Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, সোমবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ , ১ আশ্বিন ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.3/5 (6 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৭-২০১৯

নির্বাচনোত্তর রাজনীতি নিয়ে কিছু ভাবনা

আবদুল গাফফার চৌধুরী


নির্বাচনোত্তর রাজনীতি নিয়ে কিছু ভাবনা

ত্রিশে ডিসেম্বরের নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটা গুণগত পরিবর্তন ঘটিয়েছে। এই পরিবর্তন হল একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধী সম্মিলিত জোটের ক্রমাগত হামলার মুখে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি- বিশেষ করে আওয়ামী লীগ সরকারকে ক্ষমতায় রাখার কাজে বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোর বিশেষ ভূমিকা গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনেকটা ফুরিয়েছে বলে মনে করা হয়।

আওয়ামী লীগ একাদশ সংসদে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করেছে। মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের বিরোধীদের শিবির বিএনপি-জামায়াতের এ সংসদে প্রায় বিলুপ্তি ঘটেছে।

স্বাধীনতাবিরোধী শিবির সংসদে প্রায় নেই বলা চলে। আবার মাঠে নেমে আন্দোলন করার মতো দলীয় শক্তি এবং জনসমর্থনও তাদের নেই। আওয়ামী লীগ এবার নির্বাচনে জিতে রাজনীতিতে একাধিপত্য প্রতিষ্ঠার পর পরিস্থিতি বুঝেই মহাজোটের শরিক দল থেকে মন্ত্রিসভায় কোনো সদস্য এখন পর্যন্ত গ্রহণ করেনি।

বর্তমান মন্ত্রিসভা সম্পূর্ণভাবে আওয়ামী লীগ মন্ত্রিসভা, মন্ত্রিসভায় ওয়ার্কার্স পার্টির রাশেদ খান মেনন, জেপির আনোয়ার হোসেন মঞ্জু যেমন নেই, তেমনি দলের বাম ঘরানার মন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, মতিয়া চৌধুরী প্রমুখও নেই।

জেনারেল এরশাদের জাতীয় পার্টিও মন্ত্রিসভায় আসন না নিয়ে বিরোধী দলের অবস্থান নেবে বলে জানা গেছে। যদি তা হয়, তাহলে আওয়ামী মহাজোট থাকবে কী থাকবে না অদূর ভবিষ্যতেই তা বোঝা যাবে। আমার ধারণা, বিএনপি-জামায়াত সংসদে তাদের সংখ্যা শক্তি হারালেও রাজনীতিতে তাদের অবস্থান এখনও হারায়নি।

এবারেও সংসদ বর্জন করলে বিএনপির অস্তিত্ব বিলুপ্ত হবে। তাদের জোটের (ঐক্যফ্রন্টের) অন্তর্ভুক্ত গণফোরামের দুই এমপি মোকাব্বির খান ও সুলতান মোহাম্মদ মনসুর যে শপথ নেবেন এটা এখন প্রায় স্থিরকৃত। বর্তমান সংসদে আওয়ামী মন্ত্রিসভাকে শক্তিশালী না হলেও উল্লেখযোগ্য বিরোধিতার মোকাবেলা করতে হবে না, তা নয়।

ঐক্যফ্রন্টের আট সদস্য এবং এরশাদ সাহেবের ২০ সদস্য যদি নিজেদের মধ্যে দূরত্ব বজায় রেখেও সংসদে বিরোধী দল হিসেবে অবস্থান নেয়, তাহলেও কোনো না কোনো সময় তা সম্মিলিতভাবে সরকার বিরোধিতায় পরিণত হতে পারে।

বিএনপির সঙ্গে জাতীয় পার্টির (বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের প্রশ্নে) আদর্শগত মিল বেশি। সরকারের কাছ থেকে আশানুরূপ সুযোগ-সুবিধা না পেলে জাতীয় পার্টি বিএনপির দিকে ঝুঁকতে পারে, অন্তত সংসদে।

এ ক্ষেত্রে ঐক্যফ্রন্ট আনুষ্ঠানিকভাবে ভেঙে গেলেও পরিস্থিতির পরিবর্তন হবে না। সংসদে বিরোধিরা দুর্বল হলেও তা সরব থাকবে। সংসদের বাইরেও বিরোধী শক্তি বিপর্যস্ত হলেও তাদের ষড়যন্ত্রের রাজনীতি আরও কিছুকাল সক্রিয় থাকবে, একটি শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গড়ে না ওঠা পর্যন্ত ‘একাত্তরের পরাজিত শিবির’ সম্পূর্ণ নির্মূল হবে না।

সুতরাং আওয়ামী লীগের এ মুহূর্তে উচিত হবে না মহাজোটকে নিষ্ক্রিয় বা অকার্যকর করা।

আওয়ামী লীগের বাম ঘরানার বাদপড়া মন্ত্রীদের না হয় ভবিষ্যতে কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতায় একোমোডেট করা যাবে, কিন্তু বামপন্থী ও মধ্যডানপন্থী যে দু-তিনটি শরিক দলের নেতৃস্থানীয় সাবেক মন্ত্রী, যারা এবার নির্বাচিত হয়েও মন্ত্রী হননি, তাদের বেলায় কী হবে?

তারা কি আবার মন্ত্রী হওয়ার আশায় তীর্থের কাকের মতো অপেক্ষা করবেন, না নতুন কোনো কর্মপন্থা গ্রহণ করবেন?

এই মুহূর্তে মহাজোট ত্যাগ বা আওয়ামী লীগ সরকারকে সমর্থন দান থেকে বিরত থাকা তাদের উচিত হবে না। কারণ, স্বাধীনতার আদর্শের শত্র“ যে দানবের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের কমন লক্ষ্য সামনে নিয়ে তারা আওয়ামী লীগকে সমর্থন দিচ্ছিলেন, তার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে ভাবা ভুল।

নির্বাচনী যুদ্ধে শত্র“র চরম পরাজয় ঘটলেও সংসদের বাইরে তাদের রাজনৈতিক চক্রান্ত সম্পূর্ণ পর্যুদস্ত হয়নি। সুতরাং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তির ঐক্য অটুট রাখার প্রয়োজন এখনও ফুরিয়ে যায়নি। এটা আওয়ামী লীগকে বুঝতে হবে।

১৯৪৭ সালে ভারত স্বাধীন হওয়ার পর ক্ষমতায় আসে সেক্যুলার নেহেরু সরকার। এ সরকারকে সমর্থন দানের প্রশ্নে ভারতের অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টি দ্বিধাবিভক্ত হয়।

তাদের এক অংশ কংগ্রেসের ভেতরের প্রতিক্রিয়াশীল চক্র এবং বাইরের হিন্দুত্ববাদী সাম্প্রদায়িক দলগুলোর হামলা থেকে গণতন্ত্র ও সেক্যুলারিজমে বিশ্বাসী নেহেরু সরকারকে সমর্থন দিয়ে টিকিয়ে রাখা জরুরি মনে করে। অন্য অংশ এখনই ‘ইয়ে আজাদি ঝুটা হায়’ স্লোগান দিয়ে নেহেরু সরকারকে সশস্ত্র সংগ্রামের মাধ্যমে উৎখাতের সিদ্ধান্ত নেয়।

দীর্ঘকাল পর এখন প্রমাণিত হয়েছে, ভারতে যে এখনও প্লুরালিস্ট গণতান্ত্রিক শাসন বজায় আছে, হিন্দুত্ববাদী বিজেপি ক্ষমতায় এসেও তা ভাঙতে পারছে না, তার মূল কারণ এখনকার শক্তিশালী কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিআই) সমর্থনে ভারতে দীর্ঘকাল গান্ধী-নেহেরুর গণতান্ত্রিক ভারত গড়ে ওঠা ও রক্ষা পাওয়া।

ভারতে কমিউনিস্ট পার্টি ও বাম গণতান্ত্রিক দলগুলো দুর্বল ও বিভক্ত হওয়ার পর কংগ্রেসেরও নীতিবিচ্যুতি ঘটে এবং শুধু কংগ্রেসের নয়, ভারতের বামশক্তির পতন ঘটে। এখন ভারতে হিন্দুত্ববাদের জয় জয়কার।

বৃহৎ প্রতিবেশী ভারতের রাজনীতি থেকে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ এবং বাম গণতান্ত্রিক শক্তিকে শিক্ষা নিতে হবে। বাংলাদেশে এবারের নির্বাচনে একাত্তরের পরাজিত গণবিরোধী শক্তির চরম পরাজয় ঘটেছে, কিন্তু তাদের পুনরুভ্যুত্থানের আশঙ্কা দূর হয়নি।

রূপকথায় আছে, রাক্ষসের এক তিল রক্ত থেকে লক্ষ রাক্ষস তৈরি হয়। বাংলাদেশে সেক্যুলারিজম ও গণতন্ত্রের শত্র“দের একফোঁটা রক্ত থেকে লক্ষ শত্র“ তৈরি হতে পারে। ড. কামাল হোসেন, আ স ম রবের মতো ব্যক্তিরাও যে এই দানবদের দলে যোগ দিতে পারেন, সেই আশঙ্কা কি আগে কোনোদিন আমাদের কল্পনায়ও ছিল?

গান্ধী-নেহেরুর গণতান্ত্রিক ভারতের মতো বঙ্গবন্ধুর গণপ্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশকেও রক্ষা করতে পারে আওয়ামী লীগ ও বাম গণতান্ত্রিক দলগুলোর অনড় ও অটুট ঐক্য। সিপিবির মতো কোনো বাম দল যদি মনে করে, যেদেশে গণতন্ত্রের ভিতই এখনও নিরাপদ হয়নি, সেদেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা বা শোষণহীন সমাজ তৈরির সংগ্রাম তারা একাই সফল করতে পারবেন, তা আকাশকুসুম কল্পনা।

আবার আওয়ামী লীগও যদি মনে করে দেশের বামপন্থীদের (এখন যতই দুর্বল হোক) সমর্থন ও সাহায্য ছাড়া তারা গণতন্ত্র ও সেক্যুলার বাংলাদেশকে রক্ষা করতে পরবেন, তাও ব্যর্থ ভাবনা। বাম বা বাম ঘরানার মন্ত্রীদের বাদ দিয়ে তারা ওয়াশিংটন ও ভারতের মোদি সরকারের সন্তুষ্টি অর্জন করবেন ও ধরে রাখবেন, তাও চরম ভুল।

এই ভুলের খেসারত কংগ্রেসের মনমোহন সরকার দিয়েছে। শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে বাংলাদেশের আওয়ামী লীগ সরকার এ ভুলটি করবে না বলেই আমার দৃঢ়বিশ্বাস।

বর্তমান মন্ত্রিসভা থেকে বাদপড়া বাম মন্ত্রীরা আবার মন্ত্রী হওয়ার জন্য অপেক্ষা করবেন তা আমি বলি না। তারা সাম্প্রদায়িক ও ধর্মান্ধতার রাজনীতির লেজের বিষটুকুও ধ্বংস করার জন্য মন্ত্রিসভার বাইরে থেকেও আওয়ামী লীগকে সমর্থন ও সহযোগিতা দেবেন, অন্যদিকে সংসদীয় রাজনীতিতে বিএনপি-জামায়াত যাতে আবার আওয়ামী লীগের বিকল্প প্রধান দল হয়ে উঠতে না পারে সে জন্য বাম দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ গণতান্ত্রিক বিরোধী দল গঠনে তৎপর হবেন।

ভারতের রাজনীতিতে নিজেদের মধ্যে অনৈক্য ও নীতিভ্রষ্টতার জন্য বাম গণতান্ত্রিক দলগুলো নিজেরা কংগ্রেসের বিকল্প গণতান্ত্রিক বিরোধী দল হয়ে উঠতে পারেনি। প্রধান বিরোধী দল হয়ে উঠেছে সাম্প্রদায়িক বিজেপি। তারপর তারা একচ্ছত্রভাবে ক্ষমতাও দখল করেছে।

বাংলাদেশে যেন এ ঘটনার পুনরাবৃত্তি না ঘটে। বাম গণতান্ত্রিক শক্তির মধ্যে বিভাজন, দুর্বলতা, অনৈক্যের সুযোগে ধর্মান্ধ মৌলবাদী শিবির যেন আবার দেশের প্রধান বিরোধী দল না হয়ে ওঠে এবং আবার ক্ষমতা দখলের সুযোগ না পায়।

গণতন্ত্রের শ্রেষ্ঠ রক্ষাকবচ শক্তিশালী গণতান্ত্রিক সরকার এবং তার শক্তিশালী গণতান্ত্রিক বিরোধী দল। এই সত্যটি যেন আওয়ামী লীগ এবং বাম গণতান্ত্রিক দলগুলো ভুলে না যায়।

সূত্র:

আর/০৮:১৪/১৭ জানুয়ারি

মুক্তমঞ্চ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে