত ৪০ বছরে কৃষিতে ব্যাপক পটপরিবর্তন হয়েছে। ভবিষ্যতে পোশাক শিল্প খাতের পরিবর্তে কৃষি খাত প্রবৃদ্ধির চালক হতে পারে। দেশে পাটের একটি বিশাল সম্ভাবনা সৃষ্টি হচ্ছে। এ পাট শিল্প প্রবৃদ্ধির নতুন চালক হতে পারে।

সাম্প্রতিককালে লক্ষ করেছি বাজেটের দুটি ভাগ থাকে— প্রারম্ভিক ভাগ, আমি এটাকে বলব বাজেটের সাহিত্য ও বাজেট অর্থনীতি। সাহিত্য অংশে অনেক সুন্দর কথা রয়েছে কিন্তু অর্থনীতির অংশে তার প্রতিফলন নেই। খাতভিত্তিক পরিকল্পনায়ও তার কোনো প্রতিফলন নেই। সুতরাং আমাদের মূল ইস্যু হচ্ছে খারাপ ছাত্র, অর্থাৎ তুলনামূলক অনুন্নত দেশগুলোর সঙ্গে তুলনার মাধ্যমে কতদিন আত্মপ্রসাদে ভুগব? ২০০৪ সালে বাংলাদেশ ‘নেক্সট ইলেভেন কান্ট্রিজ’ নামের বিশ্বে ১১টি সম্ভাবনাময় দেশ হিসেবে নির্বাচিত হয়। তালিকার সর্বশেষ নামটি ছিল বাংলাদেশ। দুর্ভাগ্যজনকভাবে ১৪ বছর পরও বাংলাদেশ সেই ১১ নম্বরেই আটকে আছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতি বিষয়ে প্রচুর গবেষণা হয়েছে। কিন্তু তরুণদের সঙ্গে কথা বলে আমার মনে হয়েছে, সে গবেষণাগুলো পাঠ্যপুস্তক পর্যায়ে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে আমাদের ভয়ংকর ব্যর্থতা রয়েছে। টেক্সট বইয়ে গবেষণাগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হতো। বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় চ্যালেঞ্জ হলো তরুণ প্রজন্মসহ সবার প্রচলিত ধারণাকে পুনরায় চিন্তা করা। ‘রিডিসট্রিবিউট’ বা ‘পুনরায় বণ্টন করে’ সমস্যার সমাধান ধারণার মাঝে ভুল রয়েছে। কারণ বর্তমানে তরুণদের মধ্যে বেকারত্ব বাড়ছে। আমাদের অবকাঠামো খাতে বিনিয়োগ সত্ত্বেও কর্মসংস্থান হচ্ছে না। উদ্যোক্তা-শ্রেণী তাদের প্রয়োজনীয় নীতি সংস্কারের সুযোগ পাচ্ছে না। এ রকম পরিস্থিতি বাংলাদেশে অর্থনীতিচর্চার জন্য সুবর্ণ সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে। দেশে প্রবৃদ্ধি হচ্ছে কিন্তু কর্মসংস্থান তৈরি হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে আলোচনা ও বিশ্লেষণ হওয়া প্রয়োজন। ভবিষ্যৎ বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির চালক নির্ধারণ করা দরকার। বর্তমানে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ সত্ত্বেও যেভাবে অর্থনীতি পরিচালিত হচ্ছে, ভবিষ্যতে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ আশীর্বাদের বদলে অভিশাপ হবে। কারণ দক্ষ মানবসম্পদ ছাড়া ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ হয় না। এ সমস্যাগুলোর বিশ্লেষণ ও সমাধান খোঁজাই হবে অর্থনীতিচর্চার প্রধান ক্ষেত্র।

লেখক: সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা নির্বাহী চেয়ারম্যান, পিপিআরসি

এমএ/ ০২:১১/ ২১ জানুয়ারি

অভিমত/মতামত

আরও লেখা

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে