Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, রবিবার, ১৬ জুন, ২০১৯ , ১ আষাঢ় ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.0/5 (10 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০১-১৫-২০১৯

জঞ্জাল সরানোর এটাই শেষ সুযোগ

রাজীব আহাম্মদ


জঞ্জাল সরানোর এটাই শেষ সুযোগ

'তৃতীয় বিশ্বে টানা দুইবার ক্ষমতায় থাকা অনেক বড় ব্যাপার। আওয়ামী লীগ সেখানে টানা তৃতীয়বার ক্ষমতায় এসেছে। সরকার দাবি করছে, খুবই সবল তারা। রাজধানীর প্রাণঘাতী গণপরিবহনে এ সরকার যদি শৃঙ্খলা ফেরাতে পারে, তা হলে তাদের দাবির যথার্থতা প্রমাণ হবে। এবার যদি পরিবহন খাতের নৈরাজ্য ও অনিয়ম-দুর্নীতি দূর না হয়, তা হলে হয়ত আর কখনোই হবে না; গত কয়েক দশকে ভ্রান্তনীতির কারণে এ খাতে যে জঞ্জালের পাহাড় সৃষ্টি হয়েছে, তা আর কখনোই সাফ করা সম্ভব হবে না।

এটাই শেষ সুযোগ।'

এ প্রতিবেদককে দেওয়া সাক্ষাৎকারে এসব কথা বলেছেন গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। রাজধানীর গণপরিবহন ব্যবস্থা, যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও মহাসড়ক ব্যবস্থাপনা নিয়ে কথা বলেন তিনি।

রাজধানীর সড়কে বিশৃঙ্খলার জন্য বাস্তবতাবর্জিত 'রুট পারমিট'কে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেছেন, ঢাকার মতো মাত্র ৩০৬ বর্গকিলোমিটারের ছোট শহরে রুটের সংখ্যা ২৭৬। এত রুট পৃথিবীর কোনো শহরে নেই। যার যখন ইচ্ছা হয়েছে পরিবহন ব্যবসায় নেমেছেন। নতুন নতুন রুটের অনুমোদন নিয়েছেন। যারা অনুমোদনের দায়িত্বে রয়েছেন, তাদের এ বিষয়ে পেশাগত শিক্ষা ও অভিজ্ঞতা নেই। তা ছাড়া যিনি চেয়েছেন তাকেই অনুমোদন দিতে হয়েছে রাজনৈতিক চাপেও। রাজধানীতে রুটের সংখ্যা পাঁচ থেকে ছয়ে নামিয়ে আনা উচিত বলে মনে করেন তিনি।

সামছুল হক বলেন, বাস রুট র‌্যাশনালাইজ পদ্ধতিতে একটি রুটে একটি কোম্পানির বাস চলবে। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে না। যাত্রী পেতে রেষারেষি হবে না। ওভারটেক করার প্রবণতা থাকবে না। ঢাকায় রুটের ছড়াছড়ির কারণেই বাসে বাসে রেষারেষি, প্রতিযোগিতা ও প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটছে।

রাজধানীতে বাসের রুটের সংখ্যা কমিয়ে এনে 'বাস রুট র‌্যাশনালাইজেশনের' প্রস্তাব করা হয়েছে এক দশক আগে। ২০১৫ সালে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভা থেকে এ প্রকল্প বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু এখনও কাজ শুরু হয়নি। সামছুল হক বলেন, বাংলাদেশে সুপারিশের কোনো অভাব নেই। সমস্যা চিহ্নিত করা হয়, সমাধানও চিহ্নিত করা হয়। কিন্তু বাস্তবায়নের সময় উল্টোপথে হাঁটা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ যদি বাস্তবায়ন না হয়, তা হলে কার নির্দেশে কাজ হবে!

ঢাকার পরিবহনের দায়িত্বে রয়েছে সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ঢাকা যানবাহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ), ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ (ডিএমপি), ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনসহ অন্তত এক ডজন সংস্থা। সামছুল হক বলেন, এসব প্রতিষ্ঠানের একটিরও সক্ষমতা নেই। ট্রাফিক বাতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব এমন ব্যক্তির হাতে, যার এ বিষয়ে কোনো পড়াশোনাও নেই, দক্ষতাও নেই। প্রতিষ্ঠানগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, নয়ত কোনো কাজ হবে না।

এ পরিস্থিতির জন্য রাজনৈতিক নেতৃত্বকে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, দেশে উন্নয়নের একটি ভ্রান্ত ধারণা তৈরি হয়েছে। সব সংস্থা ফ্লাইওভার ও এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে করতে চায়। কারণ, এগুলো দৃশ্যমান বিশাল অবকাঠামো। এগুলো করলে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত লাভও হয়। তাই বলা হয়, বড় অবকাঠামো মানেই বড় উন্নয়ন। অথচ ব্যবস্থাপনার দিকে কোনো নজর নেই। কোনো টাকা খরচ না করেই বাস রুট পুনর্বিন্যাস, সড়ক ও ফুটপাত দখলমুক্ত ও লেন পদ্ধতি চালু করার মতো কাজ সম্ভব। এভাবে অর্ধেক সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। কোনো প্রকল্প নয়, নীতি সংস্কার করে এ কাজগুলো করা সম্ভব।

রাজধানীতে প্রাইভেটকার নিরুৎসাহিত করে গণপরিবহনকে প্রাধান্য দেওয়ার সুপারিশ করা হয় ১৯৯৮ সালের 'ঢাকা আরবান ট্রান্সপোর্ট প্ল্যানে'। কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) ও সংশোধিত কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাতেও (আরএসটিপি) গণপরিবহনকে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে তার উল্টো হচ্ছে বলে মনে করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, এসটিপি ও আরএসটিপিতে গণপরিবহনবান্ধব মেট্রোরেল ও বাস র‌্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) করার পরিকল্পনা রয়েছে।

কিন্তু তা না করে করা হয়েছে ফ্লাইওভার। বিআরটির কাজের গতি নেই। ঢাকায় আটটি ফ্লাইওভার করে প্রাইভেটকারকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আটটি ফ্লাইওভার নির্মাণের পরও ঢাকায় গাড়ির গতি গত দেড় দশকে এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে। তার মানে ফ্লাইওভার যানজট না কমিয়ে বাড়িয়েছে। অথচ এখনও ফ্লাইওভার বানানোর প্রতিযোগিতা থেকে কর্মকর্তারা বের হতে পারেননি। বিআরটির জন্য নির্ধারিত করিডোরে কাকরাইল থেকে ঝিলমিল পর্যন্ত আরেকটি ফ্লাইওভার করা হয়েছে। ফ্লাইওভার ও অপরিকল্পিত উন্নয়নের কারণে ঢাকা বরং থমকে গেছে।

মহাসড়ক নির্মাণে উচ্চ ব্যয় এবং এর দুরবস্থার জন্যও নীতি দুর্বলতা ও সুশাসনের অভাবকে দায়ী করেন সামছুল হক। সমকালকে তিনি বলেন, পরিবহন খাতের সংস্থাগুলোর মধ্যে একমাত্র সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের দক্ষ ও প্রয়োজনীয় পেশাগত শিক্ষিত জনবল রয়েছে। কিন্তু এ সংস্থাটির জনবলকে কাজে লাগানোই হয় না। মহাসড়ক নির্মাণের মূল দায়িত্ব পালন করে পরামর্শক সংস্থাগুলো। যদিও বাংলাদেশে কোনো ভালো পরামর্শক প্রতিষ্ঠানই আসে না। বরং যেসব পরামর্শক আসে, তাদের কারণে কাজের গুণগত মান রক্ষা করা যায় না। প্রকল্প নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়ন হয় না। ফলে প্রকল্প ব্যয় বাড়তে থাকে। এ কারণে বাংলাদেশে সড়ক নির্মাণ ব্যয় পৃথিবীতে সর্বোচ্চ। মহাসড়কের দুর্বলতার জন্য দীর্ঘ নির্মাণ সময়কে দায়ী করেন সামছুল হক। তিনি বলেন, পাঁচ-ছয় বর্ষা ধরে কাজ করা হয়। কাজ শেষ হতে না হতেই রাস্তা ভাঙতে শুরু করে।

মহাসড়কে নৈরাজ্যের জন্য দায়ী কে?-এমন প্রশ্নের উত্তরে আইন প্রয়োগের দুর্বলতাকে দায়ী করে সামছুল হক বলেন, পৃথিবীর কোনো মহাসড়কের পাশেই স্থাপনা থাকে না। অথচ এ দেশে মহাসড়কের পাশে হাটবাজার, দোকানপাট, রাজনৈতিক কার্যালয়, গাড়িঘর, কারখানা সব রয়েছে। মহাসড়কের পাশে এত ঘন স্থাপনা থাকায় বৃষ্টি হলে রাস্তা থেকে পানি নিস্কাশনের পথই থাকে না। পানি না সরলে রাস্তা ভাঙবেই। মহাসড়কের পাশের জায়গা সরকারি, সেখানকার স্থাপনাগুলো নিশ্চিতভাবেই অবৈধ। অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে টাকার দরকার হয় না। প্রয়োজন শুধু সদিচ্ছা, সাহস ও রাজনৈতিক সমর্থন। বর্তমান সরকার গণতান্ত্রিক, তারা যদি এ কাজ করতে না পারে তা হলে কে করবে!

সড়কের দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের দক্ষতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন সামছুল হক। তিনি বলেন, একটি চাকার ট্রাকের পণ্য পরিবহনের ক্ষমতা ১৫ টন। এ ট্রাককে ২২ টন পণ্য বহনের অনুমতি দিয়েছে সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়। এর চেয়ে অবৈজ্ঞানিক কাজ আর হতে পারে না। সারা বিশ্বে যদি এই ট্রাক ১৫ টনের বেশি পণ্য বহনের অনুমতি না পায়, বাংলাদেশে কেন পাবে? বলা হয়, ব্যবসায়ীদের চাপে অতিরিক্ত পণ্য বহনের অনুমতি দিতে বাধ্য হয় মন্ত্রণালয়। যদি মন্ত্রণালয়কে ব্যবসায়ীদের চাপই সইতে হয়, তা হলে সরকার থাকার কি দরকার? অতিরিক্ত পণ্যবাহী যানবাহন রাস্তা ভাঙছে, দুর্ঘটনা ঘটছে। মহাসড়কের অধিকাংশ ট্রাক, বাস, কাভার্ডভ্যান, লরির বডি বা নকশা ঠিক না থাকলেও বছরের পর বছর সড়কে চলছে। বিআরটিএ থেকে ফিটনেস সনদ পাচ্ছে! বছর শেষে দাবি করছে, তারা সফল সংস্থা, কারণ সরকারি কোষাগারে হাজার কোটি টাকা জমা দিতে পেরেছে। অথচ বিআরটিএর দায়িত্ব সরকারের জন্য আয় করা নয়, সড়কে শৃঙ্খলা রক্ষা করা।

সারাদেশে অন্তত ১৫ লাখ অবৈধ যানবাহন চলছে। ইজিবাইক আমদানিতে বাধা না থাকলেও সড়কে চলাচল নিষিদ্ধ। ড. সামছুল হক বলেন, নৈরাজ্যের সবচেয়ে বড় উদাহরণ এটি। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় যখন ইজিবাইক আমদানির অনুমোদন দিয়েছে তারা চিন্তাই করতে পারেনি এ বাহনটি কী ভয়ঙ্কর সমস্যা তৈরি করবে ভবিষ্যতে। এখন সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়, সর্বোচ্চ আদালত থেকে নির্দেশনা দিয়েও কাজ হচ্ছে না। কারণ, হিসেবে বলা হচ্ছে, এসব অবৈধ যান বন্ধ করলে ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষ বেকার হয়ে যাবেন। ২০ বছর পর কী হবে এখনই চিন্তা করতে হবে, কারণ এটাই শেষ সুযোগ।

আর/০৮:১৪/১৫ জানুয়ারি

সাক্ষাৎকার

আরও সাক্ষাৎকার

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে