Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, বৃহস্পতিবার, ২৩ মে, ২০১৯ , ৯ জ্যৈষ্ঠ ১৪২৬

গড় রেটিং: 2.9/5 (121 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১৯-২০১৩

হুমায়ুন আহমেদ-এর জাদু জীবন

মুহাম্মদ জলিল



	হুমায়ুন আহমেদ-এর জাদু জীবন
দেখতে দেখতে জাদুশিল্পী, ঔপন্যাসিক, চিত্রপরিচালক, নাট্যকার, গীতিকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী, নন্দিত কথা সাহিত্যিক বহুগুণে গুণান্বিত হুমায়ূন আহমেদ এর ১ম মৃত্যু বার্ষিকী চলে এলো। একটি বছরে হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে প্রচুর লেখা লেখি হয়েছে। তাঁর অসারণ কর্মকান্ড নিয়ে বেরিয়েছে বহু গ্রন্থ। যিনি নিজে এক সময় লেখতেন- যাঁর লেখা আজও পড়তে হয় মন্ত্রমুগ্ধের মত, পড়তে হবে বহুযুগ ধরে। তিনি আজ লেখার বিষয়। হুমায়ূন আহমেদের মৃত্যুর পর আমি আমার কয়েকটি লেখায় তাঁর জাদু বিষয়ক অভিজ্ঞতা ও সাফল্য নিয়ে লেখেছি। আজকের লেখায় তাঁর জাদু জীবন নিয়ে আরো বিস্তারিত তুলে ধরার উদ্দেশ্যে কলম ধরা।
মহান ব্যক্তিত্ব হুমায়ূন আহমেদের জন্ম ১৯৪৮ সালের ১৩ নভেম্বর, ময়মনসিংহ জেলার মোহনগঞ্জ থানার কুতুবপুর গ্রামে।  হুমায়ূন আহমেদকে বাচ্চু নামেও ডাকা হতো। তাঁর আরো একটি আদুরে নাম কাজল। বাবা শহীদ ফয়জুর রহমান ছিলেন দেশ প্রেমিক পুলিশ কর্মকর্তা। অত্যন্ত আমুদপ্রিয় লোক ছিলেন ফয়জুর রহমান। রতœগর্ভা মা বেগম আয়েশা আক্তার খাতুন। আয়েশা আক্তার খাতুন সুগৃহিনী ও শক্তিশালী লেখকা। হুমায়ূন আহমেদের অপরাপর ভাই বোনেরা  হলেন- ড. মুহাম্মদ জাফর ইকবাল, আহসান হাবীব (শাহীন), সুফিয়া হায়দার শেফু, মমতাজ বেগম ও রোকসানা বেগম। বাবা পুলিশ কর্মকর্তা হওয়ার সুবাদে তাদের পরিবারকে ঘুরে বেড়াতে হয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে। ১৯৫৫ সালে তাঁর বাবার কর্মস্থল সিলেট জেলায় ছিল, আর তাই ১৯৫৫ সালে সিলেট জেলার কিশোরী মোহন পাঠশালায় প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি হওয়ার মাধ্যমে তাঁর  শিক্ষা জীবন শুরু হয়। ১৯৬৫ সালে কওরা জেলা স্কুল থেকে এস.এস.সি পরীক্ষায় মেধা তালিকায় দ্বিতীয় হন হুমায়ূন আহমেদ। ভর্তি হন ঐতিহ্যবাহী ঢাকা কলেজে। ১৯৬৭ সালে কৃতিত্বের সাথে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। পরবর্তীতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে রসায়ন (অনার্স) স্মাতক এবং স্মাতকোত্তর ডিগ্রী লাভ করেন। অতঃপর রসায়ন শাস্ত্রের মেধাবী ছাত্র হুমায়ূন আহমেদ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ডাকোটা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পি.এইচ.ডি ডিগ্রী লাভ করেন পলিমার কেমিষ্ট্রিতে গবেষণার জন্য। 
হুমায়ূন আহমেদের বৈবাহিক জীবন ও অন্যান্য সাফল্য গাঁথা একপাশে রেখে (আলোচনায় না এনে) তাঁর জাদু জীবনের অজানা কথা ভক্তকুল তথা পাঠক সমাজের জন্য তুলে ধরার লোভ সংবরণ করতে পারছি না।
 

প্রথম জাদু প্রেমঃ শৈশবের একটা সময় হুমায়ুন আহমেদ কাটিয়ে ছিলেন সিলেটের মীরা বাজারে। সময় ও সুযোগ পেলেই একা একা ঘুরে বেড়াতেন। তাঁর অন্যতম আকর্ষন ছিল সিনেমা হলের পোষ্টার দেখা। একদিন দিলশাদ সিনেমা হলের সামনে দিয়ে যাচ্ছেন হুমায়ূন আহমেদ, দেখেন একজন ম্যাজিসিয়ান ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। অদ্ভুত ম্যাজিক। কাঠের একটি তক্তার সঙ্গে গা লাগিয়ে দু’হাত দুই দিকে দিয়ে যীশুখ্রিষ্ট্রের ক্রশবিদ্ধ ভঙ্গিতে এক মায়াকাড়া চেহারার বালিকা দাঁড়িয়ে রয়েছে।
কিশোরীর দশ বার ফুট দুরত্বে চোখ বাঁধা অবস্থায় দাঁড়িয়ে ম্যাজিসিয়ান, তার হাতে ধারালো ছুরি। ম্যাজিসিয়ান দ্রুতগতিতে বালিকাটির দিকে ছুরি ছুড়ে মারছেন। ছুরি বালিকার গা ঁেঘষে কাঠের তক্তায় বিঁধে যাচ্ছে বালিকার গায়ে লাগছে না। একসময় বালিকাকে ঘিরে ছুরির বলয় তৈরী হলো। সে এক অদ্ভুত রোমাঞ্চকর ম্যাজিক। হুমায়ূন আহমেদ সেদিনই প্রথম ম্যাজিকের প্রেমে পরেন।
জাদুবিদ্যায় হাতে খড়ি ঃ ১৯৬৫ সাল। হুমায়ূন আহমেদ ঢাকা কলেজে ইন্টারমিডিয়েটে ভর্তি হয়েছেন। লেখা-পড়ার চাপ তেমন একটা শুরু না হওয়ায় ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে বেড়াতেন। কোন একদিন ঘুরে বেড়াতে বেড়াতে এক হকার ম্যাজিসিয়ানের দেখা পেলেন। দেখলেন, ম্যাজিসিয়ান পথের ধারে লোক জড়ো করিয়ে ম্যাজিক দেখাচ্ছেন। হুমায়ূন আহমেদ  ম্যাজিসিয়ানের  ম্যাজিক দেখে মুগ্ধ। তাঁর  শৈশবের জাদু প্রেম আবারও জাগ্রত হলো। ম্যাজিসিয়ানের ম্যাজিক দেখে যখন সবাই চলে গেলো জাদু প্রেমিক হুমায়ূন আহমেদ তখন ম্যাজিসিয়ানকে অনুরোধ করলেন তাকে জাদু শিখাতে। ম্যাজিসিয়ান টাকার বিনিময়ে কয়েকটি ম্যাজিক হুমায়ূন আহমেদকে শিখিয়ে দিলেন। হুমায়ূন আহমেদ যেন হাতে আকাশের চাঁদ পেলেন। চর্চার মাধ্যমে রপ্ত করতে লাগলেন ম্যাজিক গুলি। হুমায়ূন আহমেদ প্রবেশ করলেন ইন্দ্রজালের মায়বী ভুবনে।  
একনিষ্ঠ জাদু সাধনা ঃ হুমায়ূন আহমেদের জাদুগুরু পথে পথে ম্যাজিক দেখাতেন আর থাকতেন চাঁনখারপুলে এক  বস্তিতে। জাদু প্রেমের তীব্র আকর্ষণে হুমায়ূন আহমেদ প্রায়ই চলে যেতেন চাঁনখারপুলের সেই বস্তিতে তাঁর জাদুগুরুর কাছে জাদু শিখতে।
টিফিনের টাকা দিয়ে টিফিন না খেয়ে (অভুক্ত থেকে) ম্যাজিসিয়ানের কাছ থেকে ছোট ছোট ম্যাজিকের সরঞ্জাম কিনতেন তিনি এবং নিরবে চালিয়ে যেতেন একনিষ্ঠ জাদু সাধনা। এ এক অভূতপূর্ব জাদুপ্রেম। মাঝে মাঝে মাঝ রাতে  যখন গুলতেকিনের নিদ্রা ভঙ্গ হত তিনি দেখতেন লেখক একনিষ্ঠ জাদু সাধনায় মত্ত ! এক সময় হুমায়ূন আহমেদ বুঝলেন এই বিদ্যায় আরো ব্যুৎপত্তি লাভ করতে হলে তাঁকে মর্ডান ম্যাজিক সম্পর্কে  খোঁজ  খবর নিতে হবে। আর তাই তিনি যখনই বিদেশে যেতেন, খবর নিতেন সেই দেশে কোথায় ম্যাজিক শপ আছে, সেখান থেকে সংগ্রহ করতেন জাদু বিদ্যার বই, ডিভিডি, বৈঠকী ও ক্লাব ম্যাজিক। এই সংগ্রহও ছিল বিশাল। 
বাড়ীতে হুমায়ূন আহমেদের বাবার ছিল পারিবারিক লাইব্রেরী। তাতেও ছিল প্রচুর বই। সেখানে  প্ল্যানচেট (পরলোক থেকে মৃত প্রাণীর আত্মা আনার) বইও ছিল। প্ল্যানচেট এর মাধ্যমে আত্মা আনার চেষ্টা করতেন হুমায়ূন আহমেদ। পরলোক থেকে আত্মা আনার চেষ্টাকালে একদিন মহা বিপদেও পড়েছিলেন তিনি। 
হুমায়ূন আহমেদের জাদু প্রদর্শন ঃ জাদুবিদ্যা রপ্ত ও চর্চা করে হুমায়ূন আহমেদ কোথায় তা প্রদর্শন করতেন ? কলেজ ও ইউনিভার্সিটির লম্বা ছুটিতে হুমায়ূন আহমেদ যখন ছুটি কাটাতে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে মিলিত হতেন তখন তিনি ম্যাজিক দেখিয়ে পরিবারের সদস্যদের অবাক করে দিতেন। কিন্তু তাঁর মা চিন্তা করতেন ছেলে আমার জাদু চর্চা করে, পড়াশুনা করে কখন ? এছাড়া হুমায়ূন আহমেদ জাদু প্রদর্শন করতেন তাঁর ইউনিটের লোকজনের সামনে, বন্ধু মহলে, বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের সামনে। এক আড্ডায় হুমায়ূন আহমেদ জাদু দেখিয়ে তাক লাগিয়ে দিয়েছিলেন ভারতের বিশিষ্ট লেখক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়কে। লেখক সুনীল গঙ্গোাপাধ্যায়কে এ্যাসট্রে থেকে একটু ছাই তুলে নিতে বললেন এবং তুলে নেওয়া ছাই অন্য হাতের পিঠে ঘষে ঘষে মিলিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিলেন, তাই করেলেন সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় । এবার  তাঁর সেই হাত উল্টে দেখতে বললেন জাদুশিল্পী হুমায়ূন আহমেদ । হাত উল্টে দেখতেই সেখানে উপস্থিত সকলে বিস্মিত। একি, হাতের পিঠের ছাই হাত ভেদ করে তালুতে চলে গেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় তো হতবাক!  উপরোক্ত ম্যাজিকটি  বিশ্বনন্দিত জাদুশিল্পী জুয়েল আইচ একাধিক আড্ডায় হুমায়ূন আহমেদকে  দেখাতে দেখে মন্তব্য করেন- এই ম্যাজিকটি শুরুর আগে ম্যজিসিয়ানের সামান্য পূর্ব প্রস্তুতির দরকার হয়। হুমায়ূন ভাই সবার মধ্যে বসেই সেই প্রস্তুতির কাজটি  সেরে নিতেন। এই কাজটি কখন সারতেন  আমার চোখে কোনদিন তা পড়েনি । আমার কাছে এটাই সবচেয়ে বড় ম্যাজিক! হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে বলতে গেলে বা লিখতে গেলে তাঁর নামের পূর্বে যে সমস্ত বিশেষণ যুক্ত করা হয় তা হলো - বিশিষ্ট কথা সাহিত্যিক, ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক, গীতিকার, সুরকার, চিত্রশিল্পী ইত্যাদি। জাদুশিল্পী কথাটি খুব কম ক্ষেত্রেই তুলে ধরা হয় (হয় না বলেলেই চলে)। অথচ জাদুশিল্পী হিসেবে তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত। তাঁর এই বিশেষ গুণটির কথা পাশ কাটিয়ে যাওয়া উচিৎ কি ? বৈঠকী ম্যাজিক ও মিসডাইরেকশন জাতীয় ম্যাজিকের ক্ষেত্রে হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন অত্যন্ত ইর্ষণীয়। তাঁর হস্ত কৌশলযুক্ত ম্যাজিক ম্যাজিসিয়ানদেরও তাক্ লাগিয়ে দিতো। তাঁর সহজ সরল ও স্বাভাবিক নিজস্ব ঢংঙের প্রদর্শন ভঙ্গি  প্রদর্শিত ম্যাজিককে করে তুলতো আরো আকর্ষণীয়। চ্যানেল আইয়ের ক্ষুদে গানরাজ অনুষ্ঠানে বিচারকের  দায়িত্ব পালন করতে এসে অনুষ্ঠানের এক পর্যায়ে চমৎকার ম্যাজিক দেখিয়েছিলেন  হুমায়ূন আহমেদ ।
হুমায়ূন আহমেদ বহু নাটকে জাদু বিদ্যাকে তুলে ধরেছেন যা জাদু বিদ্যার প্রতি তার দুর্বলতারই বহিঃপ্রকাশ। তাঁর লেখা ম্যাজিক মুন্সী বইটি তাঁর একটি ব্যক্তিক্রম ধর্মী বই। 
ইন্টারন্যাশনাল ব্রাদারহুড অফ ম্যাজিসিয়ান্স (আমেরিকায় অবস্থিত) ম্যাজিসিয়ানদের একটি সর্ববৃহৎ জাদু সংগঠন। সারা বিশ্বে রয়েছে এই সংগঠনের অসংখ্য  রিং (শাখা)। 
সারাবিশ্বে রয়েছে এই সংগঠনের অজস্র সদস্য। হুমায়ূন আহমেদ ছিলেন এই আন্তর্জাতিক জাদু সংগঠনের একজন সম্মানিত সদস্য। জাদু শিল্প ও জাদু শিল্পীদের জন্য ছিল তাঁর অকৃত্রিম ভালবাসা। হুমায়ূন আহমেদের সঙ্গে একান্তে বহু আড্ডা দেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল বলেই আজ উপরোক্ত কথাগুলি গর্বের সাথে বলতে পারছি। 
 

জাদুর ছোঁয়া সর্বত্র ঃ প্রকৃত অর্থে তাঁর কর্মের প্রতিটি ক্ষেত্রে সাফল্য ছিল ম্যাজিকের মত। তাঁর চলচ্চিত্র ও নাটক মানুষকে আকর্ষণ করে ইন্দ্রজালের মত। তাঁর হাতের কলম লিখে গেছে কতশত জাদুকরি লেখা- আর তাইতো তাঁকে বলা হয় কলমের জাদুকর। হুমায়ূন আহমেদ ১৯৬৮ সালে তৎকালীন পাকিস্তান টেলিভিশনে চমকপ্রদ জাদু প্রদর্শন করেন। তাঁর বেশ পরে ১৯৭২ সালে তার প্রথম উপন্যাস “নন্দিত নরকে” প্রকাশিত হয়। যদি তথ্য উপাত্তে এটাই প্রমাণিত হয় যে, লেখালেখির আগেই হুমায়ূন আহমেদ হয়ে উঠেছিলেন জাদুশিল্পী। আর যদি তাই হয়, ভবিষ্যৎ দ্রষ্টারমত হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন ম্যাজিকের চাইতে লেখালেখিতেই তাঁর জন্য অপেক্ষা করছে সোনালী ভবিষ্যৎ হয়তো তাই ঁিতনি রেখে দিয়েছিলেন জাদুদণ্ড আর হাতে তুলে নিয়েছিলেন কলম। কিšু— ইন্দ্রজালের ভুবন থেকে বেরুনো সম্ভব হলোনা তাঁর।  তিনি উপাধি পেয়ে গেলেন কলমের জাদুকর হিসাবে। মহান এই শিল্পমনা মানুষটি ম্যাজিকের মতই গত ১৯ জুলাই ২০১২ হঠাৎ পৃথিবী নামের এই রঙ্গমঞ্চ থেকে চিরতরে ভ্যানিস হয়ে গেলেন।
 
সিডনী

 


Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে