Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English

গড় রেটিং: 3.0/5 (15 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

print
আপডেট : ০১-১৬-২০১৯

বিশ্বের সব দরিদ্র মানুষের জীবনচিত্র এক রকম নয় 

অমর্ত্য কুমার সেন


বিশ্বের সব দরিদ্র মানুষের জীবনচিত্র এক রকম নয় 

অমর্ত্য কুমার সেন, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও দার্শনিক। অর্থনীতিতে নোবেলজয়ী; পেয়েছেন ভারতরত্ন। লাইভমিন্টকে দেয়া এক সাক্ষাত্কারে কথা বলেছেন ভারতের অর্থনীতি, কৃষি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ বিভিন্ন বিষয়ে

চীন-ভারতের মধ্যকার তুলনা সবসময় করা হয়। কিন্তু দুটি ক্ষেত্রে, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য, সেখানে এ দুই দেশের মধ্যে কোনো প্রতিযোগিতা রয়েছে বলে মনেই হয় না। বিষয়টি আপনি কীভাবে দেখছেন?

শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার আরো বেশি উন্নতি ঘটিয়ে মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধির মধ্য দিয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা বজায় রাখার পেছনে চীনের আগ্রহ ছিল। এটি একটি পুরনো জ্ঞান। আপনি দেখবেন এ বিষয়টি ‘ওয়েলথ অব দ্য নেশনস’ ও ‘দ্য থিওরি অব মোরাল সেন্টিমেন্টস’-এ বেশ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করেছেন অ্যাডাম স্মিথ। এখানে একটি বুদ্ধিজীবী সংযোগ রয়েছে। মার্ক্সের ওপর অ্যাডাম স্মিথের সবচেয়ে বেশি প্রভাব ছিল এবং মাও জে দংয়ের ওপর বড় প্রভাব ছিল মার্ক্সের। মাওয়ের পদ্ধতি ও কর্তৃত্ববাদ এমন কিছু, যার জন্য পর্যায়ক্রমে চীনে তার সম্পর্কে মানুষ সমালোচনামুখর হয়ে ওঠে। কিন্তু বিষয়টি হলো, তিনি যে মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরির দিকে নজর দিয়েছিলেন, তা এখনো বজায় রয়েছে। 

চীনে দরিদ্র মানুষও রয়েছে। কিন্তু দরিদ্র মানুষ ভারতে যে ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়ে, চীনের দরিদ্রদের সেগুলোর সম্মুখীন হতে হয় না। ভারতে একজন দরিদ্র ব্যক্তি যেতে পারে এমন বিদ্যালয় পায় না, হাসপাতালও নেই; যেখানে সে তার সন্তানকে ভর্তি করাবে, যেখান থেকে সাধারণ পরীক্ষা-নিরীক্ষা  ও স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হবে।  এটি কিন্তু একটি বিশাল ব্যাপার এবং আমি ভীত যে আমরা কোনোভাবেই এসব সমস্যা সমাধান করতে পারব না। মূল বিষয় হলো, মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা বা প্রাথমিক শিক্ষা খাতকে মজবুত করার বিষয়ে ভারত কখনই চেষ্টা করেনি। এর অনুপস্থিতিতে আপনি অন্য কিছুও দাঁড় করাতে পারবেন না।

এটি কী আমাদের পূর্বপরিকল্পনার ব্যর্থতা?

হ্যাঁ। কিন্তু এটি চূড়ান্তভাবে আমাদের রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার ব্যর্থতা। ভারত স্বাধীন হওয়ার সময় অনেক ধরনের উদ্বেগ ছিল, যেগুলো এসেছিল বিভিন্ন রাজনৈতিক পক্ষ থেকে এবং জওহরলাল নেহরু নিশ্চিতভাবে এ বিষয়ের দিকে মনোযোগী ছিলেন যে সবকিছুর উপরে আমাদের মৌলিক শিক্ষা ও মৌলিক স্বাস্থ্যসেবার সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন রয়েছে। মিনু মাসানি নিজের বই আওয়ার ইন্ডিয়াতে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে ভারতের ব্যর্থতা ও সাফল্যের মধ্যকার পার্থক্য নিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন। এর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে এক ধরনের সর্বসম্মতি ছিল। কিন্তু যে সময় ভারত স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে আবির্ভূত হলো, রাজনৈতিক মতভেদ অন্য এক দিকে চলে গেল। বেসরকারিভাবে এ চাহিদা পূরণ করা যেতে পারে— এ পুরো আইডিয়াটা হাস্যকর। কোনো দেশ এভাবে কাজ করে সফল হতে পারেনি।

অ্যাডাম স্মিথের মৌলিক ধারণা হলো, চূড়ান্তভাবে মানবসম্পদের দক্ষতার মানের ওপর অর্থনৈতিক সম্প্রসারণ নির্ভর করে এবং শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও সামাজিক নিরাপত্তা মানবসম্পদের দক্ষতার কেন্দ্রে রয়েছে। কেন ভারতীয়রা এ বিষয়ে এত অবহেলা করে, আমি জানি না। এটা কিন্তু পুরনো প্রথা নয়। যখন জমশেদ টাটা একটি জায়গায় পৌঁছেন, যে জায়গাটিকে আমরা পরবর্তীতে জমশেদপুর বলে ডাকা শুরু করি, তিনি চারদিকে তাকালেন এবং বললেন: আমি এখানে আমার স্টিল কারখানা স্থাপন করব, আমার কী কী প্রয়োজন হবে? আমার প্রয়োজন পড়বে সবার জন্য বিদ্যালয়, হাসপাতালের এবং এটা শুধু স্টিল কারখানার শ্রমিকদের জন্য নয়, যারাই এখানে বসবাস করবে তাদের সবার জন্যই। একজন বেসরকারি উদ্যোক্তা, যিনি একদম শুরু থেকেই জানতেন কী চ্যালেঞ্জ আসতে যাচ্ছে।

যদি শুনতে চাওয়া হয়, তবে আপনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা খাত বিষয়ে সরকারকে কী পরামর্শ দেবেন?

এমনটা হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ! সরকারের আগে গণমাধ্যমকেও মেনে নিতে হবে যে এটি একটি সমস্যা। যখন জিন ড্রেজে ও আমি আমাদের বই ‘দি আনসার্টেইন গ্লোরি’ নিয়ে কাজ করছিলাম, আমরা দেখে আশ্চর্য হয়েছিলাম স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসংক্রান্ত বাজে নীতিগুলো কত কম গণমাধ্যমের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পেরেছিল। যদি মানুষ স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে আগ্রহ না দেখায়, তবে আপনি স্বাস্থ্যসেবা পাবেন না।

কৃষি দুর্দশা নিয়ে আপনার চিন্তা কী?

ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) এ ইস্যুর কারণে নির্বাচনে হারল। আমরা এ সমস্যার সমাধান খুঁজে পেয়েছি এমনটা মনে হয় না।

অনেক সমস্যার একটি হলো কৃষি দুর্দশা। এ সমস্যা নিয়ে ১৯২০ দশকের পর থেকে আলোচনা করে আসছি। কিছু ব্যক্তি মনে করেন, ঋণছাড় সম্পূর্ণভাবে একটি ভুল পদক্ষেপ। আমি এমনটা মনে করি না। নিশ্চিতভাবে এটি একটি ইনসেনটিভ সমস্যা কিন্তু বহু সমতা নীতিতে ইনসেনটিভ সমস্যা রয়েছে। 

প্রগতিশীল কর ব্যবস্থায় একটি ইনসেনটিভ সমস্যা রয়েছে। তাহলে কি আমরা প্রগতিশীল কর ব্যবস্থা গ্রহণ করব না, যেহেতু এর ইনসেনটিভ সমস্যা রয়েছে? এটা গ্রহণ করা হলে তো বড় ভুল হবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো, আমাদের লক্ষ্য অনুযায়ী কীভাবে আমরা ইনসেনটিভ সমস্যা সামাল দেব।

আমি বেড়ে উঠেছি শান্তিনিকেতনে, যেটা ঘিরে রয়েছে উপজাতি গ্রাম। আমাদের বাসা ও চালকলের মধ্যে দূরত্ব ছিল তিন-চার মাইল, এর মাঝে ধানক্ষেত ছাড়া কিছু ছিল না। ছোট ছোট ধানক্ষেতের বেশির ভাগের মালিক ছিল উপজাতিরা। এখন তাদের হাতে শুধুই বাড়িঘর, কারণ তারা ঋণগ্রস্ত হয়েছে এবং জমি বিক্রি করে দিয়েছে। আমি যথেষ্ট রক্ষণশীল হতে চাই না, এটা বলার জন্য যে ধানক্ষেত দেখার চেষ্টা করিনি। কিন্তু এ ঘটনার বড় শিক্ষা অবশ্যই হলো, কৃষকদের নিজেদের জমি বিক্রি করে দিতে হচ্ছে। কারণ তারা ঋণে বেশ ভালোভাবে ডুবে গেছেন। আপনি যেমনটা মনে করছেন, ঋণ মওকুফ ততটা নির্বোধ নীতি নয়। যারা ঋণ গ্রহণ করেন তাদের অনেক সমস্যা থাকে এবং হয়তো এ সমস্যার অনেকগুলোর জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। বিষয়টি বিবেচনার জন্য আপনি নৈতিকতার চেয়ে বরং স্মিথসোনিয়ান মতাদর্শ গ্রহণ করতে পারেন। অন্যদিকে বেশির ভাগই কোনো কিছু করেন না জমি থেকে সর্বোত্তম ফল পাওয়ার জন্য। তারা নিজেদের ছোট জমি থেকে যে আয় করতে পারেন শুধু জমিটা দিয়ে দেন, এটা রক্ষণাবেক্ষণ করেন না।

কৃষির ওপর অতিরিক্ত মানুষ নির্ভরশীল, এটাই কি মৌলিক সমস্যা?

এটা নিশ্চিতভাবে একটি সমস্যা এবং এটি একটি বিষয়ের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, যেটি হলো ম্যানুফ্যাকচারিং খাতে আমাদের কর্মসংস্থান সৃষ্টির হার খুবই নিম্ন। ইউপিএ (ইউনাইটেড প্রগ্রেসিভ অ্যালায়েন্স) সরকারের তুলনায় এখন তো আরো বাজে অবস্থা। আগের কংগ্রেস সরকার যে শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিয়ে খুব পরিষ্কার চিন্তা করেছে তা নয়; কিন্তু বর্তমান মোদি সরকার যে পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে, তার তুলনায় অনেক বেশি করেছে তারা। আদতে এ ব্যাপারে আগ্রহের ব্যাপক ঘাটতি রয়েছে।

আপনি অনেক সরকারের যাওয়া-আসা দেখেছেন। বর্তমান সরকারকে কীভাবে মনে রাখবেন? এ সরকারের এমন কি কোনো বিশেষ বিষয় রয়েছে, যেটি আপনাকে সবচেয়ে বেশি নাড়া দিয়েছে?

সেটা সম্ভবত কোনো অর্থনৈতিক বিষয় হবে না। এ সরকার আমাদের দেশে বিভক্তি তৈরি করেছে। এটি এমন একটি সরকার, যেটি মানবাধিকার নিশ্চিতকে কঠিন করে তুলেছে। এ সরকার কে কী খায়, সেদিকে লক্ষ রাখে এবং আপনি যদি ভুল জিনিস খান, তাহলে আপনার বেঁচে থাকার অধিকার না-ও থাকতে পারে। আমি মনে করি, সরকারের বিভেদ নীতি আমার চিন্তার বেশির ভাগটা জুড়ে থাকবে; কারণ আমি ভারত সম্পর্কে যতটা বুঝি, সে বোঝার বেশির ভাগেরই বিপরীত এটি। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতকে অবহেলা করা একটি ভুল কিন্তু জনগণের একটি অংশের মধ্যে বৈরীভাব সৃষ্টি করা ভুলের থেকেও বেশি কিছু। এটি অশুভ।

আগামী সরকারের জন্য আপনার পরামর্শ কী থাকবে?

দু-তিনটি বিষয় রয়েছে। আমাদের একসঙ্গে অনেক ভিন্ন কাজ করতে হবে। যখনই কেউ বলে, দু-তিনটি কাজের পরামর্শ দিন, আমি বলি দুটি কেন, কেন ২০০টি নয়? আমি চাইব মানুষ স্বীকার করে নেবে যে একজন নাগরিক হচ্ছেন নাগরিক এবং আপনি কাউকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাগরিক হিসেবে গণ্য করতে পারেন না। ভারত কোনো সাম্প্রদায়িক দেশ নয়, ভারত সব ভারতীয়র জন্য। এবং ভারত এমন একটি দেশ, যার সহিষ্ণুতা ও বহুত্বের বিশাল ঐতিহ্য রয়েছে এবং আমাদের এটি নিয়ে গর্ব করার অসংখ্য কারণ রয়েছে। এর সঙ্গে আমি বিজ্ঞান ও শিক্ষার ভূমিকার বিষয়ে খুব আগ্রহী এবং স্বাস্থ্যসেবা বিজ্ঞানের একটি অংশ। আমাদের ভুল এড়িয়ে চলতে হবে এবং একই সঙ্গে এড়িয়ে যেতে হবে অশুভ কাজ।

ভাষান্তর সাঈদ সরকার

এমএ/ ০০:২২/ ১৬ জানুয়ারি

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে