Deshe Bideshe

DESHEBIDESHE

ইউনিজয়
ফনেটিক
English
টরন্টো, মঙ্গলবার, ২০ আগস্ট, ২০১৯ , ৫ ভাদ্র ১৪২৬

গড় রেটিং: 3.1/5 (64 টি ভোট গৃহিত হয়েছে)

আপডেট : ০৭-১৮-২০১৩

হুমায়ূন আহমেদ নেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়

বিশ্বজিত সাহা



	হুমায়ূন আহমেদ নেই বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়
১.দূরারোগ্য ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে দ্বিতীয় দফা অস্ত্রোপচারের ২৯দিন পর গত ২০১২ সালের ১৯ জুন নিউইয়র্ক সময় দুপুর ১টা ২৩ মিনিটে নিম্ন রক্তচাপ-এর ফলে তাঁকে চিকিৎসকেরা বাঁচিয়ে রাখতে ব্যর্থ হন। প্রায় তিন সপ্তাহ লাইফ সাপোর্টে থাকার পর অনেকটা নীরবে নিভৃতে কিছু না বলেই চলে গেলেন বাংলা ভাষার কিংবদন্তী লেখক হুমায়ূন আহমেদ। ১৯ জুলাই ২০১২ থেকে ১৯ জুলাই ২০১৩। স্যার আপনি আমাদের কাছ থেকে চলে গেলেন এক বছর হয়ে গেলো। আমরা ভুলি কিভাবে আপনাকে। আপনি যে বাঙালীর মননে, স্বপ্নে, চেতনায়, হৃদয় জুড়ে রয়েছেন। একসময় আমরা রোমেনা আফাজ, কাজী আনোয়ার হোসেন পড়ে যারা পাঠ্য বইয়ের বাইরে পড়া শুরু করেছি তাদের আপনি আপনার লেখা দিয়ে নতুন দিগন্তে উড়ার স্বপ্ন দেখালেন। উপন্যাস, গল্প, ভ্রমণকাহিনী, সায়েন্স ফিকশন, মিসির আলী, হিমু দিয়ে তন্দ্রাচ্ছন্ন্ করে রেখেছিলেন প্রায় ৪০ বছর। ২০১৩ সালের বইমেলায়ও পেয়েছি আমরা আপনার সর্বশেষ উপন্যাস। স্যার আমরা এখন কি পড়বো? আমার বিশ্বাস হুমায়ূন আহমেদের সকল পাঠকেরই এই একই প্রশ্ন। হুমায়ূন ভক্তদের মাঝে বিশাল শূণ্যতা। তাইতো তাঁর চলে যাওয়ার এক বছর পরও বাংলাদেশসহ পৃথিবীর যেখানে বাঙালী আছেন সেখানে স্মরণ করা হচ্ছে তাঁর স্মৃতিকে। শারীরিকভাবে আমরা হুমায়ূন আহমেদকে না পেলেও তিনি চিরদিন থাকবেন আমাদের হৃদয়ে। স্যার আপনি নেই, বিশ্বাস করতে ভীষণ কষ্ট হয়। 
মৃত্যুর একবছরের মাথায় বারবার মনে পড়ছে সেইসব দিনগুলোর কথা: 
 
প্রচন্ড মানসিক শক্তির অধিকারী হুমায়ূন আহমেদকে ক্যান্সার পরাস্ত করতে পারেননি। ১২টি কেমো থেরাপী বা প্রথম অস্ত্রোপচারের পরও হুমায়ূন আহমেদকে কখনো বিমর্ষ দেখায়নি। প্রডন্ড ঠাট্টা তামাশার মাঝে তাঁর অসুস্থতা, কেমোর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ায় নিউইয়র্কের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে টুপি খুলে চুল পড়ে যাওয়া দেখানো, শরীরের চামড়া পড়ে যাওয়ায় ‘সর্পরাজ’ বলে রসিকতা সহ নিজের মৃত্যুর আগে দাওয়াত করে কুলখানি খাওয়ানোসহ বিভিন্ন রসিকতা করে গেছেন অবলীলায়। সেই মানুষটি কিছুই বলে যেতে পারেন নি, কিছু লিখে যেতে পারেননি শেষ মূহুর্তে। জুনের শেষ সপ্তাহে মুখে বলতে পারেননি, তবে লিখে জানতে চেয়েছিলেন কবে তাঁর শরীর থেকে এসব যন্ত্রপাতি খোলা হবে। কবে তিনি আরোগ্য লাভ করে বাসায় যাবেন? কখনোই তিনি ভাবতে পারেননি তিনি এভাবে চলে যাবেন। আমার এখনো জ্বল জ্বল করছে প্রথম অস্ত্রোপচারের আগে সার্জেন্ট মিলারকে নিজেই জিজ্ঞেস করেছিলেন  কত শতাংশ নিশ্চয়তা রয়েছে তাঁর ভালো হবার। ডাক্তার সাহেব বলেছিলেন - আমি অস্ত্রোপচার করলে শতভাগ। উজ্বল হয়ে গিয়েছিল হুমায়ূন আহমেদ-এর দুচোখ। এবং তারপর অনেক আনন্দ নিয়ে মা মাতৃভূমি আর অতি ভালোবাসার নুহাশপল্লী দেখতে গিয়েছিলেন হুমায়ূন আহমেদ।
হুমায়ূন আহমেদ দেশ থেকে ফিরে এলেন যেন আনন্দ উৎসব করে। বললেন, অনেক ভালো লেগেছে দেশে গিয়ে। মা’কে নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ-এর ভালোবাসার শেষ নেই। মা  ছেলের চিকিৎসার জন্য দিয়েছেন সারা জীবনের সঞ্চয়। তাইতো মুহম্মদ জাফর ইকবাল হুমায়ূন আহমেদ-এর অকাল মৃত্যুর পরপরই বেলভ্যু হাসপাতালে বললেন, দাদাভাইর মৃত্যু মা  মেনে নিতে পারবেন না।  
 
 

২০১২ সালে দেশ থেকে আসার পর হুমায়ূন আহমেদ এর ভালো লাগার গল্প প্রায় প্রতি সন্ধ্যায় হতো। বিশেষ করে সুস্বাদু বাঙালি খাবারের গল্প। আমি ঢাকায় গিয়েছিলাম ফেব্রুয়ারীর বইমেলায়, এরপর আবার নিউইয়র্কের বইমেলার প্রয়োজনীয় কাজ করতে মার্চে। প্রতিবারই দুসপ্তাহের জন্য ছিলাম। একবারও আমি হুমায়ূন আহমেদকে আগে থেকে জানাইনি ঢাকায় যাচ্ছি। যেদিন ফ্লাইট ছিল সেদিনই তিনঘন্টা আগে গিয়ে বলেছি, আমি ঢাকায় যাচ্ছি। মাঝখানে একটি থেরাপীর সময় আমি শুধু ছিলামনা। আর একটি থেরাপীর আগের দিন নিউইয়র্কে পৌঁছে গেছি। বলে গেছি হুমায়ূন ভাই আমি নেই, রুমা (আমার স্ত্রী রুমা সাহা) আছে। আপনি চিন্তা করবেন না। একটি বিষয়ে গত ৯ মাসে উনি নিশ্চিত ছিলেন, ডাক্তারের এপয়েন্টমেন্ট থাকলে সে আমাদের গাড়ী দিয়ে হোক বা সাবওয়ে হোক বা অন্য কারো গাড়ী করে নিয়ে যাবার জন্যে বিশ্বজিত হাজির থাকবেই। উনার এ বিশ্বাস-এর কখনো অমার্যাদা হয়নি। এনিয়ে অনেক সময় অনেক কথাও হয়েছে। দেখা গেছে হুমায়ূন আহমেদকে বাসায় গিয়ে ঘুম থেকে উঠিয়েও হাসপাতালে নিতে হয়েছে। অনেক স্মৃতি, অনেক কথা। ১৯৮৭ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত ‘আনন্দপত্র ঈদ সংখ্যায়’ প্রকাশিত উপন্যাস ‘প্রিয়তমেসু’ নিতে গিয়ে হুমায়ূন আহমেদ এর সাথে ঘনিষ্ঠতা। ২০১২ সালের ১৯ জুন অপরাহ্নে ২৫ বছরের একটি সম্পর্কের ছেদ, একটি বন্ধনের অবসান। 

আমার এখনো মনে আছে হুমায়ূন আহমেদ-এর যখন দ্বিতীয় কেমো থেরাপী চলছে স্লোন মেমোরিয়াল হাসপাতালে, সেদিন সকালে হুমায়ূন আহমেদ আমাকে বললেন বিশ্বজিত ক্যান্সারের চিকিৎসা শেষে এবার হার্টেরও চেকআপ করিয়ে যাবো। চোখের নীচে কালো দাগ দেখিয়ে বললেন, ডারমোটলজির এপয়েন্টমেন্ট করতে। গতবার ২০০১ সালে তুমি বেলভ্যু হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলে কিন্তু আমি চিকিৎসা না করে চলে গেছি। এবার চিকিৎসা করিয়ে যাবো। কেমো নিতে তিন ঘন্টার মতো লাগতো সময়, এরপর পোটেবল থেরাপী সঙ্গে দিয়ে হুমায়ূন আহমেদকে বাড়ী পাঠিয়ে দেয়া হতো। সেদিনই কেমো নেয়ার ফাঁকে আমি বেলভ্যু হাসপাতালে খোঁজ নিতে যাই। এসে বললাম, কাগজপত্র নিয়ে এসেছি, বাকিগুলো জমা দিয়ে আপনার হাসপাতাল কার্ড করবো। তারপর এক এক করে সব চিকিৎসা শেষ করে ভালো হয়ে দেশে ফিরে যাবেন। 
কোনকিছু অপছন্দ হলে স্যার সরাসরি বলে দেন। এর প্রয়োজন নেই বা অন্যকিছু।  কোন এক প্রসঙ্গে এরপরই কেমো থেরাপীর খরচ জানার জন্য একদিন বেলভ্যু হাসপাতালে যাই। পুরো একাউন্ট সেকশন ঘুরেও আমি জানতে পারিনি সিটি হাসপাতালে এর খরচ কতো। দুজন বাঙালি কাজ করেন, এ ডিপাটমেন্টে। তাঁরা চেষ্টা করেও আমাকে জানাতে পারেনি। আমার শ্বাশুড়ীমার রেফারেন্সে পরিচয় হলো বেলভ্যু হাসপাতালে কর্মরত রনি বড়–য়ার সঙ্গে। এরই মধ্যে হুমায়ূন ভাইরা বেড়াতে যাবেন লেখক জ্যোতিপ্রকাশ দত্ত ও পূরবী বসুর ডেনভারের বাড়ীতে। মহা আয়োজন। যাবার দিন কাগজপত্রে স্বাক্ষর করে দিয়ে গেলেন, এসে পেলেন হাসপাতালের কার্ড। আমেরিকায় যারা থাকেন, তাদের সকলেই জানেন, কারো অনুপস্থিতিতে কি কখনো তার হাসপাতালের কার্ড হয়। হুমায়ূন আহমেদ-এর বেলায় সেটাই হয়েছিল।  তারপর হুমায়ূন আহমেদ ডেনভার থেকে ফিরে আসলেন। এসেই পেলেন বেলভ্যুর এপয়েন্টমেন্ট। আগে থেকেই আমি এপয়েন্টমেন্ট করে রেখেছি। এবং অঙ্কোলজিস্ট ডাঃ জেইনের অধীনে চিকিৎসা শুরু। কাড়ি কাড়ি নগদ টাকা দিয়ে স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালে চিকিৎসা করাতে হয়নি। এভাবেই স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতাল থেকে লেখক হুমায়ূন আহমেদ এর বেলভ্যু হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু হয়। এর পর আর্থিকভাবে কারো কাছে দ্বারস্ত হতে  হয়নি তাঁকে। বিক্রি করতে হয়নি নিজের গড়া কোন সম্পত্তি। ঋণ নিয়ে হুমায়ূন আহমেদ সবসময় চিন্তিত থাকতেন। পত্রিকায় সাক্ষাৎকারেও বলেছেন চ্যানেল আই-এর ঋণ তিনি দেশে গিয়ে শোধ করে দেবেন। মেমোরিয়াল স্লোন ক্যাটারিং হাসপাতালের পাঁচটি থেরাপীর খরচ বহন করার পর চিকিৎসার জন্য আর কোন খরচ বহন করতে হয়নি হুমায়ূন আহমেদকে। মুক্তধারা এবং আমাদের পরিবারের সদস্য হিসেবে বেলভ্যু হাসপাতালে মেডিকেইড করিয়ে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হয়। 
 
 

২০১২ সালের নিউইয়র্কের বইমেলা নিয়েও ছিল হুমায়ূন আহমেদ-এর অনেক স্বপ্ন। একদিন নিজে থেকেই বললেন বিশ্বজিত এবারের বইমেলায় একটি অনুষ্ঠান হবে ‘শতবর্ষের বাংলা গান’। টপ্পা থেকে শুরু করে হাল আমলের গান পর্যন্ত। প্রতিটি গানের শুরুতে গানটির ইতিহাস হুমায়ূন আহমেদ বলবেন। তখন আলো পড়বে হুমায়ূন আহমেদ-এর ওপর। এরপর গান করবেন মেহের আফরোজ শাওন, তখন আলো থাকবে তাঁর ওপর। গান শেষে আলো পড়বে যন্ত্রীদের ওপর। হুমায়ূন আহমেদ-এর স্বপ্নের অনুষ্ঠানটি হলোনা, হলো না তাঁকে সম্মাননা জানানোর অনুষ্ঠানটি। হয়েছিলো তাঁর আঁকা প্রথম চিত্র প্রদর্শনী। ২০টি ছবি স্থান পায় এই প্রদর্শনীতে। এটিই হলো হুমায়ূন আহমেদ-এর জীবদ্দশায় তাঁর ছবির প্রথম ও শেষ প্রদর্শনী। সেময় তিনি ছিলেন বেলভ্যু হাসপাতালের সিসিউতে। আসতে পারলেন না হুমায়ূন আহমেদ বইমেলায়। 

গত ১৩ নভেম্বর ২০১১ জ্যাকসন হাইটসের মুক্তধারায় অনুষ্ঠিত হয় হুমায়ূন আহমেদ-এর ৬৩তম জন্মদিন। স্কাইপিতে নিজের টুপি খুলে সবাইকে অবাক করে দেন, তেমনি গ্রহণ করেন জন্মদিনের সিক্ত ভালোবাসা। হুমায়ূন আহমেদ-এর জন্মদিনকে ঘিরে নিউইয়র্কের মুক্তধারা যেভাবে সাজানো হয়েছে তা ছিল দেখার মতো। ৭দিনব্যাপী চলে হুমায়ূন আহমেদ-এর বইয়ের প্রদর্শনী। পিতার হয়ে কেক কাটেন পুত্র নিষাদ সে জন্মদিনে। জন্মদিন উপলক্ষে প্রকাশিত হয় রংপেন্সিল নামক গ্রন্থ। মোড়ক উন্মোচন করেন গোলাম মুরশিদ। 
 
হুমায়ূন নিজেই বলতেন ২০০২ সালে নিউইয়র্কে অনুষ্ঠিত ‘হুমায়ূন মেলা’ ছিল তাঁর জীবনের সেরা অনুষ্ঠান। সেসময়ে কর্মরত জাতিসংঘের স্থায়ী প্রতিনিধি ইফতেখার আহমেদ চৌধুরী প্রায়ই আমাকে ঐ অনুষ্ঠানের জন্য অভিননন্দন জানাতেন। দুসপ্তাহের মধ্যে হুমায়ূন আহমেদ-এর শতাধিক বইয়ের প্রদর্শনী, চলচ্চিত্র প্রদর্শন, হুমায়ূন আহমেদ-এর গানের অনুষ্ঠান, হুমায়ূন আহমেদ এর মঞ্চ নাটক, হুমায়ূন আহমেদ-এর গল্পবলা নিয়ে অনুষ্ঠিত ঐ ‘হুমায়ূন মেলা’ নিউইয়র্কবাসী তথা বাংলাভাষাভাষী মানুষের কাছে অমলিন হয়ে থাকবে। 
২. 
১৯৯৬ সালে আমেরিকায় বইমেলা উদ্বোধন করলেন হুমায়ূন আহমেদ। সারাদিন মুষলধারে বরফ পড়ছে। তখন বইমেলা হতো ফেব্রুয়ারীর শেষদিকে। প্রচন্ড তুষারপাতের মধ্যে (১২ ইঞ্চির উপর তখন বরফ পড়েছিল)  উদ্বোধনের সময় লোকজন থাকবে কিনা সন্দেহে ছিলাম। সন্ধ্যা ৮টায় উদ্বোধন। হুমায়ূন আহমেদ পৌনে ৭টায়  মিলনায়তনে আসলেন। ৩০ মিনিটের মধ্যে শত শত হুমায়ূন ভক্ত ঘিরে ধরলেন তাদের প্রিয় লেখককে। অটোগ্রাফ শিকারীদের কবল থেকে উঠে ফিতা কেটে বইমেলা উদ্বোধন করলেন তিনি। আবার অটোগ্রাফ দিতে বসলেন। একজন পাঠক গোটা ৩০ বইতে স্বাক্ষর করালেন। অপেক্ষারতরা ছিলেন ভীষন বিরক্ত। কিন্তু সেই লাইন আমি কখনো ভুলবোনা। সেদিন একজন কিশোরী এসে বলেছিল ’ স্যার আপনাকে আমি একটু ছুঁয়ে দেখতে পারি? আরেকজন মুখে বলতে পারেননি কিন্তু তাঁর প্রিয় লেখককে স্পর্শ করতে গিয়ে লেখককে ফেলেছিলেন বেকায়দায়। সে যাত্রায় রক্ষা পাওয়ার জন্য হুমায়ূন আহমেদকে সিগারেটের অজুহাতে অটোগ্রাফ দেয়া থেকে উঠে যেতে হয়। 
হঠাৎ করে একদিন বিশেষ খামে একটি চিঠি এলো মুক্তধারায়। বিশেষ কতগুলো নথিপত্র  সমেত। চিঠিটা খোলা হলো। আমেরিকার লস এঞ্জেলেসের একটি জেলখানা থেকে। একজন বাঙালি জেলখানা থেকে মুক্তধারায় চিঠি লিখেছেন হুমায়ূন আহমেদের ২০১০ সালে প্রকাশিত বই চেয়ে। মানে পাঠকের আগের বইগুলো পড়া। জেলখানা থেকেও হুমায়ূন আহমেদের বই পড়ার আকুতির কথা কি কখনো ভোলার?
 
এরকম আরো অনেক ঘটনা। আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ যাচ্ছেন, ইমিগ্রেশন পার হচ্ছেন। বাঙালী ইমিগ্রেশন অফিসার এসে সালাম করে হতবাক করে দিলেন বা প্লেনে ওঠার পর ককপিঠে প্লেন চালক সিগারেট খাওয়ার জন্য স্যারকে আমন্ত্রণ জানাচ্ছেন। কত রকম ঘটনা। এ রকম আরো উল্লেখ করার মতো  মজার ঘটনা  আছে যা এই বরেণ্য লেখকের জীবনে।
৩.
হুমায়ূন আহমেদ আসলেন ক্যান্সারের চিকিৎসা করাতে আমেরিকায়। লেখা শুরু করলেন ‘প্রথম আলো’ এবং ‘কালের কন্ঠে’। নিজের মৃত্যুর কথা নিয়ে এমন রসিকতা (রসবোধ) করলেন তাতে পাঠকরাই শিউরে উঠলেন। অসুস্থতার মধ্যেও লেখা ও পাঠ করেই কাটছে তাঁর সময়।  এক কলামে লিখলেন নিউইয়র্ক লেখক গাজী কাশেমের বইয়ের কথা।  আমেরিকা প্রবাসী বাঙালি লেখককুল  হুমায়ূন আহমেদের কাছে পাঠিয়েছেন তাদের গ্রন্থ। শ’ পাঁচেক বই ইতিমধ্যে পৌঁছে গেছে তাঁর হাতে। এটি এক অনন্য উদাহরণ,  শুধু সব বয়সী পাঠকদের কাছে নয় নবাগত লেখকদের কাছেও তিনি সমান  জনপ্রিয়। গত ৪০ বছরের এই ঈর্ষণীয় জনপ্রিয়তার সুগভীর রহস্য শুধু তিনিই জানেন। আমরা শুধু স্মরন করতে পারি তাঁর হিরন্ময় কিছু কাজ্। 
 
নন্দিত নরকে, শংখনীল কারাগার লিখে সাড়া জাগিয়ে সত্তর দশকের শুরুতে বাংলা সাহিত্যাকাশে তাঁর যাত্রা। এরপর এক এক করে তাঁর সুনিপুণ লেখনীতে সৃষ্টি করেছেন মিসির আলী, হিমুর মত চরিত্র। আবার মুক্তিযুদ্ধের উপর লিখেন বিশাল ক্যানভাসের ‘জোৎ¯œা ও জননীর গল্প’। ইতিহাস ভিত্তিক উপন্যাস মধ্যাহ্ন ও বাদশাহ নামদার বাংলাদেশের সীমানা ছাড়িয়ে পশ্চিমবঙ্গে সমানভাবে সমাদৃত। আত্মজৈবনিক লেখা আমার ছেলেবেলা, কিছু শৈশব, বল পয়েন্ট, ফাউন্টেন পেন, কাঠ পেন্সিল এবং সর্বশেষ রং পেন্সিল পাঠকদের আগ্রহের নতুন সংযোজন। ‘দেয়াল’ প্রকাশিত হবার আগেই তাঁর লেখনীর যাদুকরী স্পর্শে করেছে দেশব্যাপী বিশাল আবেদন। হয়তো দেয়ালই হয়তো তাঁর লেখা শেষ বই। আমার যতদূর মনে পড়ে হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন তাঁর মৃত্যুর পর তাঁর অনূদিত কোরান শরীফ প্রকাশিত হবে। সেটি এখন কোথায় এবং কোন অবস্থায় রয়েছে সেটাও অনুসন্ধিৎসু পাঠকদের আগ্রহের বিষয়।
 
বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পে হুমায়ূন আহমেদ একটি প্রতিষ্ঠান। যে প্রকাশকই আর্শীবাদ পেয়েছেন, সেই হয়ে ওঠেছেন সেময়ের সফল প্রকাশক। যেমন একসময় ছিলো খান ব্রাদাস, তারপর অবসর প্রকাশনা, এরপর সময়। সর্বশেষ অন্যপ্রকাশ। হুমায়ূন আহমেদের আর্শীবাদেই বাংলাদেশের প্রকাশনা জগতে গড়ে উঠেছে বড় বড় প্রকাশনা সংস্থা। তাই তাঁর অসুস্থতায় প্রকাশক ও প্রকাশনা শিল্পে নামে বিষাদের ছায়া। 
 
এতো গেল বাংলাদেশের কথা। এবার দেখা যাক পশ্চিমবঙ্গের দিকে। নব্বইর দশক থেকে শুরু হয় পশ্চিমবঙ্গে হুমায়ূন আহমেদরে গ্রন্থ প্রকাশ। বিখ্যাত প্রকাশনা সংস্থা মিত্র এন্ড ঘোষ প্রকাশ করেছে এইসব দিনরাত্রীর মত গ্রন্থ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে প্রকাশিত শারদীয় দেশ পত্রিকায় পর পর কয়েক বছর প্রকাশিত হয় হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাস। আমার জানা মতে দেশ পত্রিকায় এ যাবৎ আর কোন লেখকের পর পর ৩ বছর কোন উপন্যাস প্রকাশ হয়নি। এটা তাঁর জনপ্রিয়তারই স্বীকৃতি।
 শিল্প সংস্কৃতির নানা শাখায় হুমায়ূন আহমেদ প্রবাদপ্রতীম। তাঁর এই সব দিনরাত্রি, কোথাও কেউ নেই, বহুব্রীহি, অয়োময়, আজ রবিবার এর মতো ধারাবাহিক নাটক যেমন মানুষের হৃদয়ে চির জাগরুক তেমনি নিমফুল, অচিন বৃক্ষ, আজ আমাদের ছুটি এখনো মানুষ খুঁজে বেড়ায়। হুমায়ূন আহমেদ-এর শংখনীল কারাগার গ্রন্থের মতো চলচ্চিত্রেও অমর সৃষ্টি। পরিচালনা করেছেন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক চলচ্চিত্র আগুণের পরশমণি, সৃষ্টি করেছেন নতুন ইতিহাস। আবার গ্রামবাংলাকে উপজীব্য করে সৃষ্টি করেছেন শ্রাবণ মেঘের দিনের মত অসম্ভব জনপ্রিয় চলচ্চিত্র।
 
আসলে সাহিত্য-সংস্কৃতি যে শাখায় তাঁর হাত পড়েছে সেখানেই তিনি সোনা ফলিয়েছেন। 
সংগীতের ক্ষেত্রে তিনি হাছন রাজাকে করেছেন ব্যাপক জনপ্রিয়। শাহ আব্দুল করিমসহ বিভিন্ন শিল্পীকে তুলে এনেছেন প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে। আবার যখন নিজে গান রচনা শুরু করলেন, সৃষ্টি করেছেন অসাধারণ কিছু গান: এক যে আছে সোনার কন্যা, ও আমার উড়াল পঙ্খী, বরষার প্রথম দিন, আমার ভাঙা ঘরের ভাঙা চালা, চাঁদনী পসর রাতে  আমার মরণ, যদি ডেকে বলি এসো হাত ধরো, কে পরাইল আমার চোখে কলঙ্ক কাজল ... নামক অমর গীতিকথা।
 
পাদটীকা
২০১২ সালের ১২ জুন বেলভ্যু হাসপাতালে বাংলা ভাষার নন্দিত লেখক হুমায়ূন আহমেদের কোলনে অস্্েরাপচার। ১৯ জুন বেলভিউ হাসপাতালে সফল অস্্েরাপচার শেষে হাসতে হাসতে ওজোন পার্কের বাড়ীতে ফেরা। পরের দিন চেয়ার থেকে পড়ে যাওয়া। পড়ে যাওয়ার ১৫ ঘন্টা পর ২১ জুন সকালে হুমায়ূন আহমেদকে হাসপাতালে নেয়ার চেষ্টা। পথিমেধ্যে এ্যম্বুলেন্স ডাকা। অস্ত্রোপচারের সেলাই খুলে যাওয়ায় হুমায়ূন আহমেদ এর পেটের ব্যথা বৃদ্ধি পেতে পেতে সহ্য সীমার বাইরে চলে যায়। যার ফলে গাড়ী থেকে ফোন করতে হয় ৯১১ (হাসপাতালের জরুরী বিভাগে)। এ্যাম্বুলেন্স কর্তৃক ২১ জুন সকাল ১১টা ১৫ মিনিটে জ্যামাইকা হাসপাতালের জরুরী বিভাগে ভর্তি। সেখানে প্রায় ১০ঘন্টা বিনা চিকিৎসায় পড়ে থাকা। (শুধুমাত্র সিটি স্ক্যান করা ছাড়া আর কিছুই করা হয়নি তাঁর)। এরপর বিকেল ৫টায় প্রাইভেট এ্যম্বুলেন্সে করে বেলভিউ হাসপাতালে নেয়া। রাত ৯টা ২৮ মিনিটে বেলভ্যু হাসপাতালে পুণরায় ভর্তি। ভোর রাতে বেলভিউ হাসপাতালে করা হয় সেই লিক মেরামত করার জন্য  অস্্েরাপচার। ৩০ জুন থেকে হুমায়ূন আহমেদ-এর ১০০ শতাংশ ভেন্টিলেশন সাপোর্টে থাকা। প্রচন্ড ব্যথা, যন্ত্রণায় হুমায়ূন আহমেদ কাটিয়েছেন তাঁর শেষ দিনগুলো। ব্যথা-বেদনায় ছিড়ে ফেলতে চেয়েছেন  তাঁর শরীরে লাগানো তারগুলো। সেই যে জ্যামাইকা হাসপাতাল হয়ে বেলভ্যু হাসপাতালে এলেন এরপর আরো তিনটি অন্ত্রোপচার করা হলো হুমায়ূন আহমেদ এর। অবশেষে ১৯ জুলাই নিউইয়র্ক সময় দুপুর ১টা ২৩ মিনিটে হুমায়ূন আহমেদ এর লাইফ সাপোর্ট খুলে দিলে তিনি মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন। এই কথাগুলো কি কখনো আমরা ভুলতে পারবো? প্রতিবছরই মনে পড়বে স্যার আপনার শেষদিনগুলোর কথা। কি করে আমরা ভুলবো। আপনার ¯েœহ, আপনার ভালোবাসা, আপনার স্মৃতি এখনো জ্বল জ্বলে। এতো কখনো ভুলার নয়। স্মৃতিরোমন্থন আর গভীর শ্রদ্ধায়-ভালোবাসায় চিরদিন আপনার গুণমুগ্ধ হয়েই থাকতে চাই। 
 
(বিশ্বজিত সাহা: সাংবাদিক ও ‘হুমায়ূন আহমেদের শেষদিনগুলো’ গ্রন্থের লেখক)

স্মরণ

Bangla Newspaper, Bengali News Paper, Bangla News, Bangladesh News, Latest News of Bangladesh, All Bangla News, Bangladesh News 24, Bangladesh Online Newspaper
উপরে